সোমবার, মার্চ ২৫

 চুরি হয়ে গিয়েছিল লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির ‘মোনালিসা’, পুলিশের নজরে ছিলেন বিখ্যাত চিত্রকর পাবলো পিকাসো!

রূপাঞ্জন গোস্বামী

১৯১১ সালের ২১শে আগস্ট, সোমবার। আকাশে ভোরের আলো ফুটে উঠেছে।  প্যারিসের বিখ্যাত ল্যুভর মিউজিয়ামের ভেতরে রাখা দেওয়াল আলমারি থেকে বেরিয়ে এলেন এক ব্যক্তি। সারারাত অপেক্ষা করছিলেন এই মাহেন্দ্রক্ষণটির জন্য। দেওয়াল থেকে ফ্রেমে আঁটা মোনালিসাকে নামালেন। তারপর ফ্রেম থেকে ছবিটি খুলে নিজের ওভারকোট দিয়ে মুড়ে বেরিয়ে গেলেন ল্যুভর থেকে।

পরের দিন ২২ আগস্ট ১৯১১। সকাল ন’টায় চিত্রশিল্পী লুইস বেরোদ ল্যুভর মিউজিয়ামে এলেন। মোনালিসা যেখানে রাখা ছিল সেখানে গিয়ে দেখলেন, কেবল মাত্র চারটি পেরেক আছে। মোনালিসা নেই। মিউজিয়ামের নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে জানতে চাইলেন, মোনালিসা কোথায়? চিত্রশিল্পী লুইস বেরোদ ঘটনাটি মিউজিয়ামের প্রধান গার্ডকে জানান। গার্ড বলেছিলেন, ছবিটি অন্য কোথাও প্রদর্শিত হচ্ছে হয়তো। কিন্তু সন্দেহ হয় শিল্পীর। সেকশন প্রধানের কাছে এই তথ্যটি যাচাই করেন। শিল্পীকে সেকশন প্রধান জানান, মোনালিসাকে অন্য কোথাও প্রদর্শনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়নি। সংবাদপত্রগুলির অফিসে দুপুরেই দুঃসংবাদটি পৌঁছে গেল।পরের দিন সকালে ফরাসি কাগজে লেখা হল-

অভাবনীয়: মোনালিসা কোথাও নেই!’ ল্যুভর থেকে চুরি হয়ে গেল লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মোনালিসা!

প্যারিসের বিখ্যাত ল্যুভর মিউজিয়াম

মোনালিসা চুরির খবরটি, দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল ইউরোপে। ফ্রান্সের বর্ডার সিল করে দেওয়া হয়েছিল। ফ্রান্স জুড়ে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেছিল জনগণ। ল্যুভর মিউজিয়ামের তৎকালীন কিউরেটর থিওপেলি হোমলোকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। ঘোষণা করা হয়েছিল, ছবিটি যে খুঁজে এনে দেবে তাকে কোনওরকম প্রশ্ন ছাড়াই ৪০ হাজার ফ্রাঁ দেওয়া হবে। একই কারণে, প্যারিস জার্নাল ৫০ হাজার ফ্রাঁ পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।

কে এই মোনালিসা!

‘মোনালিসা’ হল তেলরঙে আঁকা ইতালীয় চিত্রশিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির এক অমর সৃষ্টি। লিওনার্দো যখন ফ্রান্সে আসেন, ফ্রান্সের রাজা প্রথম ফ্রান্সিস মাত্র চার হাজার সোনার মুদ্রার বিনিময়ে ভিঞ্চির কাছ থেকে মোনালিসাকে সংগ্রহ করেন। রাখেন ভার্সাইয়ের রাজপ্রাসাদে। এরপর নেপোলিয়ন মোনালিসাকে নিয়ে যান টুইলিরাইসে, নিজের শয়নকক্ষে। নেপোলিয়নের মৃত্যুর পর ছবিটি ল্যুভর মিউজিয়ামকে উপহার দেওয়া হয়। ছবিটি ফ্রান্সের জাতীয় সম্পত্তিতে পরিণত হয়।

মোনালিসা

অনাদরে ছিল মোনালিসা

শুধু জনপ্রিয়তার দিক থেকেই নয়, অর্থমূল্যের দিক থেকেও মোনালিসা পৃথিবীর সব চেয়ে দামী শিল্পকর্ম। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রবন্ধে বলা হয়েছিল,  ১৯০৬ সালে ছবিটির দাম ছিল ১৬২ কোটি ৯৫ লাখ ২৮ হাজার ৬২ ডলার। মোনালিসার দাম প্রতি মিনিটে বাড়ে ৯৪ দশমিক ৩০ ডলার ( বর্তমান মুল্যে ৬৭৩৫ টাকা )। এ হেন ছবি অনাদরে ছিল। এবং ল্যুভরের মত বিশ্বখ্যাত মিউজিয়ামে। চুরি যাওয়ার বেশ কিছু মাস আগের কথা।মিউজিয়ামের নজরদারির ঢিলেঢালা নিরাপত্তা ব্যাবস্থাকে জনসমক্ষে উন্মোচিত করার জন্য, এক ফরাসি সাংবাদিক ল্যুভর মিউজিয়ামের মমির ঢাকনার মধ্যে সারারাত লুকিয়েছিলেন। দেখিয়েছিলেন সহজেই যে কোনও ক্যানভাস খুলে নেওয়া যায়।

প্যারিস জার্নালের অফিসে নিজেই এলেন এক শিল্পচোর

দিনের পর দিন কেটে যাচ্ছে। চুরির কোনও সূত্র মিলছে না। ফরাসি গোয়েন্দারা মরিয়া হয়ে উঠলেন। মোনালিসা  চুরি যাওয়ার ৮ দিন পর (২৯ আগস্ট) ,প্যারিস জার্নাল-এর অফিসে এলেন এক যুবক। তাঁর নাম জোসেফ গেরি পিয়েরেট। পিয়েরেট নিজেই স্বীকার করলেন, তাঁর নেশা ল্যুভর থেকে আইবেরিয়ান আর্ট ওয়ার্ক চুরি করা। তার প্রমাণ হিসেবে পিয়েরেট যিশুর জন্মেরও আগে তৈরি একটা ছোট মূর্তি দেখান। যেটিকে পরে ল্যুভরের কিউরেটর চিনতে পারেন। প্যারিস জার্নাল জানতে চায়, পিয়েরেট নিজে মোনালিসা চুরি করেছেন কিনা। কিন্তু পিয়েরেট স্বীকার করেননি। তবে তিনি জানান, ল্যুভর থেকে চুরি করা কিছু মূর্তি তিনি  প্যারিসের এক বিখ্যাত চিত্রশিল্পীর কাছে বিক্রি করেছেন। যাঁর আইবেরিয়ান আর্ট ওয়ার্ক সংগ্রহের নেশা ছিলো।

আদালতে কবি অ্যাপোলিনেয়ার

নাম গোপন করে প্যারিস জার্নালে ছাপা হল, পিয়েরেটের স্বীকারোক্তি কথা। পুলিশের সন্দেহ গেছিলো কবি অ্যাপোলিনেয়ারের দিকে। তিনি ছিলেন পিকাসোর আধুনিক আর্ট গ্রুপ la bande de Picasso-এর একজন বড় প্রবক্তা। এবং পিয়েরেট  ছিলেন তাঁর প্রাক্তন সেক্রেটারি। পুলিশ সন্দেহ করল, ফ্রান্সের শিল্পচুরির চক্রের পিছনে আছেন সমাজের গন্যমান্যরা। 

সন্দেহ ঘুরে গেল পাবলো পিকাসোর দিকে

কারণ পিয়েরেট তার স্বীকারোক্তিতে বলেছেন,  পিকাসো নিজে তাঁর প্যারিসের অ্যাপার্টমেন্টের আলমারির মধ্যে চুরি করা আইবেরিয় স্ট্যাচু রাখতেন। যদিও পরে পিকাসো এবং অ্যাপোলিনেয়ার পুলিশকে বলেছেন, তাঁরা জানতেন না মূর্তিগুলির উৎস কী। কিন্তু স্ট্যাচুর তলায় লেখা ছিলো  PROPERTY OF THE MUSÉE DU LOUVRE। কিন্তু একটাই সমস্যা, পিকাসো বা অ্যপোলিনেয়ার সরাসরি মোনালিসা চুরিতে যুক্ত নন। সার্চ করেও কবি অ্যাপলিনেয়ার ঘর থেকে কিছুই তথ্য পাওয়া গেলো না। কিন্তু দুজনকে নির্দোষও বলতে পারছে না পুলিশ।

সন্দেহের তির এ বার পাবলো পিকাসোর দিকে

প্রমাণ নষ্টের চেষ্টায় পিকাসো

ঘড়ির কাঁটা তখন ৫ সেপ্টেম্বরের (১৯১১) মধ্যরাত ছুঁয়েছে। প্রমাণ নষ্টের জন্য এইটাই সঠিক সময়। তাঁদের দেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে জেনে পিকাসো ও অ্যাপোলিনেয়ারে সিদ্ধান্ত নেন তাঁদের কাছে থাকা কিছু চোরাই মূর্তি প্যারিস জার্নালকে ফেরত দিয়ে দেবেন। সেই মতো, আইবেরিয় স্ট্যাচুগুলি পুরোনো একটি সুটকেসে ভরে নিয়ে পাবলো পিকাসো ও  অ্যাপোলিনেয়ার স্টুডিও থেকে বেরিয়ে পড়লেন। গাড়িতে যাওয়া বিপদ, রাস্তায় রাস্তায় পুলিশ গাড়ি সার্চ করছে। তার চেয়ে পায়ে হাঁটা অনেক নিরাপদ। প্যারিসের মন্টমারতে এলাকার পাহাড়ি ঢাল দিয়ে রাতের আঁধারে এগোতে লাগলেন দু’জনে। সেইন (Seine) নদীর ধারে গ্যাসের বাতি জ্বলছে। নদীপথই ভরসা। নদী পেরিয়ে প্যারিস জার্নালকে পিকাসো ফেরত ফেরত দিলেন আইবেরিয় স্ট্যাচুগুলি।

পরিনত বয়েসে বিশ্ববিখ্যাত চিত্রকর ও ভাস্কর পাবলো পিকাসো 

আদালতের কাঠগোড়ায়  বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসো ও কবি অ্যাপলিনেয়ার

কারণ কবি অ্যাপলিনেয়ার পিকাসোকে গোপনে বলেছিলেন, তাঁর কাছে মোনালিসার ছবিটি রয়েছে। এবং তিনি সেটা বিক্রি করবেন। পিকাসো ছবিটি কিনে নেন। কিন্তু ছবিটি ছিল নকল। তদন্তে সেটা প্রমাণিত হওয়ার পর পুলিশ তাঁদের ছেড়ে দিলেও তাঁদের ওপর ল্যুভরের চোরাই মূর্তি কেনার অভিযোগ আনা হল। অ্যাপোলিনেয়ার স্বীকার করলেন তিনিই পিয়েরেটকে বাড়িতে রেখেছিলেন। চোরাই আর্ট রেখেছেন। তথ্য প্রমাণ মুছতে চেষ্টা করেছেন। কোর্টে কান্নায় ভেঙে পড়ে পিকাসো উন্মত্তের মতো ক্রমাগত বলে গেলেন তিনি নাকি কবি অ্যাপলিনেয়ারকে চেনেন না। বিচারের নামে প্রহসন হল। বিচারক হেনরি ড্রায়ক্স মামলা খারিজ করে দিলেন। মোনালিসা চুরির দায় থেকে মুক্ত হলেন দুই বরেণ্য শিল্পী ও কবি।

পাওয়া গেল মোনালিসার  খোঁজ

মোনালিসা চুরি করেছিলেন এই ভিনসেনজো পেরুগিয়া

যখন সবাই প্রায় বিশ্বাস করে ফেলেছিলেন, যে, মোনালিসা চিরকালের জন্য হারিয়ে গেছে। তখনই পাওয়া গেল  খোঁজ। ১৯১৩ সালের নভেম্বর মাসে, ইতালিয়ান আর্ট ডিলার আলফ্রোডা গেরি গোপন সূত্রে মোনালিসা কেনার একটি প্রস্তাব পেলেন। তিনি তাঁর বন্ধু, ইতালির ‘উফিজি’ গ্যালারির কিউরেটর জিওভানি পোগিকে কথাটা বললেন। দু’জনে মিলে প্যারিসের সেই সোর্সের সাথে যোগাযোগ করলেন। সোর্স এক ইতালিয়। নাম ভিনসেনজো পেরুগিয়া। তিনিও একজন চিত্রশিল্পী। একদিন ভিনসেনজো, দু’জনকে তাঁর বাড়িতে ডেকে খাটের নিচ থেকে মোনালিসার মূল ছবিটি বের করে দেখালেন। ৫ লাখ লিরা পেলে মোনালিসাকে বিক্রি করবেন বলে জানালেন।

মোনালিসা চুরির ঘটনাটি শিল্পীর তুলিতে

খবর গেল ল্যুভরে

ভিনসেনজোর কাছে আসল মোনালিসাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই ফ্রান্সের ল্যুভর মিউজিয়াম কতৃপক্ষকে জানালেন আর্ট ডিলার গেরি। সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই মোনালিসা সমেত ধরা পড়ে গেলেন ভিনসেনজো। জানা গেল, ভিনসেনজো ল্যুভর মিউজিয়ামেরই কর্মচারী ছিলেন। ১৯১১ সালের ২০ শে আগস্ট, কাজের শেষে, তিনি মিউজিয়ামের ভেতর ঝাড়ু রাখার আলমারিতে লুকিয়ে পড়েন। এবং ২১ আগস্ট ভোরবেলা মোনালিসাকে তাঁর কোটের নীচে লুকিয়ে বের হয়ে যান।

খুঁজে পাওয়া গেল মোনালিসাকে, কয়েক সপ্তাহের জন্য রাখা হলো ইতালির উফিজি গ্যালারিতে

আদালতে ভিনসেনজো বললেন, যেহেতু ভিঞ্চি ইতালীয় নাগরিক ছিলেন, তাই মোনালিসা ইতালির সম্পত্তি। ভিনসেনজোর স্বপ্ন ছিলো ইতালির সম্পত্তিকে ইতালিতে পাঠানো। ইতালিতে মামলা চলতে থাকে। বিচারে এক বছরের জেল হয় ভিনসেনজোর। উফিজি গ্যালারিতে দুই সপ্তাহ প্রদর্শিত হওয়ার পর ১৯১৩ সালেই ফ্রান্সে ফিরিয়ে আনা হয় মোনালিসাকে। ইতালিতে ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে আখ্যা পান, মোনালিসা চুরির আসল নায়ক ভিনসেনজো পেরুগিয়া

আরও পড়ুন: মৃত্যু ঘোষণা হওয়ার ছ’দিন পরেও বেঁচে ছিলেন আলেকজান্ডার!

Shares

Comments are closed.