Latest News

Bridal Fashion: এ বছর কনের সাজের ট্রেন্ড কী? বাঙালি থেকে অবাঙালি কতটা বদলেছে মেকআপের ধরন

দ্য ওয়াল ব্যুরো: এই বছরে কনের সাজের ট্রেন্ড (Bridal Fashion) কী? কোনটা আউটডেটেড আবার কোনটা ইন সেই সম্পর্কে এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার দিলেন সেলিব্রেটি মেকআপ আর্টিস্ট স্টাইলিস্ট কৌশিক রজত। বলিউডের হেভিওয়েট তারকা থেকে শুরু করে তীরন্দাজ দোলা ব্যানার্জিকে কনের সাজে তাঁরা চমকে দিয়েছিলেন আপামর ভারতবাসীকে। প্রায় পঁচিশ বছর ছুঁই ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে থাকা কনের সাজে কী ধরনের বিবর্তন চোখে পড়ে সেই অভিজ্ঞতার কথা দ্য ওয়ালকে জানালেন। আলাপচারিতায় চৈতালি দত্ত।

প্রায় ২৫ বছর ধরে আপনারা জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে জাতীয় স্তরে কনে সাজাচ্ছেন। এই এত বছরে কনের সাজের কোনও বিবর্তন কী চোখে পড়ে?

রজত: বিয়ে ব্যাপারটা খুবই ট্রাডিশনাল। তাই আমরা বাঙালি এবং অবাঙালিদের বিয়ের সাজের ক্ষেত্রে বলব যে বিশেষ করে বিয়ের দিনে খুব বেশি কনেরা এক্সপেরিমেন্ট করতে পছন্দ করেন না। এখন বিয়ের অনুষ্ঠান একটু বিস্তৃত হয়েছে।ইদানিং বিয়ের আগে এবং পরে যে নানা রকমের অনুষ্ঠান হয় সেখানে কিন্তু সাজের ক্ষেত্রে কনেরা নানা রকম এক্সপেরিমেন্ট করেন । দু’দশক আগে কিন্তু বাঙালি কনেরা কোনও মেহেন্দি বা সঙ্গীতের অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন না ।তাঁদের কাছে গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানের বিশেষ প্রাধান্য ছিল। সব ক্ষেত্রে না হলেও মেহেন্দি, সঙ্গীত এই ধরনের অবাঙালিদের প্রচলিত অনুষ্ঠান গুলো এখন বাঙালি বিয়েতে চালু হয়েছে। বাঙালি বিয়ের অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে কিন্তু এই পরিবর্তন এসেছে।

মেকআপ আর্টিস্ট ও স্টাইলিস্ট কৌশিক-রজত

কৌশিক: আগে বাঙালি বিয়ের অনুষ্ঠান মানেই ছিল গায়ে হলুদ, বিয়ে, বৌ-ভাত, রিসেপশন। আবার আমাদের কেরিয়ারের শুরুতে দেখেছি বাঙালি বাড়িতে বৌভাতের দিনে বাড়িতে বৌভাত হত সন্ধ্যেবেলায় রিসেপশন একইসঙ্গে হয়ে যেত। কিন্তু আজকাল অনেকেই বৌভাত আর রিসেপশন আলাদা দিনে করে থাকেন। যেহেতু বিয়েতে নতুন নতুন অনুষ্ঠান ঢুকেছে তাই সাজেরও পরিবর্তন এসেছে। মেহেন্দি অনুষ্ঠানে গ্রিন কালারের আনারকলি এবং সঙ্গীতের অনুষ্ঠানে বাঙালি কনেরা লেহেঙ্গা পরছেন। নারী পুরুষ উভয়ের কাছে বিয়ে একটা স্বপ্নের মতো। আর এখন তো বলিউড থেকে টলিউডের ছবিতে বিয়ের সিকোয়েন্স অনেক বড় করে দেখানো হয়। তবে অবাঙালিদের বিয়ের অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে খুব যে বড়সড় পরিবর্তন এসেছে তা কিন্তু নয়।

কনের সাজের ক্ষেত্রে বলব ওঁরা খুব ‘আপ টু দ্য মার্ক’। আজ থেকে কুঁড়ি বছর আগে অবাঙালিরা ব্যাচেলার পার্টি করতেন। কিন্তু সেটা বড় আকারে নয়। তবে রক্ষণশীল অবাঙালি পরিবারের মধ্যে ব্যাচেলার পার্টির চলন কিন্তু আমরা সেই সময় দেখিনি। এখন যেহেতু ‘ডেস্টিনেশন ওয়েডিং’ খুব ট্রেন্ড তাই ডেস্টিনেশনে গিয়ে নতুন নতুন অনুষ্ঠান সংযোজিত হয়েছে। তারমধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য ‘ক্যাসিনো নাইট’, ‘ ব্যাচেলার নাইট’ , ‘বিচ পার্টি ‘। এটা কোনও আচার অনুষ্ঠান নয়। বিয়ে তো দুটো মানুষের মধ্যে শুধু সীমাবদ্ধ নয়, বিয়ে দুই পারিবারিক বন্ধন। আর দুই পারিবারিক বন্ধনকে আরও দৃঢ ও গাঢ় করতে এই ধরনের অনুষ্ঠানের এখন প্রচলন হয়েছে। আচার অনুষ্ঠান যা আগেও ছিল এখনও তাই আছে।

বলিউডের বহু তারকা এমনকি তীরন্দাজ দোলা ব্যানার্জিকে আপনারা কনে সাজিয়েছেন। সেই অভিজ্ঞতাটা কেমন ছিল?

কৌশিক: দোলা তো একেবারেই নন মেকআপ পার্সেন। মাঠে সানস্ক্রিন ছাড়া কিছুই ব্যবহার করেন না। কনে সাজানোর সময় সে কথাই দোলা আমাদের বলেছিলেন। কিন্তু বিয়েতে যখন ওঁকে রেড কালার শাড়ি পরতে আমরা উপদেশ দিই তখন সত্যিই একটু হলেও দোলা ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। ওঁর মেকআপ করা আমাদের কাছে সত্যিই খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল। কিন্তু সাজানোর পর ওঁকে এত সুন্দর দেখতে লাগছিল ও নিজেই সে কথা আমাদেরকে বারে বারে বলেছেন। সেখানেই আমাদের সার্থকতা।

তারকাদের কনের সাজে কোনও বায়নাক্কা থাকে?

রজত: তারকাদের শ্যুটিংয়ে যত বেশি বায়নাক্কা থাকে কনের সাজের ক্ষেত্রে কিন্তু সেভাবে ওঁদের বায়নাক্কা থাকে না । যেহেতু একটা নতুন জীবনে পা রাখতে চলেছে ফলে সেই ব্যাপারে কিন্তু তারকাদের মধ্যেও একটা চিন্তা কাজ করে। টলিউড সুপার স্টার জিৎ এর স্ত্রীকে আমরা যখন সাজিয়েছিলাম তখন বেশ কিছুটা তাঁকে আমাদের গ্রুমিং করতে হয়েছিল । কারণ জিৎ এর স্ত্রী একজন সাধারন মেয়ে ।ফলে তিনি জানেন না যে তাঁর স্বামী টলিউডের কত বড় সুপারস্টার। সেই কথাটা তাঁকে আমরা ভালো করে বুঝিয়ে ছিলাম। আর অনেক ক্ষেত্রেই দেখেছি বিশেষ করে এই কনের সাজের ক্ষেত্রে সেই দিনের জন্য আমরা ওঁদের অনেক কাছের মানুষ হয়ে যাই।

তারকাদের কনের সাজ আর সাধারণ মেয়ের কনের সাজে কতটা পার্থক্য রয়েছে?

রজত : যেহেতু এত বছর ধরে আমরা এই পেশাতে রয়েছি যেই সময় কাজ শুরু করেছিলাম তখন শুধু পত্রিকা, ম্যাগাজিন ছিল। কোনও সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। করিশ্মা কাপুরের বিয়ের দোপাট্টায় ফ্যাশন ডিজাইনার মনীশ মালহোত্রা যে লেহেরিয়া ঝুলিয়েছিলেন তখন কিন্তু আমাদের সব অবাঙালি কনেদের চাহিদা ছিল যে দোপাট্টায় লেহেরিয়া সেটা যেন করিশ্মার মাথার ওপর যেভাবে পরানো ছিল ঠিক সেভাবেই যেন আমরা পরাই । সেই সময়ে এক প্রকাশনা সংস্থা করিশ্মা কাপুরের বিয়ের ওপর স্পেশাল ম্যগাজিন বের করেছিল যার চাহিদা ছিল তখন তুঙ্গে। আবার অনুষ্কা শর্মা বিয়েতে যে হেয়ারস্টাইলিং করেছিলেন সেই চাহিদাও কিন্তু আমাদের কনেদের মধ্যে ছিল লক্ষণীয় ।

টলিউড সুপার স্টার জিৎ অবাঙালি। কিন্তু সে বাংলা ছবির নায়ক। তাই ওঁর রিসেপশনে আমাদের ওঁর স্ত্রীকে একটু বাঙালি ঘেষা টাচ দিতে হয়েছিল। ফ্যাশন ডিজাইনার শান্তনু গোয়েঙ্কার সঙ্গে অনেক আলাপ আলোচনা করে অ্যাটেয়ার তৈরি করা হয়েছিল ।


কৌশিক: জিৎ আমাদেরকে বলেছিলেন,’ আমি অবাঙালি হলেও যেহেতু আমি বাংলা ছবির নায়ক তাই একটু কনের সাজে যেন বাঙালি টাচ থাকে। আর রিসেপশনে সেই লুক ছিল। আর সেই বছরই আমাদের অনেক অবাঙালি , বাঙালির কনের মধ্যে ওই লুকের চাহিদা ছিল প্রবল। আর লুকটা ছিল কনটেম্পোরারি। নায়ক নায়িকার বিয়ের সাজের প্রভাব সাধারণ কনের মধ্যে এক বছর তো কমপক্ষে থাকেই ।প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার জন্য ফ্যাশন ডিজাইনার সব্যসাচী মুখোপাধ্যায় দীর্ঘকায় দোপাট্টা তৈরি করেছিলেন ।যার সাহায্যে প্রিয়াঙ্কার বিয়ের আসরে এন্ট্রি হয়। যেভাবে এন্ট্রি হয়েছিল সেই চলনও কিন্তু সাধারণ মেয়ের মধ্যে এতটা প্রভাব ফেলেছিল। আমাদের অনেক কনে কে সেভাবে তৈরি করতে হয়েছে। সাধারণ অনেক কনে সেই সময় তিনটি দোপাট্টা ব্যবহার করতেন। নেটের ওপর কারুকাজ করা দোপাট্টা দিয়ে তাঁরা বিয়ের আসরে প্রিয়াঙ্কার মতো একইভাবে এন্ট্রি করতেন। দীপিকা পাড়ুকোন, ক্যাটরিনা কাইফ ‘সৌভাগ্যবতী ভব’ লেখা যে দোপাট্টা পরেছিলেন আজও বেশিরভাগ কনের দোপাট্টার ক্ষেত্রেই সেই লেখার ভীষণ ট্রেন্ড । বাঙালি বিয়ের ক্ষেত্রে এখন রিসেপশনের দিন অনেক কনে লেহেঙ্গা পরছেন। শাড়ি পরার ড্রেপিং এর ধরন পাল্টেছে। মাথায় দোপাট্টা দিচ্ছে না। চুলটা খোলা থাকছে । তবে কোনও কনে বিয়ের দিন আউট অফ দ্য ট্র্যাক হতে পছন্দ করেন না ।

বাঙালিদের শাড়ি ড্রেপিং এর ক্ষেত্রে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে?

রজত: সে রকম পরিবর্তন না এলেও তবে এখন সাদাসিধে করে কুঁচি আঁচল দিয়ে রিসেপশনে বেশিরভাগ শাড়ি পড়ার চলন। তবে অবাঙালিদের মতো সামনে আঁচল দিয়ে শাড়ি পরার চলন অনেকটাই এখন ‘আউট’।

গতবছর লকডাউন শিথিল হলে সরকারি গাইডলাইন অনুযায়ী অল্পসংখ্যক অতিথি নিয়ে বিয়ে বাড়ির অনুষ্ঠান শুরু এবং উড়ান চালু হলে তখন আপনারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুবাই কনে সাজাতে যান-

রজত: ( মুখের কথা কেড়ে নিয়ে) আপনি একদমই সত্যি কথা বলছেন। প্রথম যখন আনলক হল এবং সরকারের গাইডলাইন অনুযায়ী যখন ধীরে ধীরে অনুষ্ঠানে ছাড় এবং নির্দিষ্ট দিনে উড়ান চালু হল এরকম একটা কঠিন পরিস্থিতির মাঝে দাঁড়িয়ে খানিকটা আমরা দিশাহারা হয়ে গেছিলাম। তখন আমি আর কৌশিক মিলে প্রথম সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে আমরা বিদেশ যাব না। আমাদের ব্রাইডাল বুকিং বেশিরভাগই এক বছর আগে হয়। সেই পরিস্থিতি তে বিদেশ থেকে কনে নিজে যখন ফোন করে বলছেন যে তিনি আমাদের জন্যই অপেক্ষা করে বসে আছেন তখন অনেকটাই আমরা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। বুঝতে পারছিলাম না সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমাদের কী করা উচিত। কারণ ওই পরিবারের অনেক মেয়েকেই আমরা ইতিপূর্বে সাজিয়েছি। ফলে সেই কনে অনেকটাই আমাদের ওপর ভরসা করে বসে রয়েছেন।

কনের সেই আকুতি আমাদের মনকে নাড়া দেয়। কনের সেই আকুতি তে গত বছর প্রথম আনলক হবার পর আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে আমরা দুবাই যাব।আমরা কতটা সুন্দর করে সাজাতে পারব সেটা আমরা জানি না । সেই সময় খুবই অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। অনেকবার কোভিড টেস্ট করতে হয়েছে। দুবাইতে বিয়ের তিনদিন আগে গিয়ে টানা তিনদিন কোরেনটাইনে থাকতে হয়েছে। কোভিড আবহে আমাদের পেশার মানুষদের কাজ করা খুবই চ্যালেঞ্জিং। কারণ একে অপরের সান্নিধ্য ছাড়া এই কাজটা করা সম্ভব না। একজন মেকআপ আর্টিস্ট স্টাইলিস্ট যাঁর মেকআপ করছেন তাঁর খুব কাছে থাকে। এটা কিন্তু দু’পক্ষেরই চিন্তার বিষয়। যাই হোক সকলের ভালোবাসা আশীর্বাদে আমরা কাজটা ঠিকমতো করতে পেরেছি। আজও কাজ করছি। হয়তো এখন বেশি ট্রাভেল আমরা করছি না, ইচ্ছে করে কমিয়ে দিয়েছি। আর আমাদের পেশায় প্রচুর ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়। এখন তো মিডিয়া বুমিং তাই আমাদের খবর সাধারন মানুষ জানতে পারেন। আমাদের পেশার আগের প্রজন্মের মানুষদের কী ধরনের স্ট্রাগল ছিল সে কথা কিন্তু কেউ জানতে পারেন নি । আমরা যখন একবার বুকিং নিয়ে নিই শ্যুটিং কিংবা কনে সাজানোর আজ পর্যন্ত ফেল করিনি । নিজের আপন জনে দেহ দাহ করে আমরা নির্ধারিত সময়ে পৌঁছে গেছি সেরকম দিনও গেছে।

কোভিডের আগে যেভাবে আপনারা কাজ করেছেন অতিমারির আবহে এখনও কি সেই একই ভাবে কাজ চলছে?

রজত : কোভিডের শুরুর আগের মতো সত্যি এখনও কাজ শুরু হয়নি। শ্যুটিংয়ের ক্ষেত্রে তো কাজ অনেকটাই কমে গেছে । আমরা যেসব নামী ব্র্যান্ডের সঙ্গে অ্যাসোসিয়েটেড কিংবা কন্ট্রাক্টে আছি তাঁদের শ্যুটিং গুলো অবশ্যই হচ্ছে। তবে অবশ্যই একটা ভয় কাজ করে। ইউনিটের সকলেই ডাবল ভ্যাক্সিনেটেড। বাড়তি সতর্কতা নিয়ে কাজ করছি।বারে বারে আমাদের পেশার মানুষজন কোভিডে আক্রান্ত হচ্ছেন। ইতিপূর্বে অনেকেরই হয়েছে।ঝুঁকি তো একটা থেকেই যায় ।ভয় কে উপেক্ষা করে কাজ তো করতেই হবে এটা যে আমাদের পেশা।

ছোট থেকে বড় পর্দায় এখন বিয়ের সিক্যুয়েন্সের একটা বড় ভূমিকা থাকে। কনের সাজের ক্ষেত্রে তার কোনও প্রভাব পড়ে কি?

কৌশিক : আমাদের ব্রাইডাল যাঁরা রয়েছেন কিংবা ক্লায়েন্ট তাঁরা সত্যিকথা বলতে কি সিরিয়ালের ব্যাপারটা মাথায় রাখেন না । বড় পর্দার নায়িকা দের দোপাট্টা বা হেয়ার স্টাইল কিংবা ফ্লাওয়ার ডেকোরেশন স্টাইলিং এর একটা প্রভাব সাধারণ মেয়েদের ওপর পড়ে । কিন্তু মেকআপের ক্ষেত্রে কনেরা কিছু বলেন না। কারণ যদি কোনও কনে অমুক তারকার মতো করে তাঁকে মেকআপ করাতে বলেন সেটা তো সম্ভব নয়। কারণ তাঁর মুখটা তো সেই তারকা’র মতো নয়। প্রত্যেকের একটা নিজস্বতা রয়েছে। তাঁর মতো করে সেদিনের জন্য সুন্দর করার দায়িত্ব আমাদের নিতে হয় । মেকআপে, সাজপোশাকে, সবসময় আমাদের একটা নিজস্ব সিগনেচার স্টাইল রাখি ।যেটা কনে কে দেখতে ভালো লাগবে সেটাই আমরা করি।

২০২২ কনের সাজের ট্রেন্ড কী ?

কৌশিক : মেকআপের ক্ষেত্রে এখন লেস মেকআপ অর্থাৎ খুব নামমাত্র মেকআপের ট্রেন্ড। হেয়ার স্টাইলিং এর ক্ষেত্রে বাঙালি, অবাঙালি নির্বিশেষে মাথার পেছনে একটা জুরা বা খোঁপা করে। সেইসঙ্গে মাথা অর্থাৎ হেয়ারের সামনের দিকটা অনেক রকম ভাবে আমি স্টাইল বা ড্রামা করি। তবে জুরার চারপাশে সম্পূর্ণ গোলাপ অথবা জিসপি কিংবা কারনেশিয়ান ইত্যাদি রিয়্যাল ফুল দিয়ে এমনভাবে ইলাবোরেট করে জুরার চারপাশে ফ্লাওয়ার ডেকোরেশন করা হয় যাতে জুরা দেখা না যায়। ফুল যাতে হাইলাইটেড হয়। সেক্ষেত্রে দোপাট্টার সঙ্গে মানানসই করে ফুল দিয়ে এক্সপেরিমেন্টাল করি। যেমন রেড দোপাট্টা হলে আমরা জুরার চারপাশে হোয়াইট আর লাইট পিঙ্ক কালারের ফ্লাওয়ার দিয়ে ডেকোরেশন করি। যাতে দোপাট্টার অন্তরাল থেকে ফ্লাওয়ার হাইলাইটেড হয় । আমরা যাঁরা এই পেশায় সিনিয়র তাঁরাই তো ট্রেন্ড সেট করি ।

এই ট্রেন্ড এখন আমরা শুরু করেছি। বাঙালি এবং অবাঙালিদের ক্ষেত্রেই বিয়ে ব্যাপারটা খুবই ট্রাডিশনাল। যেমন বাঙালিদের বিয়ের দিনে লাল বেনারসি পরার চলন তো আদি-অন্ত ধরে চলে আসছে ।যার কোনও বিকল্প নেই। এককথায় অনবদ্য। এখন আবার হোয়াইট ও রেড পাড় কিংবা ডিপ পার্পেলের সঙ্গে রেড কালারের পাড় দেওয়া বেনারসি শাড়ির ফ্যাশন হয়েছে। এছাড়াও মা ঠাকুমার আমলে কাতান শাড়ির প্রাচীন মোটিভ এখন বেনারসিতে ইনপুট করা হচ্ছে যা এখন ট্রেন্ড। আমরা নিজেদের সুবিধার্থে মেকাপের ভাষা করে নিই ।বাঙালি কনের সাজে এখন ‘চারুলতা’ সাজ ভীষণ ইন ।মাথায় প্রজাপতি ডিজাইনের সিঁথি পট্টির সঙ্গে নাকের নথে প্রজাপতি ডিজাইন এখন ট্রেন্ড। আমরা সম্প্রতি একটি বিখ্যাত জুয়েলারি সংস্থার এই ধরনের কনের সাজে শ্যুটিং করেছি ।ওই পুরনো দিনের কনের সাজ দেখে আমাদের এ বছরে অনেক বাঙালি ব্রাইড বুকিং করেছেন । আমরা কনে কে সেভাবে সাজিয়েছি। এখন নকশাদার চন্দনের পরিবর্তে আগের দিনের লবঙ্গ দিয়ে যে ফোঁটা ফোঁটা করে কপালে চন্দন আঁকা হতো সেই ট্রেন্ড আবার ফিরে এসেছে । এখন শুধু কনে কে কপালেই চন্দন পরানো হয়। গালে, থুতনিতে চন্দন পরার ফ্যাশন এখন আউট। আবার হয়তো চার-পাঁচ বছর পর রিসাইকেল হবে। তবে এখন লবঙ্গ দিয়ে না পরিয়ে আমরা তুলির সাহায্যে শুধুমাত্র কপালে ফোঁটা ফোঁটা করে কনের চন্দন পরাই।

অবাঙালিদের ক্ষেত্রে বলব বিয়েতে এখন কনে লাল লেহেঙ্গা সেভাবে পরছেন না । আবার কটকটে পিঙ্ক কালারও পরেন না। এখন লাইট কালারের ফ্যাশন এসেছে। ফলে পিঙ্ক কালারের অনেক ভ্যারিয়েশনও এসে গেছে। অবাঙালি কনেরা এখন পাউডার পিংক কালার অথবা প্যাস্টেল শেডের লেহেঙ্গা পরছেন। আবার শীতকালে তার সঙ্গে দোসর হচ্ছে লং জ্যাকেট । বাঙালি কনেরাও এখন রিসেপশনে লেহেঙ্গা পরছেন। মেরুন, রেড পরিবর্তে ইংলিশ কালার যেমন শ্যাম্পেন ইত্যাদি কালার ছাড়াও প্যাস্টেল শেডের লেহেঙ্গা বাঙালি কনেরাও রিসেপশনে পরছেন। কটকটে রঙের পরিবর্তে পাউডার ব্লু ,পিঙ্ক কালারের লেহেঙ্গা অবাঙালিরা সঙ্গীতে পরছেন । লিপস্টিকের কালারে পরিবর্তন এসেছে। মেকআপের ক্ষেত্রে ঠোঁটের মেকআপ একটা বড় ভূমিকা পালন করে।
লিপস্টিকের কালারের ক্ষেত্রে মেয়েদের একটা নিজস্ব পছন্দ থাকে। ফলে লিপস্টিকের কালার নির্বাচনের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ কনে আমার ওপর ভরসা করেন। যাঁরা আমার ক্লায়েন্ট। কিছু ক্ষেত্রে আবার কোনও কনে তাঁদের ডিপ বা লাইট কালার লিপস্টিক পছন্দ মেকআপ করার আগেই তা জানিয়ে দেয়। আদৌ কনের সাজের ক্ষেত্রে পোশাকের সঙ্গে সেদিনের জন্য তা মানানসই হচ্ছে কিনা সেটা দেখা আমার ফার্স্ট প্রায়োরিটি। তখন কিন্তু পুরোটাই আমি তাঁর পছন্দের মতো করি না। নিজস্ব চিন্তাভাবনা করে লাইট ডিপ করে ঠোঁটের মেকআপ করার চেষ্টা করি । কারণ মেকআপের শেষে ভালো-মন্দ বিচার কিন্তু আমার ওপরই বর্তায় ।স্মোকি আইস কনের সাজের ক্ষেত্রে এখন আউট অফ ট্রেন্ড।

বিয়েতে এখন ডিজাইনার মেহেন্দি বা আলতা কী ধরনের ফ্যাশন চলছে?

কৌশিক : বিয়েতে অবাঙালিদের কোনও সম্প্রদায়ের মধ্যে আলতা পরার প্রচলন নেই।অবাঙালিদের মধ্যে বিয়েতে মেহেন্দি পরা প্রচলিত। কিন্তু আগে বিয়ে তে বাঙালিদের মধ্যে মেহেন্দি পরার কোনও প্রচলন ছিল না। বেশ কয়েক বছর ধরে তবুও বাঙালি কনেরা বিয়ে তে মেহেন্দি পরছেন। তবে কোনও অবাঙালি কনের যদি বাঙালি কোনও পাত্রের সঙ্গে বিয়ে হয় এবং সম্পূর্ণ বাঙালি আচার বিধি মেনে বিয়ের অনুষ্ঠান হয় সেক্ষেত্রে কনে ‘দেবদাস’ ছবিতে ঐশ্বর্য রাই যেভাবে খুব সাধারণভাবে হাতে ,পায়ে আলতা পরেছিলেন সেই ভাবে পরতে চায় । তবে এত বছরের পেশায় এই ধরনের ক্লায়েন্ট হিসাবে কনে আমরা এক শতাংশ পেয়েছি।

বাঙালির বিয়েতে চিরাচরিত ট্র্যাডিশন কে বজায় রাখতে সাবেকি গয়না , সাজপোশাকের সঙ্গে কখনও ডিজাইনার আলতা যায় না। সেক্ষেত্রে কিন্তু বাঙালির চিরাচরিত সাজ কে বিকৃত করা হয়। বাঙালিয়ানা কে বাঙালিয়ানার মতো করেই রাখা উচিত। এ দিনের জন্য অতিরঞ্জিত কোনও কিছুই ভালো লাগে না। অনেক সময় কনের ব্যক্তিত্বের হানি হয়। আমি কোনও আর্টিস্টকে ছোট করছি না। যদি আমরা পুরনো বাঙালিয়ানা সাজ কে প্রতিষ্টিত করতে চাই সেক্ষেত্রে মাথায় ট্রাডিশনাল গয়না পরার সঙ্গে ডিজাইন করা আলতা হাতে বা পায়ে যেতেই পারে না। আমাদের যাঁরা বাঙালি ক্লায়েন্ট অর্থাৎ কনে তাঁরা কেউ ডিজাইনার আলতা পরতে পছন্দ করেন না । এমন অনেক ডিজাইনার আছেন যাঁরা বেনারসিতে নিজস্ব কাজ করা পাড় বসান। কিন্তু বাঙালি বিয়ের কনেকে বেনারসি তে বিয়ের দিন দেখতে বেশি ভাল লাগে ।

বাঙালি কনের সাজে যেহেতু ‘চারুলতা’ সেই সাজ ফিরে এসেছে তাই ‘চারুলতা’ ছবিতে মাধবী মুখোপাধ্যায় যেভাবে আলতা পরেছিলেন সেই ধরনের আলতা পরার এখন বাঙালি কনেদের মধ্যে ক্রেজ। আমাদের যাঁরা বাঙালি কনে ক্লায়েন্ট তাঁদের মধ্যে ডিজাইনার আলতা পরার কোনও চাহিদা নেই । বাঙালিদের পুরনো দিনের আলতা পরার স্টাইল আবার ফিরে এসেছে। তবে জবরজং নয়, পায়ে প্লেন আলতা পরে আংগুলের ডগা আলতায় চোবানো থাকে আর পায়ের পাতার ওপর একটা ফুল থাকবে । আবার যাঁরা আলতা পরবেন তাঁরা মেহেন্দি পরবেন না। এটা নির্ভর করবে যিনি কনে তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দের ওপর। যেমন সোনার সঙ্গে পিতলের গয়না মিশিয়ে পরা আমরা পছন্দ করি না। সোনা পরলে শুধু সোনাই পরতে হবে সেভাবেই কনেকে পরামর্শ দিয়ে থাকি। যখন আমাদের ব্রাইডাল বুকিং হয় তারপর একদিন কনের সঙ্গে বসে আমরা মিটিং করি এবং আলোচনার মাধ্যমে কনের সাজের লুক সেট করি। আর ক্যানভাস ভাল না হলে মেকআপ ভাল হয় না। তাই কনের স্কিন ও হেয়ার এর ধরন অনুযায়ী স্কিন ও হেয়ার এর যথাযথ কেয়ারিং-এর কথাও বলে দিই।

রজত: ( মুখের কথা কেড়ে নিয়ে) যেহেতু আমি স্টাইলিং এর পার্ট দেখি তাই কী ধরনের স্টাইলে শাড়ি বা লেহেঙ্গা পরানো হবে,গয়নার প্লেসমেন্ট কেমন হবে ,শাড়ির কালার প্যালেট এবং কোন ডিজাইনারের শাড়ি, লেহেঙ্গা ব্রাইডালওয়্যারের জন্য এখন ‘আপ টু দ্য মার্ক’ ইত্যাদি খুঁটিনাটি সবই কনের সঙ্গে বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করে নিই। কপালে টায়রা সরু না মোটা পরলে কনেকে মানাবে ইত্যাদির সব কিছুর পরামর্শ দিই। তারকা বা সাধারণ একটি মেয়ে কনে যখন হতে চলেছে তখন সে নিজের ‘ড্রিম ওয়ার্ল্ড ‘এ থাকে। তাই আমাদের কাছে বিয়ের মতো বিশেষ দিনের জন্য যে কোনও কনেই সমান।

You might also like