Latest News

হাসান আজিজুল হক, অখণ্ড বাংলার কথাশিল্পী

অমর মিত্র

চলে  গেলেন। এই মুহূর্তে  তিনি আর নেই।
হাসান আজিজুল হক
এপারের মানুষ। জন্মেছেন বর্ধমান জেলার কাটোয়া মহকুমার নিকটবর্তী এক গ্রাম যবগ্রামে।  ১৯৩৯   সালের মার্চ হবে। স্কুল ফাইনালের পর তিনি চলে যান তাঁর দিদির কাছে, খুলনা জেলা শহরে। দৌলতপুর কলেজে গিয়ে ভর্তি হন। সেই থেকে হাসান ওপারের মানুষ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, রাজশাহীতেই থাকেন। কলকাতায় এলে দেখা হয় এই অনুজের সঙ্গে। তাঁর স্নেহ পাই। শেষ যেবার এসেছিলেন, ২০১৮-তে আমি কলকাতায় ছিলাম না, দেখা হয়নি। হাসানভাইকে   আমি বলতাম, আপনার কাছে অর্পণ করে এসেছি আমরা আমাদের জন্মভূমি, মাতৃভূমি। আপনি রেখে গেছেন আমাদের কাছে   আপনার জন্মভূমি, মাতৃভূমি।  এত বছর বাদে, দেশভাগের ৭৫ বছর বাদেও বলতে  হয়, এমনটা না হলেই হত। আমাদের কি  দরকার ছিল হিন্দু-মুসলমান করে আলাদা হতে। ছিল না। তাই ‘আগুনপাখি’ উপন্যাসে দাদি থেকে যান এপারে। পার্টিশনকে   অগ্রাহ্য করে থেকে গিয়েছিলেন এপারে।হাসান আজিজুল হককে আমি  প্রথম পড়ি  ১৯৭১-এর গ্রীষ্মে, ‘এক্ষণ’ পত্রিকায় ‘জীবন  ঘষে আগুন’ গল্পে। ‘জীবন ঘষে আগুন’ দীর্ঘ এক গল্প। সেই গল্প ছিল রাঢ়ের মাটির, হাসানের ছেড়ে যাওয়া এই দেশ তার পটভূমি। তীক্ষ্ণ, টানটান এক গদ্যে দীর্ঘ এক গ্রীষ্মের কথা বলেছিলেন তিনি। পড়তে পড়তে মনে হয়েছিল এমন গল্প আমি পড়ি না তো। সেই সময়টা ছিল আমার গল্প শিখে নেওয়ার। হাসান আমাকে শিখিয়েছিলেন। গত পঞ্চাশ বছরে দুটি উপন্যাস( আগুন পাখি ও সাবিত্রী উপাখ্যান ) ও অসামান্য সমস্ত ছোটগল্প লিখে হাসান আমার কাছে খুব জরুরি এক লেখক। তাঁর অসামান্য সব গল্প আমার কাছে নিয়মিত পাঠ্য। উপন্যাস নিয়ে কি তাঁর দ্বিধা ছিল! তাই লেখেননি! পরিণত বয়সে পার্টিশন নিয়ে ‘আগুনপাখি’ লিখেছেন। দায় থেকেই লিখেছেন। আলাপে বুঝেছি এই উদারহৃদয় মানুষটির ভিতরে  দেশভাগের ক্ষত শুকোয়নি।‘চালচিত্রের খুঁটিনাটি’ নামের একটি বই অনেকবছর আগে আমি পেয়েছিলাম, কীভাবে তা ভুলে গেছি। সেই বইয়ের   ভিতরে যে পূর্ববাংলার কথা পেয়েছিলাম, তা আমাদের ফেলে আসা মাতৃভূমি। হাসানকে আমি নিয়মিত পড়েছি আমাদের ফেলে  আসা সেই মাতৃভূমির কথা শুনতে। তাঁর ভিতর দিয়ে আমি আমার পিতৃপুরুষকে দেখতে পাই। ‘জীবন ঘষে আগুন’ পড়েছিলাম এক্ষণে। তারপর বছরকয় বাদে, ১৯৭৮ নাগাদ মহাশ্বেতাদি আমাকে হাসানের দুটি গল্পের বই উপহার দেন। একটি ‘পাতালে হাসপাতালে’, অন্যটি খুব সম্ভবত ‘নামহীন গোত্রহীন’। তারপর থেকে হাসান আজিজুল হক আমার অবশ্যপাঠ্য লেখক। শকুন, আত্মজা ও একটি করবী গাছ, শোণিত সেতু, পাতালে হাসপাতালে, জননী, পাবলিক সারভেন্ট, বিধবাদের কথা…কোন গল্পের কথা বলব আমি? তাঁর দেখার চোখ আলাদা। বাংলা গল্পকে কাহিনির বলয় থেকে মুক্ত করেও তিনি যে কাহিনি বলেন, তা স্থানিক হয়ে থাকে না। বাংলাদেশের বাস্তবতা এদেশের বাস্তবতায় কোথায় যেন মিলে যায়।সাহিত্য-সমালোচক আমি নই। আর এখন তাঁর গল্প বা উপন্যাস নিয়ে কথা বলার মনও নেই। প্রথম দেখেছিলাম তাঁকে কবে, তা মনে নেই। কলকাতার এক সাহিত্যসভায়, স্টুডেন্টস হল কিংবা মহাবোধী সোসাইটির ঘরে তাঁর এক বক্তৃতার আয়োজন করা  হয়েছিল। অনেকদিন বাদে তিনি ভারতে এসেছিলেন, ফলে আমাদের কৌতুহল কম ছিল না। বাংলাদেশের সাহিত্য নিয়ে তিনি বলেছিলেন। তাঁর বলার ভিতরে এপারের সাহিত্যও ছিল। মূলত গল্প নিয়েই তিনি বলেছিলেন। এরপর ২০০০ সালে আমরা ক’বন্ধু বাংলাদেশে আমন্ত্রিত হই। খুলনা জেলার ফুলতলা গ্রামে রবীন্দ্রনাথের শ্বশুরবাড়ি। সেখানে ২৫শে বৈশাখে রবীন্দ্রজন্মোৎসবে আমরা আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। তখন খুলনা শহরে হাসান উপস্থিত। ঠিক হল, তিনি আমাদের নিয়ে যাবেন রাজশাহীতে। আমরা তাঁর সঙ্গে নক্সিকাঁথা এক্সপ্রেসে খুলনা থেকে রওনা হয়েছিলাম। সেই যাত্রা ছিল অক্ষয় আনন্দের। তাইই। এখনও মনে পড়ে, তিনি আমাদের চলনবিল দেখাচ্ছেন। চলনবিল শেষই হয় না। তার পাশ দিয়েই চলেছে ট্রেন। এশিয়ার সবচেয়ে বড় সেই বিল এলাকা। হাসান আজিজুল হক যাচ্ছেন, তাঁর অতিথি আমরা… তার সম্মানই আলাদা। আমাদের জন্য একটা আলাদা কম্পারট্মেন্ট ছিল।  লাঞ্চ হল বেলা একটা নাগাদ। কলাপাতা, নুন, লেবু দিয়ে গেল। বালতি করে ধোঁয়াওঠা গরম ভাত এল। মুগের ডাল, বেগুন ভাজা, পুঁই শাক আর চিংড়ি দিয়ে ছ্যাঁচড়া, কাতলা মাছের ঝোল। আমার পাতে পড়ল একটি মাথা। আর ছিল আমের চাটনি, দই, রসগোল্লা। ট্রেনে কেউ এমন খেয়েছেন? হাসান আজিজুল হক যাচ্ছেন, তাই এমন ব্যবস্থা। নাটোরে নেমে গাড়িতে রাজশাহী গিয়েছিলাম। তিনি তখন বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টারে থাকেন। আমরা থাকলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট হাউজে। হ্যাঁ, সেবার সাতক্ষীরের কাছে ধূলিহরে আমাদের গ্রামে গিয়েছিলাম। সেই  আমাদের পৈতৃক ভিটে। ভিটেয় যাঁরা থাকেন, তাঁরা বাড়ির গাছের আম দিয়েছিলেন। সেই আম আমি কলকাতা আনব কীভাবে! হাসানভাইকে দিয়ে দিলাম। আমাদের ধূলিহরের আম নিন। তিনি আমাদের নিয়ে গিয়েছিলেন পাহাড়পুর মহাস্থানগড়ে। বৌদ্ধধর্মের যে স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে তা দেখিয়েছিলেন। সারাদিন ব্যয় করেছিলেন আমাদের জন্য। তখন রাজশাহী শহরে তাঁর বাড়ি উঠছিল। কাছেই পদ্মা নদী। আমরা দেখেছিলাম। নিকটজনের মতোই আমাদের সব দেখাচ্ছিলেন। কত কথা হয়েছিল তাঁর সঙ্গে। সাহিত্য, শিল্প, গল্প, উপন্যাস–সব  নিয়ে।তারপর বহু জায়গায় দেখা হয়েছে। গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনারে, মালদহে। সেবার নাসরিন জাহান এসেছিলেন। ২০১৭ সালে ঢাকার বাংলা আকাডেমির আমন্ত্রণে ২১শে বইমেলার উদ্বোধনে যাই। তিনি এসেছিলেন। তাঁর সহাস্য উপস্থিতি আমাকে আনন্দ দিত। এর আগে ২০১৫ সালের জুন-জুলাই নাগাদ তাঁর ফোন পাই আচমকা। ”অমর তোমাকে রাজশাহী আসতে হবে।  কবিকুঞ্জের অনুষ্ঠানে।” বললাম ‘যাব’। অক্টোবরে যাওয়ার কথা। কিন্তু কোনও এক কারণে সেই অনুষ্ঠান এক-দু’মাস পিছিয়ে যায়,  ফলে আমার আর যাওয়া হয় না। পরের বছর গেলাম। তিনিই কবিকুঞ্জের প্রধান উপদেষ্টা। আমাকে যেন স্বজনের মতোই গ্রহণ করলেন। তাঁর সেই বাড়িতে গিয়েছিলাম অনুষ্ঠান শেষে আমি যেদিন ঢাকা যাব, সেইদিন সকালে। বইয়ের সমারোহ দেখেছিলাম। গল্প করতে করতে তিনি বললেন, ‘চাকভাঙা মধু’ নাটক প্রথম মঞ্চস্থ করিয়েছিলেন তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ‘চাকভাঙা মধু’  এক্ষণ পত্রিকায় বেরিয়েছিল ১৯৭১-এ, তাঁর গল্প ‘জীবন ঘষে আগুন’-এর সঙ্গে। তিনি জোতদার ‘অঘোর  ঘোষ’-এর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। কথাটা আমার দাদাকে বলতে বললেন। আমাকে বললেন, তুমি আমার কী কী বই নেবে, নিয়ে নাও, পছন্দমতো। আমি তিনটি বই নিয়েছিলাম। তার ভিতরে একটি ছিল হারিয়ে যাওয়া বই ‘চালচিত্রের খুঁটিনাটি’। তারপর তিনি নিজে  আমাকে তাঁর আত্মজীবনীর একটি খণ্ড উপহার দিলেন। বললেন, খুলে দেখ। দেখলাম খুলে, আমাকে উৎসর্গ করেছেন সেই বই। আমিও আমার একটি গল্পের বই যা ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল (মেলার দিকে ঘর), তাঁকে উৎসর্গ করেছি।

তিনি ছিলেন দুই বাংলার ভিতরে এক সেতু। অখণ্ড বাংলার কথাকার। গল্প লিখেছেন আন্তর্জাতিক মানের। শিল্পবোধে তা অতি উচ্চ। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ‘বিধবাদের কথা’ নামের ক্ষুদ্রায়তন পুস্তিকার তুলনা হয় না। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমার পড়া শ্রেষ্ঠ গল্প। ক’মাস আগে তাঁর কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার দরকার পড়েছিল। ‘দ্য অ্যান্টোনিম’ নামের এক ওয়েব ম্যাগাজিনে তাঁর একটি গল্প অনুবাদ করা হবে। মেল পাঠিয়েছিলেন তিনি আমাকে, ‘অমরকে অনুমতি দিলাম গল্প অনুবাদ করার জন্য’। না, আমি অনুবাদক ছিলাম না। আমি পত্রিকার সঙ্গে জড়িত ছিলাম মাত্র। ভালোবাসা পেয়েছি তাঁর কাছ থেকে। সেই ভালোবাসা আমার অর্জন।

হাসান আজিজুল হক ও লেখক

হাসানভাইকে নিয়ে লিখতে বসেছি, তাঁর গল্প নিয়ে কিছুই বলব না, তা হয় না। তুলনায় অপরিচিত একটি গল্পের কথাই বলি, ‘পাবলিক সারভেন্ট’। আমলাতন্ত্রের ক্ষমতায়ন নিয়ে এমন গল্প খুব কমই লেখা হয়েছে। ক্ষমতা কোথা থেকে আসে, তার একটি সূত্র এই গল্পে পাওয়া যায়।
তাহলে ‘পাবলিক সারভেন্ট’-
এর কথা বলি। এই গল্প ক্ষমতার। ক্ষমতা কোথা থেকে নেমে আসে তার এক অদ্ভুত আন্দাজ দিয়েছেন হাসান। মামুন রশিদ সরকারী আমলা। অতি উচ্চপদস্থ তো নিশ্চয়ই। ফেব্রুয়ারি মাসের ৩ তারিখ তার কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। শুভ দিনই। এই ১৯৮৩-র তেসরা ফেব্রুয়ারির আগে অবধি তাইই ছিল। ওইদিন, ৩/২/৮৩-র সকাল অবধি তাইই ছিল। ঐদিন সে তার চাকরির বিশ বছর পূর্ণ হয়েছিল। ঐদিন তার বিয়ের আঠেরো বছর পূর্ণ হয়েছিল। তার মনে হয় তার জন্মও ওই তারিখেই, কোনও এক তেসরা ফেব্রুয়ারিতে হয়েছিল। মামুন কদিন ছুটি নিয়ে আছে বাড়িতে। তার বাড়ি নিখুঁতভাবে সাজানো। খুবই সুখী সংসার। কিন্তু সমস্ত বাড়িতে কবরের নিস্তব্ধতা। বাইরে ফেব্রুয়ারির আকাশ মেঘলা। একটা ঝোড়ো বাতাস বইছে। কিন্তু এই ঘরে তার চিহ্ন নেই। মামুন তার সাজানো ড্রয়িংরুমে বসে বউকে ডেকেছে কয়েকবার। সে আসেনি। সোফায় বসে চুরুট টানতে টানতে মামুন দিশেহারা হয়ে যায়।  সে যখন সার্ভিসে ঢুকেছিল এই দেশের নাম অন্য ছিল। দেশে তখন জঙ্গল বেশি, আবাদি জমি কম। মানুষজন কম। হাসান লিখছেন,”তখন রোদ ছায়া নদীনালা মাটি জল অন্যভাবে সাজানো ছিল। বিশবছরে সবই প্রায় নিড়িয়ে সাদা করে আনা গেছে।” পাবলিক সারভেন্ট মামুনের তাতে কিছু যায় আসে না। সে জানে পাবলিক সারভেন্ট, জনগনের সেবক আসলে জনগনের শাসক। তার অভ্যাস উঁচু জায়গাটিকে দখল করা। সারভিসে সে তাই করে এসেছে। ঠিক সময়ে ঠিক জায়গাটি বেছে নিয়ে সে প্রায় ক্ষমতার চূড়ায়। কিন্তু সেই চূড়ার উপরেও এক চূড়া আছে। ক্ষমতার সিংহাসন। ওই নিষিদ্ধ ফলের দিকে সে কখনও চেয়ে দ্যাখেনি। ওই আসন হল চূড়ান্ত ক্ষমতার আসন। কিন্তু চূড়ান্ত সেই ক্ষমতা কার? সেই প্রশ্ন গর্হিত। ক্ষমতার নাক মুখ চোখ নেই। মামুন চুরুট নিতে ঘরে ঢুকে দ্যাখে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে তার বউ শায়েলা। মামুন শায়েলার সঙ্গে কথা বলতে চায়, শায়েলা পাথর। পাবলিক সারভেন্ট হিসেবে সে জানে, কথা বলতে পারলে সব সমস্যা মিটে যায়। শায়েলা তার কথায় সাড়া দেয় না। মামুন বলতে চায়, একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে, তা ঘটতেই পারে, আমরা সবসময় তা এড়াতে পারি না।  শায়েলা স্তম্ভিত হয়ে মামুনের দিকে তাকায়। যা ঘটেছে তা দুর্ঘটনা! মামুনের স্ত্রীর সম্মান গেছে, আর তা দুর্ঘটনা! এই গল্প পড়তে পড়তে শিরদাঁড়ায় হিম স্রোত বয়ে যায়। ঘটনা একটা ঘটেছিল। উচ্চপদস্থ আমলা মামুনের সঙ্গে সেদিন সকাল নটায় দেখা হয়েছিল তাঁর। তিনি বেঁটেখাটো, চুল ছোট করে ছাঁটা, চিলের মতো কপিশ একজোড়া চোখ। না হেসে কথা বলেন না। আগে তাঁর সামনে দাঁড়ালে মামুনের গা ঠান্ডা হয়ে যেত। এখন কথা বলতে বলতে তিনি মামুনের কাছে সহজ হয়ে গেছেন অনেক। সেদিন বিকেলে একটা পাবলিক মিটিং ছিল। জাতি জেনে গেছে তিনি একটা রাজনৈতিক দল গঠন করছেন। তিনি সেই বিষয়ে মামুনের অভিমত জানতে চাইছিলেন। বোঝা যায় তিনি মিলিটারি শাসক। এখন জনগণের কাছে নিজেকে নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেছিলেন, আর কতদিন ক্ষমতা আঁকড়ে বসে থাকবেন জনগণের কাছে না গিয়ে? মামুন বলেছিল, জনগণের কাছে যেতে হবে কেন, ক্ষমতা যখন জনগণের কাছ থেকে আসেনি? তিনি বিপরীত মত প্রকাশ করেছিলেন। বলেছিলেন, জনগণই ক্ষমতার উৎস, সমস্ত ক্ষমতা সেখান থেকেই আসে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। মামুনের সঙ্গে সকালে তাঁর তর্ক হয়েছিল ক্ষমতার উৎস নিয়ে। সেনাশাসক বলতে চেয়েছিলেন, সেনাবাহিনী জনগণের অংশ। মামুন বলেছিল, জনগণের অংশ বটে, কিন্তু তা বিচ্ছিন্ন অংশ। মামুন বলেছিল, স্যার আদেশ দিলেই সে তার স্বাধীন মত বলতে পারে। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন সেনাবাহিনী জনগণেরই অংশ। তারা বিচ্ছিন্ন অংশ নয়। সেনাবাহিনী আসে কোথা থেকে? তাদের আত্মীয়-স্বজন তো জনগণের ভিতরই থাকে। মামুন যে কথা বলেছিল তা সেই সেনাপ্রধানের বিপরীত। সেনাবাহিনী সম্পর্কে মামুনের মূল্যায়নে তিনি ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন। আসলে মামুনের কাছে তিনি তাঁর মতের সমর্থন চেয়েছিলেন। মামুন স্বাধীন মতামত দেবে, কিন্তু তা যেন তাঁর মতের বিরুদ্ধে না যায়। সেইদিন বিকেলে তিনি  রাজনৈতিক দল গঠন ঘোষণা করেন। মামুন সেই সভায় সস্ত্রীক উপস্থিত। মামুনের সৌভাগ্য সে ক্ষমতার এই শীর্ষকে চেনে। তার সঙ্গে কথা বলে। এদেশের কোনও আমলার সেই ক্ষমতা নেই। সে বসে ছিল শায়েলাকে নিয়ে। সুন্দরী বউ। তিনি মঞ্চ থেকে দল ঘোষণার পর আচমকা আলো নিভে যায়, তখন শ্লোগান চলছিল অন্ধকারেই। আর সেই অন্ধকারেই শায়েলাকে তুলে নিয়ে যায় যুবশক্তি। মামুনকে বলে, আমলার বাচ্চা, বাড়ি যা, খানিক বাদে আইস্যা নিয়া যাস… হ্যাঁ, পুলিশ পাহারায় ধর্ষণ সম্পন্ন হয়েছিল। অন্তত শায়েলা তাই জানে। তারা যুবশক্তি, নতুন পার্টির সুখে আমলার বউকে ধর্ষণ করতে লেগেছে। সেই সময় এক মুহূর্তের জন্য সব আলো জ্বলে উঠেছিল। সেই মুহূর্তের আলোর ভিতরে সে কি মামুনকে দেখেছিল দশ হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে! কী ভয়ানক এই গল্প! মামুনও জানে ১৫ সেকেন্ডের জন্য আলো জ্বলেছিল। তখন কি সে হামাগুড়ি দিয়ে বসা কুকুরের মাংস খাওয়া দেখছিল?  ক্ষমতা আর তার অলীকতা এইভাবে মামুনের কাছে এসে পৌঁছেছিল। এই গল্প ভোলা যায় না।

বাংলা ছোটগল্পের তিনি এক নিসর্গ শিল্পী। জীবনশিল্পী। এই শিল্পীর মহাপ্রয়াণে বাংলা ভাষায় কথা বলা মানুষ নিঃস্ব হল।     

 

You might also like