আমার প্রাণের ঠাকুর… ফের যদি ডুবে যাই, তুমি তো আছো!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দেবস্মিতা

    তখন এক আশ্চর্য সময়। প্রায় পাঁচ বছরের লিভ-ইন সম্পর্কটা শেষ হতে চলেছে। সময়টা গরম কাল। কিন্তু আমার হাত পা কেমন যেন কেবলই ঠান্ডা হয়ে আসছে, শিথিল হয়ে আসছে। বুঝতে পারছি পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। ভালোবাসা ভাগ হয়ে গেছে। কিন্তু তখনও আমরা একই বাড়িতে, একই ছাদের তলায়।

    আমার ভালোবাসার মানুষটা কেমন ছেলেমানুষের মতো অবলীলায় আর এক জনকে ঘরে নিয়ে এসেছে। তার জন্য তার মন কেমন করছে, তাকে ফোনে ধরার জন্য অস্থির হয়ে উঠছে, তার কথা ভেবে চোখে ঝিলিক দিচ্ছে আর আমি নির্বাক হয়ে দেখছি সব। অথচ কিছুই বলতে পারছি না।নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে এতটা কাছ থেকে ভালোবাসতে দেখতে সাহস লাগে। আমি তখন আসতে আসতে নিজের অস্তিত্ব হারাচ্ছি। ভাবনা চিন্তার ক্ষমতা হারাচ্ছি।

    অফিস থেকে বাড়ি ফিরলেই মনে হতো, ঘরে ঢুকতেই সব অন্ধকার হয়ে যাবে। আমি একটাও লাইটের সুইচ খুঁজে পাব না কিছুতেই। এতটাই অন্ধকার আমার ভেতর থেকে বাইরে অবধি ঢেকে ফেলছিল তিল তিল করে। বিশ্বাস হতো না, পাশে যে মানুষটা  শুয়ে আছে, সে এক দিন আমায় বলেছিল, মায়ের পরে আমার থেকে ভালো কিছু তার জীবনে আর ঘটেনি। বিশ্বাস হতো না, সে-ই বলেছিল, আমিই তার অপেক্ষার শেষ। অথচ এখন যখন সব একটু একটু করে শেষ হয়ে যাচ্ছে, তার স্বপ্ন-ঘুম কিছুতেই ভাঙছে না।

    ছেড়ে যাওয়ার কথা তখনও ভাবিনি। জেদ চেপে গেল, ভালোবাসা কী ভাবে শেষ হয়ে যায়, তা নিজের চোখে দেখব।ফলস্বরূপ একটু একটু করে আমি জড়িয়ে পড়লাম ঘুমের অষুধে। আমাদের মাঝে তখন এক ভালোবাসা দূরত্ব। কী করলে সব ঠিক হয়ে যাবে, এই ম্যাজিকের আশায় আমি একা বসে থাকতাম ছাদে। সারা রাত। কোনও পরী নেমে আসত না। ভাল না বাসাটা যে ভালোবাসার মতোই সত্যি সেটা আমার প্রতিদিনের একটু একটু করে ভেঙে যাওয়ার শব্দে স্পষ্ট শুনেছি।

    কখনও নম্বর না দেখে ভুল বাসে উঠে শহরের অন্য প্রান্তে চলে যাচ্ছি, কখনও অফিসে মিটিং এর মাঝে কেঁদে ফেলছি অঝোরে। কখনও বাড়ি ঢুকতে ভয় পেয়ে উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছি বাড়ির চার পাশে। নিজের ওপর যৎসামান্য অধিকারটুকুও বিলিয়ে দিয়েছি অপারগতার কাছে। ভাঙতে ভাঙতে এতো টুকরো হয়ে গেছি, যে মনে হতো নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবে আর কোনও দিন দেখতে পাবো না আমি। তখন শুধু এক প্রবল চাওয়া, সেই, সব ঠিক হয়ে যাওয়ার ম্যাজিকের অপেক্ষা।

    মনে হতো যে কোনও মূল্য দিতে রাজি, শুধু সব কিছু ঠিক আগের মতো হয়ে যাক। আমার দিন, রাত্রি, ভালোবাসা, ঘর, বিছানা, সে, আমি– সব একদম আগের মতো হয়ে যাক। শুধু চাওয়া, শুধু প্রার্থনা, শুধু আকুতি।

    এমনি কোনও এক বিকেলে, দুমড়ে মুচড়ে উদ্ভ্রান্ত হয়ে বসে আছি এক লেকের ধারে। কানে গুঁজে রাখা ইয়ার ফোনে কোনও এক এফএম চ্যানেলে বেজে উঠল, “আমি বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই, বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে।”

    এমন নয়, এ গানটা প্রথম বার শুনলাম। অথচ ওই সন্ধ্যে নামার মুখে, ভেতরের ওই প্রবল ভাঙচুরে, মনে হলো কেউ একটা পাশে এসে বসল। মনে হলো, কেউ একটা হাত রাখল মাথায়। যেন আমি যে তলিয়ে যাচ্ছি, সেটা আর কেউ জানে না। তখনই  সদ্য এক ঝাঁক পাখি উড়ে গেল জলের ওপার দিয়ে।

    “না চাহিতে মোরে যা করেছো দান, আকাশ আলোক তনু মন প্রাণ”– ঠিক এই লাইনটা যখন বেজে উঠল, মনে হলো নিজের যে টুকরোগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল, তাকে গুছিয়ে এনে রাখি। লেকের জলে দেখেছি  হাওয়ারা আলতো করে ঢেউ তুলে দিচ্ছে। খুবই ছোট অথচ কী নির্বিকার। যতটুকু আছে তাই নিয়ে বয়ে চলেছে অবিরাম। একমাত্র মানুষই বোধ হয় পাওয়ার থেকে চাওয়াটাকে বড় করে দেখে। এই যে এত দিন ধরে মনে হচ্ছিল সব শেষ হয়ে যাচ্ছে, কোথায় যেন সেই ভাবনাটা থেকে একটু দূরে এসে বসতে পারলাম সে দিন। প্রথম।

    মনে হলো, এখনও তো অনেক কিছু আছে, এই যে আকাশের নীচে, জলের ধারে বসে আছি– এটাও তো কম বড় পাওয়া নয়। হঠাৎ হোঁচট লাগল। এই যে আমার চাওয়া, সব কিছু আগের মতো ফিরে পাওয়ার এক তীব্র চাওয়া– সে তো এক প্রকার প্রতিযোগিতার শেষে সান্ত্বনা পুরস্কারের মতো। যা চাইছি তা পেয়ে গেলে কী হতো, তা বুঝতে কিছুমাত্র দেরি হলো না, যখন “অতি ইচ্ছার সংকট হতে বাঁচায়ে মোরে” লাইনটা কানের ভেতর দিয়ে গিয়ে সোজা জায়গা করে নিল মনের গভীরে।

    ঠিক সেই মুহূর্তে আর কিচ্ছু চাইতে ইচ্ছে করল না। না ইচ্ছে করল ফিরে যেতে, না ফিরে পেতে। সেই দিন অনেক রাত অবধি কেউ এক জন আমার পাশেই বসেছিল।  তার পর থেকে অনেক দিন পর্যন্ত এই গানটাই আমার প্রার্থনা হয়ে উঠেছিল। বঞ্চিত থাকার জন্য প্রার্থনা, উপলব্ধি করার জন্য প্রার্থনা। না চাওয়ার মধ্যে যে শান্তি আছে, তাতে ভর করে একটু একটু করে বুদবুদের মত ওপরে ওঠার শুরু সেই থেকেই।

    কেমন যেন মনে হয়, এ মানুষটার কাছে সমস্ত দুঃখের ত্রাণ রাখা আছে। না জানি আমার মতো কত সহস্র প্রাণ উনি একা হাতে বাঁচিয়েছেন! এভাবেই! সাহিত্য জানি না, সংগীত জানি না, শুধু জানি ডুবতে থাকা প্রতিটা প্রাণের খড়-কুটো ওই মানুষটা। তাই বোধ হয় কোনও প্রাতিষ্ঠানিক রবীন্দ্রচর্চা না করেও উনি কেমন যেন আমার প্রাণের ঠাকুর হয়ে গিয়েছেন।

    শীত বসন্ত পেরিয়ে যখন বছর ঘুরে ফের পঁচিশে বৈশাখ এলো, সবার আঁড়ালে চুপি চুপি তাঁকে জন্মদিনের উপহার হিসেবে বলে এলাম, ঠাকুর আমি বেঁচে আছি। ভরসা রেখেছি, আবারও ভালোবাসার সাহস জুগিয়েছি। ফের যদি ডুবে যাই, তুমি তো আছো!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More