ফিল্ম রিভিউ: ওয়াচমেকার

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ

যখনই নতুন বাংলা সিনেমা বাজারে আসে দু’পক্ষকে রে রে করে মাঠে নেমে পড়তে দেখি। একদল বলেন কিস্যু হচ্ছে না, অন্যদল বলেন তাঁরা জুতো অবধি মুগ্ধ। কিন্তু যা বাজারে আসে না তা নিয়ে সিনেমা পণ্ডিতরা কথাই বলেন না। যে বাজার নিয়ে এত আকচাআকচি সে বাজারে মুগ্ধবোধ অতুলনীয় এই দিক থেকে।

সময় আপনার জুতো থেকে শুরু হয়ে চুলে এসে পৌঁছয়। অথবা উল্টোটা। খুঁজে, বুঝে নেবার দায় আপনার। আপনার সমস্তের ছাঁট বলে দেয় আপনি আধুনিক না প্রাগৈতিহাসিক। এই বিভাজনের লীলাখেলা নিরন্তর বইতে থাকে পণ্যের দুনিয়া থেকে নগণ্যের দুনিয়াতেও। সে লীলা হাজারো ধর্মযুদ্ধের জন্ম দেয়। অনিন্দ্য পুলক ব্যানার্জির ‘ওয়াচমেকার’-এর শেষেও তার দোর্দন্ডপ্রতাপ নিয়ে সে হাজির।

একটি কন্যা এবং এক নারী একটি সিঁড়ি দিয়ে কেবলি ওঠে নামার দিকে। এমন অন্তর্ঘাতি লিরিক্যাল এবং উপমা সুলভ ভিস্যুয়াল কতযুগ দেখি না। একটি পুরুষ বারেবারে তাদের ধাক্কা দিয়ে দুঃখিত বলে ওঠার দিকে নামে আর নামার দিকে ওঠে। প্রশ্ন হচ্ছে সিঁড়ি কি নামে না ওঠে? কেউ জানে না। যুগের পর যুগ আমরা তবু সিঁড়ি বানাচ্ছি। সিঁড়িভাঙার অঙ্ক কষছি। আমরা উঠছি না নামছি এই ‘বোধ’ দিয়ে সিঁড়ির চরিত্র নির্ধারিত হয়। সাফল্য-ব্যর্থতা নির্মিত হয়। এবং সফল ও ব্যর্থ উভয় পক্ষেরই পক্ষে-বিপক্ষে থাকে সময়।

তিনটি চরিত্র একে একে এসে জমে। দুই পুরুষ, এক নারী। একজনের মতে সময় পেছন দিকে চলেছে। সে ঘড়িনির্মাতা। তার দু-একটা ঘড়ি বাদে সবই পিছিয়ে যাচ্ছে বলে তার ধারণা। মেয়েটির সময় একেবারে থেমে আছে। ভাস্কর পুরুষটি দিন-রাত্রিকে কেটে ভাস্কর্য বানানোর কাজ, সময় নিয়ে তার বিরাট মাথা ব্যথা নেই। এবং ওডিসি যে ফেরার কথা বলে তা সত্যিই সম্ভব হয়েছিল কি?

সিনেমার পর্দাতে অনিন্দ্য পুলক ব্যানার্জি, হিরণ মিত্রের শিল্প নির্দেশনা,  মধুরা-র সিনেমাটোগ্রাফি, শব্দ এবং আবহ সহযোগে এক প্রচণ্ড তাণ্ডবে মেতে ওঠে। সম্পাদনার কাজটা কঠিন লিনিয়ার নয় বলেই। ন্যারেটিভে এক ধরণের থ্রিল এসে বসে পড়েছে। আবার সেই থ্রিলটা জেমস বন্ড মার্কাও নয়। আত্মমগ্ন স্বরের মত তার চোরাটান। ফ্রেমে ফ্রেমে মিলিয়ে দিলেই এখানে প্রেম আসবে না। প্রেম বিলোতে এখানে বেশ কঠিন রাস্তায় হাঁটতে হয়েছে সম্পাদককে।

‘স্কাল্পটিং ইন টাইম’ নামক ফ্যাশনেবল স্টেটমেন্ট এবং তারকোভস্কির নাম জপে কাজ চালানো যায়নি। তার ফলেই ঝুঁকিবহুল এক খেলা চলেছে গোটা সিনেমা জুড়ে। এমন হয়েওছে পাঁচিলে হাঁটতে হাঁটতে খেলোয়াড় এখানে পড়েই গেছে। ডাউন এন্ড আউট। বিশেষ করে ইংরেজি আর ফরাসির ব্যবহার। ক্লান্ত করে। দর্শকাসন থেকে চিৎকার করে উঠতে হয় গালি সমেত। এত ভাল একটা খেলায় এমন একটা পাস বাড়ালি কেন? তারপর সে সব অমৃত শব্দাবলী! এবং রাগটা কষ্টের দিকে চলে যায়। নির্দেশক এবং তার গোটা ইউনিটের পাশে কাঁধে হাত দিয়ে বসে থাকা যায়। ওরা চূড়ান্ত একটা ভাল খেলার সম্ভাবনাকে মাঠে ফেলে রেখে এসেছে। অথচ আরেকটা খেলার প্রতিশ্রুতি জাগিয়ে দিয়েছে।

অনিন্দ্য পুলকের এটি দ্বিতীয় কাজ নির্দেশক এবং চিত্রনাট্যকার হয়ে। এ সিনেমা আমার-আপনার পাড়ার হলে আসবে না। জনগণ গেয়ে না গেয়ে বিতর্ক করার স্কোপ নেই পপকর্ন খেতে খেতে। অবগাহন করার আছে। সময় মানুষের তৈরী করা বেশ কিছু ধারণার মধ্যে একটা। মানুষের হাতের সেই স্বকল্পিত রাজদণ্ড যাতে  ব্রহ্মাণ্ড মেপে ফেললাম, কেমন দিলাম গোত্রের অশ্লীলতা কাজ করে। সাম্রাজ্যের স্বর সময়ের পরিকল্পনার মধ্যে সর্বদা নিহিত পাতালছায়া। সেই সময়কে ভেঙে ফেলার দুঃসাহস, না সেই মিথকে ভাঙার দুঃসাহস নিয়ে ‘ওয়াচমেকার’ উঠে দাঁড়িয়েছে।

আসলে ‘ওয়াচমেকার’ যদি শুধুই উঠে দাঁড়াত, মেডাল জয়ের গন্ধ এসে যেত তার মধ্যে তাহলে শিল্পের প্রতি একপ্রকার বিশ্বাসঘাতকতাও রচনা হত। মেডাল জয়ের জন্য শিল্প নয়। অস্তিস্ত্বকে প্রশ্ন করার যে পরম সক্ষমতা মানুষের, তার কাছেই এ শিল্পের বিশ্বস্ততা। এর প্রতিটি উত্থান-পতনকে চিহ্নিত করে বলা দরকার, একটাও উত্থান-পতন নয়। ওই ধারণাটাকে এখানে ফেলে দিতে হবে, প্যারামিটারগুলো বেকার বলে। এ শুধু এক যাত্রা, যেখানে সিসিফাস পাথর তুলবে আর গড়াবে। আমরা বিপন্ন হব, বিপন্ন হব আলো-আঁধারির ম্যাট্রিক্সে। আততায়ী কাছাকাছিই তো থাকে।

(লেখক সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং নাট্যকর্মী)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More