Latest News

ত্রিপুরায় এ কোন তৃণমূল!

অমল সরকার

ত্রিপুরার (Tripura) সাম্প্রতিক ঘটনাবলি অবাক করছে। বিগত কয়েক মাস যাবৎ সেখানে শাসক দল বিজেপির সঙ্গে বাংলার শাসক দল তৃণমূলের জোর সংঘাত শুরু হয়েছে। হালে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভার অনুমতি আদায় করতে আদালত পর্যন্ত দৌড়তে হল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলকে। সেই ত্রিপুরায় সংখ্যালঘুদের উপর হামলার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে দিল্লির নাগরিক সংগঠনের পর্যবেক্ষক দল পাঠানো, ত্রিপুরা পুলিশের সেই দলের সদস্য এবং কয়েকজন সাংবাদিক ও আইনজীবীর বিরুদ্ধে বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইনে (ইউএপিএ) মামলা দায়ের, তাতে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ, ইত্যাদি কত কী হয়ে গেল। কিন্তু আশ্চর্যের, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর দলের তরফে যে উচ্চগ্রামে প্রতিবাদ, যা তাদের চলতি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারত, তা দেখা যাচ্ছে না। এক-দু’জন নেতার সমালোচনার মধ্যেই প্রতিবাদ সীমাবদ্ধ আছে। হিংসার ঘটনার বিহিত চেয়ে তৃণমূল জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছে। এছাড়া তারা সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছে, পুরভোট ঘিরে রাজনৈতিক সন্ত্রাসের অবসান চাইতে।

অথচ, টাডা এবং ইউএপিএ-র মতো বিতর্কিত আইনের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে হাতে গোনা যে ক’জন রাজনীতিকের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর একটা সময় দেশের মানবাধিকার কর্মীদের ভরসা জুগিয়েছে তাঁদের একজন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। টাডা শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়। তাতে বড় ভূমিকা ছিল বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর। তিনি তখন বিরোধী নেত্রী।

ত্রিপুরায় সংখ্যালঘুদের উপর হামলার অভিযোগ, বিশেষ করে ধর্মস্থান আক্রমণের খবর অস্বীকার করেছে সে রাজ্যের পুলিশ। তৃণমূলের ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ অবস্থান দেখে ধরে নেওয়া যায় বিপ্লব দেবের সরকারের পুলিশের এই বয়ানে বাংলার শাসক দলের জোরালো আপত্তি নেই। এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক আরও কিছু ঘটনায় জোড়াফুলের পার্টির অবস্থানকে খানিক এভাবেও দেখতে হচ্ছে, বাংলায় সংখ্যালঘুরা (জনসংখ্যার ২৮ শতাংশ) ভোটের রাজনীতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাগ্য নির্ধারণে যে ভূমিকা নিতে পারে, সংখ্যার কারণেই ত্রিপুরায় (জনসংখ্যার ১৩ শতাংশ) তাদের সে ক্ষমতা নেই। মধ্যপ্রদেশের পর ত্রিপুরার বিধানসভা নির্বাচনে সম্ভবত ভোট-রাজনীতিতে কট্টর আর নরম হিন্দুত্বের লড়াই আসন্ন। সেখানে জনসভার থেকেও নেতাদের মন্দির সফর বেশি দেখা যাচ্ছে।

ভেগানদের তীর্থে পাঠাবে নিরামিষ স্পেশাল ট্রেন! ভারতীয় রেলের ক্যাটারিংয়ে বড় বদল

বিপ্লব দেবের প্রশাসন সম্ভবত প্রতিপক্ষের মতলব বুঝতে পেরেই কট্টর হিন্দুত্বের লাইন মজবুত করতে সংখ্যালঘুদের পাশে থাকা দলহীন ক্ষীণ কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করতেও ইউএপিএ-র মতো ‘মারণাস্ত্র’ প্রয়োগ করেছে। কারণ, হিন্দু বাঙালির সিংহভাগ ভোট তাদের চাই। এ জন্য কোনও সুযোগই তারা হাতছাড়া করতে নারাজ। তাই হাস্যকর হলেও সত্যি, দিন কয়েক আগে বিপ্লব দেবের পুলিশ তৃণমূলের এক সামনের সারির দাপুটে নেতাকে থানায় ডেকে জানতে চেয়েছে কেন তিনি ভাষণে সীতার পাতাল প্রবেশের প্রসঙ্গ টেনে ছিলেন।

সেই নেতাও কম যান না। বিজেপির মতলব বুঝতে পেরে তিনি রামায়ণ সঙ্গে নিয়ে থানায় গিয়েছিলেন। তারা মুসলমানের পার্টি নয়, বাংলার বাইরে বাংলার শাসক দলের এটা প্রমাণ করা এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে সন্দেহ নেই।

ভারতের জাতীয় অপরাধ পঞ্জির (ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো) সর্বশেষ রিপোর্ট অনুয়ায়ী ২০১৪ থেকে ’২০ পর্যন্ত ত্রিপুরায় ইউএপিএ-তে মামলার নজির নেই। অথচ সাম্প্রতিক ঘটনাবলী নিয়ে ১০২ জনের বিরুদ্ধে এই ‘কালা আইনে’ মামলা রুজু হয়েছে। ফলে বলাই যায়, খানিক বিলম্বেই বিপ্লব দেবের সরকার বিজেপি শাসিত অন্য রাজ্যগুলির সঙ্গে একই বন্ধনীতে এল।

বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন এবং দেশদ্রোহিতার ধারায় মামলা দায়ের এখন প্রশাসনের খেয়াল খুশির ব্যাপার। জাতীয় অপরাধ পঞ্জির পরিসংখ্যান বলছে, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির পরিস্থিতি ভয়াবহ। অপছন্দের খবর নিয়ে প্রতিবাদ পত্র পাঠানোর পরিবর্তে চালু ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে সাংবাদিক ও সম্পাদকের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার ধারায় মামলা দায়ের। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশে ইউএপিএ-তে হওয়া মামলার প্রতি তিনটির একটি দায়ের হয়েছে জম্মু-কাশ্মীরে এবং ২০১৪-থেকে ২০১৯ অর্থাৎ মোদী সরকারের এই সময়কালের মধ্যে তা পাঁচগুন বৃদ্ধি পেয়েছে। ত্রিপুরায় ইউএপিএ-তে অভিযুক্তদের একজন সাংবাদিক শ্যাম মিরা সিংয়ের অভিযোগ তিনি শুধু টুইট করেছিলেন, ‘ত্রিপুরা ইজ বার্নিং।’

এমন আরও অনেক তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে গারদে পুড়ে দেওয়ার কারণেই হালে ইউএপিএ-তে মামলার মাত্র ২.২ শতাংশ ক্ষেত্রে পুলিশ আদালতে অভিযোগের প্রমাণ হাজির করতে পেরেছে। একই কারণে এ রাজ্যের একটি জেলা আদালতে মাদক মামলায় বিচারকের প্রশ্নের কাছে পুলিশকে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হয়েছিল। পুলিশ মাদক আইনের পাশাপাশি ধৃতের বিরুদ্ধে ইউএপিএ ধারায় মামলা দায়ের করে বলেছিল, মাদক তৈরিতে প্রয়োজনীয় তরলের পাঁচ লিটারের জার অভিযুক্তের মোটর সাইকেলের পিছনের বাক্স থেকে তারা উদ্ধার করেছে। বিচারক একটি মোটর সাইকেল এবং পাঁচ লিটারের জার আনিয়ে পুলিশকে বলেছিলেন, জারটি বাক্সের ভিতর ঢুকিয়ে দেখাতে। বলাই বাহুল্য, পুলিশ পারেনি।

এ নিয়ে এখন আর কেউ চক্ষুলজ্জার ধার ধারে না। কারণ, বহু ক্ষেত্রেই আইনগুলি প্রয়োগ করা হচ্ছে সরকারের সমালোচকদের কণ্ঠরোধ করতে। প্রতিবাদকে অপরাধ, এমনকি বেআইনি কার্যকলাপ হিসাবে দেগে দেওয়া হচ্ছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে ইউএপিএ প্রয়োগ নিয়ে সরকারকে তাই সতর্কও করেছে দিল্লি হাইকোর্ট।

কিন্তু তাতে কী! নিরপরাধ প্রমাণের আগে আইনি বিধানকে কাজে লাগিয়েই বছরের পর বছর অভিযুক্তকে আটকে রেখে উদ্দেশ্য হাসিল করে নিচ্ছে সরকার ও শাসক দল। এলগার পরিষদ মামলায় সন্ত্রাস দমন আইনে ফাদার স্ট্যান স্বামী শেষ পর্যন্ত জামিন পাননি। জেলেই বিচারাধীন বন্দি হিসাবে মরতে হয়েছে তাঁকে। নাগরিকের উপর সন্ত্রাস এবং মানবাধিকার হরণে আইন কত ধারালো অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে, জরুরি অবস্থার কালো দিনগুলির পর ভারতবাসী আবার এখন টের পাচ্ছে। ঘটনা হল, ইন্দিরা গান্ধী সংবিধানের একটি অনুচ্ছেদের সেদিন অপব্যবহার করেছিলেন। নরেন্দ্র মোদীর সরকার আইন, সংবিধানের তোয়াক্কা করে না।

কথায় আছে, যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ। মোদী জমানায় মানবাধিকার হরণ নিয়ে রাজনীতিকদের মধ্যে জোরালো ভাষায় কলম ধরেছেন কংগ্রেস নেতা পি চিদম্বরম। ঘটনা হল, স্ট্যান স্বামীকে গ্রেফতার করেছিল এনআইএ। আর এই জাতীয় তদন্ত সংস্থা গড়ার আইনটির প্রধান কারিগর হলেন চিদম্বরম। ইউপিএ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে তিনি সংসদে এ নিয়ে বিল এনেছিলেন সব রকম আপত্তি অগ্রাহ্য করে। বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইনটিও কংগ্রেসের অবদান। নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহ’রা ক্ষমতাসীন হয়ে সেই আইনের ফাঁক পূরণ করেছেন ব্যক্তি বিশেষের বিরুদ্ধেও তা যাতে প্রয়োগ করা যায়।

এ রাজ্যে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বাম জমানায় একাধিক ক্ষেত্রে ইউএপিএ-র ধারায় মামলা হয়েছে। তৃণমূল শাসনে সংখ্যা কম হলেও দৃষ্টান্ত আছে। সম্প্রতি অজ্ঞাতবাসে থাকা কেএলও নেতা জীবন সিংয়ের বিরুদ্ধে ইউএপিএ-তে মামলা দায়ের করেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুলিশ। বিমল গুরং এক বিচিত্র দৃষ্টান্ত। বিমল গুরংয়ের বিরুদ্ধে ইউএপিএ-র ধারায় মামলা দায়ের করা রাজ্য পুলিশই এখন তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে।

হালে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড় সন্ত্রাস দমন আইনের অপব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে সরকারকে সতর্ক করেছেন। তাঁর বক্তব্য, নাগরিক অধিকার থেকে কাউকে একদিনের জন্যও বঞ্চিত রাখা যায় না। এই প্রসঙ্গে আদালতের ভূমিকাও মনে করিয়ে দিয়েছেন চন্দ্রচূড়। তাঁর বক্তব্য, নাগরিকের স্বার্থ রক্ষায় প্রাথমিক রক্ষকের ভূমিকা আদালতেরই। কিন্তু দেশে এখন আদালত মোটের উপর দুই প্রকার। একপ্রকার অসহায়, আর এক প্রকার শাসকের ঢাল। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে।

পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা ‘সুখপাঠ’

You might also like