Latest News

Ethos of darkness: ডার্ক রুমের আঁধারে বিষাক্ত রাসায়নিকের মধ্যে কাজ করতেন এঁরা, চমকে দেবে অভিজিতের নতুন ছবি

দ্য ওয়াল ব্যুরো: অজানা একদল মানুষ না থাকলে পরিচালক নায়ক গায়ক চিত্রগ্রাহক সৃষ্টি হত না। সেই ল্যাব টেকনিশিয়ানদের অসহায়তার ওপর নির্ভর করে পরিচালক প্রযোজক অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় তথ্যচিত্র ‘ইথস অফ ডার্কনেস’ তৈরি করেছেন। এই ব্যপারে তিনি কী বলছেন?

পরিচালক প্রযোজক অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের তথ্যচিত্র’ ইথস অফ ডার্কনেস ‘ নন্দন ৩ প্রেক্ষাগৃহে কিছুদিন আগে দেখানো হয়েছে। কেরল সাইন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সম্প্রতি এই তথ্যচিত্রটি দেখানো হয়েছে যা সমালোচকদের ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছে। বিজ্ঞাপন জগতে অভিজিৎ ‘অ্যাড জিৎ ‘নামে পরিচিত । এই ছবির সহ পরিচালক হলেন ডঃ দেবযানী হালদার। এক সময় অ্যানালগ ছবির ভবিষ্যৎ ল্যাব টেকনিশিয়ানদের ওপর নির্ভর করত। অথচ দুঃখের ব্যাপার কোনও পরিচালকই তাঁদের ছবিতে এই টেকনিশিয়ানদের ঋণ স্বীকার করেননি। এমনকি কোনওদিন ক্রেডিট লিস্টে তাঁদের নামও ছিল না। সেই নেপথ্যে কারিগরদের সম্মান দেওয়ার জন্যই এই তথ্যচিত্র তৈরি করা হয়েছে । পরিচালক প্রযোজক অভিজিৎ এই তথ্যচিত্র নিয়ে এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে নানা কথা জানালেন চৈতালি দত্তকে।

এই তথ্যচিত্র তৈরি করতে গিয়ে আপনি কোনও দায়বদ্ধতা অনুভব করেছিলেন কি ?

অভিজিৎ : যদি একটু পিছনে ফিরে যাই তাহলে হয়তো বিষয়টা বোঝাতে পারব। আমি যেহেতু মফস্বলে বেড়ে ওঠা একজন মানুষ তাই সেখানে এক সময়ে পাড়ায় পাড়ায় থিয়েটার করার চর্চা ছিল ছিল। সেই অভ্যাস আগের মতো এখন থাকলেও তা অনেকটাই কমে এসেছে। আমি নিজেও সেই সময় থিয়েটারে অভিনয় করতাম । ফলে থিয়েটারে অভিনয় করতে গিয়ে নিজেকে খুব নায়ক বলে মনে করতাম। অভিনয়ের স্বপ্ন নিয়ে আমার টলিপাড়ায় আসা। কিন্তু অভিনয়ের সুযোগ না পেয়ে তখন পরিচালক কাঞ্চন বন্দোপাধ্যায়ের সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করি। সেই সূত্রে পরিচালকের ক্যান ল্যাবরেটরিতে পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে চিত্রনাট্য লেখা, বারবার কপি করা এইসব কাজ আমায় করতে হত।

যে সময়ের কথা বলছি সে সময়ে এত ফটোকপির সুযোগ হয়নি। ক্রমশ লিখতে লিখতে তখন পরিচালনার দিকে আমার ঝোঁক বাড়ে। এরপর আমি টেলিভিশনে ধারাবাহিক পরিচালনা করতে শুরু করি। আমার প্রথম পরিচালিত ধারাবাহিক ছিল রূপা গঙ্গোপাধ্যাকে নিয়ে ‘দ্রৌপদী’। ‘আস্থা’, ‘পারাপার’ , ‘দাগ ‘ সমেত অগণিত সিরিয়াল আমি পরিচালনা করেছি। এরই মাঝে আমি আবার বিজ্ঞাপনের কাজও শুরু করি । কারণ আমি বুঝলাম শুধুমাত্র পরিচালনা করলে আমার খাওয়া জুটবে না। আমি ১৯৯৪ সালে ‘অ্যাডজিৎ অ্যাডভার্টাইসিং এজেন্সি’ নামে বিজ্ঞাপন সংস্থা তৈরি করি। আর যেহেতু মফস্বলের ছেলে তাই কলকাতার অনেক মানুষই সেই সময় আমার ওপর ভরসা করতে পারেননি। ফলে মনের মধ্যে সেই ক্ষতটা কিন্তু আমার ছিলই। আর এই কাজের পাশাপাশি আমি আবার স্টিল ফটোগ্রাফি করতাম। যদিও সেটা অ্যামেচার লেভেলে। সেই সময় ‘ কালান্তর ‘নামে একটি পত্রিকায় আমার তোলা ছবি বিক্রি করতাম। এই কাজ করতে গিয়ে আমার ভীষণ কৌতূহল ছিল ডার্ক রুমে যে ছবি ডেভেলপমেন্টের কাজ হয় সেটা কীভাবে হয় জানার। ডার্ক রুমে ফিল্ম ডেভলপমেন্ট হত। সেখানে বাইরের লোকজনের ঢোকার অনুমতি ছিল না। শুধু আমি নই, কোনও পরিচালক সেই সময় ওই ডার্করুমে ঢুকতে পারতেন না। ফলে ছবি তৈরির একটা বিশেষ রাউন্ড পরিচালকদের অগোচরেই থাকতো।

সিনেমা পোস্ট প্রোডাকশনের গুরুত্বপূর্ণ এবং বেশিরভাগ অংশ তৈরি হত এই অন্ধকার ঘরে। যাকে ইংরেজিতে “ডার্করুম’ বলা হয়। অ্যানালগ যুগে পোস্ট প্রোডাকশন পর্যায় জুড়ে থাকতো রসায়নবিদ্যা, যেখানে ছিল রাসায়নিক নিয়ে কারবার। আর ডার্করুমে অ্যাসিড থেকে নিঃসৃত রাসায়নিক গ্যাস ভরপুর থাকত। ফিল্মের নেগেটিভ ডেভেলপ করার অন্ধকার সেই ঘর যেখানে দরজা-জানলা শুধু বন্ধ থাকত তা নয়, ঘরে কোনও ফাঁকফোকড় থাকত না। আর ওই ডেভেলপিং প্রসেসিং ছিল ননস্টপ। এক অসহনীয় পরিবেশে সেই অন্ধকার ঘরে দিনের পর দিন বছরের পর বছর নিরবে কর্মীরা কাজ করে গেছেন। তাঁদের সামান্য ভুল ত্রুটিতে নষ্ট হয়ে যেতে পারত ‘পথের পাঁচালী’ থেকে শুরু করে ‘পরশপাথর’, ‘জলসাঘর’ মতো কালজয়ী সব ছবি। কিন্তু কোনও পরিচালকই তাঁদের ছবিতে সেই একদল টেকনিশিয়ানের ঋণ স্বীকার করেননি বা ছবিতে ক্রেডিট লিস্টে কোথাও তাঁদের নাম ছিল না। এখন তো আর সেই ব্যাপারটা নেই। এখন সব ডিজিটাল হয়ে গেছে। এখন যেটা পাওয়া যায় সেটা হার্ডডিস্কে। আমাদের প্রজন্ম খুবই ভাগ্যবান ছিলাম যে আমরা সব ধরনের ট্রানজিশন দেখেছি। সবধরনের ফরম্যাটে কাজ করেছি। আর সেই বিশেষ একদল টেকনিশিয়ানরা যাঁরা অন্ধ কুঠুরিতে বসে সিনেমাকে পরিপূর্ণ রূপ দিতেন তাঁদেরকে ঘিরেই আমার এই তথ্যচিত্র । আজও ডার্করুমের প্রতি আমার কৌতুহল অব্যাহত। নীতিবোধ এবং দায়বদ্ধতার থেকেই আমার এই ছবি করা।

আপনি তো ফিচার ফিল্ম প্রযোজনা করেছেন?

অভিজিৎ : আমি যখন মেগাসিরিয়াল পরিচালনা করি সেই সময় একটি ছবি আমি প্রযোজনাও করি, যা ইন্ডিয়ান প্যানোরমাতে নির্বাচিত হয়েছিল। তারপরে আমি ঈপ্সিতা রায় চক্রবর্তীর প্রোডাকশনে প্রথম তথ্যচিত্র ‘দ্য কোনারক কোড’ তৈরি করি। তবে আমি আর কোনও ফিচার ফিল্ম তৈরি করিনি।

আপনার প্রযোজিত ফিচার ফিল্ম পরিচালক শৈবাল মিত্রর ছবি ‘সংশয় ‘?

অভিজিৎ : হ্যাঁ। উনি আমার খুব পছন্দের একজন পরিচালক। যখন আমি নিজে প্রথম ছবি প্রযোজনা করলাম তখন যেন আরও এক দফা ফিল্ম ডেভেলপিং নিয়ে কৌতূহল বেড়ে গেল। দীর্ঘ সময় ধরে অনুসন্ধান করতে গিয়ে বুঝলাম যাঁরা এই অন্ধকার ঘরে বসে গোটা সিনেমার জন্ম দেন তাঁরা কোথাও গিয়ে পুরোপুরি ব্রাত্য। অথচ নীরবে কাজ করে চলা এই ডার্করুমের মানুষগুলো কোনওদিন স্বীকৃতি পাননি । তাঁরা যে কত বড় ক্রিয়েটার এবং শিল্পমনস্ক তা বলাই বাহুল্য। তাঁদের চোখের দৃষ্টি এবং শিল্প মননে একটা ছবির জন্ম হত। কোথাও বিন্দুমাত্র ভুল ত্রুটি
হয়ে গেলে ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী ‘ র মতো অজস্র সুপার ডুপার হিট ছবি আমরা সঠিকভাবে কোনওদিনও দেখতে পারতাম না। আর ফিল্মের নেগেটিভের গায়ে যে অডিও থাকত সেটাও অর্থাৎ গানটা কোন পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে চোখের দৃষ্টি দিয়ে তাঁরা এক লহমায় বলে দিতে পারতেন। তাঁরা এতটাই ছিলেন প্রজ্ঞা ।

আজ তাঁদের ছাড়া কিন্তু হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, লতা মঙ্গেশকরের মতো কোনও সঙ্গীতশিল্পীর সঠিক কণ্ঠস্বর শুনতে পারতাম না। গত তিন-চার বছর ধরে এত অনুসন্ধান করে গোটা পৃথিবীর ইতিহাসে ফিল্ম ডেভেলপারদের নাম খুঁজেও পেলাম না। কোথাও তাঁদের কথা উল্লেখ নেই। অথচ পরিচালকদের প্রত্যেকের বায়োগ্রাফি লেখা আছে । কিন্তু স্টুডিওর নাম মিললেও অবাক ব্যাপার যে ল্যাবরেটরিতে কারা ফিল্ম ডেভেলপ করেছেন তাঁদের নামের কোনও উল্লেখ নেই। শতাব্দী ধরে যাঁরা সিনেমার জন্ম দিয়েছেন তাঁদের খবর কেউ রাখে না। সিনেমার জন্য তাঁরা নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করে দিয়েছেন, অনেক সন্ধান করে অবশেষে দু’জনকে কলকাতায় পেয়েছি যাঁরা বেঁচে আছেন। আরেকজনকে পেয়েছি তিনি অল্প বয়সী দক্ষিণী। নাম মুথথু। তিনি ২০১২ তে তামিলনাড়ু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিল্ম ডেভেলপার কোর্স নিয়ে পাশ করেন। তবে ২০১৩ সালের পর থেকে তামিলনাড়ু সরকার এই কোর্স বন্ধ করে দিয়েছেন। এখন মুথথু এফ টি টি আই-তে ডেভেলপারের কাজ করেন।

কলকাতার ডেভেলপারদের সম্পর্কে বলুন

অভিজিৎ : কলকাতার একজন হলেন স্বপন নন্দী। ফিল্ম সার্ভিসেসে গ্রেডার ছিলেন। তবে তিনি প্রথমে এই ফিল্ম সার্ভিসেসে ক্যানবয় ছিলেন। সেখান থেকে পরে স্টুডিওর ইনচার্জ হন। তাঁর তত্ত্বাবধানে ছবি পরিস্ফুটিত হত।পরবর্তী সময়ে তিনি চিত্রগ্রাহক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। এখন তিনি চিত্রগ্রাহকের কাজ করেন। অপরজন হলেন শীতল চট্টোপাধ্যায়, যিনি বেঙ্গল ল্যাবের ডেভেলপার ছিলেন। এখন তিনি এন টি ওয়ান এক নম্বর ফ্লোরে ফুরানে ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করেন। আমার ছবির প্রিমিয়ারে দুটো কোম্পানি থেকে এই দুজনের হাতে ৫০ হাজার টাকা করে এক লক্ষ টাকা তুলে দিয়েছি।

আপনার এই ছবি দেখে এই দুই ডেভেলপারের প্রতিক্রিয়া কী?

অভিজিৎ : তাঁরা হতভম্ব হয়ে গেছেন। আমায় বললেন,’ কবর থেকে খবর খুঁড়ে বের করেছেন ।’খাবার মত পয়সা তাঁদের কাছে প্রায় নেই। আর্থিক অনটন কতটা মারাত্মক তা ধারণার বাইরে।

স্বপন নন্দী ডেভেলপার

এই তথ্য চিত্রটি করার ক্ষেত্রে কতদিন যাবৎ আপনাকে রিসার্চ করতে হয়েছে?

অভিজিৎ : বছর ৩\৪ তো বটেই । বেশি ছাড়া কম নয়। এঁদের ওপর লেখা কোনও বই নেই । কোভিড আবহে লকডাউনে বাড়িতে বন্দিদশায় থাকার সময় এই বিষয়টি নিয়ে প্রচুর আলোচনা, তথ্য বের করা ইত্যাদি প্রক্রিয়া আমাকে করতে হয়েছে।

শীতল চট্টোপাধ্যায় ডেভেলপার

ছবিটির নন্দনে প্রিমিয়ার হলেও কোন কোন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ছবিটি প্রদর্শিত হয়েছে?

অভিজিৎ : কেরালা সাইন ফেস্টিভ্যালে ছবিটি দেখানো হয়েছে। কলকাতার সাউথ এশিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল নির্বাচিত হয়েছে। সম্ভবত জুন মাসে এই ফেস্টিভ্যাল হবে। বুসান এবং মুম্বই ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ছবিটি পাঠানো হয়েছে।

এই তথ্যচিত্র তৈরি করতে কত সময় লেগেছে?

অভিজিৎ : ৮/৯ মাস তো বটেই। এই তথ্যচিত্রে বক্তব্য রেখেছেন অগণিত মানুষ। প্রত্যেকে স্বীকার করে নিয়েছেন তাঁদের ভুলের কথা। তাই তাঁরা এক বাক্যে এই ছবিতে অংশগ্রহণ করতে রাজি হয়েছেন। যাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য শ্যাম বেনেগাল, রাজকুমার হিরানি , অঞ্জন বসু, গৌতম ঘোষ ,গোবিন্দ নিহালিনী ,ইন্দ্রকুমার,অসীম বসু প্রমুখ। প্রত্যেকেই স্বীকার করে নিয়েছেন যে ওই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ওই মানুষজন রাসায়নিক গ্যাস সমৃদ্ধ ডার্করুমে সত্যিই নিজের জীবনকে বিপন্ন করে সিনেমা এবং শিল্পের টানে নিঃশব্দে কাজ করে গেছেন। প্রযুক্তি বদলে যাওয়ায় সারা দেশের কয়েক হাজার টেকনিশিয়ান কর্মহীন হয়ে পড়েন। তাঁরা প্রত্যেকেই আনসাং হিরো।

এই টেকনিশিয়ানদের একটা ছবির জন্য প্রতিদিন কত ঘণ্টা সময় দিতে হত?

অভিজিৎ : (মুখের কথা কেড়ে নিয়ে) শুধু একটা সিনেমার জন্য ১৬ \১৮ ঘণ্টা তো বটেই তার ওপর আবার ওভারটাইম করতে হত। মাসিক বেতন মাত্র ৭০০ টাকা। ওভারটাইম প্রতি ঘণ্টায় ৮ টাকা করে। এক দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ছবি ডেভেলপ হত।

এই তথ্যচিত্রটি আপনার নিজস্ব প্রযোজনায় তৈরি?

অভিজিৎ : ৫৮ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের এই তথ্যচিত্রটি একেবারেই আমার নিজস্ব টাকায় তৈরি। আমার প্রযোজনা সংস্থার নাম শ্রী গনেশ প্রোডাকশনস কলকাতা। এই তথ্যচিত্রের কো- ডিরেক্টর হলেন দেবযানী হালদার। ছবিটি ট্রাই লিঙ্গুয়াল হলেও সাবটাইটেল ইংরেজি।

এরকম গবেষণামূলক এবং নিজের নীতি ও দায়িত্ববোধ থেকে এই বিষয় নিয়ে তথ্যচিত্র তৈরি করলেন। আগামী দিনের পরিকল্পনা কি?

অভিজিৎ : পরিচালক সাগ্নিক চট্টোপাধ্যায়ের ফিচার ফিল্মে আমি সহযোগী প্রযোজক হিসেবে কাজ করছি। আরও কিছু পরিকল্পনা রয়েছে যা ক্রমশ প্রকাশ্য।

You might also like