শনিবার, মে ২৫

ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করছে শয়ে শয়ে কুকুর, রহস্যময় ব্রিজ নিয়ে আতঙ্কিত স্কটল্যান্ড

রূপাঞ্জন গোস্বামী

২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাস। স্কটল্যান্ডের ঘন সবুজে ঘেরা ওভারটাউন এস্টেট। টানা কয়েকদিন বৃষ্টির পর সেদিন একটু রোদ উঠেছিল। গা ছমছমে ঘন জঙ্গলের বুক চিরে চলে গেছে আঁকা বাঁকা চকচকে রাস্তা। সেই রাস্তায় মর্নিং-ওয়াক করছিলেন  লোটি ম্যাকিনন। সঙ্গে তাঁর দুই পোষ্য ডোবারম্যান কলি আর বনি। হাঁটতে হাঁটতে তাঁরা এসে গিয়েছিলেন ওভারটাউন ব্রিজ-এর কাছে। ব্রিজটির কাছে আসতেই লোটির নজরে এল তাঁর দুই পোষ্যের অসংলগ্ন ও অস্বাভাবিক ব্যবহার।

লোটি ম্যাকিনন পরে সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেনযেন এক অপদেবতা বনির ঘাড়ে চেপেছিল।  প্রথমে বনি একদম পাথরের মূর্তির মত এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়েছিল।  তারপর তার মধ্যে অদ্ভুত প্রচন্ড একটা খুনে মেজাজ দেখতে পেয়েছিলাম। যা আগে কোনওদিন বনির মধ্যে দেখিনি।  তীব্রগতিতে দৌড়ে ব্রিজের পাঁচিলের ওপর থেকে নীচে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু বনি লাকি ছিল, তাই বেঁচে গেছিল। যদিও বনির পিছনের পা ভেঙে গিয়েছিল

কিন্তু সব কুকুর বনির মত লাকি ছিল না। ২০১১ সালে ডেভিড আর লুই ম্যাকফিল তাঁদের ল্যাব্রাডর সোফিকে নিয়ে একই রাস্তায় হাঁটছিলেন। ওভারটাউন ব্রিজ-এর কাছে কাছে আসতেই, সোফি দৌড়ে ব্রিজের পাঁচিলে উঠে, নীচে ঝাঁপ দিয়েছিল দিয়েছিল।

ডেভিডরা চিৎকার করে ওঠার আগেই ব্রিজের নীচের পাথুরে জমিতে আছড়ে পড়েছিল সোফি। কয়েক মুহূর্তে সব শেষ। সোফির মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল ব্রিজের নীচ থেকে।

স্থানীয় গবেষকরা জানিয়েছেন,  ১৯৬০ এর দশক থেকে কমপক্ষে ৬০০ টি কুকুর ওভারটাউন ব্রিজ থেকে ঝাঁপ দিয়েছে। এর মধ্যে দুই শতাধিক কুকুরের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে। তাই স্থানীয়রা ব্রিজটির নাম দিয়েছে ডগি সুইসাইড ব্রিজ’

ব্রিজের ওঠার আগেই সতর্ক করে দেওয়া হচ্ছে কুকুরের মালিকদের

কী এই ওভারটাউন এস্টেট!

স্কটল্যান্ডের ওয়েস্ট ডাম্বারটনশায়ারের অদূরে অবস্থিত এই ওভারটাউন এস্টেট। ঘন জঙ্গলে ঘেরা এই জমি ও সম্পত্তি  ওভারটাউন ফার্ম নামে পরিচিত। ১৮৫৯ সালে জেমস হোয়াইট নামে এক ব্যারিস্টার এস্টেটটি কেনেন। তিন বছর পর তিনি এই এস্টেটে বানান রাজকীয়  ওভারটাউন হাউস

ভুতুড়ে ওভারটাউন হাউস

১৮৮৪ সালে জেমস হোয়াইট  মারা গেলে, ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইনার হেনরি মিলারকে দিয়ে ওভারটাউন ব্রিজটির নকসা করান তাঁর ছেলে জন হোয়াইট। ওভারটাউন ব্রিজ তৈরি শেষ হয় ১৮৯৫ সালে। খাদের ওপারে থাকা গারশেক এলাকার সঙ্গে ওভারটাউন এস্টেটের সংযোগ ঘটায় এই ব্রিজ। স্থাপত্য ও অপরূপ নৈসর্গিক পরিবেশের কারণে প্রাতঃভ্রমণকারী ও কুকুরের মালিকদের জন্য দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ব্রিজটি।

ওভারটাউন ব্রিজ

ব্রিজটির কাছে এলেই কুকুরদের ঘাড়ে চাপে আত্মহত্যার প্রবণতা 

শয়ে শয়ে প্রাতঃভ্রমণকারী জানিয়েছেন, তাঁদের পোষ্য কুকুরেরা ব্রিজটির কাছে এলেই কিরকম অপ্রকৃতিস্থ হয়ে যায়। চেনে বাঁধা না থাকলে তারা ব্রিজটির দিকে ছুটে যায়। ব্রিজটির পাঁচিল টপকে লাফিয়ে পড়ে পঞ্চাশ ফুট নীচে। আত্মহত্যার জন্য। চেনে বাঁধা থাকলেও, আপ্রাণ চেষ্টা করে আত্মহত্যা করার।

বহু প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, আত্মহত্যার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়া কুকুর বেঁচে গিয়ে, আবার ব্রিজের ওপর উঠে এসে দ্বিতীয়বার লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছে। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলা কুকুরদের এই আত্মহত্যার প্রবণতা, ডাম্বারটনের বাসিন্দাদের আতঙ্কের মধ্যে রেখেছে।

Scottish Society for the Prevention of Cruelty to Animals নামে একটি সংস্থা এই রহস্যভেদের উদ্দেশ্যে ওভারটাউনে তাদের প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল। কিন্তু  কুকুরদের গণহারে আত্মহত্যার কোনও বিশ্বাসযোগ্য কারণ খুঁজে পাননি তদন্তকারীরা।

অপদেবতার হাতছানিতেই আত্মহত্যা!

স্কটল্যান্ডের ডাম্বারটনের বাসিন্দারা এমনিতেই কুসংস্কারে বিশ্বাস করেন। কুকুরদের গণহারে আত্মহত্যা, তাঁদের কুসংস্কারের পালে যুগ যুগ ধরে হাওয়া দিয়ে আসছে।  ঘটনাটিকে সেভাবেই ব্যাখ্যা করেছেন স্থানীয় ট্যাক্সি ড্রাইভার অ্যালিস্টেয়ার ডাটন

আমরা ওভারটাউন এস্টেটের মাঠে খেলে বড় হয়েছি। শুধু আমি নই, স্থানীয় সবাই জানেন ওভারটাউন এস্টেটে ভূত থাকে। আমরা দেখেছি তাকে। ঘটনাটিগুলির জন্য দায়ী একমাত্র সেই মহিলা।

স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন কুকুরদের আত্মহত্যার পিছনে আছে এক অপদেবতার হাত। ওভারটাউন প্যালেসের কোনও এক মালিকের বিধবা স্ত্রী নাকি ভূত হয়ে আজও ওভারটাউনে ঘুরে বেড়ান। ব্রিজে, জঙ্গলে, প্যালেসের জানলায়, ছাদে, বাগানে তাঁকে এখনও দেখা যায়। তাঁর অতৃপ্ত আত্মার রক্ততৃষ্ণাই নাকি কুকুরদের আত্মহত্যার জন্য দায়ী।

 সত্যিই আত্মহত্যা নাকি অন্যকিছু!

প্রথম তত্ত্ব- কুকুরদের ঘ্রাণশক্তি মানুষের থেকে প্রায় ১০০০০০ গুণ বেশি। কিন্তু দৃষ্টি শক্তি ততটা প্রখর নয়। গবেষক ও পশু-বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কুকুরেরা এই ব্রিজের কাছে এসে, ব্রিজের নীচের খাদে থাকা কোনও স্তন্যপায়ীর তীব্র গন্ধে আকৃষ্ট হচ্ছে। কিন্তু সে গন্ধ মানুষের নাকে ধরা পড়ছে না। সেই গন্ধ, কুকুরের জিনে থাকা শিকারী প্রবৃত্তিকে মুহূর্তের মধ্যে জাগিয়ে তুলছে। তাই তারা শিকারের লোভে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ব্রিজ টপকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে  অজানা গন্ধের উৎস সন্ধানে। 

দ্বিতীয় তত্ত্ব-  কুকুরদের সারাদিনই কিছু না কিছু শুঁকতে দেখা যায়। জীববিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন অনেক সময় নিজের গন্ধকে আড়াল করতে গন্ধ শোঁকে কুকুরেরা। শিকার ও আত্মরক্ষার জন্য  নিজের গন্ধ ঢাকতে কুকুরদের পূর্বপুরুষ, নেকড়েরাও  মৃত পশুর দেহের অবশিষ্ট অংশের চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। ওভারটাউন ব্রিজের ঝিম মারা পরিবেশে ভয় পেয়ে,  আত্মরক্ষার জন্য কুকুররা অন্য কোনও গন্ধ মাখতে চাইছে। যা কিনা ব্রিজের নিচের খাত থেকে আসছে। সেই গন্ধের কাছে যাওয়ার জন্যই তারা ব্রিজ থেকে নীচে লাফিয়ে পড়ছে।

কী বলছেন বিখ্যাত পশু-ব্যবহার বিশেষজ্ঞ ডক্টর ডেভিড স্যান্ড!

ডাম্বারটন কাউন্সিলের ডাকে সাড়া দিয়ে তিনিও তদন্ত করেন। তিনি কুকুরদের মৃত্যুর পিছনে তাদের জৈবিক প্রবৃত্তি , উচ্চতা ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেছেন কুকুরদের পৃথিবী আমাদের চেয়ে আলাদা। একই জায়গাকে কুকুর ও মানুষ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখে ও বিচার করে।

ডঃ স্যান্ডের মতে ব্রিজের নিচু পাঁচিলের নীচেই যে ৫০ ফুটের খাদ, সেটা আমরা দেখতে পেলেও উচ্চতা কম থাকায় কুকুররা দেখতে পায় না। ফলে ব্রিজের তলায় অজানা জন্তুর গন্ধ পেয়ে শিকারী প্রবৃত্তির বশে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাঁচিল টপকে। এবং মারা যায়।

কিন্তু প্রশ্ন হল, কুকুরেরা ওভারটাউন ব্রিজ থেকেই লাফিয়ে মরে কেন! তাও আবার শয়ে শয়ে কুকুর! একই রকম পরিবেশ, একই স্থাপত্যের ব্রিজ স্কটল্যান্ডের অনেক জায়গায় আছে। সেখানে কেন কুকুরেরা আত্মহত্যা করে না!

Shares

Comments are closed.