Latest News

বিরিয়ানির সঙ্গে বোরহানি, বানাবেন কীভাবে?

সাবিনা ইয়াসমিন রিংকু

মৌসম এখন যাচ্ছেতাই রকমের সুহানি। করোনার মারাত্মক ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন বিদেশে বা ভারতে ঠিক কতটা ছড়ালো বা ছড়াতে পারে, সেসব নিয়ে প্রকৃতির কোনও হেলদোল নেই। আমাদেরও নেই। থাকলে নিশ্চয়ই নিয়ম করে মাস্ক পরতাম! স্যানিটাইজর ইউজ করতাম। সেই দুর্গাপুজোর সময় থেকে এমন গা-ছাড়া ভাব দেখতাম না। প্রকৃতি তার কাজগুলো মোটামুটি ঠিকঠাক করে যাচ্ছে। গ্রীষ্মে বেলি, বর্ষায় কামিনী, হেমন্তে ছাতিম ফুটিয়েছে একেবারে নিয়ম মেনেই। মাঝেমধ্যে অকালবৃষ্টি, ঝড় ইত্যাদি দিয়ে চমক দিয়েছে বটে, কিন্তু সে চমকের পেছনে মানবসভ্যতারই অসভ্য অবদান রয়েছে।
এই মুহূর্তে প্রকৃতির অঙ্গনে মরশুমি ফুল ফোটানোর প্রস্তুতি চলছে। টবের গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা বেড়ে উঠছে তরতরিয়ে। চাষের জমিতে ফুলকপি, বাঁধাকপি, পালং শাকের মস্তানি। আর কিছুদিনের মধ্যে সর্ষে ফুলেরা হলুদ চাদর বিছিয়ে দেবে জমিতে।করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে বেসামাল হওয়া রাজ্য এখন অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে। লোকাল ট্রেন চলছে। যে করোনা সাধারণ মানুষের মনের শক্তি অনেকটা কমিয়ে দিয়েছিল, সেই করোনার ভয়কে কিছুটা জয় করে মানুষ নিত্যদিনের কাজে ফিরেছে।
অটোতে এফএম-এ অরিজিৎ সিং নিতি মোহনকে সঙ্গে নিয়ে গাইছেন, হো লাখো মিলে/ কোই ভি না তুমসা মিলা/ ও মেরা ইয়ে দিল/ তেরি ওর চলতা গ্যয়া না রুকা/ মেরে ইয়ারা… মেরে ইয়ারা… যাঁরা এখনও পর্যন্ত ‘ইয়ারা’ জোটাতে পারেননি, বাড়ি থেকে দেখেশুনে তাঁদের বিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা চলছে। সার্থক রূপায়ণ চলবে সেই টানা ফাল্গুন মাস পর্যন্ত। আশা করি তখন পর্যন্ত মৌসম সুহানি-ই থাকবে এবং করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট কর্নাটকেই ‘রুকে’ যাবে, এ রাজ্যে আসবে না।
ইতিমধ্যে যাঁরা নতুন বউ হয়ে গিয়েছেন তাঁদেরকে শুভেচ্ছা আর যাঁরা নতুন বউ হবেন, তাঁদের আগাম শুভকামনা জানিয়ে রাখলাম।
সেই ‘পরের বাড়ি’ যাবেন-ই যখন, তখন বেশ কিছুদিন আগে থেকেই খানিকটা মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখুন। একটু বুদ্ধি নিয়ে পরের বাড়ির মানুষগুলোকে ম্যানেজ করে নিজের করে নিতে পারলে কিছুদিনের মধ্যেই পরের বাড়িটাই আপনার ‘একান্ত আপন’ হয়ে যাবে। তাই পাকাকথার পরক্ষণেই পরোক্ষ অ্যাকশনে নামুন।
তবে পাকাকথায় স্ট্যাম্প পড়ার আগে হবু শ্বশুরবাড়ি সম্বন্ধে একটু ছানবিন করে নেওয়ার দরকার আছে। প্রচুর খোঁজখবর নেওয়ার পরেও অনেক গোঁজামিলের সন্ধান মেলে আজকাল। তাই বিয়ে করার আগে পাত্র এবং পাত্রপক্ষকে একটু যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন।
যাইহোক, এই সব ঝামেলার অনুসন্ধান পর্ব মিটলে এবং বিবাহ স্থির হলে শ্বশুরবাড়িতে কতজন মেম্বার আছে মনে মনে হিসেব করে নিন। এখন তো আর একান্নবর্তী পরিবার তেমন নেই! তাই আপনার শ্বশুরবাড়ি মাঝারি বা ছোটো মাপের পরিবারের আওতার মধ্যেই পড়া উচিত। যদি একান্নবর্তী পরিবারে আপনার বিয়ে হয় সেটা আপনার জন্য দুর্ভাগ্যের না সৌভাগ্যের সেটা আমি নই, আপনিই ভাল বুঝবেন। যাইহোক, আপনার হবু স্বামী অনাথ না হলে আপনি বিয়ের দিনেই শ্বশুর, শাশুড়ি, একটা ছটফটে আইবুড়ো ননদ অথবা দুটো বিবাহিত ননদ পেয়ে যাবেন। ভাগ্য সামান্য ভালো হলে কলেজে পড়া একটা চমৎকার দেওরও জুটে যেতে পারে কপালে। আর ভাগ্য চরম ভালো হলে সন্ধ্যা রায়ের মত একখান মমতাময়ী জা আর রঞ্জিত মল্লিকের মতোন একজন দেবতুল্য ভাশুরও পেয়ে যেতে পারেন! তবে পুরো ব্যাপারটা-ই আপনার ভাগ্য আর আগের জন্মের কর্মফলের ওপর নির্ভর করবে। শ্বশুরবাড়িতে যতজন সদস্য-ই থাকুক না কেন প্রথমদিকে প্রচুর শ্রম, বুকভরা ভালোবাসা আর বিনম্র শ্রদ্ধা দিয়েও আপনি একসঙ্গে সব্বার মন জয় করতে পারবেন না।
নববধূর হাজার খুঁত বেরোবে। ‘মা কিছু শেখায় নি?’– কথাটা নিঃশব্দে অথবা সশব্দে আপনার দিকে তেড়ে আসবে বহুবার। কষ্ট পেলে চলবে না।
শাশুড়ি যখন বলবেন “চাঁদু আমাকে ছাড়া কক্ষনও ঘুমায়নি”….. অবাক কিংবা আপসেট হলে চলবে না। ব্যাপারটা চাঁদুকেই বুঝে নিতে দিন। শোয়ার ব্যাপারটা চাঁদুই সলভ্ করে নেবে। রাত্তিরবেলা নতুন বরের দিকে পিছন ফিরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলেও হবে না। প্রথমবার যখন রঘুনাথগঞ্জে মেজমাসির বাড়িতে দশদিনের জন্য বেড়াতে গিয়েছিলেন,অস্বস্তি হয়নি? নিজের মাসি তো! তবুও প্রথম তিনরাত ঘুমোতেই পারলেন না। নতুন জায়গা। মাসির শ্বশুর, শাশুড়িও আপনার কাছে নতুন। অপরিচিত বিছানা। মাসতুতো বোন বুল্টির পাশে শুয়ে না ঘুমিয়ে তার নাকডাকা শুনে গেলেন ভোর পাঁচটা পর্যন্ত। অথচ ফেরার দিন কী মনখারাপ!
যে হস্টেলে প্রথমবার পা রেখে আপনার মনে হয়েছিল জেলখানা, ছেড়ে আসার সময় ওই জেলখানাটাকে মনে হয়নি নিজের বাড়ি? সমস্ত কয়েদিদের জন্য ডুকরে ডুকরে কাঁদেননি? শ্বশুরবাড়িটাও ওইরকম। প্রথম প্রথম অচেনা অজানা অসহায় লাগবে। তবে একবার গেঁড়ে বসে পড়তে পারলেই শিকড়ফিকড় গজিয়ে আপনি নিজেই যে কখন একটা বৃক্ষ হয়ে উঠবেন, বুঝতেই পারবেন না! আপনার মায়ামাখা ছায়ায় জিরিয়ে নিতে নিতে শ্বশুর হয়ে যাবেন বাবা। শাশুড়ি হয়ে যাবেন মায়ের মতো। আর হ্যাঁ! শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার আগে বিরিয়ানি রান্নাটা ভাল করে রপ্ত করে নিন। বিরিয়ানি ভালবাসে না এমন পাষাণ খুব কম-ই আছে পৃথিবীতে। ওই একটামাত্র রান্না দিয়েই আপনি জাঁদরেল শ্বশুরবাড়ির সব্বাইকে বশ করে নিতে পারবেন।
তবে সদ্য বিয়ে মানে যে শুধুই রোমান্স- এ ভুল ধারণাটা ভেঙে ফেলে তারপরেই বিয়ের পিঁড়িতে বসুন। কারণ তোমার হৃদয় আমার হোক বলার সঙ্গে সঙ্গে ওঁর দাঁতের পায়োরিয়াটাও আপনার হয়ে যাবে। কবুল বলার পরমুহূর্তেই আপনার লুকোনো দাদ হাজা চুলকানিটাকেও কবুল করে নিতে হবে। খালি সুখ-দুখ ঘর-বিছানা নয়, গায়ের গন্ধ, সু-অভ্যাস বদভ্যাস… সব নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিতে হবে।
যখন আপনার গা থেকে নতুন বউয়ের গন্ধ বেরোচ্ছে,যখন সকাল থেকেই মনটা খুব হু হু… তখনই আপনার কর্পোরেট স্বামী বলে উঠবেন ‘আমার জাঙিয়াটা যেন বিছানার চাদরের সঙ্গে গরম জলে ভিজিয়ে দিও না।
ইলাস্টিক নষ্ট হয়ে যাবে।’ আপনি ধাক্কা খাবেন।
আপনিও কিন্তু ধোয়া তুলসি পাতাটি নন। যখন আপনার স্বামী আপনাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফিরে পেছন থেকে আপনাকে জাপটে ধরবেন ব’লে পজিশন নিচ্ছেন, ঠিক তখনই জানলা দিয়ে কৃষ্ণচূড়াগাছটার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে অবচেতনমনে আপনার নাক খোঁটা দেখে তিনিও ধাক্কা খাবেন। যেন গালে টোল ফেলা মেয়ে নাক খুঁটলে গজব নেমে আসবে!
সংসারও এক প্রকার পাঠশালা। কিছুদিন সংসার করার পর কুচুটে, মুখে মধু বুকে বিষ, ভালো, খুব ভালো, দেবীর মতো ভালো… এমন নানা সার্টিফিকেট মিলবে। জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত হবে। বাস্তবের মাটিকে সম্পূর্ণভাবে ছুঁয়ে ফেলবেন আপনারা দুজন। কখনও কঠোর, কখনও রোম্যান্টিক ধাক্কা খেতে খেতে সময় পাখির পালকের মতো ছুঃমন্তরে উড়ে যাবে… টেরও পাবেন না। একদিন বারান্দায় পাশাপাশি বসে হিসেব কষলে অবাক হয়ে দেখবেন সেই গালে টোল ফেলা যুবতীটি কখন যেন ৬৫ তে পা রেখেছেন। আর অক্ষয় কুমারের মত বলিষ্ঠ যুবকটি আজ ৭০। একজনের সঙ্গে এতটা বছর কাটিয়ে দেওয়া মুখের কথা নয়। আর সেই মুখরক্ষার ব্যাপারে বিরিয়ানির অবদানের কথা ভুললে কিন্তু চলবে না।
খুব কঠিনভাবে, জোরালো প্যাঁচে ফেলে বিরিয়ানির রেসিপি দেওয়াই যায়। কিন্তু নবাগতা বা হবু বধূদের মিষ্টি মুখের দিকে তাকিয়ে খুব সহজ পদ্ধতিতে বিরিয়ানি বানানোর রেসিপি দিলাম।

চিকেন বিরিয়ানিউপকরণ: চিকেন ৫০০ গ্রাম, বাসমতি চাল ৪০০ গ্রাম, টকদই ছোট্ট এক কাপ, আদা রসুন বাটা, ঝিরিঝিরি করে কাটা পেঁয়াজ ২ টো, আলুবোখারা ৪ টি, এক কাপ দুধ, বিরিয়ানি মশলা, মিঠা আতর, জাফরান, কেওড়া জল, নুন, সাদা তেল।প্রণালী: আলু বেশ বড় বড় করে কেটে নুন, এক চিমটে জাফরান আর দুটো আলুবোখারা দিয়ে অল্প জলে সেদ্ধ করে ভেজে রাখুন।
চিকেনের বড় বড় পিস সাদা তেলে পেঁয়াজ, আদা রসুন, লংকার গুঁড়ো, নুন আর টকদই দিয়ে রান্না করে নিন।
চাল আধঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে তারপর ফুটন্ত জলে নুন এবং গোটা পাঁচেক লবঙ্গ ফেলে ওই জলে চালগুলো ৭০ পার্সেন্ট সেদ্ধ করে নিয়ে জল ছেঁকে ভাতটা রেখে দিন।
এবার একটা তলাভারী পাত্রে ঘি তেল মিশিয়ে গরম করে একটা মাঝারি সাইজের পেঁয়াজের বেরেস্তা করে তুলে রাখুন। ওই তেল ঘিয়ের মধ্যে পাতিলেবুর রস চিপে দিন । মাংসের অর্ধেক ঝোল দিন । মাংসগুলো পাত্রের মধ্যে সাজান। মাংসের ওপর আলু সাজান। একটু বেরেস্তা ছড়িয়ে দিন। বিরিয়ানি মশলা দিন খানিকটা। একটু কেওড়ার জল দিন। আলুর সঙ্গে সেদ্ধ হওয়া আলুবোখারার সঙ্গে বাকি দুটো আলুবোখারাও দিয়ে দিন । এবার ওপরে ভাতের পরত দিন। তার ওপরে দিন বিরিয়ানি মশলা,দুধ। মাংসের বাকি ঝোলটুকুও দিয়ে দিন। জাফরান গোলা দিন। দুফোঁটা আতর দিন। একটু কেওড়া জল আর বেরেস্তা দিয়ে হাঁড়ি বা ডেকচির ঢাকনা আটার লেই দিয়ে এয়ারটাইট করে দিন।
গ্যাসে চাটু বসিয়ে তারপর বিরিয়ানির পাত্রটি রেখে ঢিমে আঁচে আধঘণ্টা দমে বসিয়ে রাখুন। আরও আধঘণ্টা পর সার্ভ করুন।

 

বোরহানি
উপকরণ: টক দই, বিটনুন, সাদা নুন, কাঁচালঙ্কা বাটা, পুদিনাপাতা বাটা, সামরিচ গুঁড়ো।প্রণালী: সব উপকরণ একসঙ্গে নিয়ে ডাল ঘুঁটনি দিয়ে খুব ভালো করে ঘুঁটে নিতে হবে । তারপর সুতির কাপড়ে ছেঁকে নিয়ে বিরিয়ানির সঙ্গে বোরহানি পরিবেশন করতে হবে।

 

লেখিকা পেশায় স্কুলশিক্ষিকা, ভালোবাসেন রকমারি রান্না আর রন্ধনবিষয়ক আড্ডা।

 

বাংলার হেঁশেল (ফুলকপির জোড়া রেসিপি)

You might also like