বুধবার, মার্চ ২০

রিভিউ সঞ্জু, খলনায়ককে নায়ক করা অতিসরল দারুণ এন্টারটেনমেন্ট

শমীক ঘোষ: নামী এবং বড়লোক বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে। সেই ছেলে ড্রাগ খায়। কেন খায়? না তার বাবা বকেছে। তাই সদ্য আলাপ হওয়া একটা ছেলে যখন তাকে ড্রাগ খেতে বলে, সে বিনা বাক্যে খেয়ে নেয়।

সব চেয়ে প্রিয় বন্ধু, যে তার জন্য সব কিছু পণ করতে পারে, তারই একমাত্র বান্ধবীর সঙ্গে শুয়ে পড়তে পারে। কেন? না বন্ধুটি মাতাল অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়েছে এবং মেয়েটি চেয়েছে বলে।

বাবাকে মেরে ফেলার ভয় দেখানো হয়েছে বলে সেই আবার জোগাড় করে ফেলে একে ফিফটি সিক্স অ্যাসল্ট রাইফেল। না এবারও কিন্তু এই আইডিয়াটা তার নিজের নয়। এই পরামর্শও তাকে দিয়েছে তার এক বন্ধু।

এই ছেলেই আবার পুলিশের একটা থাপ্পড় খেয়ে গড়গড় করে বলে দেয় তার সব অপরাধে কথা। তার সঙ্গে বলে স্যার প্লিজ বাবা যেন জানতে না পারে।

আরও পড়ুন: পর্দায় ফিরছে নব্বইয়ের নস্টালজিয়া ‘1942-a love story’

কি সরল না ছেলেটা? কি অতিমাত্রায় সরল! সে ড্রাগ খায়, অন্য লোকের ইমোশন নিয়ে খেলে। রাষ্ট্রবিরোধী কাজে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু কোনও কিছুর জন্যই সে দায়ী নয়।

অবশ্য এই ছেলেটার একটাই ভয় আছে। কেউ যেন না ধরে নেয় সে টেররিস্ট। তাহলে তার বাবার মাথা কাটা যাবে। তাহলে তার সন্তানদের লোকে বলবে, তোমাদের বাবা টেররিস্ট ছিল। এইটুকুই। এর বাইরে আর কিছুই নয়।

এই ছেলেটা যদি বলিউডের ফিল্মস্টার না হয়ে, সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দলের এমপি এবং প্রাক্তন সুপারস্টারের ছেলে না হত, তাহলে এর অতি সহজ সারল্য আদৌ বিশ্বাসযোগ্য হত? ক্ষমা করতে পারতেন একে?

কিন্তু গল্পটা বললেন কে? না হিন্দি সিনেমার অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্টোরিটেলার, ঋষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের উত্তরসূরি হিসাবে যাকে ধরা হয় সেই রাজকুমার হিরাণী।

নিঁখুত গল্পবলিয়ে হিসাবে তাঁর খ্যাতি প্রবল। নিন্দা একটাই সবকিছুরই অতিসরলীকরণ করে, সামাজিক সমস্যাকে সহজ পাচ্য সর্বজনগ্রাহ্য আবেগে সহজে গিলিয়ে দিতে পারেন।

আরও পড়ুন: পিকুর পর ফের ড্রাইভারের চরিত্র, কারওয়াতে কী চমক দেবেন ইরফান

এই ভাবেই সমাজের ধরে নেওয়া খলনায়ক মাস্তান মুন্নাভাইকেও তিনি সবার আদরের মণি করে তুলেছিলেন। এবার করলেন মুন্নাভাইয়ের অভিনেতা সঞ্জয় দত্তকে। বললেন একটা বন্ধুত্বের গল্পের ঢঙে। মুন্নাভাইয়ের সার্কিটের জায়গায় এইখানে ‘কমলি’। কমলেশ কানহাইয়ালাল কাপাসি।

মুম্বাই দাঙ্গা, মুম্বাইয়ের বোমা বিস্ফোরণ সেই মামলায় সঞ্জয় দত্তের জড়িয়ে পড়া। বলিউডের আন্ডার ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে তাঁর কানেকশন, সব শুধু ছুঁয়ে যাওয়া হল। বলা হল সঞ্জয় দত্তের নিজের বয়ানে। সব কিছুকেই দূরত্ব আর সামান্য স্ক্রিন টাইমের লঘুত্বে ঢেকে দিয়ে।

সঞ্জয়-মাধুরীর প্রেম, প্রাক্তন স্ত্রী রিচা শর্মা, রিয়া পিল্লাই,  সঞ্জয়ের অন্য অসংখ্য সম্পর্ক, ড্রাগ খেয়ে দিনের পর দিন সিনেমার হিরো হওয়া। এবং সেই নেশাগ্রস্থ অবস্থায় জঘন্য বাজে অভিনয়ের পরও একের পর এক ছবিতে চান্স পেয়ে যাওয়া, কিছুই বলা হল না।

সঞ্জয়ের ইমেজ খারাপ করার জন্য দায়ী কে? না মিডিয়া। গোটা ছবিতে এটাই প্রতিপাদ্য বিষয়। আর নিখুঁত গতিময় স্ক্রিপ্ট দিয়ে সেটা প্রমাণ করার পর, শেষে টাইটেল কার্ডের সঙ্গে খোদ সঞ্জু বাবার মুখে গান বসিয়ে সেটাকে আরও দেগে দেওয়া হল।

আরও পড়ুন: প্রথম দিনেই ৩৪ কোটি, ভাইজানের সঙ্গে হলিউডকেও পিছনে ফেললেন রণবীর

সঞ্জয় দত্তের বায়োপিক নয় এই ছবি। এ হল জনপ্রিয়তার নিখাদ মোড়কে সঞ্জয় দত্তের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা সহজ অতিসরল বয়ান।

একদম সোনম কাপুরের খ্যানখ্যানে গলায়, ‘হোয়ার ইজ মাই ব্লাডি মঙ্গলসূত্র’ বলে হাত ঝাঁকিয়ে চিৎকার করার মতোই। কিংবা বলব জীবনীকারের তাঁর সঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে তুলনা করেছেন বলে তাঁর ওপর বিরক্ত হওয়ার মতো কিংবা সেই মুহূর্তেই টিভি দেখে খোদ সঞ্জয় এবং তাঁর পরিবারের সুপ্রিম কোর্ট তাঁর মামলার রায় জানার মতো হিন্দি সিনেমার নিজস্ব অতিসরল সংবেদনশীলতা।

তবু বলব, দু’ঘন্টা ৪০ মিনিটের এই সিনেমা থেকে একবারও চোখ ফেরাতে পারবেন না। একবারও ভাবার অবকাশ পাবেন না।

তার কারণ অভিজাৎ জোশি আর রাজকুমার হিরাণীর স্ক্রিপ্ট আর রাজকুমার হিরাণীর অসাধারণ এডিটিং।

আরও পড়ুন: ফ্যানি খান নামের মাত্রাটাই পাল্টে দিয়েছেন অনিল

আর রণবীর কাপুর। এই ছবি জুড়ে শুধুই তিনি। অন্যরকম ছবি করে বেশ কয়েকবার ব্যর্থ রণবীর এই ছবিতে প্রথমবার বুঝিয়ে দিলেন, নির্দেশকের সামান্য সমর্থন পেলে, তিনি একাই গোটা সিনেমাটাকে ঘাড়ে করে টেনে নিয়ে যেতে পারেন। আর তাঁর সঙ্গে যোগ্য সঙ্গত করলেন কমলেশ কাপাসির ভূমিকায় ভিকি কৌশল।

মান্যতা দত্তের ভূমিকায় দিয়া মির্জার স্ক্রিন প্রেজেন্স ছাড়া বিশেষ কিছু করার ছিল না। লেখক উইনির চরিত্রে অনুষ্কাও শুধুই একটা সুন্দর মুখ। অবশ্য রণবীর সর্বস্ব এই স্ক্রিপ্টে তাঁর করারও বা কতটুকু ছিল। পরেশ রাওয়ালের অবশ্য ছিল। তিনি সেটা করলেনও। তবু বলব সুনীল দত্তের ভূমিকায় তাকে যেন কোথাও ঠিক মানাচ্ছিল না। সোনম কাপুরের ‘রুবি’ও তাঁরই মতো। ‘নার্গিস’এর চরিত্রে বহুদিন পরে অভিনয় করা মনীষা কৈরালা ঠিকঠাক। তার বেশি কিছু নয়।

বরফি, রামলীলা, জগ্‌গা জাসুসের সিনেমাটোগ্রাফার রবি বর্মনের কাজ এই ফিল্মে একদম হিরাণীর অন্য ছবির মতোই – যথাযথ।

তবে শেষ অবধি বারবার মিডিয়াকেই খলনায়ক বানানোয় কেমন যেন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে মনে পড়ছিল। তিনিও তো সব কিছুর জন্য মিডিয়াকে দায়ী করার এই পোস্ট-ট্রুথের জমানার তিনিই তো কুশীলব। আর এই ছবিও যে তাইই।

মুন্নাভাই এমবিবিএস করে একদা খলনায়কের নায়ক হয়ে ওঠার পোস্ট-ট্রুথ। তবে তারপরও বলছি, এই ছবি বহু টাকার ব্যবসা করবে। কারণ রাজকুমার হিরাণীর গল্প বলা।

Shares

Leave A Reply