Latest News

মমতার চোখে চোখ রেখে আইপিএস নগেন্দ্র ত্রিপাঠি: ‘ম্যাডাম খাকি পরে দাগ নেব না’

রফিকুল জামাদার, নন্দীগ্রাম

বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জমানায় পুলিশের বিরুদ্ধে বারবার পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে। বাম, কংগ্রেস, বিজেপি বারবার অভিযোগ করেছে, এক শ্রেণির পুলিশ অফিসারের মেরুদণ্ড নেই। তাঁরা রাজনৈতিক প্রভুর নির্দেশে বিরোধীদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসাচ্ছেন।

সেই বাংলার নির্বাচনে বৃহস্পতিবার এক বেনজির দৃশ্য তৈরি হল। নন্দীগ্রামে বয়ালের ৭ নম্বর বুথের বারান্দায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন তাঁর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন, তখন মুখ্যমন্ত্রীর চোখে চোখ রেখে তাঁর উর্দি ধরে সিনিয়র আইপিএস অফিসার নগেন্দ্র ত্রিপাঠী স্পষ্ট বললেন, “ম্যাডাম এই খাকি পরে কোনও দাগ নেব না।” মমতাকে বলতে শোনা যায়, দাগ তো অনেকেই নিয়ে নিয়েছে। জবাবে নগেন্দ্র বলেন, “আমি নেব না ম্যাডাম।”

বৃহস্পতিবার সকাল থেকে নন্দীগ্রামের ভোট খালি চোখে তেমন কোনও অশান্তি নজরে পড়েনি। তবে হ্যাঁ তৃণমূল অভিযোগ করছিল, বহু বুথে তাঁদের পোলিং এজেন্টকে বসতে দেওয়া হচ্ছে না। বয়ালের বুথেও তৃণমূলের কোনও পোলিং এজেন্ট ছিল না।

সে ব্যাপারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন অভিযোগ করেন, তখন নগেন্দ্র বলেন, “ম্যাডাম আমি ওনার বাড়িতে গিয়েছিলাম, ওনাকে নিয়ে আসতে।” তবে শেষ পর্যন্ত সেই পোলিং এজেন্ট বুথে আসতে চেয়েছিলেন কিনা স্পষ্ট নয়।

বয়ালের বুথের মধ্যে যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বসেছিলেন, তখন বাইরে উত্তেজনার পারদ চড়তে থাকে। বিজেপি ও তৃণমূল সমর্থকদের মধ্যে খণ্ডযুদ্ধ বাধার পরিস্থিতি হয়। সেই অবস্থায় মুখ্যমন্ত্রীর সেখানে থাকাটা নিরাপত্তার দিক থেকে বাঞ্ছনীয় নয় বলেই পুলিশ মনে করে। এক দিকে পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী দুই শিবিরকে পিছু হঠানোর চেষ্টা করে। অন্যদিকে বুথের মধ্যে ঢুকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নগেন্দ্র ত্রিপাঠি অনুরোধ করেন ফিরে যেতে।

নন্দীগ্রামে ভোট নিয়ে এ বার স্পর্শকাতরতা ছিল স্বাভাবিক ভাবেই বেশি। নির্বাচন কমিশনও আন্দাজ করেছিল, দুই শিবির নানা অভিযোগ তুলতে পারে। তাই নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা রাখতে চেয়েছিল। সেই কারণেই সিনিয়র আইপিএস অফিসার নগেন্দ্র ত্রিপাঠিকে নন্দীগ্রাম থানার বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়।

বুথের মধ্যে এক সময়ে দেখা যায় মুখ্যমন্ত্রী নগেন্দ্রকে বলছেন, “আমাকে একটা কথা বলো বুথের ২০০ মিটারে মধ্যে কেউ থাকতে পারে না। তা হলে কী করে ওরা রয়েছে।” জবাবে নগেন্দ্র বলেন, “এখন নেই ওরা আপনি চেক করতে পারেন।”

দেখুন সেই কথোপকথন।

মুখ্যমন্ত্রী তার পর বলেন, “সকাল থেকে সুনীলকে অনেকবার বলা হয়েছে। তোমাকেও অনেকবার বলা হয়েছে।” উত্তরে নগেন্দ্র বলেন, “সকালে আমি ব্যক্তিগত ভাবে দেখে গিয়েছি। এখানে তেমন কিছু ছিল না।”

কিন্তু মমতাও নাছোড়। তিনি বলেন, “কিচ্ছু লাভ নেই। ওসব তোমরা শিখিয়ে দাও। আমরা এখানে যাচ্ছি সরে যা, অবজার্ভার যাচ্ছে সরে যা। ফর নাথিং নন্দীগ্রামটা তোমরা ইন্টারন্যাশনাল ইস্যু করলে কিন্তু।” মুখ্যমন্ত্রী এ ভাবে সরাসরি তাঁকে দায়ী করতেই নগেন্দ্র চোখ স্থির করে তাঁর উর্দির কলার ছুঁয়ে বলেন, “ম্যাডাম এই খাকি পরে এই দাগ নেই না। এই দাগ নেব না”। তাঁর কথায়, “আমি পার্সোনালি ভিজিট করে গেছিলাম। হতে পারে পরে এখানে লোকজন জড়ো হয়েছে। আপনাকে আশ্বস্ত করছি এখানে কোনও অসুবিধা হবে না। এখানে শান্তিপূর্ণ ভোট হবে।”

নগেন্দ্র এভাবে আশ্বস্ত করার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শেষ পর্যন্ত বুথ থেকে চলে যেতে রাজি হন। তার কিছু পরই দেখা যায় মুখ্যমন্ত্রী হুইলচেয়ারে করে বেরিয়ে যাচ্ছেন। এর পর নন্দীগ্রামে তৃণমূলের পার্টি অফিসে গিয়ে বসেন মুখ্যমন্ত্রী।

ষোলো সালের ভোটের সময়ে কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনারের ভূমিকা নিয়ে প্রশংসা ও সমালোচনা দুইই হয়েছিল। সার্ভিসে নিষ্ঠাবান ও সৎ অফিসার বলে পরিচিত নগেন্দ্র ভোটের দিন এক দোকানদারকে চড় মেরেছিলেন। তা নিয়েও সমালোচনা হয়েছিল। তবে নগেন্দ্রর কর্তব্যের প্রতি নিষ্ঠা প্রশংসিতও হয়েছিল। ভোটের পর দেখা গিয়েছিল নগেন্দ্রকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠিয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিশমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

কিন্তু এও যেন নিয়তি। সেই নগেন্দ্রই নন্দীগ্রামের দায়িত্ব নিয়ে বৃহস্পতিবার ভোট করালেন।

You might also like