প্রদীপদা-র জন্যই মাঠে আসতেন সৌমিত্রবাবু, আমাকে বলতেন, ‘এত দম পাও কোথা থেকে?’

৭,০৬৭

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

 

গৌতম সরকার
(ভারতের নামী প্রাক্তন ফুটবলার)

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কেমন অভিনেতা ছিলেন, এটা আমি বললে মানাবে না। আমি বরং বলব ওঁর এভারেস্টসম ক্যারিশমার কথা। একেকজন মানুষ হন, যাঁরা একটা জাতিকে প্রতিনিধিত্ব করেন, একটা সমাজকে টেনে নিয়ে যান বহমান ধারার মতো। উনিও সেরকমই একজন মহাচরিত্র ছিলেন।
আমরা খেলার মাঠের লোক, সারা জীবন ফুটবল-ফুটবল করেই কাটিয়ে দিলাম। কিন্তু এই মানুষগুলোর সান্নিধ্যও আমরা পেয়েছি একটু আধটু ফুটবল খেলেই, তাই ফুটবল নিয়েই চলতে চাই জীবনের শেষপর্যন্ত।

যা বলছিলাম, সৌমিত্রবাবু আমাদের মতো ফুটবলারদের কাছেও ছিলেন একজন মহানক্ষত্র। উত্তমকুমারের সান্নিধ্য যেমন পেয়েছিলাম একসময়, তেমনি সৌমিত্রবাবুও বহুবার ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে এসেছেন। আমরা যখন ৭০ দশকে ফুটবল খেলছি, দল জিতলে ড্রেসিংরুমে নিয়ে আসতেন আমাদের কোচ প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রদীপদা-র সঙ্গে ওঁর সম্পর্ক ছিল নিকটতম বন্ধুর মতোই।

সব থেকে বড় বিষয় হল, সৌমিত্রর শ্রদ্ধা ও ভালবাসার ব্যপ্তি, এটা প্রকাশ করা যাবে না। সারা দেশের বুকে তাঁকে নিয়ে ছিল একটা চরম শ্রদ্ধা, অভিনেতা হিসেবে বটেই, নাট্যকার, কবি হিসেবেও ছিলেন তিনি প্রবাদপ্রতীম। এমন ভালবাসা ও শ্রদ্ধা পাওয়া ব্যতিক্রম। তিনি মানুষ হিসেবে অনন্য ছিলেন বলেই এমন সম্ভবপর হয়েছে।

আমার সঙ্গে তাঁর বেশ কয়েকবার সাক্ষাতের সুযোগ ঘটেছে। তিনি ছিলেন এককথায় প্রাণখোলা। এত বড় একজন মহাব্যক্তিত্ব, সেই দম্ভ প্রকাশ পায়নি কোনওদিনই। এটাও তাঁর একটি বিশেষ চরিত্রের গুণ ছিল। আমাদের ফুটবলারদের সঙ্গে দারুণ সম্পর্ক রেখে চলতেন।

আমার বেশ মনে রয়েছে। একবার বোম্বাইতে (তখন মুম্বই হয়নি) রোভার্স কাপ ফুটবল খেলতে গিয়েছি। উনিও কোনও একটা কাজে গিয়েছিলেন সেইসময় ওখানে। আমরা খেলা শেষে টের পাই মাঠে এসেছেন শচীন দেব বর্মন, রাজ কাপুর, দিলীপ কুমাররা। সঙ্গে ছিলেন সেদিন সৌমিত্রও। আমাকে দেখে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘‘আরে গৌতম, তুমি যে মাঠে এত দৌড়য়, দম পাও কোথা থেকে?’’
আমাদের পাশেই ছিলেন কোচ প্রদীপদা (পিকে), উনি সৌমিত্রবাবুকে বলেছিলাম, ‘‘গৌতমের দম হবে না, ও তো আমাদের বেকেনবাওয়ার।’’ সেদিন সত্যিই আমি খুব লজ্জায় পড়ে গিয়েছিলাম। এত বড় অভিনেতা, খেলার প্রতি কতটা প্যাশন থাকলে এত সুক্ষ্মভাবে খেলাকে বিশ্লেষণ করতে পারেন। শুনেছিলাম উনি নিজেও একসময় কলকাতা ময়দানে খেলতেন।

একবার ১৯৭২-৭৫ সাল পর্যন্ত ইস্টবেঙ্গল সেইসময় অশ্বমেধের ঘোড়ার মতো ছুটছে। লিগ টানা জিতছে, শিল্ড জিতছে, দারুণ রমরমা ব্যাপার। সেইসময় প্রদীপদা-র কাইজার স্ট্রিটের রেলের কোয়ার্টারে একদিন সৌমিত্রবাবু এসেছিলেন। আমরা ফুটবলাররাও ছিলাম সেদিন। অনেক গল্প হয়েছিল, হাসি তামাশাও। আরও একবার সুরজিৎ সেনগুপ্তর ছেলের বিয়েতেও দেখা হয়েছিল, সেদিনও বলেছিলেন, ‘‘গৌতম দৌড়টা থামিও না।’’
তাই আজ সেইসব স্মৃতি মাথায় ভিড় করছে। তবে একটা বিষয় বুঝি, মানুষ বেঁচে থাকে তাঁর কাজের মাধ্যমে। উনিও আমাদের কাছে বেঁচে থাকবেন ফেলুদা, অপু হয়েই। ওনাদের মৃত্যু হয় না।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More