রবিবার, এপ্রিল ২১

বাঙালির কাছে কতটা সুখের ছিল পয়লা বৈশাখ!

রূপাঞ্জন গোস্বামী

পয়লা বৈশাখ ভোর থেকেই দক্ষিণেশ্বর, কালীঘাট, তারাপীঠে মানুষের ঢল নামে। নতুন পোষাক পরে লাল খেরোর খাতা মায়ের পায়ে ছুঁইয়ে, প্রসাদী ফুল নিয়ে বাড়ি আসা। দোকান, বাড়িতে চলে মা লক্ষী ও সিদ্ধিদাতা গণেশের পুজা। পুরোহিতদের দম ফেলার সময় থাকে না। দোকান, বাড়ি, ফ্ল্যাট, গাড়ি থেকে শুরু করে নতুন বাইক পর্যন্ত পুজো করতে ছুটতে হয়। দোকানে দোকানে হয় ‘হালখাতা’। সারা বছরের বাকি মিটিয়ে, নতুন বছরের জন্য কিছু টাকা জমা করে, সপরিবারে মিষ্টির প্যাকেট আর বাংলা ক্যালেন্ডার নিয়ে আসা চাইই চাই।

কাকভোরে উঠে আত্মীয় পরিজনকে আমরা মেসেজ পাঠাই শুভ পয়লা বৈশাখ। কিন্তু পয়লা বৈশাখ কি সত্যিই গ্রাম বাংলায় শুভ দিনের চিঠি নিয়ে এসেছিল! সম্ভবত নয়। বরং অনেক মানুষের চোখের জলে ভেসে যেত পয়লা বৈশাখ। তাই  পয়লা বৈশাখ কারও ছিল চরম দুঃখের দিন, কারও কাছে আবার চরম আনন্দের দিন।

যে ভাবে এসেছিল অশ্রুসিক্ত পহেলা বৈশাখ

মুঘল আমলে ভারতবর্ষে হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে খাজনা আদায় করা হত। হিজরি সন ছিল চাঁদের উপর নির্ভরশীল। ফলে ভারতের কৃষিজ ফসল উৎপাদনের সঙ্গে হিজরি পঞ্জিকা মিলত না। অসময়ে খাজনা দিতে হত চাষিদের। পুরো খাজনা উসুল হত না। তাই  সম্রাট আকবর তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহ উল্লাহ সিরাজিকে সমস্যা সমাধান করতে বলেন।

হিন্দুদের  সৌর পঞ্জিকা ও ফারসি বর্ষপঞ্জিকা তারিখ-ই-ইলাহি মিশিয়ে ফতেহ উল্লাহ সিরাজি  বানান ফসলি সন পরে এই ফসলি সন পরিচিত হয় বাংলা-বর্ষ নামে। কিন্তু, আকবরই বঙ্গাব্দ চালু করেছেন, এই কথাটি সঠিক নয়। হিন্দু সৌর পঞ্জিকা অনুসারে, ১২টি বাংলা মাস বহু শতাব্দী আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। এই বাংলায়  শশাঙ্কের সময় থেকে বঙ্গাব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়। যে বঙ্গাব্দ সংস্কৃত ভাষায় লেখা জোতির্বিদ্যার আকর গ্রন্থ সূর্য সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে তৈরী করা হয়েছিল।

ভারতে বর্ষপঞ্জিকা সৃষ্টির তিনটি যুগ দেখতে পাওয়া যায়। বৈদিক যুগ ( প্রাচীনকাল থেকে ১৩৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত) বেদান্ত-জ্যোতিষ যুগ (১৩৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৪০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত) সিদ্ধান্ত-জ্যোতিষ যুগ (৪০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে আধুনিককাল পর্যন্ত)। আর সম্রাট আকবরের শাসন করেছেন ১৫৪২ থেকে ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দ। তাই তিনি বাংলাবর্ষের আবিষ্কর্তা এটা কষ্টকল্পিত।

ফতেহ উল্লাহ সিরাজি

স্রেফ খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য, তারিখ-ই-ইলাহি বাদ দিয়ে নক্ষত্রের নামানুসারে লিখিত বঙ্গাব্দ নতুনভাবে উপস্থাপিত করা হয়েছিল। চৈত্র সংক্রান্তির পরের দিন পহেলা বৈশাখ। উর্দু শব্দ পহেলা শব্দের আভিধানিক অর্থ প্রথম এবং বাংলা নববর্ষের প্রথম মাস বৈশাখ। ধর্ম ও শাস্ত্রগত দিক থেকে পয়লা বৈশাখ দিনটির ন্যূনতম মাহাত্ম্যও কোনওদিন ছিল না।

পয়লা বৈশাখ যে একটি শুভদিন এ কথা শাস্ত্র বা বাংলা পঞ্জিকা কস্মিনকালেও দাবি করেনি। বছরের আর পাঁচটা দিনের মত এটি ছিল সাধারণ একটি দিন। তবে, এই দিনে সবচেয়ে আনন্দে থাকতেন বাংলার শাসক ও জমিদারেরা। তাঁদের কাছেই একমাত্র দিনটি শুভ ছিল।

পয়লা বৈশাখ ছিল জমিদারদের খাজনা উসুল উদযাপনের দিন

বাংলা বছরের প্রথম দিন অর্থাৎ বৈশাখ মাসের ১ তারিখে  রাজ পুণ্যাহ (রাজকর আদায়ের উৎসব) পালন করা হত। সেই সময়ে পুণ্যাহ আর বাংলা নববর্ষ সমার্থক ছিল। জমিদার ও  ভূস্বামীরা তাঁদের রায়ত বা প্রজাদের নিয়ে পুণ্যাহ  পালন করতেন। ফেলে আসা বছরের বকেয়া খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য হতেন প্রজারা। এবং জমিদারের কাছারি থেকে নতুন বছরের বন্দোবস্ত গ্রহণ করতেন। জমিদার অথবা নায়েবরা প্রজাদের হাতে তুলে দিতেন পান।

প্রজাদের অর্থশোক ভোলাতে চোখের জলে ভেজা পুণ্যাহ-এর মধ্যে সুচতুর ভাবে উৎসবের রঙ মেশানো হয়েছিল।মিষ্টিমুখের সঙ্গে সঙ্গে গান বাজনা, যাত্রা, মেলা প্রভৃতি বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হত প্রজাদের জন্য। প্রজাদেরই পয়সায়।

 ১৯৫০ সালে ইস্ট বেঙ্গল স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যাক্ট-এর অধীনে জমিদারি প্রথার বিলোপ ঘটে। সেই সঙ্গেই বন্ধ হয়ে যায় পয়লা বৈশাখের রাজ পুণ্যাহ প্রথা। রয়ে যায় খাওয়া দাওয়া আর উৎসবের অংশটুকু। সে যুগের রাজ পুণ্যাহ বর্তমানের ‘হালখাতা’ বা ‘গদিসাইত’ হিসেবে আজও বাঙালির জীবনে রয়ে গেছে।

বাকি রাখা খাজনা,মোটে ভালো কাজ না

যাঁরা খাজনা মেটাতে পারতেন না, তাঁদের ঘাড়ে চাপত সুদের বোঝা। অনেক ক্ষেত্রে জমি বন্ধক রেখে খাজনা মেটাতে হত। অনেকে সুদের ফাঁদে ফেঁসে, নামমাত্র মূল্যে জমিদারকে জমি দিয়ে দিতে বাধ্য হতেন। তাই পয়লা বৈশাখ বাংলার অনেক গ্রামে কান্নার রোল তুলত। গ্রামের হতদরিদ্র মহিলারা ভাবতেন, জমিদারের কাছারিবাড়ি থেকে বাড়ির মানুষটা ফিরবেন তো?

গুমঘর

বাংলার জমিদারদের খাজনা আদায়ের ধরণ বাংলা সাহিত্য আমাদের জানিয়েছে। যে সব প্রজা খাজনা দিতে পারতেন না,  বাংলার জমিদাররা পয়লা বৈশাখ সেই সব প্রজাদের মিষ্টি খাওয়াতেন বলে মনে হয়? তাহলে জমিদারেরা লেঠেল পুষতেন কেন? গুমঘরেরই বা কী প্রয়োজন ছিল?

ইতিহাস কটা জমিদার বাড়ির গুমঘরে পয়লা বৈশাখ-এ উঁকি মেরেছে?  ইতিহাস কটা বাড়িতে খোঁজ নিয়েছে, পয়লা বৈশাখে চুলা জ্বলেছে কিনা ? পয়লা বৈশাখে পান্তা ভাত খাওয়ার রেওয়াজ, ঘরে চাল না থাকার কারণে নয়তো? প্রশ্ন অনেক, তবুও নিরুত্তর, আজকের শুভ পয়লা বৈশাখ

Shares

Comments are closed.