Latest News

বাঙালি মেয়ের প্রেমপত্র, পুণ্যাহ আর সহজ তিনটে পদ

সাবিনা ইয়াসমিন রিংকু

প্রিয়তমেষু,
আপনার চিঠি পেয়েছি। তাতে ইনিয়েবিনিয়ে খালি কাজের কথাই লেখা। আপনার কাজের বর্ণনা। আমার কাজের খোঁজখবর নেওয়া। খালি কাজ আর কাজ! আপনার পাঠানো চিঠিখানি আপনার মতোই নীরস। চিঠির গা থেকে গোলাপের সুগন্ধ তো দূর, পাপড়ির কোমলতাটুকুও অনুভবে এল না।
সারা চিঠিতে প্রেম নাই। ‘প্রেম -পূজারী’ রবি ঠাকুরের প্রসঙ্গ এমনভাবে টেনেছেন যে চিঠিটা প্রেমপত্র না হয়ে প্রবন্ধ হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার পুণ্যাহ উৎসবে যোগদান করতে শিলাইদহে যান। জমিদারিতে নতুন বছরের খাজনা আদায়ের সূচনা উৎসব হল পুণ্যাহ। সেই অনুষ্ঠানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও সামাজিক মর্যাদাভেদে আলাদা আলাদা বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে দেখে জমিদার রবীন্দ্রনাথ ভীষণ ক্ষুব্ধ হলেন। তিনি নায়েবকে বললেন পুণ্যাহ হল মিলনের উৎসব। এই ভেদাভেদ তুলে না দিলে তিনি নিজেই বসবেন না। জমিদার হিসেবে তাঁর প্রথম হুকুম হল সবার জন্য এক আসন করতে হবে। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সমস্ত প্রজারা ঢালাও সতরঞ্চির ওপর বসে পড়লেন। এমন জমিদার তারা আগে দ্যাখেনি। চিঠির অর্ধেকটার বেশি জুড়ে এই ঘটনার বর্ণনা। আশ্চর্য হলাম এই ভেবে যে রবি ঠাকুরের প্রেমের ভাবনাও তো কত ছিল! প্রবন্ধ পড়তে হলে বঙ্কিমচন্দ্র বিরচিত ‘বিবিধ প্রবন্ধ’ পড়ব। আপনার চিঠি পড়তে যাব কেন!!
যাইহোক, আপনি কম উপকরণের কটা সহজ রেসিপি দিতে বলেছেন। রান্নাবান্নার প্রসঙ্গটা এনে আমার অনেকখানি সুবিধে করে দিয়েছেন। আপনার ভারিক্কি চাল আর সেই চালের মধ্যে কামিনীভোগের গন্ধ খোঁজার তাড়নাকে দূরে সরিয়ে রেসিপি বলা আমার পক্ষে বেশি সহজ এবং স্বস্তির। এই প্রসঙ্গে মুর্শিদাবাদের এক ধরনের রান্নার কথা মনে পড়ে গেল। সাজিয়ে রান্না। খুব সহজ। ধরুন কুমড়ো বা এঁচোড় বেশ ডুমো ডুমো করে কেটে নিলেন। পেঁয়াজও ডুমো ডুমো করে কাটতে হবে। কড়াইতে সর্ষের তেল গরম হলে পেঁয়াজগুলো হালকা বাদামি করে চেরা কাঁচালংকা, নুন, হলুদ, একটু লংকার গুঁড়ো, জিরের গুঁড়ো দিয়ে কষিয়ে জল ঢেলে দিতে হবে। এবার কেটে রাখা সবজিগুলো ঝোলের মধ্যে পর পর শুইয়ে দিতে হবে। যেভাবে ধোবিঘাটে ধোপারা পর পর জামাকাপড় শুকোতে দেয়, টান টান করে! সেইভাবে সুন্দর করে ঝোলের ওপরে সবজিগুলো সাজিয়ে দিতে হবে। তারপর ঢাকনা এঁটে দিতে হবে। পুরো রান্নাটাই ঢিমে আঁচে হবে। সবজি নরম হয়ে গেলেও আস্ত থাকবে। ঝোল শুকিয়ে একেবারে ঝরঝরে হয়ে যাবে। মশলার আধিপত্যহীন সবজির আসল স্বাদ গন্ধকে অক্ষুণ্ন রাখতে চাইলে ‘সাজিয়ে রান্না’র থেকে সহজ রান্না আর নেই।
শীতকালে টাটকা কচি সিম দিয়ে একটা সহজ এবং উপাদেয় রান্না হয়। সিমের দু’ পাশের শিরা ফেলে দিয়ে সিমগুলোকে গোটা রেখেই ধুয়ে জল ঝরিয়ে রাখতে হবে। বেশ অনেকক’টা কাঁচালংকা চিরে নিতে হবে। কড়াইতে অল্প সর্ষের তেল গরম করে আধ চা চামচ কালোজিরে দিতে হবে। তারপর সিম এবং চেরা কাঁচালংকা কড়াইতে দিয়ে দিতে হবে। নুন এবং হলুদ দিয়ে আঁচ একেবারে কমিয়ে কড়াই ঢেকে দিতে হবে। পুরো রান্নাটা ভাপে হবে। বন্ধ ঢাকনার ভিতর থেকে বাষ্পীভূত যে জল উৎপন্ন হবে, সেই জলেই সিম সেদ্ধ হবে। মাঝে একবার ঢাকা খুলে সিমগুলো উল্টে দিতে হবে। একটু মিষ্টি দিতে হয় এই রান্নাটায়। ভাতের পাতে একটা অনবদ্য পদ এইটি। এই রান্নাটার নাম দেওয়া যেতে পারে স্বাদু সিম।

জানি রেসিপিগুলো আপনার পছন্দ হবে না। কারণ খুঁতখুঁতে ধরনের মানুষগুলোকে সন্তুষ্ট করা যায় না। মনে নেই, সেই যে একবার চিংড়িঘাটার কাছে সুকান্তনগরে যে রাস্তাটার ওপরে যাদবপুর ইউনিভার্সিটির সেকেন্ড ক্যাম্পাস দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে আমাদের দেখা হয়েছিল! কলকাতায় অমন একটা মায়াবী রাস্তার কথা অনেকেই জানেন না। আমিও জানতাম না। আপনার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গিয়েছিলাম ওই মায়াবী রাস্তায়। তখন বসন্তকাল। ঝরে পড়ে থাকা পলাশ ফুলে রাস্তাটা রাঙা হয়ে উঠেছিল। রাস্তার শেষ প্রান্তে একটা চাঁচের ঝুপড়ি চায়ের দোকানে বসে চা খেয়েছিলাম আমরা। আপনি বলেছিলেন চায়ে আদার পরিমাণটা বেশি দিয়ে ফেলেছেন দোকানি। ওই নির্জন একটা রাস্তায় আপনি মাটির ভাঁড়ে আদা চা খেতে পেলেন… এটা আপনার মনে কোনও রেখাপাতই করল না! অদ্ভুত!আমি আপনার কথায় কর্ণপাত না করে দেখছিলাম ঝুপড়ির চালেও কত্ত পলাশ ফুল ছড়িয়েছিটিয়ে পড়ে আছে। মাঝেমধ্যে নাকে এসে ঝাপটা মারছিল আমের বউলের গন্ধ। কোকিল ডাকছিল না। অথচ মনটা কেমন যেন গান গান করছিল! ওই ফাঁকা জায়গায় গান কীভাবেই বা বাজবে! সিনেমার দৃশ্য তো নয়! কিন্তু বাজলো। চা খেতে আসা একজনের মোবাইলের রিংটোনে বেজে উঠলো “দুখ জাগানিয়া তোমায় গান শোনাবো…” আশ্চর্য! এইরকম একটা পরিবেশে বসন্ত যেখানে মুহুর্মুহু শ্বাস ফেলে মনে করিয়ে দিচ্ছিল আমি আছি, এখনও আছি… সেখানে কোনও অল্পবয়সী যুবকের রিংটোনে ‘মেরে রাশকে কমর’ না বেজে ‘তোমায় গান শোনাবো’ বাজছিল! তাকে ফাগুনের দান ছাড়া আর কীই বা বলতে পারতাম! সন্ধে নেমে আসার আগেই ওই মায়াবী পথটা ধরে ফিরেছিলাম আমরা। তখনও বসন্তের বাতাস কানে কানে শুনিয়ে যাচ্ছিল- আমায় পরশ করে, প্রাণ সুধায় ভরে/ তুমি যাও যে সরে…
বুঝি আমার ব্যথার আড়ালেতে দাঁড়িয়ে থাকো…
যাহ্! আবার মেইন লাইন থেকে মন কর্ড লাইনের দিকে সরে সরে যাচ্ছে!
আর একটা কথা । এবার প্রচুর গাঁদা ফুটেছে। শুকিয়ে যাওয়া ফুলগুলো গাছ থেকে তুলে পাপড়ি ছাড়িয়ে রোদ্দুরে ভালো করে শুকিয়ে কৌটোয় তুলে রেখেছি। আপনাকে পাঠিয়ে দেবো।। বইয়ের সেল্ফে অল্প অল্প করে রাখবেন। বই নষ্ট হবে না। পোকায় কাটবে না।
নিজের শরীরের খেয়াল রাখবেন। কটা সহজ রান্নার রেসিপি দিলাম। আশা করি রেসিপিগুলো দেখে ভুরু কুঁচকে নিজেকে আরো বৃদ্ধ প্রতিপন্ন করবে না।
আর এগুলোও যদি সহজ না মনে হয় তবে ডিম সেদ্ধ করে তাতে নুন গোলমরিচ ছড়িয়ে খাওয়াই আপনার ভবিতব্য ,জেনে রাখবেন।

ইতি…………

 

তেল ছাড়া দই-ডিম
উপকরণ: সেদ্ধ ডিম চারটে, টকদই, পেঁয়াজবাটা, আদা-রসুন বাটা, কাশ্মীরি লংকাগুঁড়ো, কাঁচালংকা বাটা,নুন, হলুদ, অল্প টমেটো পিউরি।প্রণালী: দকদই এর সঙ্গে বাকি সব মশলা ভালো করে মিশিয়ে ঢিমে আঁচে মশলাটা একটু কষে ওর মধ্যে সেদ্ধ ডিম চারটে অল্প অল্প করে চিরে দিয়ে দিন। ফুটে উঠলে গরমমশলার গুঁড়ো ছড়িয়ে নামিয়ে নিন।

 

কুমড়োফুলি ওমলেট
উপকরণ: দুটো ডিমের সাদা অংশ, নুন, তেল, এক কাপ কুচোনো কুমড়ো ফুল। কুমড়ো ফুল ভালো করে ধুয়ে হলুদ পাপড়িগুলোকে মিহি করে কুচিয়ে নিতে হবে।প্রণালী: ফ্রাইং প্যানে তেল দিতে হবে। তেল গরম হলে ডিমের গোলা তেলের ওপরে ঢেলে দিয়ে আঁচ একেবারে কমিয়ে দিতে হবে। ডিমের মাঝখানে কিছুটা অংশ জুড়ে কুমড়ো ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে দিতে হবে। ডিম ভাজার কেন্দ্রে অল্প কাঁচালংকা কুচি দিতে হবে। কুমড়ো ফুলের নরম পাপড়ি দারুণভাবে ডিমের গায়ে লেগে যাবে। কাঁচালংকাগুলোও সুন্দরভাবে আটকে যাবে। এবার মিনিট দুই তিনের জন্য ফ্রাইংপ্যানটাকে ঢেকে দিতে হবে। গ্যাস অফ করে ঢাকা খুললেই ম্যাজিক।

 

ডিমের ঝুরি ভুনা
উপকরণ: ২ টো ডিম। কুসুম সমেত অথবা কুসুম ছাড়া যেভাবে ইচ্ছে বানাতে পারেন। ভীষণ মিহি করে কাটা পেঁয়াজ, মিহি করে কাটা আদা, রসুন কুচি, খুব কুচি করা টমেটো, নুন, হলুদ, লংকার গুঁড়ো, জিরের গুঁড়ো, গোলমরিচ গুঁড়ো, এলাচগুঁড়ো, একটা তেজপাতা। একটা শুকনো লংকা। সর্ষের তেল পরিমাণ মতো।

প্রণালী: একটা বাটিতে ডিম দুটো ফেটিয়ে নিন। গ্যাসে কড়াই বসিয়ে তেল গরম করে শুকনো লংকাটাকে তিন চার কুচি করে ফোড়ন দিন। তেজপাতাটা দিন। তারপর পেঁয়াজ কুচি দিন। পেঁয়াজ হালকা বাদামি হতে শুরু করলে আদা কুচি, রসুন কুচি দিয়ে বেশ করে ভেজে নিন। নুন, হলুদ, লংকা, জিরে, গোলমরিচ গুঁড়ো দিয়ে মশলা কষিয়ে টমেটো কুচি দিয়ে দিন। মশলা ভালো করে ভুনে নিন। একটু জল দিন। জল ফুটে উঠলে এবার বাটিতে গুলে রাখা ডিমের গোলা ডিম ভাজার মতো করে মশলার ওপরে ছড়িয়ে দিয়ে জমাট বাঁধার জন্য ওয়েট করুন। জমাট বাঁধতে শুরু করলেই খুন্তি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ডিম ঝুরো ঝুরো করে নিন। মশলার সঙ্গে ডিম ভালো করে মীশে যায় যেন। টমেটো, পেঁয়াজ থাকার জন্য মাখোমাখো হবে ব্যাপারটা। ছোট এলাচের গুঁড়ো ছড়িয়ে গ্যাস অফ করে দিন। গন্ধের চমক দেওয়ার ইচ্ছে থাকলে ছোট এলাচের গুঁড়োর সঙ্গে একটু শাহ-জিরার গুঁড়োও দিতে পারেন।

লেখিকা পেশায় স্কুলশিক্ষিকা, ভালোবাসেন রকমারি রান্না আর রন্ধনবিষয়ক আড্ডা।

শীতের দুপুরে জিওল মাছের ভুনা-ভর্তা

You might also like