অনাহারে থাকা সন্তানদের জন্য ডিম চুরি করেছিলেন ‘মা’, তাঁকে হতবাক করেছিলেন সার্জেন্ট

হেলেন ভেবেছিলেন তাঁকে হাতকড়া পরিয়ে জেলে পাঠানো হবে। কাঁপতে কাঁপতে হাত দুটি এগিয়ে দিয়েছিলেন, হাতকড়া পরানোর জন্য।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রূপাঞ্জন গোস্বামী

আমেরিকার আলাবামার ট্যারান্ট শহরের মধ্যবিত্ত এলাকার ছোট্ট ঘরে বসেছিলেন ওঁরা পাঁচজন। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাস শেষ হতে বাকি ছিল দিন দশেক। প্রায় দু’দিন অনাহারে আছেন সাতচল্লিশ বছরের বিধবা হেলেন জনসন, তাঁর দুই বিবাহবিচ্ছিনা মেয়ে ও দুই নাতনি। একজনের বয়েস এক, অন্যজনের তিন। ভীষণ কাঁদছিল বড় নাতনি তামারোজ। আগের দিন রাত থেকে না খেয়ে ছিল সে।

ভাগ্যবিপর্যয়ে জর্জরিত কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারটি, বছর খানেক আগেই এসে দাঁড়িয়ে ছিল খাদের কিনারায়। সরকার থেকে মাসে ১২০ কুড়ি ডলার করে সাহায্য মিলতো। যা পাঁচজনের তিনবেলা খাবার যোগানোর পক্ষে যথেষ্ট ছিল না। ডিসেম্বর মাসের টাকাটা কোনও কারণে আসেনি। প্রতিমাসে এক দুই ডলার করে জমাতে চেষ্টা করতেন হেলেন। তাই দিয়ে প্রায় অর্ধাহারে কেটেছিল ডিসেম্বর মাসের কুড়িটি দিন। একসময় ফুরিয়ে গিয়েছিল জমানো টাকাও। শুরু হয়েছিল অনাহার।

অনাহারে থাকা মেয়ে ও নাতনিদের মুখ দেখতে পারছিলেন না হেলেন। শেষ সম্বল, ১ ডলার ২৫ সেন্ট নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছিলেন। পাঁচটা ডিম ও একটি পাউরুটি কিনে সবাইকে খেতে দেবেন। দু’মাস ধরে আমেরিকার বিভিন্ন অংশে চলছিল কৃষ্ণাঙ্গ এবং শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা। অশান্ত পরিস্থিতির মধ্যেই হেলেন পৌঁছে গিয়েছিলেন, ‘ডলার জেনারেল’ নামে এক ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে।

পাঁচটি ডিম নিয়ে ক্যাশ কাউন্টারে গিয়েছিলেন। কাউন্টারের কর্মী জানিয়েছিল ট্যাক্স নিয়ে পাঁচটি ডিমের দাম পড়বে ১ ডলার ৭৫ সেন্ট। ক্যাশ কাউন্টারের কর্মীকে হেলেন বলেছিলেন, তাঁর কাছে ৫০ সেন্ট কম আছে। কর্মীটি বলেছিলেন ডিমগুলি র‍্যাকে রেখে আসতে। পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে মরিয়া হেলেন নিয়েছিলেন অন্য পথ। ডিম পাঁচটি র‍্যাক থেকে তুলে নিয়ে জ্যাকেটের পকেটে ঢুকিয়ে ফেলেছিলেন। সোজা চলে গিয়েছিলেন দরজার কাছে।

ভেঙে গিয়েছিল জ্যাকেটের পকেটে থাকা ডিম। পকেট গড়িয়ে বেরিয়ে এসেছিল ডিমের হলুদ অংশ। দরজায় দাঁড়ানো গার্ড থামিয়ে ছিলেন হেলেনকে। পকেট সার্চ করে পাওয়া গিয়েছিল তিনটি ভাঙা ডিমের খোলা ও দুটি আস্ত ডিম। মেলেনি ডিমের রসিদ। খবর দেওয়া হয়েছিল পুলিশে। কয়েক মিনিটের মধ্যে পৌঁছে গিয়েছিলেন ট্যারেন্ট পুলিশ স্টেশনের সার্জেন্ট উইলিয়াম স্ট্যাসি।

সার্জেন্ট উইলিয়াম স্ট্যাসি

কাঁদতে কাঁদতে সার্জেন্ট স্ট্যাসিকে হেলেন বলেছিলেন, “আমি চুরি করব বলে আসিনি অফিসার। ডিম কিনতেই এসেছিলাম। কিন্তু পঞ্চাশ সেন্ট কম পড়েছিল। গত দু’দিন ধরে আমার মেয়ে আর নাতনিরা না খেয়ে আছে। সন্তানদের বাঁচাতে আমি ডিম চুরি করেছি।” স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন সার্জেন্ট স্ট্যাসি। হেলেনকে চিনতেন তিনি। দাঙ্গার সময় বাইরে বেরোতে নিষেধ করার জন্য,একবার হেলেনদের বাড়িতেও গিয়েছিলেন। তখন দেখেছিলেন হেলেনদের অবস্থা। ঘরে খাট নেই, মেঝেতে পাতা ম্যাট্রেসে শুতে হয় তাঁদের।

সার্জেন্ট গিয়েছিলেন স্টোরটির মালিকের কাছে। দুজনের মধ্যে কথা হয়েছিল। দু’জন এগিয়ে গিয়েছিলেন হেলেনের দিকে। হেলেন ভেবেছিলেন তাঁকে হাতকড়া পরিয়ে জেলে পাঠানো হবে। তিনি ভয়ে কাঁপছিলেন। কাঁপতে কাঁপতে হাত দুটি এগিয়ে দিয়েছিলেন সার্জেন্ট স্ট্যাসির দিকে, হাতকড়া পরানোর জন্য। বলেছিলেন, “অফিসার আমাকে জেলে পাঠান। কিন্তু বাড়িতে অন্তত তিনটে ডিম দিয়ে পাঠিয়ে দিন। আমার কাছে ১ ডলার ২৫ সেন্ট আছে।”

হেলেনকে জড়িয়ে ধরেছিলেন সার্জেন্ট স্ট্যাসি। অবাক হয়ে গিয়েছিলেন হেলেন। সার্জেন্ট স্ট্যাসি তাঁকে স্টোরের বাইরে নিয়ে এসেছিলেন। অপেক্ষা করতে বলেছিলেন পার্কিং লটে। নিজের টাকা দিয়ে স্টোর থেকে কিনে এনেছিলেন এক কার্টন ডিম। কৃতজ্ঞতার অশ্রু ঝরে পড়ছিল হেলেনের চোখ থেকে। হেলেন বলেছিলেন, তিনি কীভাবে ডিমের দাম মেটাবেন। এতগুলি ডিমের দাম দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর নেই।

পার্কিং লটে সার্জেন্ট এবং হেলেন।

সার্জেন্ট স্ট্যাসি বলেছিলেন, ডিমের দাম দিতে হবে না। পরিবর্তে হেলেনকে নিতে হবে একটি শপথ। হেলেনকে শপথ করতে হবে, তিনি আর কোনও দিন চুরি করবেন না। স্ট্যাসিকে জড়িয়ে ধরেছিলেন হেলেন। নিয়েছিলেন শপথ। কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বার বার চুমু খেয়েছিলেন স্ট্যাসির হাতে। তারপর ডিমগুলি নিয়ে উদভ্রান্তের মতো ছুড়েছিলেন বাড়ির দিকে।

পুরো ঘটনাটি সেলফোনে তুলে রেখেছিলেন এক ব্যক্তি। তিনি ভিডিয়োটি ফেসবুকে পোস্ট করেছিলেন ‘feelgoodstoryoftheday’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে। মুহুর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে গিয়েছিল ভিডিয়োটি। সার্জেন্ট স্ট্যাসির মানবিকতাকে কুর্নিশ করেছিলেন সারা পৃথিবীর মানুষ।

কয়েক ঘন্টার মধ্যে ট্যারান্ট পুলিশ স্টেশনে এসেছিল প্রচুর ফোন। প্রত্যেকেই হেলেনের পরিবারকে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে সার্জেন্ট স্ট্যাসি ভাবছিলেন, ত্রাণ আসতে দেরী হবে, ততক্ষণ পরিবারটি কী খাবে! সার্জেন্ট স্ট্যাসি নিয়েছিলেন আর একটি অসামান্য সিদ্ধান্ত। নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে কিনেছিলেন প্রচুর খাবার। পুলিশের ছোট ট্রাকে খাবার বোঝাই করে পৌঁছে গিয়েছিলেন হেলেনের বাড়ি।

বাড়ির সামনে পুলিশের গাড়ি দাঁড়াতে দেখে, আতঙ্কে চিৎকার করে উঠেছিল হেলেনের বড় নাতনি তামারোজ। দৌড়ে গিয়েছিল হেলেনের কাছে। বলেছিল, ‘মামমাম’ পুলিশ তোমাকে ধরতে এসেছে। দরজায় টোকা দিয়েছিলেন সার্জেন্ট স্ট্যাসি। দরজা খুলেছিলেন হেলেন। হেলেনকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সার্জেন্ট স্ট্যাসি এগিয়ে দিয়েছিলেন দুটি ভারী ব্যাগ। বিস্মিত হেলেন স্থানুর মতো দাঁড়িয়েছিলেন। সার্জেন্ট স্টাসি চলে গিয়েছিলেন গাড়ির কাছে। নিয়ে আসছিলেন একের পর এক খাবার ভর্তি ব্যাগ। আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠেছিল ভয় কাটিয়ে ওঠা নাতনি। সে বুঝতে পারছিল, তাকে আর না খেয়ে থাকতে হবে না।

সার্জেন্ট স্ট্যাসিকে জড়িয়ে ধরেছিলেন হেলেন। ভেঙে পড়েছিলেন কান্নায়। স্ট্যাসিকে হেলেন বলেছিলেন, “এগুলো খাবার নয়, খ্রিস্টমাসের আগে দেবদূতের হাতে পাঠানো ঈশ্বরের উপহার।” সার্জেন্ট স্ট্যাসি নিজেই রান্নাঘরের তাকে খাবারগুলি গুছিয়ে দিতে শুরু করেছিলেন। ঘন্টা খানেক পর এসেছিল, আরও একটি পুলিশের গাড়ি। গাড়িতে বোঝাই করা ছিল, কিছু সহৃদয় মানুষের দেওয়া খাবার, পোশাক ও খেলনা। হেলেনকে তাঁর ফোন নাম্বার দিয়ে পুলিশ স্টেশনে ফিরে এসেছিলেন সার্জেন্ট।

ঘটনাটির পর ট্যারেন্টের পুলিশ চিফ ডেনি রেনো, টেলিভিশনে বলেছিলেন, দাঙ্গার সময়ে সার্জেন্ট স্ট্যাসির মানবিক মুখ,  আমেরিকার পুলিশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছে। সারা আমেরিকা থেকে ফোন আসছে তাঁদের কাছে। তাঁরা জনসন পরিবারের জন্য একটি ফান্ড তৈরি করেছেন। সেখানে জমা পড়া টাকা প্রত্যেক মাসে দেওয়া হবে পরিবারটিকে। কিন্তু পুলিশের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন হেলেন জনসন।

হেলেন বলেছিলেন, “আমাদের মতো আরও অনেক গরীব পরিবার এই এলাকাতেই খুঁজে পাবেন। এই অর্থ থেকে তাঁদেরও সাহায্য করুন। এতদিন ওই ১২০ ডলারেই বেঁচে থাকতাম পাঁচজন। টাকাটা ঠিকসময়ে এলে আমাদের দিন চলে যাবে। তবে দেবদূত সার্জেন্ট স্ট্যাসিকে আমি আমৃত্যু মনে রাখব। আমার জীবন পালটে দিয়েছেন তিনি।”

সার্জেন্ট স্ট্যাসি কিছুতেই মুখ খুলতে চাননি। অনেক অনুরোধ করার পর বলেছিলেন মাত্র দুটি বাক্য, “আমরা মারধোর বা খুন করার জন্য আইনরক্ষার শপথ নিইনি। রোজ ইউনিফর্মটা পরি, মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে থাকার জন্য।”

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More