Latest News

মন্ত্রী গ্রেফতার, অতঃপর…

অমল সরকার

এ দেশে দুর্নীতির (Scam) তদন্তের দীর্ঘসূত্রিতা এবং পরিণতি সম্পর্কে আমরা কম-বেশি ওয়াকিবহাল। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের (Partha Chatterjee) পরিচিত মহিলার ফ্ল্যাট থেকে এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চের বাজেয়াপ্ত করা ২০-২১ কোটি চাকরি বিক্রির কমিশন বাবদ মন্ত্রীর রোজগারের টাকা কিনা, উদ্ধার হওয়া মোবাইলগুলি কোন কাজে ব্যবহার হতো, সেগুলির আসল মালিক, ইত্যাদি প্রমাণে ফরেনসিক তদন্তে কতদিন কাটবে, এসব প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসা স্বাভাবিক। কিন্তু শিক্ষক নিয়োগে যে বিপুল অনিয়ম, দুর্নীতি হয়েছে, বিষয়টি আদালতে গড়ানোর আগেই তা জলের মতো স্পষ্ট ছিল। ভাগ্যবানদের অনেকেই টাকার বিনিময়ে চাকরি পেয়েছেন, এই তথ্যও নতুন নয়। শিক্ষকের চাকরি বিক্রি চক্রের মাথায় স্বয়ং মন্ত্রী—ইডির এই দাবি আদালতে প্রমাণ সাপেক্ষ। মন্ত্রী ও তাঁর ঘনিষ্ঠ দু’জন গ্রেফতার হওয়ার আগে চাকরি বিক্রির চক্র সম্পর্কে সংবাদমাধ্যমে কোনও আভাস মাত্র ছিল না। এই লেখা দীর্ঘায়িত করার আগে সাংবাদিক হিসাবে করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া তাই বিধেয়।

Image - মন্ত্রী গ্রেফতার, অতঃপর...

অবশ্য, এক্ষেত্রেই শুধু নয়, গোটা দেশেই সাংবাদিকতার অভিধান থেকে ‘ফাঁস’ শব্দটি মুছে গিয়েছে। কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে, নাগরিক সক্রিয়তার অভাব এবং সমাজের মধ্য ও উপরতলায় পিছনের দরজা দিয়ে যাতায়াতের সামাজিক অনুমোদন। লাইন ভেঙে সুবিধা পাওয়াটা সাধারণ প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৫-তে বাংলায় চিটফান্ড কেলেঙ্কারি নিয়ে রাজ্য যখন উত্তাল তার আগের পনেরো বছরে দুর্নীতির অভিযোগ দায়ের হয়েছিল মাত্র ৩৯টি। সেগুলির একটিতে কারও সাজা হয়নি। অর্থাৎ বে-পথে বড়লোক হওয়ার বাসনাকে কাজে লাগিয়ে চিটফান্ডগুলিগুলি চুটিয়ে ব্যবসা করে নিয়েছে। অথচ, এই সব ভুঁইফোড় সংস্থায় টাকা রাখার বিপদআপদ কারও অজানা ছিল না।

সারদা কেলেঙ্কারিতে প্রতিবাদ। ফাইল চিত্র

৩৪ বছরের সিপিএম শাসনে চাকরিবাকরি, বিশেষ করে শিক্ষকতার চাকরিতে ‘চিরকূট ব্যবস্থা’র কথাও লোকের মুখে মুখে ঘুরত। তথ্যপ্রমাণ-সহ লেখালেখি তুলনায় ছিল নগন্য। সিপিএমের ভাগ্যবান অনুগতদের হাতে ‘কমরেড আমাদের লোক’ লেখা নেতার হাত-চিঠি বা চিরকূট পৌঁছত। সেটিই ছিল প্রধান শংসাপত্র। বামফ্রন্ট সরকারের প্রথম অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র’র সঙ্গে গোড়াতেই দলের বিরোধ দেখা দেওয়ার অন্যতম কারণটি ছিল শিক্ষাক্ষেত্রে সীমাহীন দলতন্ত্র। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, সরকার স্কুল-কলেজ চালু করছে কি দলের লোকেদের চাকরি দেবে বলে? পদে পদে দলীয় আনুগত্যের কাছে মেধার হার মেনে নিতে পারেননি তিনি। তবে আজকের মতো আইন-আদালত, ইডি-সিবিআই, মিটিং-মিছিল-অবরোধ-ধর্না—এসবের মুখোমুখি হতে হয়নি তৎকালীন শাসকদের। পার্টির শাসন-শৃঙ্খলায় সব চাপা পড়ে থাকত। তখন আর এখন, ফারাকটা আসলে আর্ট ফিল্ম আর ফিচার ফিল্মের। সে জমানার দুর্নীতি, অনিয়ম, অনাচারও ছিল শিল্প নৈপুণ্যে ভরা।

দুর্ভাগ্যের হল, প্রয়াত অশোক মিত্রের তোলা প্রশ্নটি আজও প্রাসঙ্গিক। স্কুল-কলেজের চাকরি তখন নিজেদের মধ্যে বিলিবণ্টন হত, এখন বিক্রি হয়। তবে সে আমলেও বিক্রিবাট্টা একেবারে ছিল না, ব্যাপারটা মোটেই তা নয়। স্কুল সার্ভিস কমিশন গঠনের ভাবনার পিছনে যে বিষয়টি কাজ করেছিল তা হল টাকাটা স্কুল, কলেজের ম্যানেজিং কমিটি পকেটস্থ করছিল। অনেক ক্ষেত্রে পার্টির লোকেরা এরফলে কোথাও কোথাও বঞ্চিত হতে থাকে। তাতে লাগাম দিতেই এসএসসি গঠনের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া সরকার তথা রাজ্য পার্টি নিজেদের হাতে তুলে নেয়।

এসব কথা বলার উদ্দেশ্য আজকের পাপ, অপরাধকে লঘু করা নয়। বর্তমান সরকার ৩৪ বছর ক্ষমতাসীন বামফ্রন্টের একজন মাত্র মন্ত্রীকে একটি রাজনৈতিক হত্যা মামলায় জেলে পুরেছিল। আর কোনও অপকর্মের দায়ে কোনও মন্ত্রীকে সরকার কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারেনি।

সে আমলে কোনও মন্ত্রী হাত পেতে টাকা নিয়েছেন, এমন প্রমাণ নেই। ফলে নিয়েছেন, কী নেননি এই তর্ক অনর্থক। তবু তর্কের খাতিরে যদি ধরেনি নিয়েছেন, তাতে আজকের নেওয়াটা ক্ষমার যোগ্য হতে পারে না। দুর্নীতি, অনিয়মের রেকর্ড ভাঙার জন্য মানুষ জমানা বদল চায়নি।

মন্ত্রী ঘনিষ্ঠের বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া ২০-২১ কোটির সঙ্গে দলের সম্পর্ক না থাকার দাবিটি তৃণমূল আরও জোরদার করতে পারত নৈতিক দায় নিয়ে মন্ত্রিসভা থেকে পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে সরিয়ে দিলে। তৃণমূলের অন্দরের খবর, এই সিদ্ধান্ত ঘিরে দলে নবীন ও প্রবীণ নেতৃত্বের মধ্যে মতবিরোধ আছে। নবীনেরা পার্থর অপসারণ চাইলেও প্রবীণ নেতাদের সঙ্গে তাঁদের আপোষ করতে হয়েছে।

Image - মন্ত্রী গ্রেফতার, অতঃপর...
ব্যাপম কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ফাইল চিত্র

অবশ্য, দুর্নীতি, নীতিহীনতা নিয়ে বিলাপ করে যেতে হলে এখন দেশত্যাগ করা ছাড়া উপায় নেই। একটি রাজ্যও নেই, যেখানে চাকরি পাওয়ার ব্যবস্থাটি দলতন্ত্র, অর্থতন্ত্র মুক্ত। কেন্দ্রের শাসক দল হওয়ার সুবাদে কল্যাণীর এইমসে চাকরি দুর্নীতিতে নাম জড়িয়েছে রাজ্যের বিরোধী দলের বিধায়কদের। বিজেপি শাসিত মধ্যপ্রদেশে ব্যাপম কেলেঙ্কারির পর্দা ফাঁসও কোনও সংবাদমাধ্যমের কৃতিত্ব নয়। তথ্য জানার অধিকার আইন বলে সরকারি চাকরি এবং ডাক্তারি ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তির সর্ববৃহৎ কেলেঙ্কারির পর্দা ফাঁস করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া যে তরুণ, তাঁরই জীবন বিপন্ন। নয় নয় করে আট-ন’বার খুনের চেষ্টা হয়েছে তাঁকে। খুন করা হয়েছে অসংখ্য সাক্ষীকে।

বিজেপি শাসিত আর এক রাজ্য কর্নাটকে হালে পুলিশে নিয়োগে বড় ধরনের অনিয়ম সামনে এসেছে। ঘুষের বিনিময়ে চাকরি দিতে সেখানে এক বিজেপি নেত্রী পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের স্কুল-কলেজগুলিকে পরীক্ষা কেন্দ্র করা হয়। দুর্নীতি বিনাশে সেই রাজ্যে সরকারি আয়োজনটি কেমন? গত বছরের রিপোর্ট বলছে, আগের পাঁচ বছরে সেখানকার অ্যান্টি করাপশন ব্যুরোর কাছে জমা হওয়া ১৮০৩টি অভিযোগের মাত্র দশটি ক্ষেত্রে অপরাধীরা সাজা পেয়েছে। কিন্তু রাজনীতি হয়েছে দশগুণ।

কর্নাটকে নিয়োগ কেলেঙ্কারিতে প্রতিবাদ। ফাইল চিত্র

এ রাজ্যে সারদা-সহ চিটফান্ডের মামলাগুলির সেই দশাই হয়েছে। তদন্তে অগ্রগতি, ক্ষতিগ্রস্থদের টাকা ফেরত, দুটোই একপ্রকার থমকে। সর্বস্ব হারিয়ে কত মানুষ আত্নহত্যার পথ বেছে নিয়েছে সে হিসাব কেউ রাখেনি। নৈতিক দায় নিয়ে রাজ্য সরকার ভুক্তভোগীদের টাকা ফেরানোর যে ব্যবস্থা করেছিল তা মাঝপথে থমকে গিয়েছে।

টাকা এক আশ্চর্য বস্তু। রতন টাটার কাছে পাঁচ কোটি পাঁচ হাজারের মতো নগন্য। রহমত আলির কাছে সেই পাঁচ হাজারই পাঁচ লক্ষ কোটির সমান। আর পাঁচটা দুর্নীতির সঙ্গে চিটফান্ড কেলেঙ্কারিকে তাই এক করে দেখা ভুল। এখানে সরাসরি গরিব মানুষের টাকা লোপাট হয়েছে। অভিযুক্তরা এক-দু’জন বাদে সবাই জামিনে মুক্ত। কিন্তু গরিব মানুষ টাকা ফেরত পায়নি। লোপাট হওয়া টাকা ফেরানোর দায় নিতে হবে সরকার, তদন্তকারী সংস্থা এবং আদালতকে।

গত বছর কলকাতা হাইকোর্টে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি মন্তব্য করেন, ‘মানুষ আমাদের কাছে বিচার চায়। কিন্তু দিনের-পর-দিন ট্রায়াল ঝুলে থাকছে। একদিকে অভিযুক্তদের জামিন দেওয়া যাচ্ছে না, শুধুমাত্র অভিযোগ গুরুতর বলে। অন্যদিকে আমানতকারীরা টাকা ফেরত পাচ্ছেন না, বিচার শেষ না হওয়ায়। ফলে আদালত কাউকেই বিচার দিতে পারছে না। যার মূলে সিবিআইয়ের দীর্ঘসূত্রিতা দায়ী।’

পশুখাদ্য কেলেঙ্কারির মামলায় লালুপ্রসাদ যাদবের এ যাবৎ পাঁচবার কারাবাসের পিছনে যাঁর অবদান অনস্বীকার্য সিবিআইয়ের সেই অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম কমিশনার উপেন বিশ্বাস মাস কয়েক আগে ‘দ্য ওয়াল’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘মানুষের জানার অধিকার আছে, তদন্তের কী হল। অনেকে আমাকে প্রশ্ন করেন, সিবিআইয়ের সঙ্গে কি তলে তলে বোঝাপড়া আছে? তা না হলে তদন্তে এই বিলম্ব কেন? মানুষের এই সন্দেহ, সংশয় সিবিআইকেই দূর করতে হবে।’

শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারিরও গোড়ার কথা সেটাই। পার্থ চট্টোপাধ্যায় মন্ত্রী, শাসক দলের উঁচু পদে আসীন। ইডি-সিবিআইয়ের সঙ্গে আইনি লড়াই তিনি অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা ধরেন। আর শুভেন্দু অধিকারীদের মতো জার্সি বদলে নিলে তো কথাই নেই। এক বিন্দু ঘাম না ঝরিয়ে মামলা থেকে মুক্তি এবং সৎ সংঘের সদস্যপদ—দুই’ই মিলবে অনায়াসে। রাজনীতি তাতে আরও টগবগিয়ে ফুটবে।

Image - মন্ত্রী গ্রেফতার, অতঃপর...
এসএসসি চাকরি প্রার্থীদের ধর্না। ফাইল চিত্র

কিন্তু ময়দানে যে ছেলেমেয়েরা রোদ-জল-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মাসের পর মাস বসে আছে, মেধা তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও যাদের চাকরি হয়নি, তাঁদের কী হবে? তাঁদের কি শুধু কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সাহচর্য পেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে?

আদালত মন্ত্রী-কন্যার বেআইনি নিয়োগ বাতিল করে বঞ্চিত প্রার্থীকে চাকরি ফিরিয়ে দিয়েছে। ক্যান্সার আক্রান্ত তরুণীরও চাকরির ব্যবস্থা হয়েছে আদালতের হস্তক্ষেপে। দুটি পদক্ষেপের জন্যই বিচারপতির প্রশংসা প্রাপ্য। প্রশ্ন হল, বাকিদের কী হবে? সংখ্যাটা কয়েক হাজার। চুরির দায়ে মন্ত্রীর কোমরে দড়ি পরলে অনেক গুরুতর বিষয় আড়ালে চলে যাওয়া স্বাভাবিক। রাজনীতির পারা চড়বে, সেটাও ধরে নেওয়া যায়। তাতে চাকরি ফেরানোর প্রতিশ্রুতি আড়ালে চলে গেলে তা হবে আরও বড় দুর্নীতি। শুধুই রাজনীতি করলে তার দায় বিরোধীরাও কিন্তু এড়াতে পারবেন না।

গ্রুপ ডি নিয়োগেও যুক্ত পার্থ, মন্ত্রীর বাড়ি থেকে উদ্ধার অ্যাডমিট কার্ড, রেজাল্ট

You might also like