ই-স্পোর্টস এবং সম্ভাবনা

গেম শুধু সময় কাটানোর উপায় নয় আজ। গেমিং একটা প্ল্যাটফর্ম, যেখানে নিজেকে প্রকাশ করা যায় একটু অন্যভাবে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অর্কপল কর

    কোভিড-১৯ মহামারীর দৌলতে দুনিয়ার অর্থনীতি আজ থমকে গেছে। পরবর্তীকালে নতুন কর্মসংস্থানের জায়গায় কত চাকরি যাবে তার ইয়ত্তা নেই। সকলে চিন্তিত পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে। কিন্তু কান ঝালাপালা করে দিচ্ছে বাড়ির কনিষ্ঠ সদস্য ও সদস্যারা, তাদের মুঠোফোন বা কম্পিউটারের সামনে বসে! সারাদিন-রাত তাদের বন্দুকবাজি বা দ্রুতগতির শব্দ চিন্তায় ফেলছে কি আপনাকে, পরবর্তী প্রজন্মের লেখাপড়ার হালহকিকৎ বা মানসিক পরিস্থিতি নিয়ে? এটা কি শুধুই তাদের গেমের নেশা, না অন্য কিছু! আসুন, দেখে নিই আসল কারণ কী? আদপেই কি গেম খেলে কিছু হয়, না কেবলই সময় নষ্ট?

    ভিডিওগেমের আবির্ভাব বিগত শতকের শেষের দিকে আশির দশকে। এই বিগত তিরিশ বছরে সে দ্বি-মাত্রিক থেকে ত্রি-মাত্রিক আকার নিয়েছে, সঙ্গে সৃষ্টি করেছে জন-উন্মাদনার। নাম নিয়েছে E-sports বা ইলেকট্রনিক স্পোর্টস। ই-স্পোর্টসের তারকারা সাধারণত যোগ দেন না রেড কার্পেটের ফটোশুটে বা প্রেস কনফারেন্সে। কার্যত লোকচক্ষুর আড়ালে তারা মাতিয়ে তোলেন ভারচুয়াল দুনিয়া আসামান্য দক্ষতা, প্রতিবর্ত ক্রিয়া বা নেহাতই ব্যক্তিত্ব দিয়ে। এককালে ই-স্পোর্টস আদপেই স্পোর্টস কিনা আলোচনার বিষয় হলেও আজ গেমাররা স্থান পাচ্ছেন ক্রীড়াবিদদের সঙ্গে এক সারিতে। ২০১৮-র এশিয়াডের মতো ২০২৪-এর অলিম্পিকেও স্থান হবে ই-স্পোর্টসের। ঠিকই দেখলেন। অলিম্পিক!

    গেমের অনেক বিভাগ থাকলেও জনপ্রিয়তা লাভ করেছে FPS (first person shooting যথা PUBG, CS:GO), Strategy (DOTA, Clash Royale) বা Simulation-এর (মূলত এফ১ বা ফুটবল) মতো ভাগগুলি, অর্থাৎ বন্দুকবাজ থেকে রেস ড্রাইভার থেকে রোনাল্ডো সবই হতে পারবেন এই ভার্চুয়াল দুনিয়ায়। এই জগতে সাফল্যের চাবিকাঠি হল নিজের পছন্দসই গেমে দক্ষতা এবং একই সময়ে সবকিছু সিরিয়াসলি না নেওয়া। এখানে আশঙ্কা হতে পারে, এই হিংস্র আক্রমণাত্মক মানসিকতা বা একটানা গেমিং আপনার সন্তানের জন্য হানিকারক কিনা। অবশ্যই অতিরিক্ত কোনও কিছুই ভাল না এবং গেমও তার ব্যতিক্রম নয়। পরিমিত সময়ে গেমিং অবশ্য অনেক উপকারেও লেগে থাকে, একজন সাধারণ গেমার মিনিটে ৩০০+ মুভ (চাল দেয়) করেন, যা তার হাত এবং চোখের সামঞ্জস্য বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিশীলিত করে মানব মস্তিস্কের সেই অংশ যা স্মৃতিশক্তি, মনঃসংযোগ এবং কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রণ করে। বৃদ্ধি পায় প্রতিবর্ত ক্রিয়া, মাল্টি-টাস্কিং, মনঃসংযোগ এবং শেখার ক্ষমতা।

    সাল ২০২০-তে দাঁড়িয়ে আজ ই-স্পোর্টসের দর্শকসংখ্যা প্রায় ৫১ কোটি, আনুমানিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ গেমিং ইন্ডাস্ট্রিতে, যা ফুটবলের এক দশমাংশের বেশি, এর পরিমাণ বাড়ছে বাড়বে। ভারত এখনও ঘুমন্ত দৈত্য, তাই চমকে ওঠার কিছু নেই। আসুন, দেখে নিই গেমিং পরবর্তী সময়ে কীভাবে আমাদের জীবনে দখল নিয়ে নিতে পারে।

    প্রথমত, বায়ুসেনা থেকে সাধারণ পাইলট সবারই ট্রেনিং হয় সিমুলেটরে বা বিশেষভাবে নির্মিত যন্ত্রে, তারপরই তারা আসল উড়োজাহাজের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি পান। মহাকাশচারীদের পুরো প্রশিক্ষণই এই সিমুলেটরের মাধ্যমে হয়। যেহেতু ভারতীয় মহাকাশ সংস্থা ইসরো বাণিজ্যিক দিক দিয়ে মহাকাশ অভিযানের একটা বড় অংশ অধিকার করে রেখেছে (নাসা বা ইউরোপিয়ান সংস্থার থেকে এগিয়ে, হাসবেন না! অন্তর্জাল তাই বলছে), তাই তার পরবর্তী মহাকাশচারীদের দক্ষতার পেছনে অনেকটাই হাত রাখবে এই গেমিং। সেনা থেকে পরিবেশবিদ সবাই কমবেশি আজকাল ড্রোন ব্যবহার করছেন, এই ড্রোন নিয়ন্ত্রিত হয় দূর-নিয়ন্ত্রকের মাধ্যমে, যা সিমুলেটরের আরেক রূপ। বলাই বাহুল্য, গেমারদের সহজাত প্রতিবর্ত ক্রিয়া তাদের একধাপ এগিয়ে রাখবে শ্রেষ্ঠ চালকের দৌড়ে।

    দ্বিতীয়ত, লাইভ স্ট্রিমিং বা সরাসরি সম্প্রসারণ। যদি পছন্দের গেমে পারদর্শী হন বা সব গেমই খেলতে ভালবাসেন আর গেম ব্যতীত দর্শকদের মনোরঞ্জনের ক্ষমতা আপনার আছে, তাহলে আপনার জন্য স্ট্রিমার আকর্ষণীয় পেশা হয়ে উঠতেই পারে। এর আয় যে নেহাতই কম নয় তার প্রমাণ আমাদের দেশের তরুণ মর্টাল (Naman Mathur) বা পোলিশ কানাডিয়ান তরুণ মাইকেল গ্রিসার্ক ওরফে শ্রাউড। ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৭৬.৮৬ কোটির মালিক এই বছর ২৪-এর তরুণ, টুইচ (twitch), ইউটিউবের মতো স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের রেভিনিউই তার আয়ের মূল উৎস। জনসংযোগে আপনার দক্ষতা থাকলে সহজেই সাফল্য লাভ করবেন।

    তৃতীয়ত, পেশাদারী গেমিং অর্থাৎ ভবিষ্যতে ভারত থেকে অনেক গেমারই উঠে আসবেন, যারা পেশাদার গেমিং টুর্নামেন্টে যোগদান করবেন কোনও না কোনও টিমের সদস্য হিসেবে। এদের স্পনসর করতে এগিয়ে এসেছে বিএমডব্লিউ নামক সংস্থা, যার পরিচয়ের অপেক্ষা রাখে না। তারা হাত মিলিয়েছে cloud9, G2 sports, Fnatic-এর মতো টিমের সঙ্গে, যার মধ্যে Fnatic ইতিমধ্যেই TSM Entity-র (ভারতের বর্তমান বেস্ট টিম, পাবজি) সঙ্গে ভারতে বিনিয়োগ করেছে। এই টিমগুলি সারাবছরে বিভিন্ন গেমে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে এবং প্রতি টুর্নামেন্টের প্রাইজ মানি ভারতীয় মুদ্রায় ৩-৪ কোটির বেশি।

    এছাড়া ভবিষ্যতে ভারত অলিম্পিক গেমসের ই-স্পোর্টসে যোগদান করবে, সেই স্কোয়াডের ভিত এখন থেকেই শক্ত করতে হবে। তাই গেমিং পেশা হিসেবে বেশ লোভনীয়ই, কারণ বয়স এখানে কোনও বাধা নয়। স্কিল থাকলে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই আপনি সাফল্য পেতে পারেন। অন্তত জেক ইয়প বা `Stewie2k’-এর কাহিনি তাই বলে। তবে দক্ষতার সঙ্গে পরিশ্রমও দরকার। সন্তানের প্রতিভা আর ইচ্ছে থাকলে সে পেশা হিসেবে বেছে নিতে পারে গেমিং, তার তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে কিন্তু আপনিই থাকবেন। আপনাকে থাকতে হলে জানতে হবে গেমিংকে গেম বলে অবজ্ঞা না করে।

    চতুর্থত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পেশা হতে পারে গেম ডেভেলপার বা গেম বানাবেন যারা। দেশীয় পণ্যের ওপর অনেকটাই বাজার নির্ভরশীল থাকবে। আমাদের দেশে ক্রিয়েটিভিটি বা গল্পের কোনও অভাব নেই, অভাব নেই কাজ জানা লোকেরও। বরং সুযোগ অনেক ভারতীয় পণ্যকে বাজারজাত করার। জেনে অবাক হবেন, বাংলাদেশের ছেলেরা ইতিমধ্যেই বাংলাভাষার ওপেন ওয়ার্ল্ড গেম নিয়ে এসেছে, নাম ‘আগন্তুক’! ইউটিউবে দেখতে পারেন। সুতরাং আপনি গল্প থেকে গ্রাফিক্স, যেকোনও একটা সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারলে সহজেই লাভবান হতে পারেন। কোডিং বা কম্পিউটারের ভাষা জানতে হতে পারে আপনাকে। তবে আপনার সাফল্যের ভাগীদার যেমন আপনি, তেমনই আপনার ডেডিকেশন এবং ইচ্ছাশক্তিও একটা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। একদা অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগের মুখে পড়া এস্টোনিয়ান যুবা Robin Kool ওরফে ROPZ আজ সমস্ত অভিযোগ ধূলিসাৎ করে নিজেকে শিখরে নিয়ে গেছেন মাত্র ২১ বছর বয়সে। তার এই অবিশ্বাস্য যাত্রার পিছনে দায়ী পিতৃবিয়োগের তীব্র অবসাদ।

    গেম শুধু সময় কাটানোর উপায় নয় আজ। গেমিং একটা প্ল্যাটফর্ম, যেখানে নিজেকে প্রকাশ করা যায় একটু অন্যভাবে। আগেও উল্লেখ করেছি, ভারতে তথা সারা বিশ্বে গেমিংয়ের পরিধি বাড়বে, কারণ গেমও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের একটি অংশ। আমরা কি এখনও তৃতীয় বিশ্বের তকমা বজায় রাখব?

    (লেখক এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ার।)

    আরও পড়ুন…

    আন্তর্জাল এবং গোপন নজরদারির সাম্রাজ্য

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More