Latest News

কলকাতায় আজ থেকে তসর উৎসব, জানেন কি কোথায় মিলবে তসরের এক্সক্লুসিভ শাড়ি?

৫১ বছর আগে স্বতন্ত্র ঘরানায় যাত্রা শুরু হয়েছিল ‘কনিষ্ক’র। প্রতিটি শাড়ির পরতে পরতে জড়িয়ে অভিনব শৈল্পিক ভাবনা, স্বাতন্ত্রের ছোঁয়া। শাড়ি প্রতিষ্ঠানের অন্যতম দুই কর্ণধার নন্দিতা রাজা ও তাঁর স্বামী দিলিপ রাজার অক্লান্ত পরিশ্রমে আজ কনিষ্কর ব্যাপ্তি কলকাতা ছাড়িয়ে ভারতবর্ষ তথা আমেরিকা, আফ্রিকা, দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া সহ পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি কোণে পৌঁছে গেছে। শোভা সেন, শাবানা আজমি, দীপ্তি নাভাল, কিরণ খের, রাখি গুলজার, অপর্ণা সেন, উষা উত্থুপের মতো হেভিওয়েট সেলিব্রেটিরা এঁদের শাড়ির অনুরাগী। প্রতি বছরের মতো এবছরেও ‘কনিষ্ক’-এ শুরু হতে চলেছে তসর উৎসব। আজ থেকে ৩ দিনব্যাপী এই উৎসব এ বছর পা রাখল ৪৫ এ। তার ঠিক আগে এক্সক্লুসিভ আড্ডায় মাতলেন প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার নন্দিতা রাজা। চৈতালি দত্তর সঙ্গে একান্ত কথাবার্তায় উঠে এল ‘কনিষ্ক’-এর জন্মলগ্ন থেকে তসর উৎসবের সাতকাহন।আপনি তো মূলত পিওর কটন, সিল্ক এসব নিয়ে কাজ করেন…
নন্দিতা- একদম তাই । ১০০% পিওর কটন, সিল্ক নিয়ে কাজ করি। পাওয়ার লুম এবং মিক্সড কাপড়ে আমি কোনও কাজ করি না। আজও কেউ পিওর কটন বা সিল্কের শাড়ি দোকানে নিয়ে এলে আমরা হ্যান্ড ব্লকপ্রিন্ট করে দিই। আর সিল্কের ক্ষেত্রে বিষ্ণুপুর সিল্ক নিয়ে আমি কাজ করি। মুর্শিদাবাদ সিল্ক রাখি না। এছাড়া তসর নিয়ে প্রচুর কাজ হয়। আমার তসর খুবই জনপ্রিয়। সংগীতশিল্পী উষা উত্থুপকে তো আমার তসরের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসডর বলা যায়। উনি আমার তসরকে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছেন। লন্ডনের শো করতে গিয়েও আমার শাড়ি পরে সেখানেও আমার প্রচার করেছেন উনি।আজ অর্থাৎ ১৬-১৮ ডিসেম্বর তিনদিনব্যাপী তো আপনার তসর উৎসব চলবে। কী ধরনের তসর নিয়ে কাজ করেছেন?
নন্দিতা- 
আমি সাধারণত  উড়িষ্যা, বিহার, অন্ধ্রপ্রদেশ ,মধ্যপ্রদেশের তসর নিয়ে কাজ করি। বেঙ্গল তসর নিয়ে কাজ করি না।তসরের ওপর কী ধরনের কাজ থাকে?
নন্দিতা-
 ব্লক প্রিন্ট, টাই অ্যান্ড ডাই, কলমকারি, বাটিক, কাশ্মীরি আর কাঁথা স্টিচ।

আপনার তৈরি এর শাড়ির দামের রেঞ্জ কত থেকে শুরু হয়?
নন্দিতা- ব্লাউজ পিস সমেত তসর প্রিন্টেড শাড়ির দাম শুরু হয় ৮০০০ টাকা থেকে।‘কনিষ্ক’র ৫১ বছরের জার্নি কেমন ছিল?
নন্দিতা (হেসে)- প্রচুর স্ট্রাগল, পরিশ্রম তো ছিলই। সেইসঙ্গে ছিল আমার স্বামীর অদম্য উৎসাহ আর জেদ। আমার স্বামীর উদ্যোগ, অনুপ্রেরণা ছাড়া আমি আজ ডিজাইনার নন্দিতা রাজা হতে পারতাম না।

শুরুর দিকটা কেমন ছিল?
নন্দিতা- অল্প বয়স থেকেই আমি ডিজাইনের প্রতি আকৃষ্ট ছিলাম। তখন তো ডিজাইনিং কনসেপ্ট ছিল না। আমি যখন স্কুল-কলেজে পড়তাম তখন কোনও ভালো শাড়ি, পোশাক একটু অন্যরকম ডিজাইন দেখলেই সেটা কাটিং করে স্ক্র্যাববুকে রেখে দিতাম। সেইসময় গড়িয়াহাটের ফুটপাতে ছোট ছোট শাড়ি প্রিন্ট করার দোকান ছিল। আমি শাড়ি পরতাম না। আমার মা, দিদির বেশ কিছু পুরনো শাড়ি নিয়ে ওই সব প্রিন্টারদের কাছে শাড়ি ছাপাতে দিতে যেতাম। কাঠের ব্লকে যখন শাড়িতে রং-বেরঙের প্রিন্ট ফুটে উঠত দেখতে ভারী মজা লাগত। ওঁদের সঙ্গে বসে নানারকম গল্প করতাম। আর আগ্রহ নিয়ে কাজ দেখতাম। বিয়ের পরেও আমার ভালো কিছু ডিজাইন চোখে পড়লে বা কিছু দেখলে নিজের কাছে সেটা সংগ্রহ করে রাখতাম। স্বামীর সঙ্গে তা নিয়ে আলোচনাও করতাম। আমার বড় ছেলে হবার আগেই আমাকে অনেকবার আমার স্বামী বলেছেন, “তোমার যখন ডিজাইনের প্রতি এত আকর্ষণ তুমি তো নিজে একটা কিছু করতে পারো।” তা সত্যি কথা বলতে কি, আমি আঁকতে পারতাম না। কীকরে জামাকাপড়ের নকশা ফুটিয়ে তুলতে হয় সেই সম্পর্কে ধারণা ছিল না। আমি সাধারণ একজন গৃহবধূ। তখন ফ্যাশন নিয়ে কোনও কনসেপ্টের সেভাবে চলন ছিল না।তারপর?
নন্দিতা-  একদিন আমার কয়েকটা পুরনো শাড়ি নিয়ে বাড়ির কাছে মিমি নামে একজন প্রিন্টারের কাছে শাড়ি ছাপাতে গেলাম। মিমি গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজ থেকে পাশ করা ছাত্রী । ছোট্ট একটা ঘরে কাজ করতেন। একটা শাড়ির ক্যাটলগ দেখে শাড়ি ছাপাতেও দিলাম। কিন্তু লক্ষ করলাম ফুল, লতা-পাতা, কলকা ছাড়া অন্য কোনও ডিজাইন নেই। অথচ আমাদের প্রতিটি রাজ্য তথা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রত্যন্ত গ্রামে রয়েছে নিজস্ব ফোক মোটিফ এবং আর্ট, যার সৌন্দর্য অনস্বীকার্য। বাজারেও সেইসময় ফুল লতা-পাতা ছাড়া কিন্তু অন্য প্রিন্ট সত্যিই চোখে পড়ত না। যা বড্ড একঘেয়ে। সে কথা আমার স্বামীকে বললে উনি বললেন যে উনি নিজেই শাড়িতে আঁকবেন। সেকথা শুনে খানিকটা হতভম্ব হয়ে গেলাম, কারণ আমি ওঁকে কোনওদিন আঁকতে দেখিনি।
তখন আমরা বালিগঞ্জ প্লেসে দোতলায় একটা ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতাম। ওই সময়ে ফেব্রিক কালারের চলন ছিল। উনি দোকান থেকে ফেব্রিক কালার কিনে আনলেন। আমার মাস্টার্ড বর্ডারের ব্ল্যাক কালারের একটা মাহেশ্বরী শাড়ি ওঁকে দিয়েছিলাম। ওই ঘরের মধ্যেই দেওয়াল জুড়ে শাড়ি টাঙানো হল। উনি তখন একটি কেমিক্যাল কোম্পানিতে চাকরি করছেণ। পরে অবশ্য চাকরি ছেড়ে কেমিক্যালের ব্যবসা করেন। রবিবার করে উনি নিজস্ব চিন্তাভাবনায় কাপড়ে আঁকা শুরু করলেন। প্রথম আঁকলেন সাপের ফণা, যার মধ্যে জিওমেট্রিক্যাল স্টাইলে জোডিয়াক চিহ্ন রয়েছে। আমি দেখে মুগ্ধ হয়ে যাই। উনি যে এত ভালো আঁকতে জানেন ভাবতে পারিনি। ঈশ্বরপ্রদত্ত শিল্পী হলে যা হয়। আসলে কোন মানুষের মধ্যে কী সৃষ্টিশীল প্রতিভা লুকিয়ে থাকে আমরা অনেকেই তা বুঝতে পারি না। সেদিন আমি জানতে পারলাম আমার স্বামী জন্মগতভাবে একজন চিত্রশিল্পী। এরকম শৈল্পিক দৃষ্টি এবং সৃষ্টিতে এত নৈপুণ্য সত্যিই ভাবা যায় না।
এরপর এক ভদ্রলোকের কথা অনুযায়ী একদিন আমরা দুজনে বড়বাজারে যাই। সেখানে যাঁরা ব্লক এবং রং করেন তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তাঁরা বলেন যে ডিজাইন দিলে সেই অনুপাতে তাঁরা ব্লক কাটিং করে দেবেন। এরপর আমি যেভাবে ডিজাইন আঁকতে বলতাম সেভাবে আমার স্বামী কাগজে ফুটিয়ে তুলতেন। আমি ওঁকে হিন্দু মাঙ্গলিক চিহ্ন অর্থাৎ লক্ষ্মীর পা ও ঝাঁপি, কুলো, কলাগাছ ইত্যাদি আঁকতে বলি। সেই অনুযায়ী উনি আঁকতে শুরু করেন। বলতে দ্বিধা নেই প্রতিটি মোটিফেই ছিল শিল্প নৈপুণ্যের ছোঁয়া। ওঁর রং সম্পর্কেও কিছু ধারণা ছিল। তাই একটু সুবিধাও হয়েছিল। আসলে কেউ রং শেখাতে চাইত না। ধীরে ধীরে আমরা রং তৈরি করতে শিখলাম। সেসময় প্রচুর শাড়ি, রং নষ্ট হয়েছে। তখন বাজারে নামী মিলের কাপড়ের যুগ। টেক্সটাইলের ক্ষেত্রে ওঁদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তখন স্থির করলাম আমরা নতুন টেক্সটাইলে কাজ করব।
পুঁজি বলতে আমাদের কিছুই ছিল না। ব্যাংকে মাত্র ৫ হাজার টাকা ছিল, সেটা তুলে নিলাম। তারপর বড়বাজারের এক ভদ্রলোকের কথা অনুযায়ী এক মঙ্গলবার ভোরবেলায় আমরা দুজনে হাওড়া মঙ্গলাহাটে গেলাম। সেখানে শাড়ি ছাড়াও হোলসেলে সবকিছু বিক্রি হয়। ওখান থেকে ১০-১২ টাকা দামের এক ডজন ধনেখালি শাড়ি কিনলাম, যার কোনওটায় বর্ডার আবার কোনোটা ছিল শুধু ডুরে। তারপর ব্লক তৈরি শুরু করলাম বাড়িতে। ড্রইংরুমে পার্টিশন করে একজন প্রিন্টারকে নিয়ে শাড়িতে প্রিন্টিং-এর কাজ শুরু হল।প্রথম ব্লক কী ছিল?
নন্দিতা- প্যাঁচার চারপাশে স্ক্রিপ্ট লেখা আর এক জায়গায় বাংলায় লেখা ছিল ‘শুভ লাভ’। এইই প্রথম আমাদের ব্লক ছিল। এরপরে নানা রকমের ডিজাইন করলাম। আমার আইডিয়ায় আমার স্বামী আঁকতেন। তবে একটা পুরো শাড়ি রেডি করতে প্রচুর প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু সে সম্পর্কে আমরা ওয়াকিবহাল একেবারেই ছিলাম না। ক্রমশ আমরা তা রপ্ত করলাম। আর এই কাজ করতে প্রচুর জল লাগে। যে ভাড়া ফ্ল্যাটে ছিলাম সেখানে বাড়িওয়ালার একটা কুয়ো ছিল। যাইহোক বাড়িওয়ালি সেটি আমাদের ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন। ফলে কাজটা শুরু করতে সহজ হয়। এরপর একে একে শাড়ি তৈরি হল। কিন্ত সেগুলো তো লোককে দেখাতে হবে। তখন নিজের আত্মীয়-স্বজন, কিছু বন্ধুবান্ধব এবং পাড়ার কয়েকজন চেনা-পরিচিত মানুষকে একদিন বিকেলবেলায় আমাদের বাড়িতে চা খেতে আমন্ত্রণ করলাম। সেইসঙ্গে তাঁদের জানালাম যে আমি নতুনভাবে একেবারে নিজস্ব ডিজাইনে শাড়ি তৈরি করেছি। নেমন্তন্ন করতে গিয়ে একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছিল। একেকজন একেক ধরণের মন্তব্য করলেন। একজন তো মুখের ওপর কটুক্তি করে বললেন, ‘বাবা আপনি তো খুব চালু মহিলা, ঘরে বসে এরকম শাড়ির ব্যবসা শুরু করলেন!’ আসলে সেটা ওঁর দোষ নয়। সালটা ছিল ১৯৭০। সেই সময় মহিলারা এটা ভাবতেই পারতেন না।আমন্ত্রিত অতিথিরা আপনার বাড়িতে সবাই এসেছিলেন?
নন্দিতা- হ্যাঁ। সকলেই এসেছিলেন। আমার বড় ছেলের নামে শাড়ি ব্র্যান্ডের নাম রাখলাম ‘কনিষ্ক’। আমার ডিজাইন করা ২০-২২ টা মতো শাড়ি ছিল। ধনেখালি, পাশাপাশি কিছু মলমলের ওপরেও আমি হ্যান্ড ব্লকপ্রিন্ট করিয়েছিলাম। নিমেষের মধ্যে প্রতিটা শাড়ি বিক্রি হয়ে গেল। এককথায় যাকে বলে ‘স্ম্যাশ হিট’। শাড়ির দাম রেখেছিলাম ২৬ টাকা। এইভাবে কনিষ্কর যাত্রা শুরু হল।কীভাবে এরপর এগিয়ে নিয়ে গেলেন কনিষ্ক’কে?
নন্দিতা-  আমার ওই ভাড়া ফ্ল্যাটে ‘কনিষ্ক’র ছোট বোর্ড লাগিয়েছিলাম। সেটি দেখে আমার পাড়ার এক স্কুলশিক্ষিকা আমাদের দোতলা ফ্ল্যাটে একদিন আসেন। আর ওই ‘শুভ লাভ’ লেখা শাড়ি কিনে নিয়ে যান। এরপর গ্র্যান্ড হোটেলে সেই শাড়ি পরে এক লেডিস কনফারেন্সে ওই শিক্ষিকা গেছিলেন। সেইসময় ফ্যাশন ম্যাগাজিন বলতে শুধু ফেমিনা ছিল। আর সেই কনফারেন্সে ‘ফেমিনা’র এডিটর বিমলা পাটিল মুম্বই থেকে এসেছিলেন। ওঁর ওই শাড়িটি খুব পছন্দ হয়। শাড়ি সম্পর্কে উনি নানা খোঁজখবর করেন। অবশেষে আমার পাড়ার সেই স্কুল শিক্ষিকার সঙ্গে আমার বাড়িতে বিমলা পাটিল একদিন আসেন। সেইসময় আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে কুয়োতে শাড়ি ধুচ্ছিলাম। ওই ভিজে শাড়ির থেকে কতগুলো শাড়ি বিমলা পাটিলের পছন্দ হয়। উনি তা ইংরাজি ফেমিনা ম্যাগাজিনের জন্য মুম্বই নিয়ে যান। সেই সঙ্গে উনি বলেন যে শাড়িগুলোর ডিটেলিং অফিসে লিখে পাঠাতে। কাগজের অফিসে কীভাবে লিখে পাঠাতে হয় তাও আমাদের জানা ছিল না। তখন আমার এক বন্ধুকে যেভাবে বললাম ও সুন্দর করে তা গুছিয়ে লিখে পাঠায়। বিমলা পাটিল ছ’টা শাড়ি নিয়ে গেছিলেন। এরপর ফেমিনা ম্যাগাজিনের সেন্ট্রাল পেজে ‘বেঙ্গল’স ব্লক’ নামে উনি রাইট আপ প্রকাশনা করেন।
সেইসঙ্গে সুন্দরী একটি মডেলকে নিয়ে খোলা চুলে, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা আর আমার তৈরি করা নামাবলি শাড়ি পরে শ্যুট করা ছবিও প্রকাশিত হয়েছিল। এ ছাড়াও মানুষের মুখ, ষাঁড়ের শিং,মাথা ইত্যাদির অন্য রকমের ব্লক করেছিলাম। শাড়িতে এই ধরনের নকশার টেক্সটাইল সেসময় ভাবা যেত না। ‘ফেমিনা’তে আমার শাড়ির ছবি প্রকাশ হতে বাড়িতে ভিড় জমতে শুরু করে। ঘরে ছোট্ট বাচ্চা, সংসার সব নিয়ে আমি তখন খুবই ব্যস্ত। আর এতটা যে আশানুরূপ সাফল্য পাব সেটা তো ভাবতেই পারিনি। এরপর আমার ভাড়া ফ্ল্যাটের যিনি বাড়িওয়ালি ছিলেন ওঁদের গ্যারেজ আমাকে ছেড়ে দেন। আমি তখন গ্যারেজে কাজ শুরু করলাম।

সেই সময় বালিগঞ্জ ফাঁড়িতে রিফিউজি হ্যান্ডিক্রাফট বলে একটি দোকান ছিল। বাংলার নানা রকমারি হ্যান্ডিক্রাফট পাওয়া যেত। সেখানের সেক্রেটারি ছিলেন মিসেস দত্তরায়। উনি একদিন আমার ঠিকানা পেয়ে আমার বাড়িতে এসে বললেন বেশ কিছু শাড়ি তৈরি করে দিতে। ওঁদের শোরুমে কনিষ্ক নামে প্রদর্শনী করবেন। সেই প্রদর্শনীও হিট হয়ে গেল। এরপর ক্রমশ বাড়িতে কাস্টমারদের আনাগোনা বাড়তে শুরু করল। তখন বাড়িতে ছোট বাচ্চা সামলে, রান্না করে শাড়ির কাজ চালানো সত্যি খুব অসুবিধা হচ্ছিল। তখন লোয়ার সার্কুলার রোডে আমাদের এক অবাঙালি বন্ধুর কার্পেটের দোকান ছিল। উনি ইরানে থাকতেন। কিন্তু সেভাবে কার্পেটের দোকান চলত না। সেই দোকান আমরা ভাড়ায় নিলাম। কিন্তু ওখানে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা ছিল না। তার ওপর ফ্লায়িং কাস্টমার পেতাম। সেইসঙ্গে আমাদের দোকানে দুবার সমস্ত কিছু চুরি হয়ে যায়। কিছুদিন পর আমাদের এক পরিচিতর মাধ্যমে ২|১ হিন্দুস্তান রোড, গড়িয়াহাটে এই বাড়ির ঠিকানা পেলাম। ভাড়াতেই ‘কনিষ্ক’র স্থায়ী ঠিকানা হল। প্রথমদিকে খুবই ছোট ঘরে কাজ শুরু করেছিলাম।  ক্রমশ তার পরিধি বাড়ল। এখন তো বহু বছর ধরে পুরো একতলা নিয়ে ‘কনিষ্ক’র কর্মকাণ্ড চলছে।

 

‘কনিষ্ক’র আর কোনও শাখা তৈরি হল না কেন?
নন্দিতা-  প্রচুর অফার এসেছে। কিন্তু শাখা করলে প্রোডাকশন বাড়াতে হবে যা ম্যানেজ করা সম্ভব হত না। তাই করিনি।
আপনার শাড়ি তো এলিট শ্রেণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ –
নন্দিতা সে কথাটা ঠিকই। কিন্তু আমরা এখনও মলমলের ব্লক প্রিন্টেড শাড়ি হাজার টাকায় বিক্রি করি। সাধারণ মানুষ সেসব শাড়ি আমার স্টোর থেকে কেনেন। সাধারণ মানুষের মধ্যেও আমার ব্লক প্রিন্টের শাড়ির খুবই কদর।আপনার প্রিন্ট তো কপি হয়?
নন্দিতা- একদম ঠিক কথা। প্রচুর কপি হয়। তবে যাঁরা তারতম্য বোঝেন তাঁরা দেখেই বুঝতে পারেন। এমনও মানুষ আছেন বড়বাজার বা পার্কস্ট্রিটের শাড়ি ব্যবসায়ী, যাঁরা একসঙ্গে এক ডজন মলমলের ব্লক প্রিন্টের শাড়ি কিনে নিয়ে যান। আমি তো কখনও তাঁদের বলতে পারব না যে আমি শাড়ি বিক্রি করব না। তাঁরা সেটাকে কপি করে স্ক্রিন প্রিন্টে বিক্রি করেন। আমি বুঝতে পেরেও সেটা কিছুতেই আটকাতে পারব না। অনেক সময় তাঁরা প্রিন্ট যে স্ক্রীনপ্রিন্টে কপি করেছেন সে কথা এসেও আমাকে বলেছেন।

ব্লক প্রিন্ট ছাড়াও তো আপনার হ্যান্ড উইভিং খুবই জনপ্রিয় ?
নন্দিতা (হাসি)- একদমই । আমরা স্বামী-স্ত্রী প্রায়ই বাইরে বেড়াতে যেতাম। আমরা বেড়াতে খুব ভালবাসি। আর আমরা প্রত্যন্ত গ্রামে যেতাম। এদেশের গ্রামেই তো রয়েছে আসল আর্ট। সেখানেই তো শিল্পীরা বিরাজ করেন। বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে তাঁদের নিজস্ব ট্রাইবল মোটিভও আমরা তুলে এনেছি। সঙ্গে আমাদের নিজস্ব ভাবনাচিন্তাও রয়েছে। খাঁটি জিনিস মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে আমরা এত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি যা অল্প কথায় বলা সম্ভব নয়। প্রচুর অভিজ্ঞতা রয়েছে।

আপনাদের রেডিমেড গার্মেন্টস ব্র্যান্ড ‘কোরা ‘বহু বছর আগে লঞ্চ করেছেন-
নন্দিতা- একদমই ঠিক। সেটা অবশ্য আমার ছোট বৌমার ইচ্ছেতেই হয়েছে। এখানে ছেলে-মেয়ে উভয়ের কালেকশনে রয়েছে। আমাদের টেক্সটাইল ও ব্লক প্রিন্ট করা পোশাকও পাওয়া যায়।

 

প্রয়াত পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের থেকে আপনি প্রচুর ছবির কাজের অফার পেয়েছিলেন। করলেন না কেন ?
নন্দিতা- ঋতুপর্ণ প্রায়ই আমার এখানে আসতেন। ওঁর ছবিতে চরিত্র অনুযায়ী বহু শিল্পীকে আমার বহু শাড়ি পরানো হয়েছে। বহুবার ঋতুপর্ণ ঘোষ আমাকে ছবিতে কাজের অফার দিয়েছিলেন। কিন্তু সত্যি বলতে কি, ছবিতে একজন কস্টিউম ডিজাইনার হিসেবে কাজ করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। আর আমার হাতে সময়ের বড্ড অভাব। সেই কারণেই কিন্তু আমি ছবির কাজ করিনি।এ বছর ৪৫ বছরে পড়ল তসর উৎসব-
নন্দিতা-(একগাল হেসে) একদম ঠিক বলেছেন। মাঝে আমি বন্ধ করে দেব ভেবেছিলাম। এক- দুবার বন্ধ করেছিলাম। আমার বড্ড একঘেয়ে লাগছিল। কিন্তু আমার কাস্টমাররা বছরে এই উৎসবের জন্য বসে থাকেন। তাই আমি করছি । আমার এই স্টোরে ১৬ – ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত সকাল ১০.৩০ থেকে রাত্রি ৮ টা পর্যন্ত এই উৎসব চলবে।

 

You might also like