হিটলারের বাহিনীর কাছে ত্রাস ছিল হল্যান্ডের এই গুপ্তঘাতক কিশোরী

আমস্টারডাম শহর ও শহরতলীতে একের পর এক জার্মান অফিসার ও বিশ্বাসঘাতক ডাচদের  নিঃশব্দে হত্যা করে গেছে এই কিশোরী।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

     রূপাঞ্জন গোস্বামী

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। নাৎসি জার্মানির দাপটে ইউরোপ দিশেহারা। লক্ষ লক্ষ মানুষ বেড়াল, কুকুরের মতো স্রেফ মরে যাচ্ছেন রাস্তাঘাটে, কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে। সমাজের বুদ্ধিজীবী শ্রেণীকে রাস্তার চৌমাথায় লটকে দিচ্ছে হিটলারের নৃশংস SS (Schutzstaffe) প্যারা মিলিটারি বাহিনী। হিটলারের এই বাহিনীর ভয়ে তখন ইউরোপের মানুষ লুকিয়ে বেড়াচ্ছে। তখনই  এক মেঘাচ্ছন্ন দিনে, হল্যান্ডের নর্থ হারলেম শহরের রাস্তায় নির্ভয়ে সাইকেল নিয়ে নেমেছিল চোদ্দ বছর বয়সী এক  ফুটফুটে কিশোরী। নাম তার ফ্রেডি ওভারস্টিজেনএক মাথা কালোচুল। শরীরে  যৌবন এসে গেছে। পরনে ফুলফুল স্কার্ট। মাথার চুলে গোলাপী রিবন বাঁধা। দুর থেকে ভেসে আসছে মর্টার আর মেশিনগানের আওয়াজ। কালো ধোঁয়াতে আকাশ ডেকে গেছে। কিন্তু কিশোরীর তা নিয়ে বিন্দুমাত্র ভয় আছে বলে মনে হয় না। রঙিন প্রজাপতি হয়ে মনের আনন্দে প্রায় ফাঁকা রাস্তায় সাইকেলের হরেক কেরামতি  দেখাতে দেখাতে এগিয়ে চলেছে সে। রাস্তার জায়গায় জায়গায় নাকাবন্দী করেছে হিটলারের SS বাহিনী। কিশোরী মেয়েটাকে আমল দেয় না কেউ। তাদের নজর যুবক ও মধ্যবয়স্কদের দিকে।

    নির্দ্বিধায় একটার পর একটা চেক পোস্ট পেরিয়ে যায় ফ্রেডি। নাৎসি সেনাদের অশ্লীল ইঙ্গিতকে পাশ কাটিয়ে কিশোরী ফ্রেডি নির্জন রেল লাইনের পাশের রাস্তায় ঢুকে পড়ে। রাইফেল পিঠে ঝুলিয়ে সাইকেলে করে তাকে অনুসরণ করতে শুরু করে এক মধ্য বয়স্ক  জার্মান SS অফিসার। ফ্রেডির সাইকেল থেকে ঠিক কয়েকশো মিটার দুরত্ব রেখে চলছে লোকটা। ধর্ষণটা এখন ইউরোপের মাটিতে বিনোদনের একমাত্র  উপায় হয়ে উঠেছে SS গার্ডদের কাছে।

     রেললাইনের পাশের জঙ্গলটা ক্রমশ ঘন হয়ে আসছে। মেয়েটি হঠাৎ সাইকেল থেকে নেমে বুনো ফুল তুলতে শুরু করে।বাচ্চা মেয়ে বেশি জোর খাটাতে হবে না। ভেতরে ভেতরে বেশ উত্তেজনা অনুভব করে অফিসার। হাসতে হাসতে এগিয়ে যায় মেয়েটার দিকে। অফিসারকে অবাক করে মেয়েটিও হাসতে থাকে। মেঘ না চাইতেই জল। ভীষণ খুশি হয় নাৎসি কম্যান্ডার। মারধর না করেই কাজটা সারা যাবে। আশপাশে লোকজন নেই। রাইফেলটা গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে রেখে মেয়েটার দিকে এগিয়ে যায় অফিসার। মেয়েটি তখনও হাসছে। মেয়েটির হাতে ফুলের সাজি, তাতে ফুল ভর্তি। মেয়েটিকে ধরে কাছে টানে কম্যান্ডার। সবল হাতের টানে হালকা মেয়েটি অফিসার বুকে লেপ্টে যায়।

    হিটলারের কুখ্যাত SS বাহিনী

    অফিসার দেখে মেয়েটির চোখের চাউনি বদলে গেছে। শক্ত হয়ে গেছে চোয়াল। পরমুহূর্তেই ‘খুট’ করে একটা শব্দ হয়। কাটা কলাগাছের মতো লুটিয়ে পড়ে জার্মান SS অফিসার। তার পেটের কাছের ইউনিফর্মে তৈরি হয়েছে এক গর্ত। সেখান থেকে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসছে টাটকা নাৎসি রক্ত। সাজির ফুলের তলায় সাইলেন্সার লাগানো পিস্তলটা আবার লুকিয়ে রাখে ফ্রেডি। অফিসারের রাইফেলটাও তুলে নিয়ে  জঙ্গলের কোনও নির্জন স্থানে লুকিয়ে ফেলে বালিকা। তারপর আবার সাইকেলে চাপে। নাৎসি অফিসারের শরীরটা মৃত্যু যন্ত্রণায় কাঁপতে কাঁপতে স্থির হয়ে যায়।

    কিশোরী ফ্রেডি খুঁজে বেড়ায় পরের শিকার আর নির্জন স্থান। ফ্রেডির শিকাররা ছিল মূলত SS বাহিনীর নারী-মাংস লোভী সৈনিক, অফিসার এবং কিছু বিশ্বাসঘাতক হল্যান্ডবাসী। এই ভাবে দীর্ঘদিন ফ্রেডি তার প্রিয় পিস্তলটির চেম্বার খালি করে যায়। কিন্তু তাকে একটু সন্দেহ করে না SS বাহিনী। কারণ ফুলের মত মিষ্টি ফ্রেডিকে দেখে কারও সন্দেহ হওয়ার কথাই নয়।

    তাই ঠান্ডা মাথায় একের পর এক SS বাহিনীর সদস্যদের খুন করে গেছে এই দুঃসাহসী মেয়ে। একটুও হাত কাঁপেনি। যে সব পানশালায় জার্মান সৈনিকরা ভিড় জমাত, সেখানে টোপ ফেলত ফ্রেডি। নাৎসি সৈনিক ও অফিসারদের সঙ্গে আলাপ জমিয়ে, তাদের যৌনতার লোভ দেখিয়ে কোনও জনবিরল স্থানে নিয়ে গিয়ে ঠান্ডা মাথায় চিরকালের জন্য ঘুম পাড়িয়ে দিত।

    ডাচ প্রতিরোধ বাহিনী

    সেই সময় নাৎসিদের বিরুদ্ধে হল্যান্ডে গড়ে উঠেছিল ডাচ প্রতিরোধ বাহিনী। নাৎসিদের ধারণা ছিল তাদের বিরুদ্ধে  গেরিলা আক্রমণ করত এই বাহিনীর পুরুষরা। আর নাৎসি বিরোধী পুস্তিকা বিলি বা লিফলেট ছড়ানোর কাজটা করত এই বাহিনীর মেয়েরা। নাৎসি বাহিনীর সদস্যরা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি তাদেরকেই শিকার করার দুঃসাহসী পণ নিয়ে দেশরক্ষায় নেমেছে ১৪ বছরের পুঁচকে এক মেয়ে। নাৎসি শিকারের পথে যার মূলধন সরল গ্রাম্য  সৌন্দর্য এবং হিটলারের  SS বাহিনী ও তার চরদের যৌনলালসা।

    আমস্টারডাম শহর ও শহরতলীতে একের পর এক  জার্মান অফিসার ও বিশ্বাসঘাতক ডাচদের  নিঃশব্দে হত্যা করে গেছে গুপ্তঘাতক বাহিনীর সদস্যা ফ্রেডি। সাত সদস্যের এই মহিলা গুপ্তঘাতক বাহিনীটিতে ফ্রেডির সঙ্গে ছিল তার দিদি ট্রুসও। মহিলা গুপ্তঘাতক বাহিনীটিতে ১৯৪৩ সালে আরও এক জন সদস্যা যোগ দেন। তিনি ছিলেন আইনের ছাত্রী, নাম হ্যানি শাফট।

    ফ্রেডি ও তার দিদি ট্রুস (ছবির ডানদিকে)

    ফ্রেডি আর হ্যানি শাফট দিনের পর দিন রাতের আঁধারে ডিনামাইট দিয়ে রেললাইন আর ব্রিজ উড়িয়ে দিয়েছে, জার্মানদের শহরে ঢোকা আটকাতে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তার চেয়ে দুই বছরের বড় দিদি ট্রুসকে সঙ্গে নিয়ে নাৎসি কনসেনট্রেশন ক্যাম্প থেকে বন্দী শিশুদের চুরি করে নিয়ে সীমান্ত পার করে নিরাপদ হাতে তুলে দিয়েছে। যে কাজ ইউরোপ কেন সমগ্র বিশ্বের ওই বয়েসের ছেলেমেয়েদের কাছে ছিল অকল্পনীয়।

    পরবর্তী কালে ফ্রেডিকে যখন কেউ জিজ্ঞাসা করতেন, তিনি কতজন  জার্মান  SS সৈনিক বা চরদের মেরেছেন। তিনি বলতেন,” আমি সৈনিক, সৈনিকরা লাশ গোনে না।” কখনও বলতেন, “একজন সৈনিককে এসব জিজ্ঞাসা করা উচিত নয়।”  তবে এতগুলি মানুষকে হত্যা করার পরও সামান্যতম অনুতাপ ছিলনা ফ্রেডি ওভারস্টিজেনের মধ্যে। সাংবাদিকদের আজীবন বলে এসেছেন, ‘আমাকে ওই লোকগুলোকে মারতে হতই।  যারা ভালো মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, তাদের মৃত্যুই সঠিক শাস্তি”।

    নাৎসি ক্যাম্পের বাইরে ফ্রেডির দিদি ট্রুস(পুরুষের পোশাকে) ও হ্যানি শ্যাফট

    ১৯৯৬ সালে দুই বোন মিলে গড়ে তুলেছিলেন ন্যাশন্যাল হ্যানি শাফট ফাউন্ডেশন নামে এক সংস্থা। তাঁদের বিপ্লবী সঙ্গী হ্যানি শাফটের স্মরণে। যে হ্যানি শ্যাফটকে নাৎসিরা ধরে ফেলে এবং নির্মমভাবে ধর্ষণ ও হত্যা করে। ফ্রেডি চিরকাল বলে এসেছেন, হ্যানি শ্যাফট হলেন নারী প্রতিরোধের জাতীয় প্রতীক।

    হল্যান্ডের সবচেয়ে বিখ্যাত নারী প্রতিরোধ বাহিনীর একমাত্র জীবিত সদস্যা এই ফ্রেডি ওভারস্টিজেন ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ৫ তারিখে প্রয়াত হন। তাঁর প্রাণের শহর হারলেম থেকে ৮ কিলোমিটার দূরের এক নার্সিং হোমে। তাঁর জন্মদিনের ঠিক আগের দিন, ৯৩ বছর বয়েসে। আমাদের জন্য রেখে গেলেন, আমাদের বৈপ্লবিক চেতনায় সদানিয়ত ট্রিগার টেপা এক বিস্ময়কর  ইতিহাস।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More