Latest News

গরমের জোড়া সহজপাচ্য রেসিপি

সাবিনা ইয়াসমিন রিংকু

রমজানের সময়ে মুসলিম এলাকাগুলোতে খাবার বিক্রিবাট্টার সময় বদলে যায় এক মাসের জন্য। অন্যান্য সময়ে সকালবেলায় স্থানীয় হোটেলগুলোর পুরি, আলুভাজা, টিকিয়ার গন্ধে যেভাবে সারা মহল্লা ম ম করে, রোজার সময় বেলা নটাতেও সেই হোটেলগুলোর ঝাঁপ খোলে না। ভেতরে তখন কর্মচারীরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। বাইরের উনুনের বাসি ছাই তখনও ফেলে দেওয়া হয়নি। ওই উনুনেই যে সারারাত ধরে মোষের দুধ জ্বাল দিয়ে মোটা সর ফেলার বন্দোবস্ত চলেছিল সেটা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারার কোনও উপায় নেই। এক ভাঁড় দুধ ২০ টাকা। রোজা রাখা পুরুষরা রাত ৩ টের সময় এক হাতা গরম ভাত, একটু গাওয়া ঘি, দু চার রকম ভর্তা খেয়ে ঘর থেকে রাস্তায় নেমে এক ভাঁড় দুধ খেয়ে মসজিদের দিকে রওনা হন। সব পুরুষরাই নির্দয় নন। কোনো কোনো স্ত্রী-প্রেমী পুরুষ নামাজের পর বাড়ি ফেরার পথে এক ভাঁড় গরম দুধ বিবির জন্য নিতে ভোলেন না। কিন্তু যাঁরা ওই হোটেলের বেঞ্চে বসেই ভাঁড়ে চুমুক মেরে ভইসের দুধ খান,সেই ভাঁড়গুলো প্লাস্টিকের বিশাল বড় ডাস্টবিন থেকে খুব সকালে উঠিয়ে নিয়ে যায় কর্পোরেশনের ঝাড়ুদার। মাঝরাতে হোটেল ব্যবসা কতোটা জমজমাট হতে পারে নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত। ঈদের পটভূমিকা রচনা করে এই রমজানের পুরো মাসটা। উৎসবের মেজাজ মাঝরাতে শুরু হয়ে যায়। রাত একটা থেকে পুরি, রুটি, সবজি, গোস্ত, পায়া, কলেজি ভুনার খুশবুতে মানুষের ঈমান নষ্ট হওয়ার জোগাড় হয়। ভোরবেলার আজানের পর এক ফোঁটা পানিও আর খাওয়া যাবে না। কিন্তু তখনও যে বেয়াড়া বাতাসে ভেসে বেড়ায় পোড়া কাবাব আর নানারকম বেহেস্তি টাইপের রান্নার খুশবু। সংযম বড় কঠিন জিনিস। সংযমী হওয়া আরও বেশি কঠিন। (Food Blog)

রোজার দিনে উপবাস রাখা মানুষগুলোর মত বাজার এবং দোকানগুলোও সারাদিন ধরে ধুঁকতে থাকে। কেমন যেন মনমরা! বিকেল হতে না হতেই প্রাণে হাওয়া লাগে দোকান বাজারগুলোতে। ফলের ঠেকের সামনে ভিড় জমতে শুরু করে। গ্রীষ্মে তরমুজ,শসা আর পাকা পাপিতার চাহিদা তুঙ্গে।
গরমকালে পল্লীর দিকে বরফের চাহিদাও দেখার মত। এখনও ওদিকে আইসক্রিম ফ্যাক্টরির দু চারটে অস্তিত্ব আছে । যেখানে কাঁচা রং মেশানো ইটের মতো শক্ত আইসক্রিম পাওয়া যায়। খাওয়ার পর জিভের রং হয়ে যায় লাল কিম্বা গাঢ় সবুজ। বাঁশের কাঠি গোঁজা সেই আইসক্রিমের স্মৃতি আমাদের অনেকের কাছে এখনও সযত্নে রক্ষিত। প্রচণ্ড মিষ্টি দেওয়া রংদার বরফের শক্ত আইসক্রিম। মায়েরা বলতেন নর্দমার জল দিয়ে নাকি ওই আইসক্রিম তৈরি হতো! ধুস! আমরা বিশ্বাস করতাম না সে কথা। সেই আইসক্রিম ফ্যাক্টরির সামনে রমজান মাসে এখনও লম্বা লাইন পড়ে। সূর্য পাটে যাওয়ার কিছুক্ষণ আগে মানুষজন একটা টিফিনবক্স টাইপের কিছু হাতে নিয়ে পাঁচ বা দশ টাকার বরফ নেয়। এখন পাঁচ বা দশ টাকায় একটা মাঝারি মাপের বরফের চাঙড় পাওয়া যায় কি না জানি না। আমি যখনকার কথা বলছি তখন পাওয়া যেত। তখন পাড়াগাঁয়ে ফ্রিজ বা খাবার ঠান্ডা রাখার মেশিন ছিল না বললেই চলে। প্রচণ্ড দাবদাহের দিনে ওই বরফ মেশানো ঠাণ্ডা শরবতের ওপর তীব্র আকর্ষণ ছিল উপোস করে থাকা মানুষজনের। কয়েক চামচ চিনি বা কয়খান বাতাসা গুলে ওর মধ্যে লেবু চিপে দিলেই অমৃত। আল্লাহর অসীম করুণার গুণগান গাইতে গাইতে এক একটা রোজার দিন পার করে দেওয়া অসাধ্য ছিল না।

এখন তো রমজান মানেই শহর আর শহরতলীর অলিতে গলিতে বিশাল হাঁড়িতে হালিমের হালুম হুলুম। রমজান এসেছে সেটা বিকেলের হালিমগন্ধি বাতাস গুজবের মত চারদিকে রটিয়ে দেয়। মুসলিম এবং অমুসলিম- সবার মনই হালিমের জন্য উথালপাথাল হয়। উথালপাথাল মনগুলোকে সারানোর দায়িত্ব নেয় নামকরা রেস্টুরেন্ট এবং অখ্যাত হোটেলগুলোও। নানানরকম ডাল আর মাংস ফোটে ইয়া বড় হাঁড়িতে। বিরিয়ানির হাঁড়ির মতো সেই হাঁড়িরও বিশাল গতর। ডাল এবং মাংসের সঙ্গে হালিমের মশলা মিশলে সে এক জঘন্য কাণ্ড ঘটে। যে কিশোর বা কিশোরী তার জীবনের প্রথম রোজাটি রেখেছে তারা বারবার ঘড়ি দ্যাখে। এখনও এক ঘণ্টা সাতান্ন মিনিট!! এইটেই তো রোজার একটা অন্যতম পাঠ। চারিদিকে নানান লোভনীয় খাবার দেখলে এবং খাবারের গন্ধ নাকে গেলে যাদের পেটে দুবেলা ঠিকমতো খাদ্য জোটে না, তাদের ঠিক কী অবস্থা হয় এই বিষয়টা অনুভব করতে পারলে মানুষ আর কোনোদিনও একা একা খাবে না। দিয়ে থুয়ে খাবে। শুধু রোজার একমাস ভালো কাজ করব, দান করব, সত্যি কথা বলব, লোকের পেছনে বদনাম করব না, কাউকে কষ্ট দিয়ে কথা বলব না, ঘুষ খাব না; আবার রোজার কোটা শেষ হয়ে গেলে আমি যা ছিলাম… তাই হয়ে উঠব… এমন মানসিকতা থাকলে রোজা না রাখাই ভালো। টানা একমাস ভালো কাজ করতে করতে যদি অভ্যাসটাই না গড়ে ওঠে তাহলে রোজার সকল মাহাত্ম্যই নষ্ট হয়ে যায়।

রোজার হালিম

রোজার সময় থুতু গিলতে নেই…. এসব কথার কোনো ভিত্তি নেই। এগুলো অপপ্রচার । চারদিকে পিচিক পিচিক করে থুতু ফেলে দৃশ্য দূষণ ঘটিয়ে ,পরিবেশ নোংরা করে ধর্ম পালনের কথা ইসলাম ধর্মে কোথাও বলা নেই। কিছু মানুষের অজ্ঞানতা,অন্ধত্ব ,বাড়াবাড়ি থেকে এই জঘন্য ব্যাপারগুলোর জন্ম হয়েছে। এগুলো ইসলাম ধর্মকে আরো কালিমালিপ্ত করেছে।
রোজা একজন মুসলিমকে সৎ এবং সত্য পথে থাকার নির্দেশ দেয়। ত্যাগের মধ্যেই সব আনন্দ লুকিয়ে আছে…. এটাই রমজান মাসের অন্যতম প্রধান বার্তা।
পবিত্র রমজান মাসের অগ্রিম শুভেচ্ছা রইলো। রোজার মূল উদ্দেশ্যগুলো আত্মস্থ ক’রে আমরা যেন প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে পারি।

হালিমের রেসিপি অন্য দিন দেব। বেশ গরম পড়ে গিয়েছে। জিনিসপত্রের দামও আগুন গরম। এখন সস্তা অথচ সহজপাচ্য রেসিপির কথাই বেশি করে ভাবা উচিত। আজকে তেমনই দু খানা রেসিপি রইলো।

পাঁচমেশালি খোসা ভাজা

উপকরণ: ঝিরি ঝিরি করে কাটা পটলের খোসা, আলুর খোসা, মিষ্টি কুমড়োর খোসা, বেগুনের খোসা, লাউয়ের খোসা। ঝিরি ঝিরি করে কাটা একটা বড় সাইজের পেঁয়াজ, অনেকগুলো কাঁচালংকা, এক চা চামচ কালোজিরে, নুন, হলুদ গুঁড়ো, সর্ষের তেল অল্প।

প্রণালী: খোসাগুলো অনেকক্ষণ ধরে জলে ভিজিয়ে রেখে তারপর জল ঝরিয়ে ঝিরি ঝিরি করে কেটে নিতে হবে। পেঁয়াজ কেটে নিতে হবে। কাঁচালংকা চিরে রাখতে হবে।
কড়াইতে সর্ষের তেল গরম করে কালোজিরে এবং কাঁচালংকা ফোড়ন দিতে হবে। তারপর বেগুনের খোসা বাদ দিয়ে বাকি খোসাগুলো ঢেলে দিতে হবে। নুন, হলুদ দিয়ে নেড়েচেড়ে ঢেকে দিতে হবে। ঢাকা খুলে বেগুনের খোসা দিতে হবে। খোসাগুলো একেবারে গলিয়ে গদগদে করে দিলে হবে না। বেশ ক্রাঞ্চি থাকবে। এটা ভাতের সঙ্গে খেতে খুব ভালো হয়।

কাঁচকলার কোপ্তাকারি

উপকরণ: দুটো কাঁচকলা, পেঁয়াজ বাটা, রসুন বাটা, টমেটো বাটা, কাঁচালংকা বাটা, নুন, হলুদ গুঁড়ো, লংকার গুঁড়ো, ধনে গুঁড়ো, জিরে গুঁড়ো, আস্ত জিরে, দুটো শুকনো লংকা, গরম মশলা গুঁড়ো, দুই চা চামচ ময়দা,পরিমাণ মতো সর্ষের তেল।

প্রণালী: কাঁচকলার কোপ্তা বানাতে অনেকে সেদ্ধ আলু ব্যবহার করেন । এই রেসিপিতে আলু দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
খোসা সমেত কাঁচকলা দুটো এক চিমটে হলুদ দিয়ে সেদ্ধ করে নিন। সেদ্ধ হয়ে গেলে খোসা ছাড়িয়ে কলা চটকে নিন ভালো করে । খোসাগুলো ফেলে দেবেন না। আয়রনে ভরপুর। উপকারী পেটের রোগের জন্যেও। খোসাগুলো খুব মিহি করে কেটে চটকানো কলা সেদ্ধর মধ্যে মিশিয়ে হাতের সাহায্যে মসৃণ করে মেখে নিন। ওর মধ্যে পেঁয়াজ বাটা,রসুন বাটা, কাঁচালঙ্কা বাটা,নুন,জিরে গুঁড়ো, ধনে গুঁড়ো,গরম মশলার গুঁড়ো এবং ময়দা মিশিয়ে কোপ্তার আকারে গড়ে অল্প তেলে ধৈর্য সহকারে ভাজুন। সোনালী রঙ ধরলে বড়াগুলো তুলে নিন। ওই কড়াইতেই তেল দিন। ইচ্ছে হলে এক চা চামচ ভালো ঘি তেলের সঙ্গে মিশিয়ে দিতে পারেন। তেল গরম হলে জিরে আর শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিন। ফোড়নের সুগন্ধ বেরোলে পেঁয়াজ বাটা দিন। ভাজা ভাজা হলে রসুন বাটা এবং সমস্ত গুঁড়ো মশলা দিয়ে দিন। ভালো করে কষান। এরপর টমেটো বাটাটাও দিয়ে দিন।কষিয়ে যান। মশলা কষার ভালো গন্ধ বেরোলে একটু জল দিন। ঝোল ফুটে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কাঁচকলার কোপ্তাগুলো ঝোলের মধ্যে আস্তে আস্তে করে ছাড়ুন। গরম মশলার গুঁড়ো ছড়িয়ে কড়াই ঢেকে দিয়ে গ্যাস অফ করুন।

You might also like