Latest News

শীতের দুপুরে জিওল মাছের ভুনা-ভর্তা

সাবিনা ইয়াসমিন রিংকু

যেসব মাছবিক্রেতারা ট্যাঙ্কিতে চ’রে বেড়ানো জ্যান্ত মাছ বিক্রি করে থাকেন, তাঁদের কাছে খাবি খাওয়া চারাপোনা, মৃগেলের বাচ্চা, বাটা, নাইলনটিকা, জ্যান্ত তেলাপিয়া থাকে। অন্য একটা ট্যাঙ্কিতে থাকে অস্থির মানসিকতার শোল, চ্যাং, ছিমড়ি অথবা ল্যাটা। পাকা শোলের দাম সাড়ে চারশো টাকা পর্যন্ত উঠে গেলেও ল্যাটা বা চ্যাং-এর দাম ২০০ টাকার মধ্যেই ঘোরাফেরা করে। ইদানীং সেও ২৮০ বা ৩০০ ছুঁয়েছে। মহৎ হৃদয়ের শোল নিজের পাশে ল্যাটাকে জায়গা দিলেও কইমাছ কিন্ত ল্যাটা বা শোলের পাশে বসতে চায় না। অথচ ক্যানিংয়ের মাছবাজার থেকে মাছবিক্রেতা কইগুলোকে জোরজবরদস্তি করে শোল-ল্যাটার সঙ্গে এমনভাবে চেপেচুপে বেঁধেছেঁদে নিয়ে আসেন যে সে মুহূর্তে বংশমর্যাদায় গর্বিত কইয়ের টুঁ শব্দটি করার জো থাকে না। তবে কলকাতার স্থানীয় বাজারে পৌঁছনোর পর তাদের বাঁধন আলগা হলেই তারা লাফালাফি শুরু করে দেয়। শোলমাছ লাফায় কম, পিছলে যায় বেশি। অহংকারের চেয়ে দুষ্টুমির ভাবটা বেশি থাকে। মাছ বিক্রেতার হাত ফসকে বার বার এদিক সেদিক চলে গিয়ে লোকের নজর কাড়ার একটা দুর্নিবার প্রচেষ্টা থাকে। এইসব কাণ্ডগুলোকে অনেকে ইগনোর করেন এবং সবজিওয়ালা মইদুলের কাছে গিয়ে কাঁচা আমের খোঁজ করেন। সর্ষেবাটা, কাঁচা আম এবং আস্ত শুকনো লংকা দিয়ে শোলের টক দারুণ উপাদেয়। বিশেষ করে গরমকালে। তবে টক ব্যাপারটা পছন্দ না হলে আরও অনেক অপশন আছে। বেগুন এবং বেশি করে জিরের গুঁড়ো দিয়ে কাঁচালংকা সহযোগেও মন্দ লাগে না। চার পাঁচটা কলাই ডালের বড়ি ভেজে ওই ঝোলে ফেলে দিলে স্বাদ আরও খোলতাই হয়।শীতের দিনে শোল, শিঙি, মাগুর… একটু যেন ঘুমের ঘোরে থাকে! ঠান্ডায় এনার্জি কমে যায় যেন! চড়ং বড়ং ভাবটা অত দেখা যায় না। যেসব মাছ ব্যবসায়ীরা খোলা আকাশের নীচে হাটে-বাজারে মাছ বিক্রি করেন, খেয়াল করে দেখবেন শীতের সকালের রোদ্দুরে কেমন মটকা মেরে পড়ে থাকে জ্যান্ত মাছের দল! দেশি শিঙি মাছের লালচে গায়ে পিছলে যায় সকালের রোদ। তবে হাইব্রিড জিওল মাছের গায়ের রং কাদা পাঁকের মতো কালো। রাক্ষুসে গতর। ছোট ছোট চৌবাচ্চায় এদের চাষ করা হয়। মুরগির নাড়িভুঁড়ি এদের প্রিয় খাদ্য। চিকেনের ছাঁট খেয়ে খেয়ে এদের চোখে মুখে কোমল ভাব বলতে আর কিছু থাকে না। চোখদুটো যেন বিজয় দীনানাথ চৌহানের মত সবসময় প্রতিশোধের স্পৃহায় জ্বলছে। খেতে ব্রয়লারের মতোই বিস্বাদ। শিঙি মাছে কাঁটা মারলে আর দেখতে হবে না! আঙুল ফুলে কলাগাছ সঙ্গে জ্বর অবধারিত। মাছওয়ালা না হয় মাছের কাঁটা, শুঁড় যত্ন করে কেটে ঝোলায় ঢুকিয়ে দিলেন, কিন্তু মাছ পরিষ্কার করবে কে? মাছের গায়ে পিচ্ছিল শ্যাওলা চেঁছে তুলে সাদা করে তবেই তো সেই মাছ খাবার যোগ্য হবে! পিঠের রগ দুটোও তো টেনে বের করে ফেলে দিতে হবে! সেয়ানা জবার মা ঝোলা উবুড় করার আগেই ঝোলার ভেতরে মাছের নড়নচড়ন কীভাবে যেন টের পেয়েই বৌদিকে শুনিয়ে দেয় “কাল আঙুলে বোলতা কামড়েচে, মাছ ঘষতে পারবুনি।”
জবার মা তাও তো একরকম! হারুর মা কাজে আসার প্রথমদিনেই ঘোষণা করেছে তাদের বংশে জ্যান্ত মাছ কাটা বাছা, ধোওয়া… এসবের ওপরে চরম নিষেধ আছে। নিষেধ না শুনলে পাপ লাগবে।
এই শীতে নতুন আলু আর টাটকা মটরশুঁটি দিয়ে দেশি শিঙি না খেলে কীসের শীত যাপন! অথবা অল্প মশলায় শিঙিমাছ ভুনা! কিন্তু মাছ ধুয়ে দেবে কে? জোঁকের মুখে নুন দিলে কেবল জোঁকই জব্দ হয় না! মাছও জব্দ হয়। কই, মাগুর, শিঙি, ট্যাংরা মাছকে চটজলদি নিস্তেজ করতে এক খাবলা নুনের খুব শক্তি। একটা গামলায় মাছগুলো রেখে মাছের ওপরে নুন ছড়িয়ে গামলা কিছুক্ষণের জন্য ঢেকে দিলে মাছদের সব মস্তানি একেবারে চুপসে যাবে। তারপর তাদের ধোয়া ঘষা পরিষ্কার করা অনেকটা সুবিধের হবে।
মাছ বিক্রেতা উপকারী, বলকারক, ফ্যাটহীন ৯০০/১০০০ টাকার লালচে শিঙ্গিমাছকে মর্যাদা দিতে তাদের জন্য আলাদা পাত্র বরাদ্দ করেন। তবে তাদের মাঝে দু’চারটে নোনা গুলে মাছওয়ালাদের উদাসীনতায় নিজের গোত্র হারিয়ে শিংদের দলে কীভাবে যেন ভিড়ে যায়।যেসব ক্রেতারা কই, জিওল (মাগুর, শিঙি) মাছের দামের ছ্যাঁকায় পুড়তে থাকেন, অথচ ওই ধরনের এক্সট্রা ফুসফুসওয়ালা মাছের ঝোল খাবেন বলে বদ্ধপরিকর, তাঁদের কাছে একটা মাত্রই অপশন থাকে। ল্যাটা/চ্যাং/ছিমড়ি/টাকি/চাইতন। একই মাছ। অথচ কতোরকম নাম! গায়ে ফুলফুল টাইপের ছাপ নিয়ে শোল মাছের সঙ্গে থেকেও গজাড় তার স্বতন্ত্রতা বজায় রাখে। ঠিক তেমনি হাবেভাবে একরকম হয়েও সাইজে বেশ ছোট এবং লেজে লাল রঙের ঝিলিক নিয়ে উলকো মাছ নিজেকে ল্যাটা বা টাকির থেকে আলাদা করে নেয়।
দুনিয়ার বহু গৃহিণীর ব্ল্যাকলিস্টে শোল এবং ল্যাটার নাম সর্বপ্রথমে থাকে। এই মাছের আকারে এবং হাবেভাবে সাপ গোছের ল্যাকপ্যাকানি থাকায় গৃহিণীরা ভয়ের থেকে ঘেন্না পান বেশি। বাজারে তিন কেজি সাইজের শোল দেখে কর্তার জিহ্বা লকলক করলেও বউয়ের ভয়ে কেনার উপায় থাকে না।
তবে এক একজন দয়ালু গৃহিণী শোলের কালিয়া খাওয়ার জন্য কর্তাকে দু’একদিনের ছাড়পত্র দেন। তবে সেদিন মাছ ধোয়া, ঘষা এবং মাছে নুন,হলুদ, লঙ্কাগুঁড়ো মাখানোর কাজটা অফিস যাওয়ার আগে কর্তাকেই করতে হয়। পেঁয়াজ, আদা-রসুন, গরমমশলা দিয়ে রগরগে কাঁই বানানোর দায়িত্ব পালন করে জবার মা। দু’দিন ধরে সেই মাছ খেতে হয় কর্তাকেই! শোলের কালিয়া দিয়ে কর্তার ভাত মাখার তৃপ্তিজনক মুখটা দেখে গিন্নি গা গোলানোর অ্যাক্টিং করেন এবং কর্তার পাশের চেয়ারে বসে কাটাপোনার ছিবড়ে চিবোন।
অথচ পোড়া শোল বা ল্যাটার ভর্তা গরম ভাতের পাতে এক অন্যমাত্রার রসনাবিলাস। ল্যাটা বা শোলমাছকে কিছুক্ষণ পাতিলেবুর রসে ভিজিয়ে রেখে তারপর ধুয়ে মুছে মাছের গায়ে নুন,হলুদ মাখিয়ে শিকে গেঁথে নিভুনিভু আঁচে ভালো করে পুড়িয়ে গায়ের কালো ছালটা ফেলে দিয়ে কাঁচাপেঁয়াজ, কাঁচালংকা, সর্ষের তেল, নুন, ধনেপাতা,একটু পাতিলেবুর রস দিয়ে মেখে নিলেই রেডি হয়ে যায় পোড়া শোল বা ল্যাটা/টাকি মাছের ভর্তা। আরও দু তিন রকম পদ্ধতিতে ল্যাটা মাছের ভর্তা করা যায়। আর মাঝারি সাইজের ল্যাটামাছগুলোকে বেছে ধুয়ে, চিরে একটু কায়দা করে ভেতরের কাঁটাটাকে বের করে গোটা অবস্থাতেই নুন এবং গোলমরিচের গুঁড়ো মাখিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিতে হবে। তারপর আবার ভালো করে ধুয়ে নুন, হলুদ, লংকাগুঁড়ো মাখিয়ে রেখে দিতে হবে আরও কিছুক্ষণ। ময়দা এবং চালের গুঁড়োতে নুন, হলুদ, কাঁচালংকা কুচি দিয়ে একটা মসৃণ ব্যাটার তৈরি করে মাছগুলো ব্যাটারে চুবিয়ে ছাঁকা তেলে ভেজে নিন। গরমাগরম দু তিনটে শুধু মুখেই খেয়ে নিন। দু একটা পড়ে থাকলে গরম ভাতে ডাল মেখে তার সঙ্গে খান।আমি মাঝেমাঝে লাউয়ের খোসা দিয়ে ল্যাটা/টাকি মাছের ভর্তা বানাই। কড়াইতে সর্ষের তেল গরম করে আদা-রসুনবাটা, জিরেবাটা দিয়ে নুন, হলুদ, লংকাগুঁড়ো মাখানো ল্যাটা মাছের খণ্ডগুলোকে সাঁতলে নিই। তারপর ঠান্ডা করে কাঁটাগুলো বেছে নিই। ল্যাটা বা টাকি মাছে প্রচুর কাঁটা থাকে না। সেটাই ভরসা। ওদিকে লাউয়ের খোসা ঝিরিঝিরি করে কেটে তার সঙ্গে ঝিরিঝিরি করে পেঁয়াজও কেটে রাখি। কড়াইতে খুব অল্প সর্ষের তেল গরম করে একটা শুকনোলংকা ফোড়ন দিয়ে পেঁয়াজসমেত লাউয়ের খোসাগুলোকে কড়াইতে ঢেলে দিই। মাছে নুন দেওয়া আছে বলে খোসাতে খুব বেশি নুন দিই না। হলুদগুঁড়ো, জিরেগুঁড়ো, কাঁচালংকা কুচি, ধনেপাতা কুচি দিয়ে ভালো করে নেড়েচেড়ে খোসাগুলো নরম হয়ে এলে কাঁটা বেছে রাখা মাছগুলো দিয়ে খুব করে নাড়াচাড়া করে একটু জল দিয়ে ঢাকা দিয়ে রেখে দিই কিছুক্ষণ। জল শুকিয়ে এলে এবং ভর্তার আকার নিলে একটু পাতিলেবুর রস চিপে দিয়ে আরো কিছুটা কাঁচালংকা কুচো এবং ধনেপাতা ছড়িয়ে দিয়ে গ্যাস অফ করে দিই।
আপনারা এই সস্তার রেসিপিটা বানিয়ে গরম ভাতের সঙ্গে খেয়ে দেখুন। আমাকে ধন্যবাদ জানাতে বাধ্য হবেন।

এবার শিঙি মাছ পরিষ্কার করার একটা সহজ উপায় আপনাদের বলবো। মাছ ভালো করে পরিষ্কার না করে রান্না করা হলে মাছের ঝোলে চরম আঁশটে গন্ধ থাকবে। খেয়াল করে দেখবেন যারা মাছ খেতে পছন্দ করে না, তারা মাছের কাঁটা এবং আঁশটে গন্ধের অজুহাত দেয়। যে মাছগুলো এক কাঁটার মাছ, সেগুলো ভালো করে পরিষ্কার করে পাতিলেবুর রস এবং নুন মাখিয়ে মাছ ধুলে মাছের গায়ে একটুও আঁশটে গন্ধ থাকে না।মাছ বিক্রেতার কাছ থেকে শিঙি মাছের কাঁটা এবং শুঁড় কাটিয়ে নিয়ে আসবেন। একটা কাঁচা পেঁপেও আনবেন মনে করে। বাড়িতে এনে মাছগুলোতে নুন মাখিয়ে খানিকক্ষণ রেখে দিলে তাদের ভবলীলা সাঙ্গ হবে।
যে কাঁচা পেঁপেটা এনেছিলেন সেটার খোসা ছাড়িয়ে খোসাগুলো মিক্সিতে পিষে নিন। এবার পেঁপের খোসাবাটা মাছগুলোর গায়ে মাখিয়ে দিন ভালো করে। দু ছিপি ভিনিগারও দিন। এবার হাত দিয়ে কচলে কচলে পরিষ্কার করুন। দেখবেন গায়ের সব ময়লা সাফ হয়ে মাছ সাদা হয়ে যাচ্ছে। মাছের পিঠের দুপাশটা একটু চিরে রগদুটো বের করে নিন। এবার দু তিনবার ভালো করে ধুয়ে শিঙি মাছের ভুনা রান্না করুন।

 

শিঙি মাছ ভুনা
উপকরণ: ৪ টে মাঝারি সাইজের শিঙি মাছ, পেঁয়াজ কুঁচি বা পেঁয়াজ বাটা ১ টেবিল চামচ, নুন, হলুদগুঁড়ো, লংকাগুঁড়ো, ধনেগুঁড়ো, জিরেগুঁড়ো, গরম মশলার গুঁড়ো, সর্ষের তেল।প্রণালী: জ্যান্ত মাছ ভেজে রান্না করলে গুণ নষ্ট হয়। তাই মাছ না ভাজাই ভালো। কড়াইতে সর্ষের তেল গরম করে পেঁয়াজ কুচি বা পেঁয়াজ বাটা দিতে হবে।
তারপর গরমমশলা বাদ দিয়ে সমস্ত গুঁড়ো মশলা এবং নুন দিয়ে মশলাটা কষাতে হবে। তারপর ঝোলের জন্য পরিমাণ মতো গরম জল ঢেলে দিতে হবে। ঝোল ফুটলে মাছগুলো দিয়ে কড়াই ঢেকে দিতে হবে। পরে মাছগুলো একবার উল্টে দিতে হবে। মাখোমাখো হয়ে এলে গরমমশলার গুঁড়ো ছড়িয়ে গ্যাস অফ করে দিতে হবে।

 

ল্যাটা মাছের ভর্তা
উপকরণ: মাঝারি সাইজের ল্যাটা মাছ ৪ টে। মাছগুলোর মাথা বাদ দিয়ে ভালো করে ঘষে নুন ও পাতিলেবুর রস দিয়ে ধুয়ে নেবেন। নুন, হলুদ গুঁড়ো, লংকাগুঁড়ো, দুটো বড় পেঁয়াজ ঝিরি ঝিরি করে কাটা, রসুনের কোয়া ৬ টি, শুকনো লংকা ৩ টে।প্রণালী: প্রতিটি মাছের গা একটু একটু করে চিরে দিয়ে নুন হলুদ আর লংকাগুঁড়ো দিয়ে মাখিয়ে রাখবেন ১৫ মিনিট। এবার একটা কড়াইতে অল্প সর্ষের তেল গরম করে মাছগুলো ভেজে নেবেন। খুব কড়া করে ভাজবেন না। ভাজা হয়ে গেলে মাছগুলো তুলে ঠান্ডা করে কাঁটা বেছে নিন। একটু ধৈর্য্যের কাজ। তবে খাবার সময় ধৈর্য্য ধরার সুফল আপনি স্বাদের মাধ্যমে পাবেন।
যে তেলে মাছ ভেজে ছিলেন সেই তেলেই ৩ টে শুকনো লংকা ভেজে নিন। তারপর পেঁয়াজ আর রসুনগুলোও হালকা ফ্রাই করে নিন। এবার মিক্সিতে শুকনো লংকা, অল্প নুন, ভাজা পেঁয়াজ, রসুন আর বেছে রাখা ঝুরো ঝুরো ল্যাটা মাছ দিয়ে মিক্সি ঘুরিয়ে নিন দুবার বা তিনবার। খুব মিহি করবেন না। মিক্সি থেকে বের করে হাতের চেটোয় একটু তেল লাগিয়ে গোল গোল করে পাকিয়ে ভাতের থালার পাশে রেখে দিন।

লেখিকা পেশায় স্কুলশিক্ষিকা, ভালোবাসেন রকমারি রান্না আর রন্ধনবিষয়ক আড্ডা।

বিরিয়ানির সঙ্গে বোরহানি, বানাবেন কীভাবে?

You might also like