Latest News

চৈতালির কন্যা শ্রাবস্তীর তিরিশ পূর্ণ, উদযাপন চলবে পুজো পর্যন্ত

সোমা লাহিড়ী

কলকাতা দূরদর্শনের সূচনালগ্ন থেকে যে মেয়েটির হাসিমুখে মানুষ আকৃষ্ট  হয়েছেন , যাঁর বাচনভঙ্গিমার মাধুর্য মুগ্ধ করেছে বাংলার মানুষকে তিনি চৈতালি দাশগুপ্ত (Chaitali Dasgupta)। শুধু বাচিকশিল্পই নয়, তাঁর শিল্পী মন ডানা মেলেছে সৃজনশীল নানা মাধ্যমে। তার মধ্যে সব থেকে বেশি সাড়া ফেলেছিল তাঁর পদ্য-পোশাক।সেতো হল,কিন্তু শ্রাবস্তী? তাঁর কন্যা? তার তিরিশ বছরের জন্মদিন কীভাবে হচ্ছে উদযাপন? জানতে গেলে ফিরে দেখতে হবে পেছনে?

Image - চৈতালির কন্যা শ্রাবস্তীর তিরিশ পূর্ণ, উদযাপন চলবে পুজো পর্যন্ত
চৈতালি দাশগুপ্ত

• পদ্য-পোশাকের গোড়ার কথা

  ১৯৭৫ থেকে একটানা পনেরো ষোলো বছর  দূরদর্শনে ঘোষণা ,সঞ্চালনা , সম্পাদনা করতে করতে একটু একঘেয়েমি আসছিল চৈতালির মনে। আসলে সৃজনশীল মানুষদের এমনটা হয়। দূরদর্শনের কর্মব্যস্ততা , সংসার , দুই পুত্রকে মানুষ করা -সব দায়িত্ব সামলেও দিনের শেষে তাঁর মন বলত, কিছু একটা করতে হবে। এমন একটা কিছু যা মনের খিদে মেটাবে। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একদিন মনে হল, আচ্ছা পোশাককে নতুন আঙ্গিকে সাজালে কেমন হয়? এমন কিছু যার সঙ্গে বাংলা সাহিত্যেরও যোগ থাকবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। চৈতালি চলে গেলেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাছে। কবির স্নেহধন্যা চৈতালি (Chaitali Dasgupta) হাতে হাতে পেলেন দুটি কবিতা – ‘প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা’  আর ‘দমবন্ধ হয়ে আসছে ‘। কবি বলেছিলেন ,’তোমার ইচ্ছে মতো ব্যবহার করতে পারো পোশাকে’। সেদিন মনের আনন্দে ঘরে ফিরেছিলেন চৈতালি। সারা রাত ঘুম আসেনি। ভাবনাগুলো ঘুরেফিরে আসছিল।

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে

ভোরবেলা ভাবনা সাকার হল। চৈতালি ঠিক করলেন, কটন টিশার্ট ,আর পাঞ্জাবিতে হ্যান্ডপেন্টিং করে লেখা হবে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার পঙক্তি। যোগাযোগ করলেন তরুণ শিল্পীদের সঙ্গে। নানান রঙের টিশার্টে ও পাঞ্জাবিতে নানান থিমের আঁকিবুকির সঙ্গে ঝলমল করে উঠল,’ প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য….’। ভূমিষ্ঠ হল
পদ্য-পোশাক। সালটা ১৯৯১। এর কিছুদিনের মধ্যেই ছিল নারী সেবা সংঘের দুদিনের বসন্ত মেলা। মেলায় পদ্য-পোশাক সাজিয়ে বসলেন চৈতালি। নিমেষে বিক্রি হয়ে গেল সব। পরের দিন কী নিয়ে যাবেন মেলায় ? সারা রাত জেগে চলল কাজ। যে কটা রেডি হল নিয়ে গেলেন মেলায়। কয়েক ঘন্টায় উধাও সব। অদ্ভুত একটা পরিতৃপ্তিতে আচ্ছন্ন হলেন চৈতালি।

Image - চৈতালির কন্যা শ্রাবস্তীর তিরিশ পূর্ণ, উদযাপন চলবে পুজো পর্যন্ত
কবি শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে চৈতালি ও রাজা দাশগুপ্ত

• চৈতালির ঘর আলো করে এল কন্যাসন্তান

কথা হচ্ছিল চৈতালির সঙ্গে। বললেন ,’বিরসার জন্মের পর  দ্বিতীয়বার যখন সন্তানসম্ভবা হলাম  ভেবেছিলাম মেয়ে হবে। মেয়ের নামও ঠিক করে ফেলেছিলাম -শ্রাবশ্তী (Chaitali Dasgupta)। কিন্তু বিলবো হল। মেয়ের সাধ মিটল যখন আমি আমার নিজের মনের মতো করে সাজাতে লাগলাম শাড়ি,পোশাক ,গয়নাকে। যেন নিজের মেয়েকে সাজাচ্ছি। বাড়ির বসার ঘরেই সাজালাম আমার ডিজাইনে তৈরি সামগ্রী। নাম দিলাম শ্রাবশ্তী। শ্রাবশ্তী আমার মেয়ের মতো নয়,মেয়েই। স্নেহে আদরে অত্যন্ত যত্নে তাকে  লালন করেছি। শ্রাবশ্তী তিরিশ পূর্ণ করল এ বছর। তার জন্মদিন উদযাপন করছি নানান অনুষ্ঠানে। সম্প্রতি নারী সেবা সংঘের কৌশিক হলে একটা প্রদর্শনী হয়ে গেল।’

Image - চৈতালির কন্যা শ্রাবস্তীর তিরিশ পূর্ণ, উদযাপন চলবে পুজো পর্যন্ত

জিজ্ঞেস করলাম ,’ শ্রাবশ্তীর প্রদর্শনীর থিম ছিল শঙ্খ ঘোষ ও নবনীতা দেব সেনের কবিতা।’
চৈতালি বললেন,’ একেবারে ঠিক। দুজনেই আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন ,ভালবাসতেন এবং উৎসাহ দিতেন।শ্রাবশ্তীর পঁচিশ বছরের জন্মদিনে দুজনেই এসেছিলেন। হঠাৎ করে চলে গেলেন দুজনেই। তিরিশের জন্মদিনে ওঁদের স্মরণ করেছে শ্রাবশ্তী। দুজনের কবিতার লাইন এসেছে শাড়িতে ,পোশাকে , ছোট ছোট উপহার সামগ্রীতে।’

Image - চৈতালির কন্যা শ্রাবস্তীর তিরিশ পূর্ণ, উদযাপন চলবে পুজো পর্যন্ত
Image - চৈতালির কন্যা শ্রাবস্তীর তিরিশ পূর্ণ, উদযাপন চলবে পুজো পর্যন্ত

• কী কী আছে শ্রাবশ্তীর সম্ভারে ?

পদ্য -পোশাক দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও সেই প্রথমকাল থেকেই মেয়েদের শাড়ি, কামিজ ,টপ ,গয়না ,বটুয়া ,পার্স ইত্যাদি থাকে শ্রাবশ্তীতে। চৈতালি  বললেন,’ আসলে বরাবরই আমি নিজের শাড়ি গয়নার নকশা নিজেই  করতাম। দূরদর্শনের কলিগরা  এবং বন্ধুরা তাদের শাড়ি করে দিতে বলত। করে দিতাম।

তাই শাড়ি সাজাতে আমার কোনও অসুনিধে হয়নি। বরং নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে অনেক পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়ে গেছি। চালিয়ে যাচ্ছি এখনও। আমাদের প্রাণের কবি রবীন্দ্রনাথের কবিতা ,ছবি নিয়ে কাজ করেছি প্রচুর। জীবনানন্দের কবিতা নিয়ে কাজ করেছি। পরিবেশ নিয়ে কাজ করেছি। নানা সময়ে নানান থিম নিয়ে সাজিয়েছি শাড়িকে ,পোশাককে।’

Image - চৈতালির কন্যা শ্রাবস্তীর তিরিশ পূর্ণ, উদযাপন চলবে পুজো পর্যন্ত

মেয়েদের আর একটা পোশাক চৈতালি (Chaitali Dasgupta) করেন প্রথম থেকেই , সেটা হল বাড়িতে পরার জন্য-‘সারাদিন’। কটনের খুব কমফরটেবল লং ড্রেস। বাড়িতে নাইটি পরে থাকলে বাইরের কারও সামনে বেরতে অস্বস্তি হয়। ওপরে হাউস কোট চাপাতে হয়। ‘সারাদিন’ পোশাকটির  ডিজাইন ও লুক খুব স্মার্ট। তাই অনায়াসে বাইরের লোকের সামনে পরা যায়।

Image - চৈতালির কন্যা শ্রাবস্তীর তিরিশ পূর্ণ, উদযাপন চলবে পুজো পর্যন্ত

এছাড়াও ছেলেদের অন্যরকম লুকের টিশার্ট ,শার্ট ,পাঞ্জাবি করেন চৈতালি। প্রত্যেকটার ডিজাইন এক্সক্লুসিভ। 

• শ্রাবস্তীর কারুকার্য তো অমূল্য ,তবু মূল্য কত?

চৈতালির (Chaitali Dasgupta) কন্যা শ্রাবস্তী। তাই তার প্রতিটা জিনিসে চৈতালির ভালবাসার স্পর্শ উপলব্ধি করেন ক্রেতা। দামের প্রসঙ্গ আসতেই চৈতালি বললেন,’আমি তো ব্যবসায়ী নই , যা করেছি নিজের প্যাশন থেকে করেছি। তাই কোনও দিনই অতিরিক্ত লাভের কথা ভাবিনি। যে সব শিল্পী কারিগর আমার সঙ্গে কাজ করেন তাঁদের আমি যথাযোগ্য পারিশ্রমিক দেওয়ার চেষ্টা করি। এমনকী এই মহামারী দিনেও আমি তাঁদের পাশে থেকেছি। যে তাঁতশিল্পীদের থেকে আমি শাড়ি ও মেটিরিয়াল সংগ্রহ করি তাঁদেরও সঠিক দাম দিই। এই দুটোর ওপরই শ্রাবস্তীর জিনিসপত্রের দাম নির্ভর করে। আমার ভাবনা আমার ডিজাইনের কোনও দাম আমি যোগ করি না। তাই আমার সম্ভারের দাম সাধারণের আয়ত্তের মধ্যে। অনেক সময় আমাদের বাজেট কম থাকে অথচ কিনতে ইচ্ছে করে। তাই আমি ছোট্ট ছোট্ট জিনিস তৈরি করি। ব্লাউজ পিস, গয়না,পার্স,বটুয়ার পাশাপাশি আছে ঘর সাজানোর ছোট্ট ছোট্ট আইটেম। যেমন এবার প্রদর্শনীতে ছিল কবি শঙ্খ ঘোষ ও নবনীতা দেব সেনের কবিতার লাইন দিয়ে তৈরি কোস্টার মাত্র ১২০ টাকায়।’

Image - চৈতালির কন্যা শ্রাবস্তীর তিরিশ পূর্ণ, উদযাপন চলবে পুজো পর্যন্ত

আগেই বলেছি , চৈতালির শিল্পসুষমামণ্ডিত প্রতিটা শাড়ি পোশাক অমূল্য। কলকাতার প্রায় সব গুণীমানুষ তাঁর কাজের কদর করেন। কেনেন এবং পরেন।আজও তাঁর বাড়ির বসার ঘরটি শ্রাবস্তীর কারুকার্যে লাবণ্যময়। ক্রেতারা চৈতালির মধুর আহ্বান আর উষ্ণ আতিথেয়তা উপভোগ করতে করতে কেনাকাটি করতেন।এখানেই শ্রাবস্তী অনন্যা। চৈতালিও।
তবে কোভিডের সময় থেকে চৈতালি পুরোপুরি অন লাইনে বিকিকিনি করছেন। মাঝেমধ্যে প্রদর্শনী চলছে। পুজোর জন্য শ্রাবস্তীর কারুকার্যে হাত বাড়াতে চাইলে এখনই চলে যান শ্রাবস্তীর পেজে। 

You might also like