কে এই দুঃসাহসী শ্বেতাঙ্গ যোদ্ধা, লড়াই করেছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা সবাই জানেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে সাহায্য করতে গিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে পুরোদস্তুর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল ভারত। একই সঙ্গে ভারতীয় সেনাকে লড়তে হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) ও পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন রণক্ষেত্রে। জেনারেল স্যাম মানেকশর নেতৃত্বে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন প্রায় পাঁচ লাখ ভারতীয় সেনা। প্রাণ হারিয়েছিলেন ৩৮৪৩ জন ভারতীয় সেনা, আহত হয়েছিলেন প্রায় ১২০০০ জন।

    মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদানের কথা আজও স্বীকার করে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে স্বীকার করে আরেকজন ডাচ-অস্ট্রেলিয় মানুষের কথা। তিনিই একমাত্র ইউরোপীয় যিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিলেন পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে। তিনি হলেন উইলিয়াম আব্রাহাম সাইমন ওডারল্যান্ড

    ছিল নাৎসিবাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা

    ১৯১৭ সালে হল্যান্ডে জন্মেছিলেন ওডারল্যান্ড। ১৭ বছর বয়েসে পড়াশুনো ছেড়ে জুতো পালিশ শুরু করেন। পরে যোগ দিয়েছিলেন বাটা কোম্পানিতে। ওডারল্যান্ড যখন যুবক, হল্যান্ডের আকাশ কালো করেছিল বারুদের ধোঁয়া। যুদ্ধের মেঘ।  ১৯৪০ সাল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজিয়ে নাৎসি  জার্মানি আক্রমণ করেছিল হল্যান্ড, ফ্রান্স, লুক্সেমবার্গ আর বেলজিয়াম। জার্মানির বিরুদ্ধে লড়ার জন্য ওডারল্যান্ড যোগ দিয়েছিলেন ডাচ ন্যাশনাল সার্ভিসে।

    ১৭ মে হল্যান্ড দখল করে নিয়েছিল জার্মানি। গেরিলা কম্যান্ডো ওডারল্যান্ড চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালাতে থাকেন নাৎসি বাহিনীর ওপর। একই সঙ্গে চলে ডাচ গেরিলাদের ট্রেনিং দেওয়া। ধরাও পড়ে যান নাৎসিবাহিনীর হাতে। কিন্তু ক্ষুরবুদ্ধির  ওডারল্যান্ডকে আটকে রাখতে পারেনি জার্মানি। অবিশ্বাস্যভাবে জেল থেকে পালান তিনি। জার্মান ভাষায় পারদর্শী ছিলেন, তাই ছদ্মবেশ ধরে ডাচ গুপ্তসমিতির গুপ্তচর হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ওডারল্যান্ড আবার বাটা কোম্পানির চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন।

    ঢাকায় এসে দেখেছিলেন পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের অত্যাচার

    বাটার কোম্পানির প্রোডাকশন ম্যানেজার হয়ে ১৯৭১ সালের শুরুতে ঢাকায় আসেন  ওডারল্যান্ড। কিছুদিনের মধ্যেই টঙ্গীতে অবস্থিত বাটার জুতো কারখানায় ম্যানেজিং ডিরেক্টর হয়ে যান। বাংলাদেশে তখন চলছিল বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের অকথ্য অত্যাচার। চলছিল নৃশংস গণহত্যা ও অবর্ণনীয় সন্ত্রাস।

    ১৯৭১ সালের মার্চে শুরু হয়েছিল রুখে দাঁড়ানো দামাল বাঙালির গণ-অভ্যুত্থান। ৫ মার্চ মেঘনা টেক্সটাইল মিলের সামনে সমবেত শ্রমিক ও জনতার ওপর গুলি চালিয়েছিল ইস্ট পাকিস্তান রাইফেল। রক্তে ভিজে গিয়েছিল রাস্তা। লাশের ওপর লাশ জমা হয়েছিল। অফিসের জানলা দিয়ে দেখেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গেরিলা কম্যান্ডো ওডারল্যান্ড।২৫ মার্চ থেকে শুরু হয়েছিল পাক বাহিনীর পরিকল্পিত গণহত্যা অপারেশন সার্চলাই। পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতার সঙ্গে নাৎসিবাহিনীর বর্বরতার কোনও তফাত ছিলনা। নেদারল্যান্ডের রটেরডাম শহরে নাৎসি বিমানবাহিনী কয়েক মিনিটে নির্মমভাবে মেরেছিল ৩০,০০০ নিরীহ মানুষকে। দেশবাসীর ছিন্নভিন্ন লাশ ও রক্তে ভেজা রাস্তার স্মৃতি জেগে উঠেছিল ওডারল্যান্ডের মনে। শক্ত হয়েছিল চোয়াল। স্থির করেছিলেন যেভাবেই হোক বাংলাদেশকে হানাদার মুক্ত করতে হবে। আর রক্তের হোলি খেলতে দেওয়া যাবেনা পাক সেনাবাহিনী ও রাজাকারদের।

    অপারেশন সার্চলাইট

    ওডারল্যান্ডের কাছে ফিরে এসেছিল তাঁর সেই গেরিলা মন

    গেরিলা আক্রমণ পরিচালনা করা ও গেরিলাদের ট্রেনিং দেওয়ার অভিজ্ঞতা ওডারল্যান্ডের ছিল। তিনি ভেবেচিন্তে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলেছিলেন। শেতাঙ্গ বলে পাকিস্তানি সেনা অফিসাররা তাঁকে সন্দেহের চোখে দেখত না। জার্মানির বিরুদ্ধে ডাচ গুপ্ত সমিতির গুপ্তচর হয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর ছিলই, ফলে তিনি সহজে ঢুকে পড়তে পেরেছিলেন পাকিস্তানি বাহিনীর অন্দরমহলে।

    প্রথমে তিনি পাকিস্তানি সেনার ২২ বালুচ রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন সুলতান নওয়াজের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে ঢুকে পড়েন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে। একই সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন গভর্নর জেনারেল টিক্কা খান, মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি ও পাকিস্তানের লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজির সঙ্গে। জোগাড় করেন ইস্টার্ন কমান্ডের হেড কোয়ার্টারে অবাধ প্রবেশের অধিকার।

    ঢাকায় ওডারল্যান্ড ( ডান দিক থেকে তৃতীয়)

    পাকিস্তানি সেনারা ওডারল্যান্ডকে এতটাই বিশ্বাস করে ফেলেছিল, পাক সেনা অফিসারদের নীতি-নির্ধারক মিটিংয়েও উপস্থিত থাকতেন তিনি। পাকিস্তানি সেনাদের ভেতরের খবর ওডারল্যান্ড জেনে নিতে শুরু করেছিলেন গুপ্তচরের দক্ষতায়। সরবরাহ করতে লাগলেন মুক্তিবাহিনীর সেক্টর-২ এর মেজর এটিএম হায়দারকে।

    একই সঙ্গে লুকিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের করা অসংখ্য গণহত্যার ছবি তুলতে থাকেন ওডারল্যান্ড। গণহত্যার ভয়ঙ্কর ছবি গোপনে পাঠাতে থাকেন বিদেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। তাঁর মনে হয়েছিল বাঙালির ওপর পাক হানাদারদের বর্বর অত্যাচার নাৎসিদের নৃশংসতার চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। তাই পূর্ব-পাকিস্তানের নারকীয় অবস্থা বিশ্ববাসীকে জানানো উচিত। ওডারল্যান্ডের তোলা ছবি বিশ্ব জনমতকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আনার ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা নিয়েছিল।

    আর গোপনে নয়, এবার সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের গেরিলার ভূমিকায়

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে উজাড় করে দিয়েছিলেন ওডারল্যান্ড। বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ ওডারল্যান্ড সব ধরনের আধুনিক অস্ত্র চালনায় পারদর্শী ছিলেন। ২নং সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা শাখার সক্রিয় সদস্য হয়ে যান। টঙ্গী কারখানার ম্যানেজিং ডিরেক্টর হয়েও তাঁর কারখানার ক্যাম্পাসে ও বিভিন্ন গোপন ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের কম্যান্ডো ট্রেনিং দিতে শুরু করেন। মারাত্মক শক্তিশালী বিস্ফোরক বানানোর সহজ পদ্ধতি শিখিয়ে দেন মুক্তিযোদ্ধাদের।মুক্তিবাহিনী ও সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি এম. এ. জি. ওসমানির সঙ্গেও যোগাযোগ রেখে চলছিলেন ওডারল্যান্ড।

    মুক্তিবাহিনীর  জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানির সঙ্গে ওডারল্যন্ড

    তাঁর সেক্টরের অনান্য নেতাদের সঙ্গে পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে তাঁর বাহিনীর রণকৌশল ঠিক করতে থাকেন। ২নং সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে টঙ্গী-ভৈরব রেললাইনে থাকা একের পর এক ব্রিজ আর কালভার্ট উড়িয়ে দিয়ে ওডারল্যান্ড পাকিস্তানি বাহিনীর অগ্রগতি রুখে দিতে থাকেন। একই সঙ্গে তার পরিচালনায় মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকার আশেপাশে পাক সেনাদের ক্যাম্প ও কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অফিসে গেরিলা হামলা চালাতে থাকে।

    যুদ্ধে যাওয়ার আগে ওডারল্যান্ড

    ঢাকার অস্ট্রেলিয় হাইকমিশন এই সময়ে  ওডারল্যান্ডকে গোপনে অনেক সাহায্য করেছিল। ওডারল্যান্ড মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাদ্য,  চিকিৎসা সামগ্রী, গরম কাপড় ও অস্ত্রশস্ত্র  আনিয়েছিলেন বাংলাদেশে। যোগান দিয়েছিলেন নগদ টাকাও।

    ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর,  মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণে বিধ্বস্ত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ করে। ভারত ও বাংলাদেশ সেনার জয়েন্ট কম্যান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা ও বাংলাদেশের এয়ার কমোডোর একে খোন্দকারের সামনে আত্মসমর্পণের দলিলে সই করেন পাকিস্তানের লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজি। বাংলাদেশের আকাশে ঝলমল করে ওঠে স্বাধীনতার মুক্তিসূর্য।

    আত্মসমর্পণ করছেন পাকিস্তানের লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজি, পাশে ভারতের লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরা

    যুদ্ধের পর ওডারল্যান্ড

    মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ওডারল্যান্ড আবার বাটা কোম্পানির চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। কর্মজীবন শেষ করে ১৯৭৮ সালে চলে গিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, অসামান্য বীরত্ব ও নৈপুণ্যতা প্রদর্শনের জন্য, বাংলাদেশ সরকার পরবর্তীকালে ওডারল্যান্ডকে রাষ্ট্রের চতুর্থ সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব বীর প্রতীক সম্মানে ভূষিত করে। ওডারল্যান্ডই একমাত্র বিদেশি যাঁকে বাংলাদেশ সরকার ‘বীর প্রতীক’ খেতাবে ভূষিত করেছে। মৃত্যুর আগে অবধি নিজের নামের পাশে ‘বীর প্রতীক’ শব্দদুটি শ্রদ্ধার সঙ্গে লিখতেন ওডারল্যান্ড।

    বীর প্রতীক উইলিয়াম ওডারল্যান্ড

    অস্ট্রেলিয়ার পার্থে  ২০০১ সালের ১৮ মে প্রয়াত হন ওডারল্যান্ড। বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় তাঁর কফিন ঢেকে দেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা দিয়ে। যে বিজয় কেতন  নীল আকাশে ওড়ানোর জন্য নিজের জীবনকে বাজি রেখেছিলেন এক ভিনদেশী যোদ্ধা উইলিয়াম আব্রাহাম সাইমন ওডারল্যান্ড

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More