রবিবার, ডিসেম্বর ৮
TheWall
TheWall

দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করতে নিষিদ্ধপল্লীর মাটি লাগে কেন!

রূপাঞ্জন গোস্বামী

 মানবজাতিকে দুর্গতি বা সংকট থেকে রক্ষা করেন বলেই তিনি দুর্গতিনাশিনী মা দুর্গা। হিন্দুধর্মে তিনি মহাশক্তির উগ্র রূপ,পরমা প্রকৃতি ও সৃষ্টির আদি কারণ।

 আষাঢ় মাসে রথদ্বিতীয়ার দিন থেকে বাংলায় মা দুর্গার আগমনবার্তা ধ্বনিত হয়। সেদিন থেকেই বাংলার বিভিন্ন কুমোরপাড়ার ঘরে ঘরে তুঙ্গে ওঠে ব্যস্ততা৷ খড় কাটা, মেড় তৈরি, কাদা মাখা শুরু করে হাজার হাজার অভিজ্ঞ হাত। ধাপে ধাপে চিন্ময়ী দেবীর দশভুজা মৃন্ময়ী রূপ ফুটে উঠতে থাকে কুমোরপাড়ায়।

একমেটে, দোমেটে থেকে ধীরে ধীরে পূর্ণ অবয়ব ধারণ করেন মহিষমর্দিনী মহামায়া। অসুরনাশিনী কাত্যায়নীর এই ভুবনমোহিনী মৃন্ময়ী রূপ ফুটিয়ে তুলতে শাস্ত্রমতে কয়েকটি বিশেষ উপকরণ লাগে।যেগুলি ছাড়া দুর্গাপ্রতিমা গড়া সম্ভব নয়।

পবিত্রতার প্রতিমূর্তি মা দুর্গার মূর্তি তৈরি করতে প্রথমেই লাগে বিশেষ কিছু জায়গার মাটি। রাজবাড়ির মাটি, চৌমাথার মাটি, গঙ্গার দুই তীরের মাটি ও  তথাকথিত ‘অশুচি’ এলাকা নিষিদ্ধপল্লীর মাটি৷ এর সঙ্গে লাগে গাভীর মূত্র, গোবর, ধানের শিস, পবিত্র গঙ্গার জল।

পুজোর কয়েক মাস আগে থেকেই মৃৎশিল্পীরা বিভিন্নভাবে যোগাড় করতে শুরু করেন এই সমস্ত উপাদানগুলি। নিষিদ্ধপল্লীতে থাকা বারাঙ্গনার ঘরের দরজার বাইরে থেকে মাটি সংগ্রহ করা হয় এবং এই আচার পালন করা হয়ে চলেছে  প্রাচীন কাল থেকে।

কিন্তু কেন এই রীতি!

প্রথম মত

প্রাচীনকালে যখন  বর্ণপ্রথা ছিল তখন হিন্দু ব্যবসায়ী শ্রেণীকে বলা হতো বৈশ্য। বেশ্যা শব্দটি এসেছে বৈশ্য শব্দ থেকে। বিক্রি হওয়া জিনিস অর্থে বেশ্যা শব্দটি  ব্যবহার হত। কালের পরিক্রমায় শব্দটির একমুখী অর্থ নির্মিত হয়েছে। পেট চালাতে শরীর বেচা মেয়েদের উপাধি হয়েছে বেশ্যা শব্দটি।

এই মতে বিশ্বাসীরা বলেন, বেশ্যাদ্বার মৃত্তিকা বলতে আসলে বৈশ্য ব্যবসায়ী শ্রেণীর বাড়ির দরজার মাটি। রাজন্যবর্গ ছাড়াও সমাজের বণিক শ্রেণীর সরাসরি পৃষ্টপোষকতায় দুর্গাপুজো হতো, তাই রাজবাড়ির মাটির সঙ্গে বৈশ্যবাড়ির মাটিও লাগত। কিন্তু কালের বিচিত্র অভিলাষে বেশ্যাদ্বার মৃত্তিকা হয়ে উঠেছে বারাঙ্গনার ঘরের দরজার বাইরের মাটি।

দ্বিতীয় মত
একজন কামাতুর পুরুষ যখন যৌনকর্মীর ঘরে প্রবেশ করেন, দরজার বাইরের পদধূলায় পড়ে থাকে তাঁর সারাজীবন ধরে সঞ্চয় করা সকল পুণ্য। কারণ তিনি সকল পুণ্য ঘরের বাইরে রেখে ঘরে প্রবেশ করছেন এবং ঘর থেকে পাপ অর্জন করে বাইরে আসবেন।

প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্রজ্ঞরা অনুধাবন করেছিলেন নিষিদ্ধপল্লীর গণিকারাই প্রকৃতপক্ষে সমাজের সবচেয়ে পবিত্র অংশ।
নারীকে পতিতা বানায় পুরুষ। আবার তারাই বারবণিতার কাছে গিয়ে যৌনসুখ পয়সা দিয়ে কিনে তাঁকেই আবার নষ্ট মেয়ে বা  অপবিত্র ঘোষণা করে।

অন্যদিকে পুরুষের মানুষের কামনা, বাসনা, লালসার গরল গ্রহণ করে তথাকথিত পতিতারা সমাজকে বিষমুক্ত করেন, নিষ্কলুষ রাখেন, পুণ্যার্জন করেন। তাঁদের পদধূলিও  লেগে থাকে তাঁদের ঘরের দরজার বাইরের মাটিতে। তাই এ মাটি পবিত্রতম।

কিন্তু রাজন্যবর্গদের পেশি ও আর্থিকশক্তির বিরুদ্ধে লড়ার ক্ষমতা ছিল না প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্রজ্ঞদের। এই অভিশপ্ত পেশার বিলোপ ঘটানোও সম্ভব ছিল না। তাই তাঁরা সুকৌশলে সমাজের এই সব দুঃখিনী নারীর সমাজের পবিত্রতম অনুষ্ঠানে অঙ্গীভূত করে সমাজকে চাবুক মেরে গেছেন।

যাঁদের জীবনে দিন ও রাত আসে কেবল বঞ্চনার পাখা মেলে, শারদ উৎসবের দিনগুলিতে হয়তো তাঁরা মা দুর্গার শরীরে অঙ্গীভূত হওয়ার তৃপ্তি অনুভব করেন। ভোররাতে সবার নজর এড়িয়ে ফাঁকা প্যান্ডেলে দুর্গাপ্রতিমার সামনে কুণ্ঠিতভাবে দাঁড়িয়ে এই অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্তি কামনা করেন। চোখ বুজে প্রার্থনা করেন,”সামনের জন্মে যেন বাবুদের বাড়ির বউদের মতো বিজয়া দশমীতে সিঁদুরখেলা খেলতে পারি মা”।

নিচের ছবিতে ক্লিক করুন, দ্য ওয়ালের পুজো ম্যাগাজিন পড়ুন বিনামুল্যে।

Comments are closed.