মঙ্গলবার, মার্চ ২৬

শিবরাত্রি: এক শিল্পীর মৃত্যু, এক বিপ্লবীর উত্থান, ব্যর্থ প্রেমের গল্প লেখে সন্ত্রাস  

চৈতালী চক্রবর্তী

অব্যক্ত কথাই শ্রেষ্ঠ কথা। অনুচ্চারিত বা অস্ফুটে কথার মালা গেঁথে চলে কারা? তারা কি শিল্পী, নাকি মনের সূক্ষতাকে বিসর্জন দেওয়া, হাতে স্টেনগানধারী একদল সন্ত্রাসবাদী? সন্ত্রাস কাকে বলে? আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে মানবশরীর ছিন্নভিন্ন করাটাও যেমন সন্ত্রাস, এক শিল্পীর শিল্পসত্তাকে নীরবে নিভৃতে হত্যা করাটাও সন্ত্রাস। যুদ্ধজয়ের পরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রক্তেরাও ভালোবাসার মৃত্যুর কথা বলে। সেখানে সন্ত্রাস মানে স্বপ্নের মৃত্যু। প্রেম-হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন-আক্রোশ থেকে জন্ম নেওয়া বিপ্লব আর তারই সমান্তরালে ঘটে চলা মৃত্যু-একই সুতোয় বেঁধেছেন প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক রাজাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলা সিনেমার জগতে প্রথম কুর্মালি ভাষার পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র ‘ডেথ সার্টিফিকেট’-এর সাফল্য ও আন্তর্জাতিক এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার ইউরোপ আমেরিকায় পাওয়ার পর  তাঁর পরবর্তী ছবি ‘শিবরাত্রি’ সমাজেরই নানা দিককে ফুটিয়ে তুলেছে।

গোটা ছবিটাই সমাজের বুকে মাথা তুলে দাঁড়ানো একটা ক্যানভাস যেখানে রং-তুলি দিয়ে পরিচালক শোষণ, নিপীড়ণ, ভালোবাসা, অস্তিত্ব, যন্ত্রণা আর মৃত্যুর ছবি এঁকেছেন।

রাজাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি সৌজন্যে: শুভজিৎ চন্দ

পুরুলিয়া-ঝাড়খণ্ডের রুক্ষ মালভূমির প্রেক্ষাপটে অপরূপ নৈসর্গিক দৃশ্য আর কুয়াশামাখা প্রকৃতির আঁকেবাঁকে ছবির চিত্রনাট্য সাজিয়েছেন পরিচালক রাজাদিত্য। প্রকৃতি বরাবরই তাঁর ছবির অন্যতম মুখ্য চরিত্র। ‘ডেথ সার্টিফিকেট’ ছবিতেও ছিল ‘শিবরাত্রি’র গল্পেও তার ব্যতিক্রম নয়। পাহাড়ের কোল ঘেঁষা প্রায় জনবিরল প্রান্তর সিতানপুর আচমকাই পরিণত হয় মৃত্যু উপত্যকায়। রেললাইনের উপর পড়ে থাকা একটা মৃতদেহ এবং তার পাশে লাল কালি দিয়ে লেখা একটা পোস্টারের কিছু শব্দ আলোড়ন তোলে এলাকার গুটিকয়েক মানুষের মনে।

দুর্ঘটনা? না ঠাণ্ডা মাথায় খুন?  রহস্যেরা কুয়াশার মতোই আষ্টেপৃষ্টে ধরে সিতানপুরকে। শুরু হয় পুলিশি তদন্ত। সিতানপুরে এসে পৌঁছন আইপিএস অফিসার সত্যেন ও তাঁর বস রামগোপালবাবু।

ততদিনে আরও কয়েকটা মৃত্যু হয়েছে এলাকায়। সবকটা মৃত্যুর ধরনই এক, পাশে থাকা পোস্টারের বুলিও এক। সত্যেন ডাকাবুকো মানুষ। বাইরেটা যতটা রুক্ষ, ভিতরটাও ততটাই কঠিন। তদন্তের শুরুতেই ধরে ফেলেন এই মৃত্যু কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং কোনও রাজনৈতিক দল বা বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন দ্বারা  খুন। রাজ্য গোয়েন্দা দফতরও সেই কথা জানায়। কিন্তু, কেনই বা এই খুন? কী তার উদ্দেশ্য?

পোস্টারের ভাষাও তো বড় বিচিত্র—

“আমি একটা যুদ্ধ লড়ছি। বলছি না তুমি আমায় সমর্থন করো। শুধু বলছি ভেবে দেখো, একটা মানুষকে কেন যুদ্ধ লড়তে হয়?”

যুদ্ধ! সন্ত্রাস! মৃত্যু! চরিত্রেরা সজীব হয়ে ওঠে, মোড় নেয় গল্প! একদিকে বেড়ে চলা হত্যাকাণ্ড অন্যদিকে অজ্ঞাতপরিচয় আততায়ীদের খোঁজ পেতে নাভিশ্বাস ওঠে পুলিশের! রুটিন তল্লাশিতে গিয়ে সত্যেনের দেখা হয় মধুবনের সঙ্গে।

মাঝবয়সী, সাধারণ চেহারা মধুবনের, কিন্তু চোখ দুটো বড় প্রখর। যেন আগুন জ্বলছে ধিকি ধিকি। পুলিশের জেরায় মধুবন জানায় সে একজন শিল্পী। নাম মধুবন, লোকে ভালোবেসে ডাকে মধু। ছৌ নাচ আর নাটকের দল রয়েছে মধুবনের, যার নাম ‘কেউ না।’ এ কেমন নাম? যে তার অস্তিত্বই জানান দিতে চাইছে না, সে কে? নাটকের দল নিয়ে মাঝে মাঝেই কোথায় উধাও হয়ে যায় মধুবন? রহস্যেরা ভিড় করে পুলিশ অফিসার সত্যেনের মনে।

একঢাল কালো চুল, বড় লাল টিপের অঞ্জলি সত্যেনের স্ত্রী। কর্কশ পুলিশ অফিসারের পাশে সে এক স্নিগ্ধ, শীতল পাহাড়ি নদী। যার মধ্যে উচ্ছ্বাস আছে,স্বপ্ন আছে। অঞ্জলি ছবি আঁকতে ভালোবাসে, সে দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়, ভাস্কর চক্রবর্তীর কবিতা পড়ে। তার শিল্পী মন যান্ত্রিক সম্পর্কের শৃঙ্খল বোঝে না। তাই প্রতি রাতে স্বামীর কাছে ধর্ষিতা হতে হতেও সে এক মায়ামাখা কুয়াশার স্বপ্ন দেখে, যেখানে শিবের মুখোশ পড়ে হেঁটে যাচ্ছে এক পুরুষ। স্বপ্নেরা মিলিয়ে গেলে অঞ্জলি ছবি আঁকতে বসে। শিবের ছবি। কিন্তু রং-তুলি জীবন্ত হয়ে ফুটিয়ে তোলে শুধু পার্বতীর অবয়ব । শিবই তো নেই তার জীবনে।

সত্যেনের সঙ্গে সিতানপুরে এসে অঞ্জলি জানতে পারে মধুবনের কথা। দমকা হাওয়ার মতো মধুবনের চরিত্রের প্রতিটা দিক তাকে না পাওয়া ভালোবাসার কথা মনে করিয়ে দেয়।  অঞ্জলির সন্দেহ হয়  মধুবন কোনও বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। অঞ্জলির সঙ্গে কি দেখা হবে মধুবনের?  আসলে কে এই মধুবন? সে কি সত্যিই কোনও সন্ত্রাসবাদী? নাকি জীবনযুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া এক প্রেমিক? মধুবনের জীবনেও কি ছিল কোনও রহস্যময় নারী? কেন সে তার নাটকের দলের নাম রাখে ‘কেউ না’?

শ্রাবণমেলার শেষে কে আসছে সিতানপুরে  ?

এই সব কিছু জানতে দেখতে হবে ‘শিবরাত্রি’। একটি সোশিও পলিটিক্যাল থ্রিলার অথচ কবিতা লিখেছেন রাজাদিত্য সেলুলয়েডে।

ছবিতে মধুবনের ভূমিকায়  অনবদ্য  অভিনয় করেছেন পরিচালক রাজাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে। মূল গল্প জনপ্রিয় সাহিত্যিক দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শিবরাত্রি’ অবলম্বনে হলেও চিত্রনাট্যের সিংহভাগ ও সংলাপ লিখেছেন পরিচালক নিজেই। সত্যেনের ভূমিকায় সুমন বন্দ্যোপাধ্যায়, রামগোপালবাবুর ভূমিকায় পার্থসারথি দেব অনবদ্য। ছবিতে নজর কেড়েছে শিশু অভিনেতা ও নৃত্যশিল্পী আরিয়ান দত্ত।


(বাঁ দিকে), আরিয়ান দত্ত। পুলিশ অফিসার সত্যেনের ভূমিকায় সুমন বন্দ্যোপাধ্যায় (ডান দিকে) 

আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচালক রাজাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে একজন থিয়েটার অভিনেতা ও দক্ষ চিত্রনাট্য লেখক।প্রেসিডেন্সি কলেজের স্নাতক রাজাদিত্য ফিল্ম মেকিংয়ে ডিপ্লোমা করেছেন বাল্টিক ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্কুল, ইস্টোনিয়া থেকে। অভিনয় জড়িয়ে রয়েছে তাঁর শিরায়-উপশিরায়। ইউরোপ ও আমেরিকার নানা মঞ্চে অভিনয় করেছেন। তথাকথিত স্টারদের বদলে তাঁর ছবিতে জায়গা পান মঞ্চের অভিনেতা-অভিনেত্রীরাই।

এই প্রসঙ্গে রাজাদিত্য বলেছেন, “আজকাল পরিচালক-প্রযোজকরা ‘প্লে ইট সেফ’ থিওরি মেনে চলেন। নামী অভিনেতা মানেই মিডিয়া কভারেজ, স্যাটেলাইট রাইটস বেচা যাবে সহজেই, শট টেকিংয়েও ফর্মুলার বাইরে যান না কেউ। অর্থাৎ একটা অঙ্ক কষে সিনেমা বানানো। কিন্তু আমি এই ধরাবাঁধা গতে চলতে চাইনি। সুযোগ এসেছে নতুনদের মঞ্চ ছেড়ে দেওয়ার।“  পরিচালকের কথায়, “আমাদের চারপাশে যা কিছু ঘটে চলেছে সেটাকেই সহজ সরলভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়বদ্ধতা একজন চলচ্চিত্র পরিচালকের থাকে। তাই মেদিনীপুর, ম্যানহাটান বা মাদ্রিদ যেখানেই মানুষ আমার ছবি দেখেন বা দেখবেন, তাঁরা নিজেদের জীবনের সঙ্গে ছবির ভাবধারাকে মেলাতে পারবেন। আর এটা করতে আমার স্টারদের প্রয়োজন নেই। দেশে বিদেশে নতুনদের নিয়ে অনেক কাজ করেছি, অনেক কিছু শিখেছি, তাদের থেকে আমি অনেক উৎসাহ পাই ।”

‘শিবরাত্রি’ মুষ্টিমেয় চরিত্র নির্ভর ছবি নয়, এই ছবি সমাজের কাছে একটা বার্তা। যেন ক্যানভাসে কবিতা এঁকেছেন পরিচালক।অসাধারণ কয়েকটি শট রাজাদিত্য কম্পোজ  করেছেন যা মনে করিয়ে দেয়  থিও এঞ্জেলোপোলিস, বেলা টার আর ক্রিস্টোফ কিসলোস্কির সিনেমার কথা।  এই ছবি ভাবতে বাধ্য করে, “একটা মানুষকে কেন যুদ্ধ লড়তে হয়?” এক থিয়েটার আর্টিস্টের বিপ্লবী হয়ে ওঠার গল্প ‘শিবরাত্রি,’ এক শিল্পসত্তার ছিঁড়েখুঁড়ে যাওয়ার গল্প‘শিবরাত্রি,’ এক ব্যর্থ প্রেমের গল্প বলে ‘শিবরাত্রি।’

পরিচালকের কথায়, “দাদা বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত ছবি হাউসফুল-এ একটা দৃশ্য ছিল যেখানে ব্যর্থ ফিল্মমেকার প্রসেনজিত (চট্টোপাধ্যায়) বলছেন ‘বাইরে একটা যুদ্ধ চলছে।’ আমি বলি লড়াইটা চলছে ভেতরে ও বাইরে। এখানে হার-জিত শেষ কথা নয়, লড়াই চালিয়ে যাওয়াটাই বড় কথা।” ট্রেলারেও তার ছাপ রেখেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। বলেছেন, ‘‘ ট্রেলার দেখে অনেকেই দাদার (বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়) সোহরা ব্রিজের কথা বলেছেন। সেই পাহাড়, কুয়াশা। পরিচালনার আর অভিনয়কে একই সঙ্গে সমান্তরাল ভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন অনেকে। তাঁদের আফশোস দাদা আর আমার যুগলবন্দী একসঙ্গে ধরা দিলো না।’’

সামাজিক নিষ্পেষণ, অবক্ষয় এবং প্রেম একই সঙ্গে গতিময় এই ছবিতে। মূল গল্পকে আধুনিকতার মোড়কে মুড়ে বাস্তব সমাজের সুস্পষ্ট ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক রাজাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সঙ্গে দর্শকদের জন্য ছুড়ে দিয়েছেন কয়েকটা অমোঘ প্রশ্ন, মানবিকতার বিশ্বায়ন কি সত্যিই সম্ভব? আমরা পারি না হিংসা আর স্বার্থের কালো মেঘ সরিয়ে একটা নতুন ভারতবর্ষ গড়ে তুলতে? একজন শিল্পীরও নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার আছে, তাকে কি সেই অধিকার কোনও দিন দিতে পারবে এই সমাজ?

আরও পড়ুন:

মানবিকতার বিশ্বায়ন কবে? প্রথম কুর্মালি ছবি ‘ডেথ সার্টিফিকেট’

Shares

Comments are closed.