মঙ্গলবার, জুন ২৫

ইন্টারনেটে লুকিয়ে থাকা ভয়ংকর বিপদ্গুলোকে চিনে নিন

দ্য ওয়াল ব্যুরো:  ইন্টারনেট প্যাক শেষ হলে বা ওয়াইফাই না থাকলে চোখে অন্ধকার দেখেন? ভাবেন কী করে নেট ব্যাংকিং করবেন। ট্রেনের বা প্লেনের টিকিট কাটবেন। ইলেকট্রিক বিল, ফোন রিচার্জ করবেন। ছেলেমেয়ের স্কুলের মাইনে জমা দেবেন বা অনলাইন শপিং করবেন। লাইনে দাঁড়াতে হবে ভাবলেই গায়ে জ্বর আসে আপনার!
তাহলে আপনি কিন্তু ইন্টারনেটে, হ্যাকারদের রাডারের আওতায় আছেন।

অনলাইন প্রতারণার খবর পড়তে এবং শুনতে আপনার কান ঝালাপালা হয়ে গেছে জানি। আপনি ভাবছেন প্রতারণা আমার সঙ্গে তো হয়নি। এবং হয়নি বলে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। কিন্তু আপনি জানেন না, আপনার সঙ্গেই হয়ত আর কয়েক মিনিট পরেই এমন কিছু ঘটতে পারে, যা আপনার জীবনে অন্ধকার ডেকে আনবে। ইন্টারনেটে কেউ ১০০ শতাংশ নিরাপদ নয়। এবং এটা জেনে হয়তো আতঙ্কিত হবেন, প্রতি মুহূর্তে আপনার অজান্তেই আপনি ইন্টারনেটে হরেক বিপদের সামনে নিজেকে উন্মোচিত করে ফেলছেন বা ফেলেছেন। যা আপনি কল্পনাতেও  আনতে পারছেন না।

তাই বিপদ ঘটার আগেই  জেনে নিন ইন্টারনেটের সবচেয়ে কুখ্যাত বিপদগুলি কী কী

আর্থিক প্রতারণা

নেট ব্যাঙ্কিং, অনলাইন শপিং, রেল, বিমান, সিনেমার টিকিট কেনা,  বিভিন্ন আর্থিক লেনদেন আজ ইন্টারনেটে মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপ থেকে কয়েক মিনিটের মধ্যে করে ফেলছেন সবাই। কিন্তু এর ভয়ানক দিকটি কি আপনি জানেন? এই সমস্ত কেনাকাটা, লেনদেন বা অনলাইন ব্যাংকিং-এ  আপনার ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড ডিটেলস লাগে। যার নাগাল  সহজেই প্রতারক বা  হ্যাকাররা পেতে পারে। হটাৎ একদিন দেখলেন আপনার মোবাইলে মেসেজ এলো আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে বড় অঙ্কের টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। মাথায় হাত দিয়ে একবার পুলিশের সাইবার সিকিউরিটি সেল আরেক বার ব্যাঙ্কে ছুটতে হবে। ফলাফল বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শূন্য।

ফিসিং

আপনার ই-মেল  অ্যাকাউন্টে প্রতি মুহূর্তে কতো মেল ঢুকছে। ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপ, শেয়ার চ্যাটে কতো মেসেজ ঢুকছে। গাড়ি, বাড়ি, ফ্ল্যাট কেনার জন্য সঙ্গে সঙ্গে লোনের ই-মেল। অবিশ্বাস্য রকমের কম টাকায় ব্যাঙ্কক পাটায়ার ই-মেল। সুন্দরী এসকর্ট আপনার হোটেলের ঘরে পাঠিয়ে দেওয়ার ই-মেল। পুরস্কার জেতার মেসেজ। মেলটি আসবে হয়তো দুবাই থেকে। কিন্তু এসকর্টের নামগুলি হবে লিলি, জুলি, প্রিয়াঙ্কা, ভাবনা। মেলগুলি যাঁরা পাঠাবেন তাঁদের ইমেল আইডি মহিলার হবে। কখনো কখনো ব্যক্তিগত আলাপ আলোচনা স্তরেও আপনাকে নিয়ে যেতে চেষ্টা করা হবে। আপনি ভাবলেন ইনি প্রতারক হতে পারেন না। ফোন নাম্বার শেয়ার করবেন। সকাল বিকেল কথা হবে। দিনের পর দিন আপনার সঙ্গে কথা বলে যাবেন এঁরা। বুঝতেই পারবেন না কিভাবে আপনি সম্মোহিতর মতো ব্যাঙ্কের তথ্য জানিয়ে দিয়েছেন। চমক তখনই ভাঙবে, যখন আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট একদিনে সাফাই হয়ে যাবে। মনে আছে আপনি জন্ম সাল দিয়ে এটিএম কার্ডের পাসওয়ার্ড রেখেছিলেন। এটা রাখতে মেয়েটি আপনাকে বারণ করেছিলো। তিনমাসের আলাপ, আপন ভেবে মেয়েটির কথামতো পাসওয়ার্ড চেঞ্জ করে দিয়েছিলেন। তার কথা মতো পাসওয়ার্ড রেখেছিলেন। মেয়েটি পুজোর মধ্যে কলকাতায় আসবে কথা দিয়েছিল। মেয়েটিও আর আসেনি। হোয়াটস অ্যাপে তার ডিপি সাদা হয়ে গেছে। ফেসবুকে তার অ্যাকাউন্ট খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। দুঃসংবাদ, আপনি ফিশিং-এর শিকার হয়েছেন।

পরিচয়পত্র  হাতানো

এটি ইন্টারনেটের সবচেয়ে ভয়ানক বিপদ। ভাবুন একজন প্রতারকের কাছে আপনার সমস্ত ব্যক্তিগত তথ্য চলে গেছে। সে আপনার প্যান কার্ড, ভোটার আইডি, আধার পেয়ে গেছে। আপনি বিভিন্ন জায়গায় পাঠাতে হয় বলে স্ক্যান করে মোবাইলে বা কম্পিউটারে রেখে দিয়েছিলেন। এখন সেটা দিয়ে সে সিম তুলছে। লোন নিচ্ছে। ই-মেল, ফেসবুক অ্যাকাউন্ট করছে আপনার নামে নেওয়া সিম থেকে। প্রতারক যা জালিয়াতি বা প্রতারণা করবে তার দায় কিন্তু আপনার। পুলিশি হ্যাপা আপনাকেই পোহাতে হবে।

হুমকি দেওয়া

ইন্টারনেটের সাহায্যে গায়ে পড়ে ঝগড়া বাঁধিয়ে প্রথমে হুমকি তারপর ব্ল্যাকমেল। ই-মেল, সোস্যাল মিডিয়া, মোবাইল টেক্সট ও চ্যাটের মাধ্যমে আপনি এর জালে পড়ে যেতে পারেন। একদিন হটাৎ দেখলেন আপনার নামে রগরগে গসিপ ছড়িয়ে পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। আপনার অ্যাকাউন্টের ইনবক্সে অশ্লীল মেসেজ আসছে। নয়তো কেউ আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে অশ্লীল ছবি আর ভিডিও পোস্ট করা দিচ্ছে। আপনার ফটোশপ করা নগ্ন ছবি, আপনার সোশ্যাল মিডিয়ার বন্ধুদের পাঠিয়ে দিচ্ছে। এর জন্য আপনাকে ট্রোলড হতে হচ্ছে। আপনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন। আপনাকে ভয় দেখানো চলছে। যারা করছে তাদের দাবি না মেটালে মুক্তি নেই। আপনাকে তারা বলেছে পুলিশকে জানালে ক্ষতি হয়ে যাবে। তাই আপনি জানালেন না। ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়বে।

ব্যক্তিগত সুনামের ক্ষতি

সোশ্যাল মিডিয়া প্রচুর অ্যাকাউন্ট তৈরিই হয় অপরের সুনাম নষ্ট করার জন্য। গালাগাল, ব্যঙ্গবিদ্রুপ করার জন্য। ট্রোল করার জন্য। এতে এরা মজা পায়। কেউ কেউ, নির্দিষ্ট কাউকে টার্গেট করে নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে ছদ্মনামে অ্যাকাউন্টগুলি খোলেন। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক রেষারেষি একটা বড় ফ্যাক্টর। এই জাতীয় স্প্যামাররা আপনার ফ্রেন্ড লিস্টে ভদ্রবেশে ঢোকে। তারপর আসল রূপ ধরে এবং আপনাকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করে। বিভিন্নভাবে আপনাকে রিঅ্যাক্ট করতে বাধ্য করবে। আপনি প্রতিক্রিয়া দেখালে তার স্ক্রিন শট দিয়ে পোস্ট করতে শুরু করবে। আপনার সামাজিক সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দেবে। এই সমস্ত অ্যাকাউন্টের সঙ্গে কথা বাড়ালে আপনার সুনামের ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই হবে না।

কী করবেন তাহলে
পুলিশের সাইবার সিকিউরিটি সেলের সব পরামর্শ অক্ষরে অক্ষরে মানুন। প্রয়োজনে তাঁদের সাহায্য নিন। ইন্টারনেটকে চায়ের দোকান বা মন হালকা করার মাধ্যম ভাববেন না। এই জগতে প্রতি পদক্ষেপে চোরাবালি। তাই অলীক নয়, রক্তমাংসের মানুষদের সঙ্গে মেলামেশা বাড়ান। সোশ্যাল মিডিয়ায় সারাদিন পড়ে থাকা বন্ধ করুন। বুঝে শুনে যাচাই করে বন্ধু করুন। সেই কবে গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের  মহীনের ঘোড়াগুলি গেয়ে উঠেছিল  ‘

“বাড়লে বয়স সবাই মানুষ হয় কি
শুনলে কথা মানুষ চেনা যায় কি
হাত বাড়ালে বন্ধু পাওয়া যায় না
বাড়ালে হাত বন্ধু সবাই হয় না

চেনা সহজ নয়, চিনতে লাগে ভয়
বলি তায়, মানুষ চেনা দায়।”

Comments are closed.