চেনা হিরোর অজানা বীরত্ব: মুম্বই দাঙ্গায় পথে নেমে এক পরিবারকে বাঁচিয়েছিলেন সুনীল গাওস্কর

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রূপাঞ্জন গোস্বামী

৬ ডিসেম্বর, ১৯৯২ সাল। অযোধ্যায় ধূলিসাৎ হয়েছিল বাবরি মসজিদ। মুম্বই শহরে শুরু হয়েছিল ভয়ঙ্কর দাঙ্গা। নিহত হয়েছিলেন এক হাজারেরও বেশি মানুষ। দাঙ্গার ঢেউ আছড়ে পড়েছিল মুম্বইয়ের অলিতে গলিতে। শহরকে ভেঙে খানখান করে দিয়েছিল এই দাঙ্গা। আলাদা আলাদা সম্প্রদায়ের আলাদা আলাদা বস্তি গড়ে উঠেছিল মুম্বইয়ে।

দাঙ্গার বদলা হিসেবে ১৯৯৩ সালের ১২ মার্চ, মুম্বইয়ে ধারাবাহিক ভাবে ঘটানো হয় ১২টি শক্তিশালী বিস্ফোরণ। নিহত হন ২৫৭ জন নিরীহ মানুষ। আবার গোটা মুম্বই জুড়ে শুরু হয় রক্তাক্ত দাঙ্গা।

মুম্বই বিস্ফোরণের পরের একটি দৃশ্য

বিস্ফোরণের কয়েকদিন পর

বান্দ্রা-ওরলি সি লিঙ্কের পাশে এক হাউসিং কমপ্লেক্স ‘স্পোর্টস ফিল্ড’। ন’তলা বিল্ডিংটিতে থাকেন ১২ জন টেস্ট ক্রিকেটার। তাঁদের মধ্যে ছ’জন ছিলেন ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক। থাকেন বিলিয়ার্ডসের বিশ্ব চাম্পিয়ন, ভারতীয় হকি দলের অধিনায়ক, আন্তর্জাতিক টেনিস ও ব্যাডমিন্টন প্লেয়ারেরা।

গাওস্করদের আবাসন ‘স্পোর্টস ফিল্ড’, সামনে দাঁড়িয়ে অজিত ওয়াদেকর ও বেঙ্গসরকার

ক্রিকেট থেকে তখন প্রায় বছর ছয়েক অবসর নিয়েছেন মানুষটি। তবুও সকালে গিয়েছিলেন মাঠে। ঘাম ঝরিয়ে এসেছেন আপাদমস্তক শৃঙ্খলালাপরায়ণ, শান্ত, ভদ্র মানুষটি। হঠাৎ ‘স্পোর্টস ফিল্ড‘-এর ফ্ল্যাটের বাইরে উন্মত্ত জনতার চিৎকার শুনতে পেলেন। সারা পৃথিবীর মাঠে মাঠে উল্লাসধ্বনি প্রচুর শুনেছেন মানুষটি। কিন্তু এ উল্লাস অন্য ধরণের। রক্তের স্বাদ পাওয়া একগুচ্ছ হায়নার জান্তব চিৎকার যেন। স্লাইডিং জানলার পাল্লা সরালেন গাওস্কর।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে অভিষেক সিরিজে ৭৭৪ রান আর চারটি সেঞ্চুরি করা গাওস্কর। ৩৪ টেস্ট সেঞ্চুরি আর ইনিংস প্রতি পঞ্চাশের বেশি রান করা গাওস্কর। টেস্টে প্রথম ১০০০০ রানের এভারেস্ট ওঠা গাওস্কর। টেকনিক, পারফেকশন, মানসিক দৃঢ়তায় বিশ্বে ক্রিকেটের প্রবাদপুরুষ হয়ে ওঠা সুনীল মনোহর গাওস্কর। যিনি বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, বিশ্ব ক্রিকেটকে শাসন করতে উঠে আসছে ভারত, অসীম শক্তি নিয়ে।

তির বেগে ছুটে আসছে একটা প্রাইভেট গাড়ি

গাওস্করদের ফ্ল্যাটের সামনের রাস্তাটাকে ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে ফেলেছিল কয়েকশো লোক। প্রাইভেট গাড়িটির পিছনে তাড়া করে আসছিল উন্মত্ত জনতা। অনেকের হাতে ছিল খাপ খোলা ছুরি ও তরবারি। গাড়িটিকে লক্ষ্য করে চলছিল ইঁট আর পাথর বৃষ্টি। রক্তপিপাসু জনতা গাওস্করদের ফ্ল্যাটের সামনে গাড়িটিকে থামতে বাধ্য করেছিল। আশেপাশের বিল্ডিংগুলির সমস্ত ফ্ল্যাটের জানলা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল আসন্ন নারকীয় ঘটনাটির আশঙ্কায়।

ইন্টারকমে সচেতন করে দেওয়া হয় গাওস্করদের কমপ্লেক্সের প্রতিটি ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের। ওদিকে গাড়ির ওপর চলছিল অবিরাম ইঁট বৃষ্টি। চুরমার হয়ে যাচ্ছিল জানলার কাঁচ থেকে উইন্ড স্ক্রীন। হঠাৎ গাওস্করের  নজর পড়ল গাড়ির ভেতর। গাড়িতে ছিলেন এক তরুণ দম্পতি ও তাঁদের সন্তান।

দম্পতি কাঁদতে কাঁদতে হাতজোড় করে দাঙ্গাবাজদের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইছিলেন। তাঁদের ছোট শিশুটিও আতঙ্কে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করেছিল। কিন্তু দাঙ্গাবাজদের উল্লাসে তা চাপা পড়ে যাচ্ছিল। ভিড় ক্রমশ বাড়ছিল গাড়িটি ঘিরে। বিল্ডিংয়ে থাকা অনান্য ভারতীয় ক্রিকেটারদের সাহায্য চেয়েছিলেন বিচলিত গাওস্কর। উন্মত্ত জনতা্র মাথায় ঘুরছিল দুটি শব্দ, পেট্রল আর দেশলাই।

দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করেছিলেন গাওস্কর

একা এবং জীবনের মায়া না করে। কয়েকশো জনতা তখন পৈশাচিক আনন্দের অপেক্ষায় অধীর। ক্রুদ্ধ জনতার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সদ্য মাঠ থেকে ফেরা গাওস্কর। তখনও বুঝি দেহের ঘাম শুকায়নি। সারা দেহের রক্ত উঠে এসেছিল মুখে। সারা শরীর কাঁপছিল। গাওস্করের সে রুদ্ররূপ বিশ্ব কোনওদিন দেখেনি। দাঙ্গাবাজরাও মারমুখী হয়ে উঠেছিল। নিশ্চিত শিকার হাত ছাড়া হতে দেবে না তারাও।

সিংহ হৃদয় মানুষটা গাড়িটির গা ঘেঁসে, গাড়ির চারদিকে সিংহের মতোই ঘুরতে শুরু করেছিলেন হায়নাদের চক্রব্যূহে। চিৎকার করে বলেছিলেন, “তোমরা যা করতে চাইছো। তা আমাকে দিয়ে শুরু করতে হবে। আমি জীবিত থাকতে তোমরা ওদের স্পর্শ করতে পারবে না। তোমরা কি মানুষ! হিম্মত থাকে তো আগে আমাকে মারো।”  ক্রিকেটের মাঠে ভারতের বিজয় পতাকা ওড়ানো তারকার ভিন্ন রুপ দেখে সেই প্রথম থমকে গেছিল রক্তের গন্ধ পাওয়া দাঙ্গাবাজেরা।

এগিয়ে এসেছিলেন সহ খেলোয়াড়েরা

ইতিমধ্যে গাওস্করদের বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন, একনাথ সোলকার, যজুবেন্দ্র সিং, প্রমুখ ভারতীয় দলের ক্রিকেটাররা। বেরিয়ে এসেছিলেন বিল্ডিং-এ থাকা অন্য খেলার খেলোয়াড়রাও। কারও হাতে ক্রিকেট ব্যাট, কারও হাতে টেনিস র‍্যাকেট, কারও হাতে হকি স্টিক।

একনাথ সোলকার

একসময় পিছু হঠেছিল জনতা। ভিড় পাতলা হয়ে গিয়েছিল ধীরে ধীরে। গাওস্করের হাত ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন দম্পতি। আতঙ্কে সিঁটিয়ে থাকা শিশুটিকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন গাওস্কর। বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করেছিলেন।  

ঘটনাটি বিল্ডিং-এর বারান্দা থেকে দেখেছিলেন গাওস্করের পুত্র রোহন গাওস্কর। ২০১৬ সালে মুম্বাইয়ের Sports Journalist’s Association গোল্ডেন জুবিলি অনুষ্ঠানে রোহন গাওস্কর ঘটনাটি বলেছিলেন। ঘটনাটি নিয়ে The Week পত্রিকাতে লিখেওছিলেন যজুবেন্দ্র সিং।

courage under fire

কেউ বলবেন একা ক্রুদ্ধ জনতার মুখোমুখি হওয়াটা হঠকারিতা। কিন্তু মানুষের জন্য নিবেদিত সেই হৃদয়ে কবে বাঁধ দেওয়া গেছে, যে হৃদয় মানুষের স্বার্থে পলকেই তেজ ঝরাতেও জানে! গাওস্কর ক্রিকেটারদের অধিকার নিয়ে লড়াই করেছেন। প্লেয়ার অ্যাসোসিয়েশন তৈরি করেছেন।

দুঃস্থ অবসর নেওয়া ক্রিকেটারদের পেনসনের ব্যবস্থা করেছেন বেনিফিট ম্যাচ খেলে টাকা তুলে দিয়ে। মুম্বইয়ের প্রাক্তন টেস্ট ক্রিকেটারদের ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে স্মরণীয় ও সেরা অবদানটি ছিল নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে তিনটি প্রাণ বাঁচিয়ে দেওয়া। যা আমরা আনেকেই জানি না।

হেলমেট ছাড়া অ্যান্ডি রবার্টস, মাইকেল হোল্ডিং, জোয়েল গার্নার, ম্যালকম মার্শাল, রিচার্ড হ্যাডলি, ডেনিস লিলি, জেফ টমসনের খুনে বোলিং-এর মুখোমুখি হয়েছেন পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চির অকুতোভয় মানুষটি। এই ঘটনার মাধ্যমে তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন প্রয়োজনে মাঠের বাইরেও খুনে মেজাজকে প্রতিহত করা যায়। দরকার শুধু অবিচল সংকল্প ও অটুট সাহস।

 আসলে সত্যিকারের চ্যাম্পিয়নরা সব মাঠেই চ্যাম্পিয়ন হন।  ‘courage under fire’ কথাটা সম্ভবত তৈরি হয়েছিল গাওস্করদের মত বিরল মানুষদের জন্যেই।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More