Latest News

একথালা সাদা ভাতের সঙ্গে চেখে দেখুন সহজ এই দুটো রেসিপি

সাবিনা ইয়াসমিন রিংকু

Image - একথালা সাদা ভাতের সঙ্গে চেখে দেখুন সহজ এই দুটো রেসিপি

ভাতের গল্প শুরু করলে গল্প আর ফুরোবেই না!
গলা ভাত। ঝরঝরে ভাত। সেদ্ধ চালের ভাত। আতপ চালের ভাত।
যে চালের ভাতই হোক না কেন, তাকে বেছে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। হাঁড়িতে জল দেওয়ার পর জলটা ফুটে উঠলে ওই ফুটন্ত জলে ধুয়ে রাখা চালগুলো দিয়ে দিতে হবে। অনেকে ভাতের হাঁড়িতে বা ডেগচিতেই চাল ধুয়ে পরিমাণমতো জল দিয়ে গ্যাসে বসিয়ে দেন। এভাবেও ভাত রান্না করা যায়। তবে ফুটন্ত জলে চাল ঢেলে ভাত রান্না করলে ভাত অনেকক্ষণ পর্যন্ত ঝরঝরে থাকে। এমনকি রাতেও ওই ভাত খাওয়া যায়। ভাত জল-জল হয় না। নরম হয় না। গন্ধ হয় না। ভাত হয়ে গেলে ফ্যান ঝরিয়ে নিতে হয়। অনেক সময় জল কম হয়ে গেলে ভাত পুড়ে যায়, হাঁড়ির তলায় লেগে যায়। তখন ওপরের ভালো ভাতটুকু তুলে আলাদা পাত্রে রেখে পাতলা কাগজ দিয়ে কিছুক্ষণ ঢেকে রাখলে পোড়া গন্ধটা একেবারে ভ্যানিশ হয়ে যায়। ভাতে সুগন্ধ আনতে চাইলে চাল ফোটার সময় তিন চারটে তেজপাতা দিয়ে দিলেই সাদা ভাতের গায়ে জন্মদিনের গন্ধ পাওয়া যাবে।

যাঁরা প্রচুর কায়িক শ্রম করেন, তাঁদের ভাত খাবার ধরনটা দেখলে মনে হয় ভাতের কোনও বিকল্প নেই। এক এক গ্রাসে এই এত্তটা ক’রে ভাত তোলেন মুখে। সঙ্গে কেবল আলু বা বেগুনের তরকারি। অথবা শুধু ডাল। পাতে একটা পেঁয়াজ, একটা কাঁচালঙ্কা থাকতে পারে, না থাকতেও পারে।

Image - একথালা সাদা ভাতের সঙ্গে চেখে দেখুন সহজ এই দুটো রেসিপি

পেটে আগুন জ্বললে মুঠোতে কতোটা ভাত ধরছে বা ভাত গোগ্রাসে গেলার সময় মুখটা রাক্ষসের মতো লাগছে কী না, সে খেয়াল থাকে না। কোনও একদিন বিকেলে মিন্টো পার্ক থেকে রবীন্দ্রসদন অবধি হেঁটে যাওয়ার সময় দেখেছিলাম একটি বালক থালায় কীসের যেন একটু ঝোল দিয়ে ভাত মেখে হাপুস হুপুস করে খাচ্ছে। ছেলেটি ফুটপাতের কোনও একটা খাবারের দোকানে বাসন ধোওয়ার কাজ করে। চিলি চিকেনের জন্য ক্যাপসিকাম, টমেটো, পেঁয়াজপাতা কাটে। কর্নফ্লাওয়ার, ময়দা আর ডিম দিয়ে কোটিং করা মাংসের টুকরো ফ্রাই করার সময় ছেলেটিও মালিকের সঙ্গে হাত লাগায়। সন্ধে হওয়ার মুখে যখন স্ট্রিটলাইটগুলো জ্বলে উঠেছে, তখন ছেলেটি দুপুরের খাবার খাচ্ছে। একটুখানি ঝোল দিয়ে অনেকটা পরিমাণ ভাত। তার গপাগপ ভাত খাওয়া দেখে, তরিবত করে আঙুল চাটা দেখে একটা কথাই মনে হয়েছে—— ভাতের চাইতে ভালো খাবার আর দুটো নেই।
এই সব ছবি আমাদের বারে বারে মনে করিয়ে দেয় অন্নের মত আর কিচ্ছু নেই। এত কাজকর্ম, কপালের ঘাম পায়ে ফেলা, এত ছুটোছুটি… সব ওই দু’মুঠো অন্নের জন্যই। কাজেই অন্ন নষ্ট করবেন না। কুকুর বিড়ালদের খেতে দিন। কিন্তু ফেলে দেবেন না। পরিবারের মানুষ এবং পোষ‍্যের সংখ্যা বুঝে চাল বা আটা নিন। অনেকেই বলবেন যে তাঁরা খাবার নষ্ট করেন না। কিন্তু ঝোল মাখা ভাত, আর নানারকম খাবারদাবারে ভ্যাট উপচে পড়তে দেখলে তখন কথাটা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না।

ভাত নিয়ে কত কথাই যে বলা যায়!
সম্মানের ভাত। অসম্মানের ভাত। প্রত্যেক বাঙালির জীবনের সঙ্গে ভাতের গল্প, ভাতের গন্ধ জড়িয়ে আছে। ঘি-ভাত হোক বা নুন-ভাত, অথবা বেশ কয়েকটা জমকালো পদের সঙ্গে জুঁই ফুলের মতো একপ্লেট ভাত—— এইটুকুই তো চাওয়া!
‘রোটি কাপড়া আউর মকান’ যদি বলিউডি চাহিদা হয়, তবে বাঙালির চাওয়া হল ভাত, কাপড় এবং একটা শক্তপোক্ত ছাদ। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভাতের গায়েও লেগেছে কতরকম মশলার প্রলেপ! মশলা এবং সুগন্ধী চালের মিলমিশে পোলাও, বিরিয়ানিতে মানুষ মজেছে। ঝাঁ চকচকে রেস্টুরেন্টে বেশি দাম দিয়ে স্টিমড রাইস অর্ডার করে চেনা ভাতের দেখা পেলে রাগের বদলে মন খুশিতেই ভরে ওঠে। এও তো ভাতের প্রতি একপ্রকার পক্ষপাতিত্ব… তাই না!

মেশিনে কাটিং করা চকচকে চালের ভাতে নেই সেই ঘ্রাণ, যে ঘ্রাণ আমরা ছোটবেলায় মায়ের রান্না করা ভাতে পেতাম। মাঝেমাঝে পথচলার সময় রাস্তার সস্তা হোটেল থেকে ভেসে আসা ভাতের গন্ধ আমাদের আচ্ছন্ন করে দেয়। মোটা, পালিশবিহীন একটু কমদামি চালের ভাত রান্নার সময় এক অদ্ভুত বাস ছাড়ে।

এক মুঠো ভাতের জন্যই তো আমাদের এত পরিশ্রম করা! গাধার খাটুনির শেষে এক থালা গরম ভাতের আশাতেই তো আমাদের বেঁচে থাকা! তার মাঝে কিছুটা সময় গান, কবিতা, সিনেমা, ফেসবুক, বন্ধুত্ব, পেছনে লাগা, শত্রুতা করা, লোকের ভাত মেরে দেওয়া।

একান্নবর্তী সংসারে ভাতের হাঁড়ি আলাদা হওয়ার মাঝেও লেগে থাকে কত অশান্তি, ঝগড়া, চোখের জল।
সারাজীবন রাতে ভাত খেয়ে আসা যে মেয়েটা বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে বাধ্য হয় রুটি চিবোতে—— তার কাছে কখনও শুনতে চাইবেন ভাতের গল্প। কিম্বা নতুন চাকরিতে জয়েন করার পর বিদেশবিভুঁইয়ে যে ছেলেটা ভাত রান্না করতে গিয়ে প্রায় প্রতিদিনই ভাতের তলা ধরিয়ে ফেলে আর সেই পোড়া ভাত মাখন দিয়ে খায়, কোনওদিন তার সঙ্গে দেখা হলে ভাতের প্রতি ভালোবাসার গল্পটা তার কাছ থেকে শুনে নিতে ভুলবেন না।

আজ এমন দুটো রান্নার কথা বলব, যেটা সাদা ভাতের সঙ্গে খেতে দারুণ লাগে। যেকোনও একটা থাকলেই অনেকটা ভাত খাওয়া হয়ে যায়।
আমাদের চারপাশে আগাছার মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে নানান ঔষধি। কোনোটি কাঁচা খেলে অনেকরকম ব্যাধি মুক্ত হওয়া যায়। আবার কোনও কোনও গাছপাতা আগুনের তাপে রান্না করে খেলেও কাজ দেয়। এইরকম একটা ঔষধি গাছ তেলাকুচা। সাদা ফুল। সবুজ ফলগুলো অনেকটা কুদরির মতো দেখতে। পাকলে ফলের রং হয় টিয়াপাখির ঠোঁটের মতো টুকটুকে লাল। পাখিদের প্রিয় খাদ্য। তেলাকুচার লতা এবং পাতার অনেক গুণ। বিশেষ করে ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য তেলাকুচা শাক ভীষণ উপকারী।
খেতেও দারুণ। যেকোনও মাছের সঙ্গে দারুণ মিশ খায় এই শাকের। খেয়ে দেখবেন! একবার খেলে বারবার খেতে ইচ্ছে করবে।

তেলাকুচা – চিংড়ি

উপকরণ: তেলাকুচা শাক এবং কচি নরম ডাঁটা, ছোট চিংড়ি অল্প, ঝিরিঝিরি করে কাটা আলু, ঝিরিঝিরি করে কাটা পেঁয়াজ, কাঁচালংকা দুটো, নুন, হলুদ, লংকাগুঁড়ো, সর্ষের তেল অল্প।

Image - একথালা সাদা ভাতের সঙ্গে চেখে দেখুন সহজ এই দুটো রেসিপি

প্রণালী: তেলাকুচা শাক এবং ডাঁটা দু তিনবার ভালো করে ধুয়ে কিছুক্ষণ নুনজলে ডুবিয়ে রাখুন। পাতাগুলো মোলায়েম হবে। নুনজল থেকে তুলে আর একবার ভালোভাবে ধুয়ে ঝুড়িতে করে জল ঝরিয়ে নিন।
কড়াইতে সর্ষের তেল গরম করে কেটে রাখা পেঁয়াজগুলো এবং চেরা কাঁচালংকা দিয়ে দিন। পেঁয়াজের রং পাল্টে গেলে ঝিরিঝিরি করে কেটে রাখা আলু এবং বেছে ধুয়ে রাখা চিংড়িমাছগুলোও দিয়ে দিন। নুন, হলুদ, লংকা গুঁড়ো দিয়ে শাকগুলো ঢেলে দিন। সবটা একটু নেড়েচেড়ে ঢেকে দিন। আঁচ কমিয়ে দিন। বাষ্পের জলে আলু এবং শাক সেদ্ধ হোক। খানিক পরে ঢাকনা খুলে ভালো করে নেড়েচেড়ে গ্যাস অফ করে দিন।
যাঁরা আলু খান না, তাঁরা তেলাকুচা শাক আলুর বদলে বেগুন দিয়ে রান্না করতে পারেন। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে তেলাকুচা শাক খেতে চাইলে শাকের মধ্যে অল্প ঝোল রাখুন।

বেগুনের টক

উপকরণ: একেবারে ছোট সাইজের বেগুন চারটে, পেঁয়াজবাটা, আদাবাটা, জিরে-শুকনো লংকাবাটা, হলুদ গুঁড়ো, জিরের গুঁড়ো, ধনে গুঁড়ো, পাঁচফোড়নের গুঁড়ো, আমচুরগুঁড়ো, নুন, চিনি, পাকা তেঁতুল, সর্ষের তেল।

Image - একথালা সাদা ভাতের সঙ্গে চেখে দেখুন সহজ এই দুটো রেসিপি

প্রণালী: প্রতিটি বেগুন শুধু মাথার দিক থেকে এমনভাবে চারফালা করে নিতে হবে যাতে বোঁটাটা বেগুনের সঙ্গে লেগে থাকে। বোঁটা সমেত বেগুনগুলো আধঘণ্টা জলে ভিজিয়ে রেখে দিতে হবে। জল থেকে তুলে একটু শুকনো করে নিতে হবে। এবার বাটা মশলা এবং গুঁড়ো মশলার সঙ্গে দু চা চামচ সর্ষের তেল মিশিয়ে মশলার একটা মিশ্রণ বানাতে হবে। ওই মশলাটা বেগুনের কাটা অংশের মধ্যে ভরে দিতে হবে। কিছুটা মশলা বেগুনের গায়েও মাখিয়ে নিতে হবে। মশলা মাখিয়ে রেখে দিতে হবে আধঘণ্টা। তারপর কড়াইতে সর্ষের তেল গরম করে বেগুনগুলো তেলের মধ্যে ছাড়ুন। কম আঁচে উল্টেপাল্টে দিন। লক্ষ রাখবেন মশলা যেন পুড়ে না যায়! একটু ঢেকে দিন। বেগুন নরম হয়ে এলে একবাটি তেঁতুলগোলা জল দিয়ে দিন। নুন টেস্ট করুন। চিনি দিন। টক ঝাল নোনতার সঠিক ভারসাম্য বজায় রেখে মশলার কাঁইটা বেশ শুকনো শুকনো হয়ে এলে গ্যাস অফ করে দিন।

You might also like