Exclusive জুতো মেরে ওঠবোস করিয়েছে তৃণমূল, ওয়ালে অভিজ্ঞতা লিখলেন কবিতা

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    কবিতা দাস

    পরশুদিনের কথা মনে পড়লেই ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। অপমানে চামড়ার তলায় এখনও জ্বালা করছে। রাগ হচ্ছে। কী করব বুঝে উঠতেই পারছি না।

    খুব খারাপ স্বপ্নেও কখনও ভাবিনি এইভাবে হেনস্থা হতে হবে। তাও পাড়া-পড়শিদের সামনে! গ্রামের ভেতরেই। একটা লোকও আমাকে বাঁচাতে এল না। প্রতিবাদ করল না!

    এবার না হয় আমার স্বামী নির্দল হয়ে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু চিরকালই তো তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থন করি আমরা। সবাই জানে মনে প্রাণে তৃণমূলকেই ভালোবাসেন তিনি। তারপরও এইভাবে হেনস্থা করল ওরা? মাঝে একটা গোটা দিন চলে গেল, অথচ তৃণমূলের কোনও বড় নেতা একবারও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন না!

    আরও পড়ুন কবিতাকে জুতো মেরেছিল, আরেক বধূকেও মেরে হাসপাতালে

    পঞ্চায়েত ভোটের দিন বাড়ির সব কাজ সকাল সকাল শেষ করে বেরিয়েও পড়েছিলাম।

    বাগডুবি প্রাথমিক স্কুলের বুথেই চিরকাল ভোট দিই আমরা। সেখানে পৌঁছে দেখি বিরাট লাইন। এগোচ্ছেই না। তবু পাড়ার লোকেদের সঙ্গে দাঁড়িয়েছিলাম। ভেবেছিলাম ভোট দিতে পারব কোনও গণ্ডগোল ছাড়াই।

    হঠাৎ দেখি এলাকার তৃণমূলের নেতা লক্ষ্মী কুইল্যা আরও অনেক লোকজন নিয়ে এসে ঝামেলা শুরু করে দিল। গালাগাল চিৎকার চেঁচামেচি করতে করতে সবাইকে সরিয়ে দিয়ে ছাপ্পা ভোট দিতে শুরু করল।

    প্রথমে কী করব বুঝতে পারছিলাম না। তারপর রাগে মাথাটা রি রি করে জ্বলে উঠল। চুপ করে থাকতে পারলাম না। ততক্ষণে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা আরো অনেকে চিৎকার শুরু করেছে। ওদের সঙ্গে আমিও রেগে গিয়ে চিৎকার করতে শুরু করলাম। বললাম, এরকম চলতে পারে না। আমাদের ভোট দেওয়া আটকানো যাবে না।

    বলামাত্রই আমাদের সবার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল লক্ষ্মী কুইল্যা আর ওর দলবল। আমাদের মারতে শুরু করে দিল।

    লক্ষ্মী যখন এগিয়ে এসে আমার গায়ে হাত দিল তখন আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। পা থেকে চটি খুলে এক ঘা কষিয়ে দিলাম ওর গালে।

    তখন কি জানতাম, তার জন্য এই ফল ভুগতে হবে? জানলে, সেইদিন হয়ত চুপ করেই থাকতাম।

    সেদিন ঝামেলার পর যে যার মতো নিজের ঘরেই ফিরে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, ভোটের রাগারাগি বুথেই শেষ হয়ে গিয়েছে।

    কিন্তু না, ভোটের ফল বার হতেই এলাকার তৃণমূল পার্টি অফিস থেকে ডেকে পাঠাল  আমার স্বামীকে। আমরা একটু ভয়ই পেয়েছিলাম। তবু ভেবেছিলাম ওরা তো জিতেই গিয়েছে, এখন হয়ত খুব বেশি কিছু করবে না। কিছুক্ষণ পর ওদের একজন এসে বলল বাড়ির মহিলাদেরও যেতে হবে। আমাদের বাড়িতে আমি একাই মহিলা। ভয় হল, আমার স্বামীর কিছু হয়নি তো?

    ছুটে গেলাম। গিয়ে দেখি এলাকার তৃণমূল নেতারা সবাই সেখানে বসে আছে। লক্ষ্মী কুইল্যাও হাজির। আমাকে দেখে সবাই রে রে করে তেড়ে উঠল। বলল, তুই লক্ষ্মীকে জুতো মেরেছিস, তোকেও এর ফল ভুগতে হবে।

    আমাকে দাঁড় করিয়ে জুতো মারার বিধান দিল ওরা। আমি ভয়ে কাঁদতে শুরু করলাম। হাত জোড় করে ক্ষমা করে দিতে বললাম। পা ধরলাম। কেউ শুনল না। জুতো মারতে মারতে আমাকে মাটিতে ফেলে দিল। তারপর বলল, লক্ষ্মীর জুতো মাথায় নিয়ে ওঠবোস করতে হবে আমায়। আমি লক্ষ্মীর পায়ে পড়লাম। ‘ছেড়ে দিন। ক্ষমা করে দিন। আমার ভুল হয়ে গিয়েছে। রাগের মাথায় অন্যায় করে ফেলেছি। ক্ষমা করে দিন আমায়।’

    লক্ষ্মী ঝটকা মেরে পা-দু’টো সরিয়ে নিল। আমাকে ধরে আমার মাথায় জোর করে লক্ষ্মীর জুতো তুলে দিল ওর চ্যালাচামুণ্ডারা। গুনে গুনে ৩০০ বার ওঠবোস করাল আমায়। আমি লজ্জায় কেঁদে ফেলছিলাম। পা’দুটো যেন ছিড়ে যাচ্ছিল ব্যাথায়। পুরো শরীরেই কষ্ট হচ্ছিল। ক্লান্ত লাগছিল। মনে হচ্ছিল মাথা ঘুরে পড়ে যাব যে কোনও মুহূর্তে। কষ্টটা শুধু শরীরের নাকি শুধুই অপমানের এখনও বুঝতে পারি না।

    তারপর জুতো মালা তৈরি করে নিয়ে এসে আমাকে পরিয়ে দিল ওরা। লক্ষ্মী কুইল্যার বউও ছিল ওদের মধ্যে। আমাকে জোর করে গ্রামের মধ্যেই জুতোর মালা হাঁটাল ওরা। সেই গ্রামে যেখানে এত বছর ধরে আমরা থাকি। যেখানে সবাই আমাদের চেনে। সেই একই গ্রামে জুতো মালা পরে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেত হল আমায়। দু’চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছিল আমার। লজ্জা করছিল। নিজের ওপরেই ঘেন্না হচ্ছিল। কিন্তু কিচ্ছু করতে পারিনি আমি। মাথা হেঁট করে গ্রামের রাস্তা দিয়ে গলায় জুতোর মালা পরে হেঁটে গিয়েছি। ওরা যেমন চেয়েছে তাই করেছি।

    আমার স্বামী এককোণে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন এইসব। ওঁর কিছু করার ছিল না। কীই বা করতে পারতেন সেসময়?

    বেলা বাড়ার পর, আমাদের ছেড়ে দিল ওরা। কোনওমতে, শরীরটাকে টানতে টানতে বাড়ি ফিরে আসলাম।

    একটু পরেই শুরু হল হুমকি। কাউকে কিছু জানালে দেখে নেওয়া হবে।

    ভয়ে পুলিশের কাছেও যেতে পারিনি আমরা। কী করব, কে বাঁচাবে ওরা ফের মারতে এলে?

    লক্ষ্মীর মুখে রাগের মাথায় জুতো মেরে হয়ত ঠিক করিনি আমি। কিন্তু তার জন্য প্রকাশ্যে, গ্রামের ভেতর, একজন বাড়ির বউকে এইভাবে অপমান করা যায়?

    জানি না এত লজ্জার পরও কীভাবে এই গ্রামে রয়েছি। এখনও…

    আরও পড়ুন: Exclusive: তৃণমূলকে ভোট দেননি, কান ধরে ওঠবোস বধূকে

     

     

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More