বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪

‘এরিয়া ৫১’ পৃথিবীর সবচেয়ে গোপন স্থান, সন্দেহবাদীরা বলেন নিল আর্মস্ট্রং চাঁদে নয় এখানে নামেন

রূপাঞ্জন গোস্বামী

আমেরিকার নেভাডা স্টেটের দক্ষিণে, লাস ভেগাস থেকে ১৫০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে পাহাড়ঘেরা মরুভূমির মধ্যে ২৯ লক্ষ একর জায়গা জুড়ে আছে Nevada Test and Training Range । পৃথিবীতে আধুনিক মারণাস্ত্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগার। এখানে আমেরিকা নাকি পাঁচশোর বেশি পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। তার মধ্যে একশোর বেশি বিস্ফোরণ হয়েছে মাটির ওপরে। এবং এখানেই অবস্থান করছে পৃথিবীর সবচেয়ে গোপন ও সবচেয়ে রহস্যময় এলাকা এরিয়া-৫১

এরিয়া-৫১ ঘাটির প্রবেশপথ

পৃথিবীর মানুষকে আমেরিকা দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছে, এরিয়া-৫১ হল তার সবচেয়ে সুরক্ষিত সামরিক বিমান ঘাঁটি। ১৯৫৫ সালের আগস্ট মাসে এরিয়া-৫১ থেকে আমেরিকার বিখ্যাত U-2 গুপ্তচর বিমান উড়ান শুরু করেছিল। তারপর থেকে আমেরিকা এখানে A-12 Oxcart, D-21, SR-71 Blackbird , F-117 Nighthawk, Bird of Prey, F-117A এবং Tacit Blue নামের অত্যাধুনিক গুপ্তচর বিমানগুলির পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়ে আসছে।

রাতের অন্ধকারে উজ্বল গ্রুম লেক ও পাপুস লেকের মাঝে এরিয়া-৫১

কিন্তু সত্যিই কি তাই! অস্বাভাবিক মাত্রার সুরক্ষা জন্ম দিচ্ছে সন্দেহের

এরিয়া-৫১ ঘাটির  ওপর দিয়ে কোনও বিমান যাওয়ার অনুমতি নেই। আকাশ পথে নজরদারি চালানোর জন্য, এই বেসের ১৫৫ মাইল উত্তর এবং উত্তর-পূর্ব দিকে, ৯৪০০ ফুট উঁচু “বেলডে” নামের এক পাহাড়ের চূড়ায়, বিশাল একটি ARSR 4 (Air Route Surveillance Radar) রাডার বসানো আছে। আরও একটি স্বয়ংক্রিয় রাডার বসানো আছে, গ্রুম লেকের উওর দিকে থাকা আর একটি পাহাড়ের চূড়ায়। মাটি থেকে প্রায় ৪৩০০ ফুট উপরে।

এরিয়া-৫১ এর চারপাশে কোন প্রাচীর বা বেড়া নেই। কিন্তু এলাকাটি সর্বাধুনিক প্রযুক্তির নিরাপত্তা ব্যবস্থা দিয়ে ঘেরা। সবার অলক্ষ্যে কাজ করে, Mobile CC Camera, Motion detector, Laser detector, Sound detector, এমনকি সর্বাধুনিক Smell detector ড্রোন সহ আরও কতশত অত্যাধুনিক গ্যাজেট।

সদা সতর্ক ক্যামো ডুড ( ১০ কিলোমিটার দূর থেকে তোলা ছবি )

এরিয়া-৫১ এর কাছে যাওয়ার উপায় নেই। ঘাতক M16 হাতে নিয়ে পাহারা দিচ্ছে হাজার হাজার ক্যামো ডুড। বারণ সত্ত্বেও এরিয়া-৫১ এর কাছে কেউ আসার চেষ্টা করলে সরাসরি গুলি করে মেরে ফেলার অনুমতি দেওয়া আছে তাদের।

তাই অতি উৎসাহীদের সাবধান করতে, এরিয়া-৫১ এর চারধারে লাগানো আছে নোটিশ। সেখানে লেখা আছে Use of deadly force Authorized। যার মর্মার্থ হচ্ছে, বারণ সত্ত্বেও ভেতরে ঢুকতে গেলে নিশ্চিত মৃত্যু।

আমেরিকার সবচেয়ে সুরক্ষিত কিছু জায়গা যেমন পেন্টাগন, হোয়াইট হাউস, নাসার সদর দপ্তর ও বিভিন্ন লঞ্চ প্যাডে অনুমতি নিয়ে সাধারণ মানুষ ঢুকতে পারলেও এরিয়া-৫১ এর ত্রিসীমানায় মিডিয়া ও জনসাধারণের প্রবেশাধিকার নেই।

চারিদিকে ঝোলানো আছে সতর্কবাণী

তাহলে কী হয় এরিয়া-৫১ এর ভেতর!

এরিয়া ৫১ কি সত্যিই মিলিটারি বেস? নাকি অন্য কিছু, সেই রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য দশকের পর দশক ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছেন কৌতূহলী সাধারণ মানুষ, সাংবাদিক থেকে শুরু করে বিভিন্নদেশের গুপ্তচরেরা। কিন্তু এর দূর্ভেদ্য নিরাপত্তা ভাঙা আজও সম্ভব হয়নি। এরিয়া-৫১ ঘাটির আসল কাজ কি সেটা জানতে চাওয়া হয়েছে অসংখ্যবার। কিন্তু আমেরিকার সরকারের কাছ থেকে উত্তর পাননি প্রশ্নকর্তারা।

পৃথিবীতে অনেক সন্দেহবাতিক মানুষ আছেন, যাঁরা বিভিন্ন ঘটনার পিছনে নানা ‘ষড়যন্ত্র-তত্ত্বে’ বিশ্বাস করে থাকেন। তাঁদের ধারণা, যে ভাবে অনেক ভাইরাল ঘটনার কথা লোকে জানেন, আসলে ঘটনাটি সেভাবে ঘটেনি, এর পেছনে অন্য কিছু আছে। নিজেদের বক্তব্যের স্বপক্ষে নানা তথ্য-প্রমাণও হাজির করেন তাঁরা। এদের বলা হয় conspiracy theorist

এই সব ষড়যন্ত্র-তত্ত্বে’ বিশ্বাসীরা বিশ্বাস করেন, এরিয়া-৫১ ঘাটিতে আমেরিকা এমন কিছু গোপন বিষয় নিয়ে গবেষণা করে যা পৃথিবীকে জানাতে চায় না তারা। এই মতবাদে বিশ্বাসকারীদের কিছু মতবাদ এখানে দেওয়া হল।

এখানে ভিনগ্রহের প্রাণীরা থাকে ও আসা যাওয়া করে

● এরিয়া-৫১ ঘাটিতে একদা কর্মরত ও পরে বরখাস্ত পদার্থ বিজ্ঞানী বব লেজার, এখানে এমনকিছু আকাশযান দেখতে পেয়েছিলেন, যেগুলিকে কোনোভাবেই পৃথিবীতে তৈরি করা সম্ভব নয় বলে দাবি করেছিলেন তিনি। এরিয়া-৫১ ঘাটির পাশের হাইওয়ের নাম The Extraterrestrial Highway

এই রাস্তা থেকে মাঝে মাঝেই নাকি অদ্ভুত আকাশযান দেখতে পাওয়া যায় এরিয়া-৫১ ঘাটির আকাশে। পৃথিবীর কোন আকাশযানের সাথে সেগুলির কোনও মিল নেই। লেজার বলেছিলেন, আমেরিকা রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সাহায্য নিয়ে এরিয়া-৫১ ঘাটিতে এলিয়েনদের মত মহাকাশযান বানিয়ে রাখছে। ষড়যন্ত্র-তত্ত্বে’ বিশ্বাসীরা বিশ্বাস করেন, ভিনগ্রহের বাসিন্দারা পৃথিবীতে নিয়মিত আসা যাওয়া করে। তাদের আস্তানা ও আকাশযান নামানোর জায়গা হল এই এরিয়া-৫১।

● লাজার আরও বলেছিলেন এরিয়া-৫১ ঘাটিতে এমন কিছু মৌলিক পদার্থ নিয়ে গবেষণা করা হয় যা আবিষ্কারের কথা আমেরিকা বিশ্বকে জানায়নি। লাজারের মতে সুপারনোভা বা বাইনারি স্টার সিস্টেম থেকে আমেরিকা সম্ভবত এমন একটি মৌলিক পদার্থ সংগ্রহ করতে পেরেছে, যে পদার্থের মাত্র এক কেজি দিয়ে ১০ মেগাটনের ৪৭টি হাইড্রোজেন বোমা বানানো যাবে।

● এরিয়া-৫১ নিয়ে আরেকটি বোমা ফাটান এই বিজ্ঞানীই। তিনি এক টিভি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন এই এরিয়া-৫১ ঘাটির ভেতরে ভিনগ্রহবাসীদের ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটি আকাশযান আছে। দুর্ঘটনায় মৃত এক এলিয়েনের শরীর ব্যবচ্ছেদ করে নাকি জানা গেছে ঐ প্রাণীটি এসেছে রেটিকুলাম-৪ নামের এক জ্যোতিষ্ক থেকে। উচ্চতায় প্রাণীটি সাড়ে তিন ফুট, রোমহীন শীর্ণ শরীর, কালো বড় বড় চোখ।

The Extraterrestrial Highway, এখান থেকেই নাকি দেখা যায় ভিনগ্রহবাসীদের আকাশযান

অনান্য মতবাদ

● আমেরিকা এখান থেকে ওয়ান ওয়ার্ল্ড ওয়ান গভর্নমেন্ট পরিচালনা করার ষড়যন্ত্র করছে। এমন একদিন আসবে সেদিন পৃথিবী একটা দেশ হবে। আমেরিকার সরকার হবে সারা পৃথিবীর সরকার।

.● এরিয়া-৫১ এর মাটির নীচে ৪০ তলা বাঙ্কার বানিয়েছে আমেরিকা, এছাড়াও এখান থেকে বিভিন্ন মহাদেশে চলে গেছে সুড়ঙ্গ। যার ভেতরে পাতা হচ্ছে রেল লাইন।

● মুহূর্তের মধ্যেই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যেতে পারা বা টেলিপোর্টেশন বিষয়টি নিয়ে আমেরিকার গবেষণা চুড়ান্ত জায়গায় পৌঁছে গেছে। এবং সেই গবেষণা হচ্ছে এখানেই। রাশিয়া আর চিনের হাতে যাতে না চলে যায়, তাই এত গোপনীয়তা।

‘ষড়যন্ত্র-তত্ত্বে’ বিশ্বাসীদের মতে নিল আর্মস্ট্রং আদৌ চাঁদে নামেননি, নেমেছিলেন এরিয়া-৫১ ঘাটিতে

এই চাঞ্চল্যকর ধারণাটির প্রবক্তা ‘ষড়যন্ত্র-তত্ত্বে’ বিশ্বাসী লেখক বিল কেসিং। ১৯৭৪ সালে, তিনি তাঁর We Never Went to the Moon: America’s Thirty Billion Dollar Swindle বইটিতে বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন আমেরিকার কোনও মহাকাশচারী আদৌ চাঁদে নামেননি। রাশিয়ার চাঁদে নামার স্বপ্ন ধূলিস্যাৎ করতে এটা ছিল পুরোটাই আমেরিকা সরকার ও নাসার সম্মিলিত ধাপ্পাবাজি।

বিল কেসিং-এর সেই দুনিয়া কাঁপানো বই

‘ষড়যন্ত্র-তত্ত্বে’ বিশ্বাসীদের মতে ষাটের দশকের শেষের দিকে নাসার বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন যে, তীব্র মহাজাগতিক তেজস্ক্রিয়তার জন্য চাঁদের বুকে পা ফেলা কোনও মানুষ পৃথিবীতে বেঁচে ফিরতে পারবেন না। সম্মানহানির ভয়ে নাসা আশ্রয় নিয়েছিল বিজ্ঞানের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জালিয়াতির।

বিল কেসিং

১৬ জুলাই ১৯৬৯, কেপ কেনেডি লঞ্চ স্টেশন থেকে চাঁদের পথে রওনা হয়েছিল নাসার অ্যাপেলো-১১ মহাকাশযান। ষড়যন্ত্র-তত্ত্বে’ বিশ্বাসীদের মতে, অ্যাপোলো-১১ উপস্থিত মানুষজনের চোখের বাইরে চলে যাওয়ার পর, একটি মিলিটারি এয়ারক্রাফটে করে অতি গোপনে নিল আর্মস্ট্রংদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো এরিয়া-৫১ এলাকায়।

সেখানে আগে থেকেই প্রস্তুত করা ছিল চাঁদের মাটি ও পরিবেশ। কারণ, অভিযানের আগে, চন্দ্রাভিযান সম্বন্ধীয় যন্ত্রপাতি, যেমন রোভার ও বিভিন্ন জীবনদায়ী যন্ত্রপাতির পরীক্ষানিরীক্ষা এখানেই হয়েছিল।

 

কয়েকদিন ধরে সেখানেই ‘চাঁদের বুকে মানুষের পা’ ভিডিয়োটির শ্যুটিং করা হয়। ক্যামেরার সামনে নিখুঁত অভিনয় করেন নীল আর্মস্ট্রং এবং বাজ অলড্রিন। বিশ্বের মানুষকে নাসা জানায়, ২০ জুলাই চাঁদের মাটিতে পা রেখেছে নিল আর্মস্ট্রং ও বাজ অল্ড্রিনের। প্রমাণ হিসেবে এরিয়া-৫১ ঘাটিতে তোলা সেই ভিডিওই বিশ্বজুড়ে প্রচারের ব্যবস্থা করে নাসা।

কিন্তু, ওপরের সবকটি তথ্য মিথ্যে বলে প্রমাণ করতে চেয়েছে আমেরিকা। নাসা বিশ্বকে দেখিয়েছে তাদের অ্যাপোলো মিশনের ৬ টি মহাকাশযান, চাঁদ থেকে প্রায় ৩৮২ কেজি ওজনের  পাথর পৃথিবীতে নিয়ে এসেছিল। অর্থাৎ চাঁদে সত্যিই নেমেছিল নাসার মহাকাশযান।

তবু প্রশ্ন রয়ে গেল একটাই। এমন কী আছে এরিয়া-৫১ এর ভেতরে, যার জন্য বারণ না শোনা মানুষকে বিনা বিচারে সরাসরি ও সঙ্গে সঙ্গে মেরে ফেলার অনুমতি দিয়েছে আমেরিকা?

Comments are closed.