Latest News

Biplab Deb: বিপ্লব খারাপ, বিজেপি ভাল, তারপরেও গদি বাঁচবে কি

শোভন চক্রবর্তী

ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে বিপ্লব দেবের (Biplab Deb) ইস্তফা এবং মানিক সাহাকে সেই জায়গায় বসানোর পর একটা ব্যাপার স্পষ্ট। তা হল, ভোটের নির্ধারিত সময়ের মাত্র ন’মাস আগে নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ, জেপি নাড্ডারা বোঝাতে চাইলেন, বিপ্লব ফেল করেছেন। ত্রিপুরায় প্রথম বিজেপি সরকার গঠনের পর বিপ্লবকে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। বিপ্লব তা যথাযথ ভাবে করতে পারেনি। তাই তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হল।

অর্থাৎ বিজেপির উদ্দেশ্য ভাল ছিল। বিপ্লবই (Biplab Deb) খারাপ। এবং বিজেপি ভাল বলেই বিপ্লবকে সরিয়ে আর এক জন ভাল মানুষকে দায়িত্ব দিল। তিনি দাঁতের ডাক্তার মানিক সাহা।

নরেন্দ্র মোদীর এই ফর্মুলা বহুদিনের। মুখ বদল করে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা যে মোকাবিলা করা যায় তা ২০০৭ সালের গুজরাত ভোটে প্রথম দেখিয়েছিলেন তিনি। সৌরাষ্ট্রে কয়েক ডজন বিধায়ককে বসিয়ে দিয়ে নতুন প্রার্থী দিয়েছিলেন মোদী। তার পর সেই ফর্মুলা বিভিন্ন রূপে বিভিন্ন স্তরে ব্যবহার করা হয়েছে।

প্রশ্ন হল, সব ফর্মুলা সব জায়গায় কি খাটে? এর পরেও ত্রিপুরায় বিজেপি জিতবে কি?

বিজেপি পরিবারে বিপ্লব (Biplab Deb) বহুদিন ধরে রয়েছেন। বাজপেয়ী জমানায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রীতা ভার্মার আপ্তসহায়ক ছিলেন তিনি। জিম ট্রেনারের কাজও করতেন। সেই বিপ্লবকে ২০১৬ সালে ত্রিপুরা বিজেপির সভাপতি করে আগরতলায় পাঠিয়েছিলেন মোদী-শাহ। তার পর ভোটে জিতে বিপ্লবকে মুখ্যমন্ত্রী করেছিলেন তাঁরা। বিপ্লবের যোগ্যতা নিয়ে তখনও প্রশ্ন ছিল দলের মধ্যে। কিন্তু সমস্যা হল, তার থেকে ভাল কাউকে আর তখন খুঁজে পায়নি বিজেপি। অর্থাৎ বিপ্লবই ছিল বেস্ট বেইট।

Image - Biplab Deb: বিপ্লব খারাপ, বিজেপি ভাল, তারপরেও গদি বাঁচবে কি

এখন বিপ্লবকে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরানোর মানে অনেকের কাছেই পরিষ্কার। তা হল, আসন্ন ভোটে হেরে যাওয়ার আশঙ্কা জাঁকিয়ে বসেছে বিজেপিতে। তাঁরা হয়তো বুঝতে পারছেন, ত্রিপুরায় সমীকরণ ঘেঁটে গিয়েছে।

এখানে বলে রাখা ভাল, গত নির্বাচনে সিপিএমকে সরিয়ে বিজেপি যখন ক্ষমতায় আসে তখন তাদের জোট শরিক ছিল আইপিএফটি। জনজাতি ভিত্তিক দল ছিল আইপিএফটি। কিন্তু সেই পার্টিটাই উঠে গেছে। এখন মাথা তুলেছে প্রদ্যোত কিশোর দেববর্মনের তিপ্রা মথা। রাজবাড়ির ছেলে তথা প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি প্রদ্যোত নতুন দল গড়ে কয়েক মাসের মধ্যে স্বশাসিত জেলা পরিষদ দখল করেছে। দুমাস আগে আস্তাবল মাঠে যে সমাবেশ প্রদ্যোত করেছিলেন তা একপ্রকার ঐতিহাসিক। তাঁর সঙ্গে বিজেপির এখনও বোঝাপড়া হয়নি। মৌলিক অনেক ব্যাপারে তাঁরা রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে। বিজেপি বুঝতে পারছে বিধানসভায় তিপ্রা মথা এক চতুর্থাংশ আসনে জয়ের জায়গায় রয়েছে। সিপিএমের এখন ষোলটি আসন রয়েছে। সুদীপ রায় বর্মন কংগ্রেসে যাওয়ার পর কী প্রভাব হবে তা কৌতূহলের। কারণ আগরতলা শহরের গোটা পাঁচেক আসনে সুদীপ ফ্যাক্টর। সব মিলিয়ে ভোটের অঙ্কে বিজেপির কাছে ত্রিপুরা অনিশ্চিত। প্রসঙ্গত, সুদীপকে বিজেপি ছাড়া করার পিছনে একা বিপ্লবই দায়ী বলে অধিকাংশের মত।

আরও পড়ুনঃ হিন্দুত্বের প্রশ্নে নীরব, কংগ্রেস কি বিজেপির বি-টিমই থেকে যাবে?

সম্ভবত তাই মুখ বদল করে মুখ বাঁচানোর চেষ্টা হচ্ছে। বিপ্লব (Biplab Deb) মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর মানিক সাহাকে রাজ্য সভাপতি করা হয়েছিল। রাজনীতিতে যাঁর অভিজ্ঞতা খুবই সীমিত। দলের রাজ্য সভাপতি পদে থাকলেও আগরতলা জানে মানিকের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বিশেষ নেই। ভোটে কখনও জেতেননি। নিজস্ব জনভিত্তিও সীমিত। বিপ্লবের মতোই তাঁর পূর্ব প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা একেবারে নেই। তাই বহুজনের মতে, এই বদল স্রেফ বদলের জন্যই করা হল। এতে নীতি বদল, কাজের বদল বা প্রশাসনিক পরিবেশে বদলের সম্ভাবনা কম।

এখন কৌতূহলের বিষয় হল, তা হলে বিপ্লবের ভবিষ্যৎ কী?

রাজ্য বিজেপির অনেকে ঘরোয়া আলোচনায় বলছেন, মানিক সাহা রাজ্যসভা থেকে ইস্তফা দেবেন। সেই শূন্য পদে বিপ্লবকে পাঠানো হবে। তাতে বিপ্লবের সম্মানজনক পুনর্বাসন হতে পারে। আবার কেউ কেউ দাবি করছেন, বিপ্লবকে রাজ্য সভাপতিও করা হতে পারে।

দলের এক রাজ্য নেতার কথায়, বিপ্লবকে যদি রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয় তাহলে বুঝতে হবে সংগঠনের নেতা হিসেবে বিপ্লব যে আগ্রাসী লড়াই করেছিলেন সিপিএমের বিরুদ্ধে, সেই মেজাজটাকে ফিরিয়ে আনতে চাইছে বিজেপি। কিন্তু কর্মীদের অনেকের বক্তব্য হল, সেই সম্ভাবনা কম। কারণ, বিপ্লবের বিরুদ্ধে সংগঠনের মধ্যে থেকেই আপত্তি রয়েছে। দলের একাংশ নেতা কর্মী মনে করেন, গত সাড়ে চার বছরে বিপ্লব আর কিছু করুক চাই না করুক ব্যক্তি প্রচারকে অন্যমাত্রায় সংগঠিত রূপ দিয়েছেন। বিপ্লব দেব মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন না। তিনি মুখ্যমন্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করতেন। সারাদিন চুল আঁচড়ানো আর বাহারি রঙের পাঞ্জাবি পরা ছাড়া কিছু নজরে পড়ত না। ত্রিপুরার তথ্য সংস্কৃতি দফতরকে নিজের পেয়াদায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন বিপ্লব। সেখানে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। তা ছাড়া আগরতলার বাইরে গেলেই হেলিকপ্টারে উড়তেন মুখ্যমন্ত্রী। ত্রিপুরার মতো আর্থিক ভাবে পশ্চাৎপদ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর এ হেন লাটসাহেবি নিয়ে পার্টির মধ্যেই সমালোচনা ছিল বিস্তর।

ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। অনেকে এও বলছেন, এই বদল দুবছর আগেও হতে পারত। কিন্তু বিপ্লবকে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সেই সুযোগ কাজে তো লাগানইনি উপরি পার্টির মধ্যেই আরও ক্ষোভের সঞ্চার ঘটিয়েছেন। গত দেড় মাস ধরে তো কেন্দ্রের মন্ত্রী প্রতিমা ভৌমিক ধর্মনগর, খোয়াই, কৈলাশহরে বৈঠক করে রটিয়ে দিয়েছিলেন, মুখ্যমন্ত্রী বদল শিগগির হতে চলেছে। তিনি খোলাখুলিই বিরোধিতা করে চলেছেন বিপ্লবের।

পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, বিপ্লব যে রকম পরিপাটি হয়ে ঘুরে বেড়াতেন তাতে আন্দাজ করা যায় নিজেকে বড্ড ভালবাসেন তিনি। এমন একজন মানুষ মুখ্যমন্ত্রীর পদ খোয়ানোর পর ভিতরে ভিতরে হয়তো চরম হতাশায় রয়েছেন। প্রতি মুহূর্তে হয়তো ভাবছেন, কীভাবে ফের মুখ্যমন্ত্রীর পদ ফিরে পাওয়া যাবে। সত্যিই তিনি যদি হতাশাগ্রস্ত হয়ে থাকেন, তা হলে তাঁকে সংগঠনের দায়িত্ব দিয়ে বিজেপি কতটা নিশ্চিত থাকবে তা বলা মুশকিল। মানিক সাহাও তখন কতটা সুষ্ঠু ভাবে কাজ করতে পারবেন তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। বরং মজার ব্যাপার হল, ঘরোয়া আলোচনায় সিপিএম নেতারা বলাবলি করতে শুরু করেছেন, বিপ্লবকেই রাজ্য সভাপতি করলে ভাল হয়।

সব মিলিয়ে ভোটের আগে দৃশ্যতই বেশ ঘেঁটে গিয়েছে ত্রিপুরা বিজেপি। আগামী ৯ মাস আগরতলার রাজনীতি বেশ রোমাঞ্চকর হতে পারে বলে তাই মনে করছেন অনেকেই।

You might also like