Latest News

মন কাড়তে এমন শীতে, বানিয়ে ফেলুন হরেক পিঠে

সাবিনা ইয়াসমিন রিংকু

পিঠে তৈরি করা যে ভীষণ ঝামেলার কাজ, সেটা আজকের মহিলারা বুঝে গেছেন। জিনিসপত্র জোগাড় করা থেকে বানানো পর্যন্ত একটা আস্ত দিন গপ গপ গপাস করে গিলে নেয় পিঠের দল। আগে বাড়ির মেয়েরাই মাথা খাটিয়ে পিঠে বানানোর পাত্র তৈরি করতেন। মাটির খোলার মাঝের অংশ সারারাত ভিজিয়ে রেখে পরদিন নোড়া দিয়ে ঠুকে ঠুকে খোলার মাঝখানটাকে ফুটো করে ধুকি পিঠে বানানোর পাত্র বানিয়ে ফেলতেন। ঢাকনার আশপাশ দিয়ে বাষ্প যাতে না বেরিয়ে যায়, মাপ বুঝে একখান হাঁড়ি চিলেকোঠায় ডাঁই করে রাখা নানান জিনিসপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে খুঁজে আনতেন। তখন চিতই বা আশকে পিঠে, পাটিসাপটা বানানোর জন্য মাটির খোলা ব্যবহৃত হত। একালের ননস্টিক তাওয়া বা কড়াই ব্যবহার করা মেয়েরা অনুভব করতে পারবেন কী, একটা খসখসে খোলা থেকে খুন্তি দিয়ে নিখুঁতভাবে চিতই পিঠে বা পাটিসাপটা তোলা প্রায় সার্কাসের ট্রাপিজের খেলা দেখানোর মতোই ভয় লাগা ব্যাপার ছিল। যদি তাওয়ায় লেগে যায়! যদি ঠিকঠাকভাবে না ওঠে! যদি শাশুড়ি রেগে যান! যদি ট্যারাব‍্যাঁকা পিঠে খেয়ে বাবুর বাবা অশান্তি করে! যদি পাশের বাড়ির মাসিমা এসে গা জ্বালানো কটা কথা শুনিয়ে যান! এতগুলো যদিকে জয় করার পর তবেই পিঠে বানানোর সাধনায় সফল হতেন মফসসলের মেয়েরা।তখন দোকানে চালের আটা কিনতে পাওয়া যেত না। আতপ চাল এবং সেদ্ধ চাল আলাদা আলাদা করে ধুয়ে শুকনো করে ঢেঁকিতে কুটে নিতে হত। গ্রামের সব বাড়িতে ঢেঁকি থাকত না। যাদের বাড়িতে থাকত, তাদের বাড়িতে চাল গুঁড়ো করার জন্য লাইন পড়ে যেত। চালের আটা বানানো হলে নারকেল কোরার পালা। মনে রাখতে হবে পিঠের প্রস্তুতিপর্বে বাড়ির রোজকার রান্নাবান্না, কাপড় কাচা, বাসন মাজা, বাচ্চাদের দেখাশোনার কাজ সব কিন্তু ঠিকঠাকভাবে করতে হত। পৌষ মাসে যেদিন খুব ‘জাড়’ পড়ত, বাসন মাজার পর দু’হাতের আঙুলে আর কোনও সাড় থাকত না, বেছে বেছে সেদিনই বাড়ির গুরুজনেরা পিঠে বানানোর বাই তুলতেন।সাত আট কেজি দুধ জ্বাল দেওয়া হত। কয়েক কেজি চালের আটাতে নুন বা চিনি মিশিয়ে চেলে নিতে হত। পাটালি জ্বাল দিয়ে তরল করে অথবা শিলে থেঁতো করে পিঠে বানানোর হাঁড়িবাসন নিয়ে শুরু হত একটা মাঝারি মাপের যজ্ঞ। পিঠে তৈরির কাজ। পিঠে বানানো হয়ে গেলে সে রাতে বাড়ির লোক পিঠে দিয়ে ডিনার সারতেন। পরের দিন সকালে এবং দুপুরেও পিঠে খাওয়া চলত। বাড়ির অনেকের বাসি পিঠে সহ্য হত না, তাদের জন্য আবার রান্নাও করতে হত ডাল, ভাজা, সবজি, চাটনি।এখনকার মেয়েরা অত ঝামেলা পোহাতে যাবে কেন বলতে পারেন? বাড়ির কাজ, বাইরের কাজ সব সামলে যেটুকু সময় পাবে শীতের সময় রোদ্দুর পোহাবে আর ফেসবুক করবে। মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীরা মেয়েদের মনের ভাব বুঝেই দোকানে পাটিসাপটা, মালপোয়া, দুধপুলি, সেদ্ধ পিঠে– সব রাখতে শুরু করেছেন। পিঠে খাবার ইচ্ছে হলে কিনে খাও না বাছা! মেয়েদের কষ্ট দেওয়া কেন? খেলেই পেট ভার, নারকেলগন্ধী বিচ্ছিরি ঢেঁকুর। চিনি খাওয়া অস্বাস্থ্যকর ব’লে কাঁড়ি কাঁড়ি গুড় খেতে হবে! এ কেমন অন্যায্য কথা! সকলের পেটে পিঠে সয় না। গতর খাটিয়ে পিঠে বানানোর চাইতে দুপুরবেলায় পিঠে রোদ লাগিয়ে বেলা দে’র ‘পিঠে-কাহিনী’ পড়া অনেক বেশি ভালো।
এইসময় ফেসবুকের বিভিন্ন ফুডব্লগগুলোতে পিঠের ঢল নামা দেখতে ভালোই লাগে! ভাপা পিঠে, ধুকি পিঠে, চিতই-পিঠে, তিলের পুর ভরা পিঠে, নারকেলের ছঁইয়ে সেদ্ধ পিঠে, ভাজা পিঠে, পাকান-পিঠে, তরকারি-ভরা নোনতা পিঠে, ছিটে-পিঠে, রাঙাআলুর পিঠে, পুলিপিঠে!— যেগুলো মনে পড়ল না,আপনারা কষ্ট করে মনে করে নেবেন। পিঠের মূল উপকরণ চালের আটা, পাটালি, নারকেল, দুধ, চিনি, নানান কায়দাবাজ তৈজসপত্র হলেও আসল উপকরণ কিন্তু অসীম ধৈর্য্য আর মনের স্ফূর্তি। প্রয়োজন একখান শীতল সাঁঝ। আর লাগবে রান্নাঘরের সামনে উঁকিঝুকি মারা এবং তর্ না সওয়া কয়েকজন পিঠে-প্রেমী। তবে পিঠের চেয়ে পাটিসাপটা বানানো মনে হয় অপেক্ষাকৃত সহজ! তাই আধুনিক রমণীদের প্রিয় হতে পেরেছে পাটিসাপটা। ননস্টিক প্যানে দারুণ হয় এই পাটিসাপটা। প্যানের গায়ে আটকে গিয়ে আপনার মানইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলা করে না।ঝামেলাবাজ পিঠের পরিবর্তে ক্ষীর বা নারকেলের পাটিসাপটা বানালে শীত উদযাপনে তেমন একটা খামতি থাকে না। পিঠে ছাড়াই পিঠে উৎসবের ফিলিং নিয়ে আসে পাটিসাপটা।
এককেজি দুধ জ্বাল দিয়ে যে ক্ষীর হবে, তাতে হেসেখেলে দশটা পাটিসাপটা হয়ে যাবে। দুধ জ্বাল দেওয়ার সময় দুটো ছোট এলাচ দিতে হবে। পরে এলাচদুটো তুলে ফেলে দিলেই হবে। ফেসবুক, হোয়াটস্অ্যাপ বন্ধ রেখে হাত ব্যথা করে হাতা দিয়ে নেড়ে নেড়ে দুধ মেরে ক্ষীর করা কাজটা খুব সহজ না। তবে সংসারের সুখের কথা ভেবে এগুলো করতেই হয়। কিছু সুখ দেখনদারি। রান্নাঘরের জানলা গ’লে বাড়ির সামনের গলিতে গুড়মেশানো নারকেলের ঘ্রাণ পৌঁছে যাবে। তারপর পাড়াময় উড়ে বেড়াবে নলেনগুড়রূপী ওমুক বাড়ির সুখ। তবেই না!
দুধ জ্বাল দেবার সময় সম্ভব হলে এককাপ গুঁড়ো দুধ মেশাতে পারেন। তাহলে ক্ষীর আরও সরেস হবে। দুধ যখন ঘন হয়ে আসবে, তখন এক বা দু চামচ চালের গুঁড়ি দিয়ে জিনিসটাকে আঁটসাট করে তুলতে হবে। চালেরগুঁড়ির বদলে দুটো কালাকান্দ সন্দেশ ভেঙে ক্ষীরে মিশিয়ে দিতে পারেন।পুর রেডি। এবার ময়দা এবং চালের গুঁড়ো দিয়ে একটা গোলা বানাতে হবে। ময়দার পরিমাণ বেশি থাকবে। চালের গুঁড়োর ভাগ কম। হিসেবটা গন্ডগোল হয়ে গেলে প্যান থেকে পাটিসাপটা তোলা জান কি বাজি হয়ে যাবে কিন্তু! গোলাটা খুব মিষ্টি না হলে খেতে ভালো হয়। খুব অল্প চিনি গুঁড়ো করে গোলায় দিয়ে দেবেন। গোলাতে একচিমটি নুনও দিতে পারেন। এবার ননস্টিক প্যানে অল্প ঘি বা সাদা তেল গরম করুন। হাতায় করে গোলাটা দিয়ে দিন প্যানে। গোলাটা ডিম ভাজার মতো করে ছড়িয়ে দিতে হবে। গোলার কাঁচাভাব কেটে গেলে এবার পুরটা লম্বা করে গোলা’র ওপর শুইয়ে রেখে খুন্তি দিয়ে গোলাটাকে মুড়িয়ে নিয়ে সাবধানে তুলে রাখতে হবে। যদি পাটিসাপটাকে ধামাকাদার বানাতে চান,তবে ক্ষীরের পাশে জ্বাল দেওয়া নারকেল কোরা ও গুড়ের মিশ্রণের একটা লেয়ার করে তারপরে গোলাটাকে মুড়িয়ে নিন। একই পাটিসাপটার ভেতরে ক্ষীর এবং নারকেলের স্বাদ পাবেন। দুটো খেলেই ডিনার কমপ্লিট।
দু’রকম পিঠের রেসিপি দিচ্ছি। একটা মুর্শিদাবাদের শান। নাম ‘ধুকি’। ধিকি ধিকি আগুনে তৈরি হয় বলে এমন নাম ।

ধুকি পিঠে উপকরণ: সেদ্ধ চালের আটা, পাটালি, নারকেলকোরা, চিনি, নুন, একটা বাটি, এক টুকরো পরিষ্কার সুতির কাপড়, উঁচু টাইপের ভাতের হাঁড়ি, হাঁড়ির মুখে বসানোর জন্য একটা মাটির খোলা (যার মাঝখানে ছিদ্র থাকবে)। হাঁড়ির মুখে ঢাকনাটাকে শক্ত করে বসানোর জন্য কিছুটা আটার লেই।

প্রণালী: চালের আটায় এক চিমটি নুন এবং অল্প চিনি মিশিয়ে চালুনি দিয়ে ছেঁকে নিতে হবে। একটু একটু করে জল ছিটিয়ে ময়ান দেবার মত করে আটা ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। পাটালি ভেঙে গুঁড়িয়ে ওর মধ্যে নারকেল কোরা মিশাতে হবে। এবার গ্যাসে ভাতের উঁচু হাঁড়ির মধ্যে খানিকটা জল গরম করতে হবে। হাঁড়ির মুখে ছিদ্রযুক্ত ঢাকনা ফিট করতে হবে। বাষ্প বেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে আটার লেই দিয়ে ঢাকনাটা হাঁড়ির মুখে টাইট করে এঁটে দিতে হবে। ঢাকনার ছিদ্রের ওপর সুতির কাপড় বিছিয়ে দিতে হবে। এবার একটা বাটিতে খানিকটা চালের আটা নিয়ে আটার ওপর নারকেল মেশানো গুড় বিছিয়ে দিয়ে তার ওপর আবার খানিকটা চালের আটা দিয়ে বাটির মুখ পর্যন্ত সাজাতে হবে। খুব চেপে চেপে করলে হবে না। হালকা হাতে করতে হবে। হয়ে গেলে ওই বাটিটা ঢাকনার কাপড়ের ওপরে সাবধানে উলটে আরো সাবধানে বাটিটা সরিয়ে ধুকি পিঠে কাপড়ের টুকরোটা দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। জলের ভাপে মিনিট সাতেকের মধ্যেই পিঠে জমাট বেঁধে গেলে নামিয়ে নিতে হবে।

গোকুল পিঠেউপকরণ: একবাটি নারকেল কোরা, একশো গ্রাম গ্রেটেড খোয়াক্ষীর, চিনি, ছোট এলাচ, ময়দা ১০০ গ্রাম, চালের গুঁড়ো ৫০ গ্রাম, পাটালি গুড়, দুধের ক্ষীর, সাদা তেল, ঘি।

প্রণালী: একটা কড়াইতে খোয়াক্ষীর একটু ভেজে নারকেল কোরা আর পাটালি দিয়ে আঁচ কমিয়ে ক্রমাগত নাড়তে থাকুন। এবার পুরের মধ্যে দু ‘ চামচ চিনি দিয়ে আবার নাড়ুন। নাড়ুর পাকের মত চিটচিটে হলে নামিয়ে ঠান্ডা করে নিন।
অন্যদিকে চিনি দেড় কাপ জল দিয়ে ফুটিয়ে নিন। এইসময় এলাচ দিন। রস খুব ঘন করবেন না।
এবার একটা পাত্রে ময়দা আর চালের গুঁড়ো দিয়ে গাঢ় ব্যাটার তৈরি করুন। কড়াইতে তেল ঘি মিশিয়ে গরম করুন। নারকেল ও খোয়াক্ষীরের পুর নিয়ে চ্যাপটা আকার গড়ে ব্যাটারে ডুবিয়ে সোনালি করে ভেজে তুলে অল্প গরম চিনির রসে ভিজিয়ে রাখুন দুঘণ্টা। তারপর পরিবেশন করুন।

You might also like