Latest News

দেওয়ালিতে ফ্যাশন পোশাকে লন্ডনে বাজিমাত বঙ্গতনয়ার

ভারতীয় সময় যখন ঠিক রাত সাড়ে আটটা তখন লন্ডনে বিকেল পাঁচটা। ফোনের রিং বেজে উঠতেই লন্ডনের কেনট থেকে ভেসে এল তাঁর কণ্ঠস্বর। যাঁর তৈরি পোশাক ইতিমধ্যে ব্রিটিশদের মধ্যে যথেষ্ট সাড়া ফেলেছে। শুধু লন্ডন নয় আমেরিকা, কানাডা, নেদারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ছাড়াও বহু দেশের সেলেব্রিটি থেকে সাধারণ মানুষ তাঁর পোশাকের গুনগ্রাহী। তিনি হলেন বিশিষ্ট ফ্যাশন ডিজাইনার রোশনি মুখোপাধ্যায়। যিনি ইংল্যান্ডে বসে বাংলার ফ্যব্রিক এবং বাংলার তাঁতিদের নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন। তাঁর লেবেল ‘মিয়োসূত্র’ যা ব্রিটিশ, এশিয়ান এবং নন এশিয়ানদের মধ্যে এখন খুবই জনপ্রিয়। লন্ডন থেকে এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার দিলেন বিশিষ্ট ফ্যাশন ডিজাইনার রোশনি মুখোপাধ্যায়। চৈতালি দত্তর সঙ্গে আড্ডায় উঠে এল তাঁর নতুন দেওয়ালি কালেকশন থেকে শুরু করে অনেক অজানা কথা।একজন লন্ডন বেসড বাঙালি ডিজাইনার হয়ে বিদেশে এত অল্প সময়ে জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে আসল রহস্য কী?
রোশনি- (খিলখিল করে হেসে) থ্যাংক ইউ। এটা ঈশ্বর এবং গুরুজনের আশীর্বাদ বলতে পারেন। ছেলেবেলা থেকেই আমার ফ্যাশনেবল জামাকাপড় পরার খুব শখ ছিল। আর আমার জামাকাপড় দেখে অনেকেই প্রশংসা করতেন। কিন্তু ফ্যাশন ডিজাইনার হব সেটা কখনও ভাবিনি। পড়াশোনা মন দিয়ে করার চেষ্টা করেছি। ২০১৭ সালে আমার শাশুড়ি মায়ের অনুপ্রেরণায় ফ্যাশন জগতে পা রাখা। সেই থেকেই পথ চলা শুরু। যেটুকু করি খুব মন দিয়ে কাজ করার চেষ্টা করি। লন্ডনে বসে আমি ব্রিটিশদের বাংলার ফ্যাব্রিকের পোশাক পরাতে পারছি, তাতেই একজন বাঙালি হিসেবে আমি গর্ববোধ করি।
আপনার লেবেল ‘মিয়োসূত্র’ এখন লন্ডনের অতি জনপ্রিয় একটি ব্র্যান্ড-
রোশনি- (একটু চুপ করে) সত্যিই ! খুব অল্প সময়ে এটি গ্লোবাল ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। কোনওদিন যা ভাবিনি। ইংল্যান্ড ছাড়াও ক্যালিফোর্নিয়া, শিকাগো, টেক্সাস, স্কটল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, কানাডার টরেন্টোয় ‘মিয়োসূত্র’ বিপুলভাবে সাড়া ফেলেছে।

একজন ব্রিটিশ মহিলা পরেছেন রোশনির তৈরি শাড়ি

আপনার লেবেল ‘মিয়োসূত্র’ সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু যদি বলেন…
রোশনি- ২০১৭ তে আমার শাশুড়িমায়ের অনুপ্রেরণায় ফ্যাশন জগতে পা রাখি। তখন থেকেই আমার লেবেল ‘মিয়োসূত্র’র জন্ম। কিন্তু মূলত এটি বাবা-মেয়ের প্রজেক্ট। আমার বাবা একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাঙ্কার। আমার দুটো ইউনিট আছে। একটা ভারতের কলকাতায়, অপরটি লন্ডনের কেনটে। কলকাতায় যে ওয়ার্কশপ আছে, সেটার দায়িত্বে আছেন আমার বাবা। তেমনই লন্ডনের কেনটে একটা ইউনিট আছে, যেখানে ফাইনাল প্রসেসিং হয়। ওয়েবসাইট, অনলাইনে আমার পোশাক পাওয়া যায়। আমার নিজের বাড়িতে স্টুডিও আছে। যেখানে বাঙালি কনেরা আসেন। পুরোটাই আমি কাস্টোমাইজ করি। প্রতিটি কালেকশনের ডিজাইন আমি নিজে স্কেচ করি। আমার টিমের যাঁরা আছেন প্রত্যেকেই এই বিষয়ে পারদর্শী। এঁরা বেশিরভাগই টেক্সটাইল নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। প্রত্যেকেরই ডিগ্রি আছে। আমার পোশাকে এমব্রয়ডারি কাজ থাকে। তবে কখনওই বাংলার ফ্যাব্রিককে বিনষ্ট করে নয়। সিল্কের ওপর এমব্রয়ডারি করি। আমার এমব্রয়ডারি করা হ্যারি পটার কালেকশন অত্যন্ত জনপ্রিয়।একদিকে আইসিআইসিআই ব্যাঙ্কের অপারেশন হেড, অন্যদিকে ফ্যাশন ডিজাইনার। এই দুই সত্তার মধ্যে কোনটি আপনার কাছে বিশেষ প্রাধান্য পায়?
রোশনি- অবশ্যই আমার লেবেল ‘মিয়োসূত্র’। এটা আমার ভীষণ প্যাশন আর ভালোবাসার জায়গা। পাশাপাশি কর্পোরেট জীবনও ছাড়তে ইচ্ছে করে না। আমি স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো-তে ইউনিভার্সিটি অফ স্ট্র্যাচক্লাইড থেকে বায়োটেকনোলজি নিয়ে মাস্টার্স করেছি। প্রথমে আমি উচ্চশিক্ষার জন্য স্কটল্যান্ডে ছিলাম। কিন্তু পরে ব্যাংক থেকে কাজের সুযোগ আসে। তখন লন্ডনের টাওয়ার ব্রিজে আইসিআইসিআই ব্যাঙ্কের অপারেশন হেড হিসেবে আমি যুক্ত হই। যে বিষয় নিয়ে মাস্টার্স করেছি একেবারে অন্য ফিল্ডে আমি চাকরি করি। অন্যদিকে আমি ব্রিটিশ একাডেমি অফ ফ্যাশন ডিজাইন থেকে প্রথমে সার্টিফিকেট ও পরে ডিপ্লোমা কোর্স করি।
আপনার তৈরি কর্পোরেট ওয়্যার তো রাতারাতি ওদেশে সাড়া ফেলে দিয়েছে
রোশনি- (হা হা করে হেসে) বাবা! আপনি তো অনেক খবর রাখেন। বাংলার ফ্যাব্রিক দিয়ে কর্পোরেট ওয়্যার তৈরি করেছি। ঢাকাই,মধুবনি,বালুচরি দিয়ে মেয়েদের জন্য জ্যাকেট করেছি। আমাদের এখানে সারা বছরই ঠান্ডা আবহাওয়া থাকে। ২০-২৫ ডিগ্রি তো থাকেই। ফলে একটা হালকা জ্যাকেট ব্যবহার করতেই হয়। এই জ্যাকেট যে কোনও ড্রেসের ওপর পরা যায়। এছাড়া চিকনকারি দিয়ে ড্রেস, শার্ট তৈরি করেছি। ইক্কত, এমনকি গামছা দিয়েও শার্ট তৈরি করেছি যা ট্রাউজার বা স্কার্টের ওপর অনায়াসে পরা যেতে পারে। ব্রিটিশ মহিলাদের কাছে এই ধরনের কর্পোরেট ওয়্যার এখন ভীষণ জনপ্রিয়। যা পরে তাঁরা এখন অফিসে যান।

দুর্গাপূজায় কেমব্রিজে প্রথম বঙ্গ কনভেনশনে আপনার তৈরি এক্সক্লুসিভ বাঙালি অ্যাটেয়ার তো রীতিমতো হিট। সে সর্ম্পকে যদি একটু বলেন…
রোশনি- এই কনভেনশনে আমার এক্সক্লুসিভ শো ছিল। সেই শো-তে মহিলারা বাংলার শাড়ি পরেছিলেন। আর আমি চেয়েছিলাম বাংলার ফ্যাব্রিক যেমন তসর, তাঁত, গরদ- এই ধরনের শাড়িকে ফোকাস করতে। আর আমি যে শাড়ি পরেছিলাম, তাতে বালুচরি, কাঁথা, ঢাকাই, গামছা, বাটিক, তাঁত অর্থাৎ সব মিলিয়ে একটা এক্সক্লুসিভ স্টোরি ছিল। ব্রিটিশদের সেই শাড়ি এত পছন্দ হয় যে আমাকে ওরকম শাড়ি তৈরি করে দিতে বলেছেন।এবছরের দেওয়ালির জন্য আপনি কী ধরনের কালেকশন এনেছেন?
রোশনি- পাটোলা স্কার্টের সঙ্গে হোয়াইট শার্ট। আমাদের এখানে উইক-এন্ডে এবারে দেওয়ালি। তাই অফিস ওয়্যার হিসেবে এটি পরা যাবে। টিনএজারদের জন্য রয়েছে স্টিচড শাড়ি। ফ্রিল দেওয়া শাড়ির সঙ্গে রয়েছে ফ্লোরাল মোটিভের ব্রাউজ। ব্রিটিশ, এশিয়ান এবং নন এশিয়ান মেয়েরা যাঁরা নিজেদের গ্ল্যামার লুকে সাজাতে চান তাঁদের জন্য আছে সিক্যুইন করা শাড়ি। এছাড়াও ব্রিটিশ বন্ধুদের অনুরোধে ঢাকাই জামদানি জ্যাকেট তৈরি করেছি।

আর পুরুষদের জন্য কী কালেকশন তৈরি করেছেন?
রোশনি- শুধু পাঞ্জাবি। ব্রিটিশদের কাছে চুড়িদার, পায়জামার কনসেপ্ট নেই। দড়ি বা ইলাস্টিকে ওঁরা স্বচ্ছন্দ নয়। জিনসের ওপর ওঁরা পাঞ্জাবি পরতে পছন্দ করেন। এক্ষেত্রে বালুচরি, পাটোলা ফ্যাব্রিক ব্যবহার করেছি। পাটোলায় জিওমেট্রিক প্যাটার্ন থাকে যা পুরুষদের কাছে খুবই গ্রহণীয়। পাটোলার পাঞ্জাবিতে অনেক ডিটেলিং রয়েছে।
পোশাকের কালার প্যালেট কী?
রোশনি- ব্রিটিশদের কাছে কালার প্যালেট বলতে ব্ল্যাক, নেভি ব্লু, গ্রে, রেড। এই কালারের বাইরে ওঁরা যেতে পারেন না। কিন্তু আমি এত কালার্স নিয়ে খেলা করি যা দিয়ে ওঁদেরকে অনুপ্রাণিত করতে পেরেছি। ওঁরা এখন আমার তৈরি ভাইব্রান্ট কালারের কুর্তি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরেন। আমার পোশাকে রোশনি মুখার্জির পার্সোনাল ‘টাচ্’ থাকবে, এটাই ওঁদের এখন ডিমান্ড। আমার ধোতি শাড়ি ওঁদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। এছাড়াও ওঁরা এখন মধুবনি, তসরের ড্রেস পরছেন। যা একজন বাঙালি হিসেবে খুবই গর্বিত করে আমায়। এছাড়াও আমি আবার রিসাইকেল অ্যাক্সেসরিজ তৈরি করে থাকি।

রোশনি মুখার্জির অ্যাক্সেসরিজে মিসেস ইউনাইটেড কিংডম শুভাঙ্গী মিত্র 

আপনার কালেকশনে দাম কত টাকা থেকে শুরু হয়?
রোশনি- শাড়ির দামের স্টার্টিং রেঞ্জ সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা হলেও সাড়ে তিন হাজার টাকা থেকে জ্যাকেটের দাম শুরু হয়। এই কারণে ওদেশের মানুষেরা আমার কালেকশন পরতে এত ভালবাসেন। শাড়ি ছাড়াও আমি জ্যাকেট ড্রেস, স্কার্ট, কুর্তি, ব্লাউজ তৈরি করি।
বিদেশে বসে আপনি তো বাংলার তাঁতিদের নিয়ে কাজ করেন, সেটা কী করে সম্ভব?
রোশনি- আমার পক্ষে লন্ডন থেকে সরাসরি ফুলিয়া যাওয়া সম্ভব হয় না ঠিকই। কিন্তু আমার ইউনিটের মানুষ যাঁরা কলকাতায় আছেন তাঁরা টেক্সটাইলে দক্ষ। ওঁরা নিজেরা ফুলিয়া যান। যখন আমি বেনারসি নিয়ে কাজ করেছি তখন বেনারস গেছি। আমার একটা বড় টিম আছে। আমি বাংলার তাঁতিদের কর্মসংস্থান দেবার চেষ্টা করি। আমার কাজের সঙ্গে বাংলার তাঁতিরা ভীষণভাবে যুক্ত। যেহেতু আমি বাঙালি, কলকাতার মেয়ে, তাই শেকড়ের টান প্রতিনিয়ত অনুভব করি। আমার যদি বাংলার সঙ্গে যোগাযোগ না থাকে তবে বিদেশিদের কী বোঝাব! বাংলায় যাঁরা ফ্যাশন ডিজাইনার আছেন তাঁদের উচিৎ আরও বেশি করে বাংলা তাঁতিদের কাজের সুযোগ করে দেওয়া।

You might also like