মঙ্গলবার, নভেম্বর ১২

অক্ষর পরিচয়ের এক আজব স্কুল অসমে, বর্জ্য প্লাস্টিক দিয়েই মাইনে দেয় কচিকাঁচারা

চৈতালী চক্রবর্তী

এই স্কুলে ভারী মজা, কিল-চড় নাই— ব্যাগের বোঝা নেই, সিলেবাস শেষ করার তাড়া নেই, শিক্ষক-শিক্ষিকার চোখ রাঙানি নেই। পড়াশোনার ধরন একেবারেই আধুনিক। শুধুমাত্র পড়ার বই নয়, পড়ুয়ারা এখানে জীবনের পাঠ নেয়। আরও একটা মজা হলো, এই স্কুলের বেতন। নাহ! টাকাপয়সার বালাই নেই। বেতন হিসেবে পড়ুয়াদের জমা করতে হয় গাদা গাদা প্লাস্টিক, তা সে ক্যারি ব্যাগই হোক বা প্লাস্টিকের কোনও সামগ্রী। বিশ্ব উষ্ণায়নের যুগে দূষণ রুখতে যখন কালঘাম ছোটাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা, তখন অসমের প্রত্যন্ত এলাকার একটি স্কুল প্লাস্টিক-দূষণ প্রতিরোধে নতুন দিশা দেখাচ্ছে। শুধু মিশন-দূষণ নয়, এই স্কুলের লক্ষ্য আরও অনেক।

মজিন ও পারমিতা

গুয়াহাটি থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরত্বে পামোহিতে গাছপালা ঘেরা এই স্কুলের নাম অক্ষর। বয়স বেশি নয়, যাত্রা শুরু হয়েছে বছর তিনেক আগে, ২০১৬ সালে। ‘‘আমাদের স্বপ্ন ছিল এমন একটা স্কুল তৈরি করা যেখানে গড়পড়তা শিক্ষা নয়, পড়ুয়াদের নানা বিষয়ে উৎসাহী করে তোলা যাবে। তার প্রথম পদক্ষেপটাই হলো প্লাস্টিক দূষণ রোধ করা,’’ জানিয়েছেন স্কুলের দুই প্রতিষ্ঠাতা পারমিতা শর্মা এবং মজিন মুখতার। তাঁদের হাত ধরেই অক্ষরের পথ চলা।

পামোহির অধিকাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে, জানিয়েছেন মজিন ও পারমিতা। এখানকার মানুষজনের পেশা হয় পাথর কাটা, না হলে রাজমিস্ত্রী, চা শ্রমিকও আছেন কেউ কেউ। অভাবের সংসারে ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠানোটা তাঁদের কাছে বিলাসিতা। তাই ছোট থেকেই এখানকার শিশুদের রুজিরোজগারে নেমে পড়তে হয়। অশিক্ষার সঙ্গে দোসর অপুষ্টি। পারমিতা জানিয়েছেন, এমন একটা জায়গায় অত্যাধুনিক স্কুল তৈরির পরিকল্পনাটা প্রথমে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, পরে সার্থক হয়।


প্রেমের বাঁধন থেকেই স্কুলের পরিকল্পনা, অক্ষর এক অন্য গল্প বলে

মজিনের জন্ম নিউ ইয়র্কে। সেখানকার একটি স্কুলে কর্মরত ছিলেন তিনি। সেই স্কুলেরই প্রজেক্ট নিয়ে ২০১৫ সালে মজিন ভারতে আসেন। পামোহিতে তাঁর সঙ্গে দেখা হয় পারমিতার। তিনি তখন টাটা ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সেস (TISS)-এ মাস্টার্স করছেন। মুখ্য বিষয় সোশ্যাল ওয়ার্ক। এ দিকে মজিনও শিক্ষকতার পাশাপাশি সামাজিক নানা বিষয়ে নিয়ে কাজ করেন। পেশার স্বার্থে পরিচয় হলেও মনের মিল হয় অচিরেই। অসমের নানা প্রত্যন্ত এলাকার দারিদ্রের ছবিটা মজিনের সামনে তুলে ধরেন পারমিতা। পামোহির এই এলাকার শিশু শ্রমিকরাও তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বিদেশে ফিরে না গিয়ে বরং দেশের মাটিতেই দেশের মানুষজনের জন্য কাজ করার পণ নেন দু’জনেই। বিয়ের পর পরই শুরু হয়ে যায় স্কুল তৈরির কাজ। নাম হয় অক্ষর। ছোট্ট স্কুলের আনাচ কানাচ সাজিয়ে তোলেন যুগলে।

পারমিতার কথায়, ‘‘স্কুল তখনও শুরু হয়নি। প্রতিদিন এই এলাকায় পা দিলেই পোড়া প্লাস্টিকের গন্ধে নাভিশ্বাস উঠত। পরে জানতে পারি এখানকার মানুষজনই সারাদিনের ব্যবহার করা প্লাস্টিক পুড়িয়ে ফেলে, যার বিষ ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় গোটা এলাকা।’’ অভিভাবকদের সঙ্গে শিশুরাও এই প্লাস্টিক পোড়ানোর কাজে অংশগ্রহণ করে। একটা বিরাট এলাকা জুড়ে প্লাস্টিকের জিনিসপত্র ডাঁই করে আগুন দিয়ে দেন বাসিন্দারা। এই প্লাস্টিক যে কতটা বিষাক্ত, প্রাণহানির কারণ সেটা এলাকাবাসীকে বোঝাতেই অনেকদিন সময় লাগে বলে জানিয়েছেন পারমিতা। তারপর বাড়ি বাড়ি ঘুরে শুরু হয় শিশুদের স্কুলে ধরে আনার কাজ।


স্কুলের বেতন প্লাস্টিক বর্জ্য 

দিনমজুর থেকে চা শ্রমিক— অভাবী পরিবার থেকে এই স্কুলে পড়তে আসে শিশুরা, জানিয়েছেন মজিন। তাঁর কথায়, ‘‘শুরুতেই সাফল্য মেলেনি। ২০১৬ সালে স্কুলে পড়ুয়াদের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৫ জন। ২০১৯ সালে সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে। আশপাশের এলাকা থেকেও বাচ্চাদের এই স্কুলে ভর্তি করাতে আনেন অভিভাবকরা,’’ মজিনের দু’চোখে আনন্দ। জানিয়েছেন, বেতন হিসেবে কানাকড়িও নেওয়া নয় না। বরং পড়ুয়াদের কড়া নির্দেশ দেওয়া আছে, নিজের বাড়ির বা এলাকার, যেখানে যত প্লাস্টিক রয়েছে ব্যবহৃত বা অব্যবহৃত সব কিছু নিয়ে এসে জড়ো করতে হবে স্কুলে। কোনও প্লাস্টিক পোড়ানো যাবে না। ক্লাস হিসেবে বেতনের থুড়ি প্লাস্টিকের পরিমাণও ঠিক করে দেন পারমিতা-মজিন। গড়ে সপ্তাহে ২৫টি করে প্লাস্টিকের যে কোনও সামগ্রী জমা করতেই হয় স্কুলে।

পারমিতার কথায়, ‘‘সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল এলাকার লোকজনকে রাজি করানো। দীর্ঘদিনের তাদের এই প্লাস্টিক ব্যবহার ও পোড়ানোর অভ্যাসটা বন্ধ করা রীতিমতো চ্যালেঞ্জিং ছিল আমাদের কাছে। তার পর তাঁদের সন্তানদের স্কুলের পাঠ নিতে রাজি করানোটাও ছিল বেশ শক্ত। শুধুমাত্র পড়াশোনা করানোর জন্য স্কুলে নিজেদের সন্তানদের পাঠাতে রাজি ছিলেন না কেউই। তাই এই অভিনব বেতনের ভাবনা এবং পড়াশোনার পাশাপাশি সৃজনশীল কাজে ছাত্রছাত্রীদের উৎসাহ দেওয়ার প্রয়াস।’’


জমা করা প্লাস্টিক থেকে ইকো-ব্রিক

সপ্তাহে যত প্লাস্টিক জমা হয় স্কুলে, সেগুলো দিয়ে ইকো-ব্রিক (Eco-Brick) তৈরি করা হয় অক্ষরে। মজিন জানিয়েছেন, স্কুলের ভিতরেই প্লাস্টিক থেকে বায়োডিগ্রেডেবল সামগ্রী তৈরির অনুমোদন দিয়েছে নর্থ-ইস্ট এডুকেশন রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন। ছাত্রছাত্রীরাই বানায় এই ইকো-ব্রিক। একটা প্লাস্টিকের বোতলের ভিতরে অন্তত ৪০টি প্লাস্টিক বর্জ্য (ব্যাগ, অন্যান্য শুকনো প্লাস্টিকজাত সামগ্রী) ঠেসে মুখ বন্ধ করে তৈরি করা হয় এই ইকো-ব্রিক বা PET Bottle। মূলত বোতলের ভিতরে এমন ভাবে প্লাস্টিক বর্জ্য ঠেসে ঢোকানো হয় যাতে স্তরের পর স্তর তৈরি হয়। এই বোতল বছরের পর বছর সংরক্ষণ করা যায়। বাড়ি তৈরিতে বা কোনও নির্মাণ কাজে ইটের বদলে পরিবেশবান্ধব এই ইকো-ব্রিক ব্যবহার করা হয়। যার ফলে ইট-ভাটার দূষণও রোধ করা যায়।

বোতলে প্লাস্টিক ঠেসে তৈরি ইকো-ব্রিক।

ইকো-ব্রিকের ধারণা প্রথম আনেন জার্মান আর্কিটেক্ট আন্দ্রেজ ফ্রোসে ২০০০ সালে। তিনি অবশ্য প্লাস্টিকের বদলে বালি ভরে পেট বোতল বানিয়েছিলেন। পরে ২০০৩ সালে নিকারাগুয়ায় অ্যালভারো মোলিনা প্লাস্টিক দিয়ে ইকো-ব্রিক তৈরি শুরু করেন। ২০১০ সালে উত্তর ফিলিপিন্সে রাসেল মেয়র ও ইরানি বাকিসান স্থানীয় স্কুলগুলিতে ইকো-ব্রিক তৈরির জন্য ছাত্রছাত্রীদের উৎসাহ দেন। ফিলিপিন্সের শিক্ষা মন্ত্রকের উদ্যোগে অন্তত ১৭০০ স্কুলে ইকো-ব্রিকিং শুরু হয়। প্লাস্টিক দূষণ রোধে সহজসাধ্য পদ্ধতি হিসেবে পরবর্তী কালে দক্ষিণ আফ্রিকার নানা দেশ, জাম্বিয়া, আমেরিকা, ইন্দোনেশিয়ার নানা জায়গায় ইকো-ব্রিকিং জনপ্রিয়তা লাভ করে।


ইকো-ব্রিক দিয়ে তৈরি নির্মাণ

মজিন জানিয়েছেন বিদেশের মতো ভারতে এখনও সে ভাবে ইকো-ব্রিকিংয়ের ধারণা তৈরি হয়নি। হাতে গোনা জায়গায় এই পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত মানুষজন। তাই অক্ষরের পাঠের মধ্যে হাতেকলমে ইকো-ব্রিকিং শেখানো হয় ছাত্রছাত্রীদের।


কেমব্রিজ স্কুলের ছায়া পামোহির অক্ষরে

মজিন ও পারমিতা জানিয়েছেন, প্রথমে তাঁরা নিজেরা শুরু করলেও এখন অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকাই স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এগিয়ে এসেছেন পড়ুয়াদের পাঠ দিতে। কেমব্রিজ স্কুলের ধাঁচে ইংরেজি ও অঙ্ক শেখানো হয় এখানে। ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ওপেন স্কুলিং (NIOS)’-এর তত্ত্বাবধানে বোর্ড পরীক্ষা দেয় এখানকার দশম ও দ্বাদশের ছাত্রছাত্রীরা।

এই স্কুলের আরও একটি বৈশিষ্ট্য হলো ছাত্রছাত্রীদের স্বনির্ভর করে তোলার প্রচেষ্টা। পারমিতা জানিয়েছেন, ইকো-ব্রিক তৈরি করে স্কুলের বেশিরভাগ খরচ তোলে পড়ুয়ারাই। তা ছাড়াও নানা হস্তশিল্পের জিনিসপত্রও তৈরি করে তারা নিজেরাই। বিদ্যুৎ খরচ বাঁচাতে স্কুলে রয়েছে সোলার প্যানেল। সেগুলিরও দায়িত্বে রয়েছে কচিকাঁচারা।

টাকাপয়সার হিসেব রাখার পদ্ধতিও শেখানো হয় বাচ্চাদের, জানিয়েছেন মজিন ও পারমিতা। তার জন্য খেলনা টাকা দেওয়া হয় পড়ুয়াদের। স্কুল ক্যাম্পাসের ভিতরেই দোকান থেকে হিসেব করে খাবার জিনিস, বই কেনে পড়ুয়ারা। পছন্দের স্যান্ডউইচ, চকোলেট সব কিনতে পারে ওই টাকা থেকেই। বেঁচে যাওয়া টাকা হিসেব করে তারা ফেরতও দেয় শিক্ষক-শিক্ষিকাদের। এমনকি নিচু ক্লাসের ছেলেমেয়েদের প্রাইভেট টিউশন দেওয়ার দায়িত্ব থাকে উঁচু ক্লাসের পড়ুয়াদের।

পারমিতার কথায়, ‘‘আমরা শুধুমাত্র সিলেবাস ভিত্তিক প্রথাগত শিক্ষা দিতে চাইনি। বিদেশের মতো হাতেকলমে পাঠ দেওয়া হয় পড়ুয়াদের। প্রযুক্তিগত বিদ্যাতেও তারা এনেক এগিয়ে। স্কুলেই তারা বানিয়ে নিয়েছে ছোটখাটো ল্যাবোরেটরি। সেখানে পড়ুয়াদের উৎসাহ দেখার মতো।’’ জানিয়েছেন, নম্বরের ভিত্তিতে গ্রেড দেওয়া হয় না। পরীক্ষার রেজাল্ট নম্বরের উপর নির্ভরশীল নয়। পুরোটাই মেধাভিত্তিক। পড়ুয়াদের সৃজন ক্ষমতা, জ্ঞান, শেখার আগ্রহ এই সব কিছুকেই মাপকাঠি করা হয়। তাই এই স্কুলে কোনও প্রতিযোগিতা নেই। সব সময়েই নতুন কিছু শেখার জন্য অপেক্ষা করে থাকে ছাত্রছাত্রীরা।

স্কুলের নিজস্ব একটা অ্যানিমাল শেল্টারও রয়েছে। পথ কুকুরদের আশ্রয় দেওয়া হয় সেখানে। পরিচর্জার দায়িত্বে থাকে বাচ্চারাই। পারমিতা জানিয়েছেন, এখন ২০টি কুকুর রয়েছে শেল্টারে। তাদের ভ্যাকসিন দেওয়া থেকে খাবার খাওয়ানো, অসুস্থ হলে ডাক্তার ডেকে আনা সব কিছুই দায়িত্ব নিয়ে সামলায় ছেলেমেয়েরা।

‘‘ভারত রত্ন ভূপেন হাজারিকার ছেলে তেজ হাজারিকা আমাকে ডেকে পাঠিয়ে বিশেষ সম্মান দেন। পাশে থাকার আশ্বাস দেন,’’ গর্ব ভরে জানিয়েছেন মজিন। এই স্কুলকে সবরকম সহযোগিতা দেওয়ার জন্য উৎসাহী অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও। ২০১৭ সালে মজিন ও পারমিতাকে ডেকে নিয়ে যায় রাষ্ট্রপুঞ্জ। ভারতের একটি প্রত্যন্ত এলাকায় এমন স্কুল চালানো জন্য যুগলের প্রশংসা করে তারাও। ২০১৮ সালে এই স্কুলের খরচ চালানোর দায়িত্ব নেয় অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেড। অসমের ‘অক্ষর’কে অনুকরণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দিল্লির পাঁচটি সরকারি স্কুল। মুম্বইতেও এমন স্কুল তৈরির জন্য অক্ষর ফাউন্ডেশনের সাহায্য চাওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে দেশ জুড়ে এমন একশোটিরও বেশি স্কুল তৈরির স্বপ্ন রয়েছে মজিন-পারমিতার।

আরও পড়ুন:

তিনি জিমি নেলসন, তাঁর লেন্সে বন্দি জনজাতিদের জীবন, সাইবেরিয়া থেকে ব্রাজিল

  •  
  •   
  •   
  •   
  •   
  •   

Comments are closed.