বই-সফর! ট্রেনের ভিতরেই আস্ত লাইব্রেরি! থরে থরে বই নিয়ে ছোটে দক্ষিণ কোরিয়ার ‘বই-ট্রেন’

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    চৈতালী চক্রবর্তী

    ট্রেন সফরে বই পড়ার বাতিক অনেকেরই রয়েছে। ছুটন্ত ট্রেনের জানলা দিয়ে দু’চোখ ভরে বাইরে গাছপালা, প্রাকৃতিক শোভার মায়াময় আরামের সঙ্গে যদি দোসর হয় জমাটি গোয়েন্দা কাহিনি, তাহলে সফরের মজা হয় দ্বিগুণ।

    কাছেপিঠে হোক বা দূর সফরে— চশমা এঁটে গম্ভীর মুখে খবরের কাগজ পড়ার চেয়েও বেশি লোভনীয় সাহিত্য-উপন্যাস, কবিতা বা হাল ফ্যাশনের ম্যাগাজিন। বইয়ের গন্ধে যে কোনও জার্নিই যে বেশ মাখোমাখো হয়, সেটা বই-প্রেমীরা বিলক্ষণ জানেন। ধরুন যদি এই সব বই ব্যাগে বয়ে লাগেজের ভার বাড়াতে না হয়, হাতেনাতেই টাটকা বই পেয়ে যান ট্রেনে বসেই। কী করে ভাবছেন তো? না ফেরিওয়ালা নয়, এমন বই-ট্রেন রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়াতে। ট্রেনের ভিতরেই দিব্যি গড়ে উঠেছে আস্ত একটা লাইব্রেরি।

    বই নিয়েই ফি দিন ছুটে চলেছে এই ট্রেন। বই পড়ার জন্য এক পয়সাও বাড়তি দিতে হয় না যাত্রীদের। শুধু ট্রেনের টিকিট কাটলেই হয়। তারপর যতক্ষণ না গন্তব্যে পৌঁছচ্ছে, একের পর এক পছন্দের বই উল্টে পাল্টে দেখে নিলেই হলো। প্রতি কামরাতেই সিটের পাশে সাঁটানো রয়েছে বইয়ের র‍্যাক। তাতে থরে থরে সাজানো হরেক রকমের বই। নাম যাই হোক, স্থানীয়দের কাছে এই ট্রেনের নাম বই-ট্রেন।

    দক্ষিণ কোরিয়ায় জিয়েওনগুই ট্র্যাকে এই বই-ট্রেনের নির্দিষ্ট একটা সময় রয়েছে। পাজুর সিওল এবং দোরাসান স্টেশনের মাঝ বরাবর জিয়েওনগুই লাইন ধরে এই ট্রেন ছুটে চলে মুনসান থেকে পাজু, প্রায় ১২৪ কিলোমিটার। সেখান থেকে ইয়াংপেয়ঙের ইয়ংমান স্টেশন ছুঁয়ে ট্রেন পাড়ি দেয় জিয়েনওগ্গিতে।

    পাঁচশোরও বেশি বই রয়েছে ট্রেনে। বই-প্রেমীদের কথা ভেবে ইদানীংকালে বইয়ের সংখ্যা আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন রেল কর্তৃপক্ষ। প্রতি কামরায় ছোট ছোট বুক-শেল্ফ তৈরি হয়েছে যাত্রী-আসনের ঠিক পাশ ঘেঁষেই। হাত বাড়ালেই মিলবে বই।  সাহিত্য-বিজ্ঞান-উপন্যাস-জীবনী থেকে গোয়েন্দা গল্প, কী নেই সেখানে। যাত্রা যদি ছোট হয়, তাহলে সময় কাটাতে ম্যাগাজিন, আর সফর যদি একটু লম্বা হয় তাহলে জমজমাট উপন্যাস বা গোয়েন্দা কাহিনী তো রয়েছেই। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ট্রেনে কাঁচের ভিতর দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে না পাওয়ার নিদারুণ বেদনাটা ভালো ভাবেই পুষিয়ে নেওয়া যাবে বই পড়ে।

    র‍্যাকে সাজানো হরেক রকম বই। ইচ্ছামতো তুলে নিয়ে পড়তে পারেন যাত্রীরা।

    হাতে গরম বাঁধানো বই তো রয়েছেই, তা ছাড়া ই-বুকের সুবিধাও রয়েছে এই বই-ট্রেনে। হালফিলের কেতাদুরস্ত তরুণ-তরুণীরা যারা মোবাইলেই অবসর বিনোদন পছন্দ করেন, তাঁদের জোর করে হাতে বই ধরানোর বদলে এই ই-বুকের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে ট্রেনে। তার জন্য চারটে ইলেকট্রনিক ডিভাইস রাখা হয়েছে ট্রেনে। মেশিনেই ঠাঁসা রয়েছে দেশ-বিদেশের নতুন নতুন বিষয়ের ই-বুক।

    ট্রেনের ভিতরে ইলেকট্রনিক ডিভাইসে ই-বুক পড়তে ব্যস্ত যাত্রী

    ‘‘এই ট্রেনে সফর করলে আমরা ক্লান্ত হই না। মোবাইল ঘেঁটে অনলাইনে বই পড়ার প্রয়োজন হয় না। ব্যাগে বই বা ম্যাগাজিন বয়েও আনতে হয় না। যাওয়া-আসার পথে দিব্যি ট্রেনের বুক-শেল্ফ থেকে বই বেছে নিলেই হলো। পড়তে পড়তেই য়াত্রীর আনন্দ অনেকটাই বেড়ে যায়,’’ বলেছেন এক যাত্রী। ট্রেনে উঠেই বই-র‍্যাকের দিকে জুলজুল করে তাকিয়ে থাকাটা অভ্যাস হয়ে গেছে এক বর্ষীয়ান যাত্রীর। এই ট্রেনে চেপেই কাজের জায়গায় যেতে হয় তাঁকে। ‘‘দেশি-বিদেশি সাহিত্যিকের এত রকম বই, আমি রোজ যাতায়াতের সময় দেখি। একটা, দু’টো পড়ি। বাকিগুলো উল্টেপাল্টে দেখি। অনেক দুর্লভ বই হাতে নিয়ে দেখতেও স্বর্গীয় আনন্দ হয়,’’ যাত্রীর দু’চোখে আনন্দের ঝিলিক।


    বই পড়ায় ব্যস্ত যাত্রীরা

    রেল কর্তৃপক্ষের কথায়, চলতি বছর জানুয়ারিতে যাত্রা শুরু করেছে এই বই ট্রেন। ঝাঁ চকচকে ট্রেনের পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে বাড়তি কিছু বলার দরকার নেই। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় সব ট্রেনই লুকে এবং স্যানিটেশনে সেরা। বই-ট্রেনের দরজাতেও বইয়ের কভারের রঙ-বেরঙের ছবি। রেল আধিকারিকদের কথায়, যাত্রী-টানতে এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ বাড়াতেই এই অভিনব ভাবনা। বই-ই ভবিষ্যৎ, বই-ই বিশ্বকে সন্ত্রাস ভুলিয়ে এক ছাদের তলায় আনবে। সেখানে বিভেদের কালো ছায়া প্রবেশ করতে ভয় পাবে।

    লাইব্রেরি বুকে নিয়ে ছুটে চলেছে ট্রেন

    সপ্তাহে দু’টো নির্দিষ্ট সময়ে এই বই-ট্রেন যাত্রা করে মুনসান স্টেশন থেকে ইয়ংমান স্টেশনের দিকে। স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৬টায় এবং দুপুর সাড়ে ১২টায়। সপ্তাহান্তে স্থানীয় সময় সকাল ৬টা ২৬, দুপুর সাড়ে ১২টা এবং সন্ধ্যা ৬টা ১৭ মিনিটে।

    ফিরতি পথে ইয়ংমান থেকে মুনসানে বই-ট্রেনের সময় সকাল ৯টা ৪১, বেলা সাড়ে ৩টে এবং সন্ধ্যা ৮টা ২৪ মিনিটে। সপ্তাহান্তে কেবলমাত্র সকাল সাড়ে ৯টা ও বেলা সাড়ে ৩টে। দেওক্সো থেকে শেষ ট্রেন ছাড়ে সন্ধ্যা ৮টা ২১ মিনিটে।

    প্রতি মাসে হই হই করে ‘বুক-কনসার্ট’-এর আয়োজনও করেন রেল কর্তৃপক্ষ। ট্রেনের ভিতরেই বসে আলোচনার আসর। নতুন লেখকদের সঙ্গে সেখানে বইয়ের নানা বিষয়ে নিয়ে আলোচনা করতে পারেন যাত্রীরা। জানাতে পারেন নিজেদের মতামতও।

    ২০১৮ সালে মহারাষ্ট্রে চালু বই-ট্রেন।   

    দক্ষিণ কোরিয়ার মতো ট্রেনের ভিতরে আস্ত লাইব্রেরি না থাকলেও, আমাদের মহারাষ্ট্রে গত বছর এমনই বই-ট্রেন চালু করেছে ভারতীয় রেল। রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী বিনোদ তাওড়ের হস্তক্ষেপে ‘ডেকান কুইন’ ও  ‘পঞ্চবটী এক্সপ্রেস’-এ সফরকালে বিনামূল্যে বই পড়তে পারেন যাত্রীরা। তার জন্য নানা রকম বইয়ে ঠেলা সাজিয়ে ট্রেনে উঠে পড়েন রেলের বই-ফেরিওয়ালারা। যাত্রীদের কাছে কাছে ঘুরে হাঁক পাড়েন। যে যেমন খুশি বই তুলে নিয়ে পড়তে পারেন। শর্ত শুধু একটাই, ট্রেন থেকে নামার আগে অক্ষত অবস্থায়, যত্ন-সহকারে বই ফেরত দিতে হবে।

    যাত্রীদের কাছে বই পৌঁছে দিচ্ছেন বই-ফেরিওয়ালারা

    মুম্বই-পুণে এবং মুম্বই ও মানমাড়ের মধ্যে এই দুই ট্রেনে এমন বই পড়ার সুযোগ রয়েছে। মাসের টিকিট কাটেন যাঁরা তাঁরা তো বটেই, এমনকি এক পয়সাও বাড়তি খরচ না করে নিত্যযাত্রীরা এই বই পড়ার সুযোগ পান। ভারতীয় রেল জানিয়েছে, ট্রেনের ভিতরে দেশ-বিদেশের বইয়ের যোগান দেয় মারাঠি বিকাশ সংস্থা। মারাঠি ভাষা তো বটেই, সব ভাষাতেই বই মেলে এই দুই ট্রেনে। গত বছর ১৫ অক্টোবর প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালামের জন্মবার্ষিকীতে রাজ্য সরকার ‘রিডিং ইন্সপিরেশন ডে’ সেলিব্রেট করে। ওই দিন থেকেই মহারাষ্ট্রে শুরু হয় বই-সফর।

    আরও পড়ুন:

    আগে হত স্ট্রবেরি চাষ, এখন শুধুই বইয়ের বাস, মহারাষ্ট্রের এই হিল স্টেশনের নাম এখন ‘বই-গ্রাম’

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More