বুধবার, মার্চ ২০

কিছু রহস্য রহস্যই থেকে যায়, যেমন বারমুডা ত্রিকোণের জলরাশি (প্রথম পর্ব)

রূপাঞ্জন গোস্বামী

“আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে সন্ধ্যা নেমেছে। হেমন্তের সন্ধ্যা, তবুও শীতের চেয়েও কনকনে। সঙ্গে আছে, জলে ভেজা পাগলা হাওয়ার দাপট। ক্রিস্টোফার কলম্বাস-এর নৌবহর চলেছে আমেরিকার সন্ধানে। নৌবহরের তৃতীয় জাহাজের ডেকে, এক হাতে রাম আর এক হাতে দূরবীন নিয়ে বসেছিলেন নাবিক রড্রিগো ডি ট্রাইয়ানা। হঠাৎ নজরে এলো, উত্তাল প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে কাঁপছে একটা আলো। তাহলে কি সামনে কোনও দ্বীপ আছে! কিন্তু আলোটা কেমন ভুতুড়ে লাগছে। আলোটা ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে। নাবিক রড্রিগো হাঁক দিয়ে ডেকে নেন আর এক নাবিক পেরো গুইতিরেজকে। তিনিও, আলোটিকে একই ভাবে পিছিয়ে যেতে দেখলেন। কিন্তু আলোটা জাহাজের আলো নয়, তাহলে আলোটা ঢেউয়ের তালে নাচত। কিন্তু নক্ষত্রের আলোর মত স্থির আলোটি, সমুদ্রের জলতলে প্রায় গা ঠেকিয়ে স্থিরভাবে পিছিয়ে চলেছে। রড্রিগোর সহ-নাবিক পেরো আরও একটি ভয়ানক সংবাদ দিলেন, সেটি হল কম্পাস কাজ করছে না। এলোমেলো ভাবে ঘুরে চলেছে জাহাজের সব কম্পাস। রাতের আকাশে অদ্ভুত রঙের সব ধোঁয়া জাহাজ ঘিরে ফেলছে। ভয়ানক পরিস্থিতি, আগেই শুনেছেন তাঁরা এই এলাকায় ডুবো পাহাড়ের কথা। কম্পাস কাজ না করলে পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে নিশ্চিত ডুবে যাবে জাহাজ।”

বিশ্ববিখ্যাত পর্তুগিজ নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস, ওয়েস্ট ইন্ডিজ আবিস্কারের ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ  ১১ অক্টোবর, ১৪৯২,  তাঁর বিখ্যাত লগ-বুকে লিখে রাখেন রড্রিগো আর পেরো-এর ঘটনাটি। যে এলাকাটিতে ঘটনাটি ঘটেছিল সেই এলাকাটিকেই এখন পৃথিবী চেনে কুখ্যাতবারমুডা ট্রায়াঙ্গল’ নামে। নাবিকরা বলেন শয়তানের ত্রিভুজ, কখনও হুডু সি বা লিম্বো অফ দ্য লস্ট নামে। আসলে বারমুডা ট্রায়াঙ্গল হলো আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে আঁকা একটি কাল্পনিক ত্রিভুজ। যে ত্রিভুজের তিনটি শীর্ষবিন্দুতে আছে তিনটি ভৌগলিক স্থান। বারমুডা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার মায়ামি এবং পুয়োর্তরিকোর সান জুয়ান। এই তিনটি স্থানের  মধ্যে থাকা আটলান্টিক মহাসাগরের প্রায় ৭০০০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে অবস্থান করছে নাবিকদের ত্রাস ‘বারমুডা ট্রায়াঙ্গল’

কেন কুখ্যাত বারমুডা ট্রায়াঙ্গল!

জাহাজ বা বিমান, বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের ভেতরে প্রবেশ করলে নাকি বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে যায়। দিক নির্দেশক কম্পাস ভুল দিক নির্দেশ করতে থাকে। আকাশে নাকি দেখা যায় অদ্ভুত রঙের ধোঁয়া। নিকষ কালো আটলান্টিকের জলে নাচতে থাকে ভুতুড়ে আলোর দল। এই শয়তান ত্রিভুজের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় জাহাজ ও বিমানের আরোহীরাও নাকি আরও সব অদ্ভুতুড়ে কান্ড দেখেছেন। সমুদ্র থেকে উঠে, আকাশ ছুঁয়ে ঘুরছে অতিকায় জলস্তম্ভ। সমুদ্রের বুকে উঠছে নামছে ভিনগ্রহের প্রাণীদের অদ্ভুত সব মহাকাশযান। কেউ বলে জল থেকে মাঝে মাঝেই আকাশে উঠে আসে আগুনের প্রকাণ্ড এক গোলা। উঠে এসেই ফেটে যায়। কয়েক মাইল ধরে ছড়িয়ে পড়ে আগুন। শেষ একশো বছরে বারমুডা ট্রায়াঙ্গল নাকি গিলে নিয়েছে কমপক্ষে শতাধিক জাহাজ ও গোটা কুড়ি বিমান সহ হাজার কয়েক মানুষকেও।

বিখ্যাত ও বহুচর্চিত তিনটি প্রমান

 ইউ এস এস সাইক্লপস 

১৯১৮ সালের ৪ মার্চ, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বার্বাডোজ দ্বীপ থেকে আমেরিকার বাল্টিমোর যাওয়ার পথে, বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় হারিয়ে যায় আমেরিকার অতিকায় জাহাজ  ইউ এস এস সাইক্লপসজাহাজটিতে প্রচুর পরিমাণে ম্যাঙ্গানিজ ছিল। জাহাজটি, ৩০৯ জন নাবিক আর টন টন ম্যাঙ্গানিজ নিয়ে চিরতরে হারিয়ে যায় ‘বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে’। আমেরিকার নৌ- ইতিহাসে যুদ্ধ ছাড়া এত বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়নি আমেরিকা। জাহাজের পাইলট ছিলেন অভিজ্ঞ লেফটেন্যান্ট কম্যান্ডার জর্জ ওর্লে। এমনই ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনার সামনে পড়েছিল জাহাজটি, ক্যাপ্টেন সাহায্যের জন্য SOS পাঠাতে পারেননি। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ক্যাপ্টেন আর নাবিকদের নিয়ে ডুবে গিয়েছিল ‘ইউ এস এস সাইক্লপস’।

ইউ এস এস সাইক্লপস

ফ্লাইট-১৯

৫ ডিসেম্বর, ১৯৪৫:  কন্ট্রোল টাওয়ার, রেডিও বার্তার অনুবাদ শুনে বুঝে গেছিল,ককপিটে চলছে প্রচন্ড তর্ক। জুনিয়র পাইলটরা তাদের প্লেন নিয়ে উড়তে উড়ে বারবার তাঁদের ট্রেনার নেভি লেফটেন্যান্ট চার্লস টেলরকে জিজ্ঞেস করছিলেন ‘আমরা কেনও পশ্চিমে উড়ছি না?“।  সিনিয়র পাইলট টেলর তাঁর প্লেন থেকে রেডিওর সাহায্যে উত্তর দিয়েছিলেন, “কেন আমরা পূর্বে যাবো না?“। এর কিছুক্ষণ পর ট্রেনার পাইলট কন্ট্রোল টাওয়ারকে জানিয়েছিলেন, “আমরা জানি না আমরা কোথায় আছি। নীচে সবুজ বর্ণের জল, কোথাও সাদা কিছু নেই”। বিমানবহরের অপর একটি বিমান থেকে মেরিন ক্যাপ্টেন এডয়ার্ড-এর আতঙ্কিত কণ্ঠ ভেসে আসে, “আমি জানি না আমরা ঠিক কোথায়I আমি নিশ্চিত, শেষ টার্নিংটা নেওয়ার পর আমরা হারিয়ে গেছি। আমার দুটো কম্পাস কাজ করছে না”। হারিয়ে যাওয়ার কয়েক মিনিট আগে ট্রেনার পাইলট লেফটেন্যান্ট টেলর কন্ট্রোল রুমের রবার্ট কস্কের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছিলেন। শেষ মুহূর্তে তিনি বলেছিলেন, ‘না না কস্ক তুমি সাবধান হও। তুমি কখনওই বিমান নিয়ে আমাদের খুঁজতে বেরিও না। তাহলে তোমরাও আমাদের মতো বিপদে পড়বে। ওরা অবিকল…. দেখতে অবিকল। এরপর বেতার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর আর রেডিও বার্তা আসেনি। আটলান্টিক মহাসাগরের বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে চিরতরে নিখোঁজ হয়ে যায়, ৫ টি টিভিএম আভেঞ্জার টর্পেডো বোমারু বিমানের একটি স্কোয়াড্রন, ‘ফ্লাইট -১৯‘, ১৪ জন বিমানকর্মীকে নিয়ে। নেভি লেফটেন্যান্ট চার্লস টেলর সাবধান করা সত্ত্বেও, একই দিনে  এই ‘ফ্লাইট-১৯’ কে খুঁজতে গেছিল আর একটি বিমান পিবিএম মেরিনার। ১৩ জন বিমানকর্মী সমেত সেই বিমানটিও আর ফিরে আসেনি ফোর্ট লডারডেল মিলিটারি এয়ারস্ট্রিপে। একই দিনে ২৭ জন পাইলট ও ৬ টি বিমানের একই জায়গায় হারিয়ে যাওয়া আজ অবধি বিস্ময় জাগায়।

ফ্লাইট-১৯

ডগলাস ডি সি-৩

২৮ ডিসেম্বর, ১৯৪৮। পুয়ের্তোরিকোর সানজুয়ান থেকে ফ্লোরিডার মিয়ামি যাওয়ার পথে তিন বিমানকর্মী এবং ৩৬ জন প্যাসেঞ্জার নিয়ে  হারিয়ে যায় Douglas DC-3  NC16002  বিমানটি। পাইলট ছিলেন রবার্ট লিংকুইসড। ভোর ৪টা ১৩ মিনিটে বিমানটি থেকে শেষ বেতার বার্তা ভেসে আসে, “আমরা ঠিক ভাবেই মিয়ামি এয়ারপোর্টের দিকে এগিয়ে চলেছি।  আমরা মিয়ামি শহরের আলোকমালা দেখতে পাচ্ছি। বিমানের সবকিছু ঠিক আছে। কোনও গোলমাল নেই। অবতরণের নির্দেশের অপেক্ষায় রইলাম”। শেষবার্তা পাঠিয়ে বিমানটি অদৃশ্য হয়ে যায়। এরপর বিমানটির আর কোনো হদিস মেলেনি।

ডগলাস ডিসি-৩

জাহাজ ও বিমান কতৃপক্ষ এবং তদন্তকারীদের ব্যাখ্যা  

ফ্লাইট-১৯ –  মার্কিন নেভির তদন্তকারীর দল, ‘ফ্লাইট-১৯‘ হারিয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী করেন পাইলটদের। নেভিগেশন ভুলের কারণে বিমানগুলিকে অনেক বেশি সময় ধরে উড়তে হয়। ফলে পাঁচটি বিমানের ট্যাঙ্ক জ্বালানিশূন্য হয়ে যায়। এবং বিমানগুলি অতলান্তিকে ভেঙে পড়ে। তবে ফ্লোরিডা উপকূলে ঠেকা একটি ট্যাঙ্কার জাহাজ  ওই দিন বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের আকাশে একটি বিস্ফোরণ দেখে। এবং জাহাজটির নাবিকরা সমুদ্রে প্রচুর তেল ভাসতে দেখেছেন বলে হারবার মাস্টারের কাছে রিপোর্ট করে। কিন্তু উদ্ধার অভিযানে এর সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীকালে কিছু বিজ্ঞানী বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের ভেতরে ঘটা কিছু অস্বাভাবিক বিস্ফোরণের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সে প্রসঙ্গে আসব পরের পর্বে।

 ইউ এস এস সাইক্লপস– তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, আমেরিকার এই অতিকায় জাহাজটি ডুবে যাওয়ার কারণ হলো জাহাজে অতিরিক্ত ম্যাঙ্গানিজ আকরিক বোঝাই করা। এছাড়াও অতিরিক্ত ওজন নিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে নকশাগত ত্রুটির কথাও উল্লেখ করেছেন তদন্তকারীরা। সন্দেহ থেকে বাদ দেননি প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও আমেরিকার শত্রুপক্ষের টর্পেডোকেও।

ডগলাস ডি সি-৩ – সিভিল এরোনটিক্স বোর্ড-এর  তদন্তের রিপোর্ট থেকে Douglas DC-3 বিমানটির নিখোঁজ হওয়ার সম্ভাব্য একটি কারণ পাওয়া গেছিল। সেটি হল, ১৯৪৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর পুয়ের্তোরিকোর সানজুয়ান থেকে ওড়ার আগে পাইলট, বিমানের ব্যাটারি ঠিকমত চার্জ না করেই টেক অফ করেছিলেন। ফলে কন্ট্রোল টাওয়ারের সঙ্গে ঠিক মতো যোগাযোগ করতে পারেন নি। তাই ঘটেছে দূর্ঘটনা। 

বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের ভিডিও

 বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের ভেতর আশ্চর্যজনক ভাবে হারিয়ে যাওয়া জাহাজগুলি

  • ১৮০০:  গুয়াদালুপি থেকে ডেলাওয়ার যাওয়ার পথে ৯০ জনকে নিয়ে ডুবে যায় USS Pickering নামের জাহাজটি।
  •  ১৮১২:  সাউথ ক্যারোলিনার চার্লস্টন থেকে নিউইয়র্ক আসার পথে  ৩০ ডিসেম্বর হারিয়ে যায়   Patriot নামের মার্কিন জাহাজটি, ৬৭ জন আরোহী নিয়ে।
  • ১৮১৪: ১৪০ জন আরোহী নিয়ে ডুবে যায় মার্কিন জাহাজ USS Wasp। জাহাজটির শেষ  নথিভুক্ত অবস্থান ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের অদুরের বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের জলভাগ।
  • ১৮২৪: কিউবা থেকে টমকিন্স আইল্যান্ড যাওয়ার পথে ডুবে যায় মার্কিন জাহাজ USS Wild, ৩১ জন আরোহী নিয়ে।
  • ১৮৪০:    Rosalie নামের একটি জাহাজকে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে। জাহাজটিতে কেউ ছিলেন না। সমুদ্রে একাই ভেসে বেড়াচ্ছিল। জাহাজটির কর্মীদের খোঁজ মেলেনি।
  • ১৮৮১Ellen Austin নামে একটি জাহাজ, বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের মধ্যে  একটি নামহীন জাহাজ খুঁজে পায় প্রথম জাহাজের কর্মীরা পরিত্যক্ত জাহাজটিকে চালিয়ে তীরে নিয়ে এলেও সন্ধান মেলেনি নাবিক ও ক্যাপ্টেনের।
  • ১৯২১জানুয়ারি মাসের ৩১ তারিখে পাঁচ মাস্তুলের জাহাজ  Carroll A. Deering কে, জাহাজটির ক্যাপ্টেন বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের ডায়মন্ড শোয়ালস এলাকায় ফেলে রেখে অন্য জাহাজে করে ফিরে আসেন। তিনি জাহাজটিকে চালাতেই পারছিলেন না। ইঞ্জিন ঠিক থাকা সত্ত্বেও।
  • ১৯২৫ :  ১ ডিসেম্বর,  SS Cotopaxi নামের জাহাজটি সাউথ ক্যারোলিনার চার্লস্টন বন্দর ছেড়ে কিউবার হাভানা যাওয়ার পথে রেডিওতে জানায় জাহাজ ডুবে যাচ্ছে। আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
  •  ১৯৪১২৩ নভেম্বর, ভার্জিন আইল্যান্ড থেকে ছেড়ে  বক্সাইট ও  ৫৮ জন আরোহী সমেত হারিয়ে যায় মার্কিন জাহাজ  USS Proteus (AC-9)l ওই মাসেই,মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে বক্সাইট ও ৬১ জন আরোহী নিয়ে হারিয়ে যায় প্রোটিয়াসের জমজ জাহাজ USS Nereus (AC-10)
  • ১৯৫৮ কি-ওয়েস্ট আইল্যান্ড থেকে ফ্লরিডার মায়ামি সৈকতে যাওয়ার পথে হারিয়ে যায়  Revonoc.A  নামের ৪৩ ফুট লম্বা একটা ইয়ট। মালিক হার্ভে কনোভার এবং বাকি চার আরোহীকে নিয়ে। ১৪ ফুটের একটা টুকরো পাওয়া গেছিল ফ্লোরিডার জুপিটারের কাছে।
  • ১৯৬৩: সালে  SS Marine Sulphur Queen নামে একটি জাহাজ, ১৫২৬০ টন সালফার ও ৩৯ জন নাবিক নিয়ে হারিয়ে গিয়েছিল বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে। 
  •  ২০১৫:  অস্টিন স্টিফানোস আর পেরি কোহেন নামে দুই কিশোর ১৯ ফুটের একটি বোটে চড়ে মাছ ধরতে বেরিয়ে ছিল। ফ্লোরিডার জুপিটার থেকে বাহামা যাওয়ার পথে হারিয়ে যায় তারা। ১৫০০০ নটিক্যাল মাইল তন্ন তন্ন করে খুঁজে মার্কিন কোস্টগার্ড এক বছর পর বারমুডার সৈকতের অদূরে অক্ষত অবস্থায় বোটটি পেয়েছিল। কিন্তু মেলেনি কিশোর দুটির খোঁজ। 
  •  ২০১৫ SS El Faro নামের এক জাহাজ ডুবে যায়  বাহামার নিকটবর্তী বারমুডা ট্রায়াঙ্গলর অংশে। উদ্ধারকারী দল  সমুদ্রের ১৫০০০ ফুট গভীরে জাহাজটিকে খুঁজে পায়।

বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের আকাশে আকস্মিক ও রহস্যজনক ভাবে হারিয়ে গেছিল যে বিমানগুলি 

  • ১০ জুলাই, ১৯৪৫ফ্লোরিডার নেভাল এয়ার স্টেশন থেকে টেক অফ করার পর ইউএস নেভির PBM3S  নামক একটি নজরদারি বিমান  ১১ জন বিমানকর্মী সমেত নিঁখোজ হয়ে যায়।
  • ৩ জুলাই ১৯৪৭: ফ্লোরিডার উপকূলবর্তী অঞ্চলের আকাশ থেকে Douglas C-54 বিমান হারিয়ে যায়, ৫ জন বিমানকর্মী সমেত।
  • ৩০ জানুয়ারি ১৯৪৮:  ৬ বিমানকর্মী এবং ২৫ জন প্যাসেঞ্জার নিয়ে পর্তুগালের এজোরেস দ্বীপের সান্তামারিয়া থেকে বারমুডা যাওয়ার পথে হারিয়ে যায়  Avro Tudor G-AHNP Star Tiger বিমান।
  • ১৭ জানুয়ারি ১৯৪৯: বারমুডা থেকে জামাইকার কিংস্টন এয়ারপোর্ট যাওয়ার পথে Avro Tudor G-AGRE Star Ariel বিমানটি হারিয়ে যায় ৭ বিমানকর্মী এবং ১৩ প্যাসেঞ্জার নিয়ে।
  •  ১৬ নভেম্বর ১৯৪৯:  B-29 বিমান  হারিয়ে যায় ৪ জন বিমানকর্মীকে নিয়ে।
  • ৯ নভেম্বর ১৯৫৬:  বারমুডা থেকে টেক অফ করে  Martin Marlin বিমান হারিয়ে যায় ১০ বিমানকর্মীকে নিয়ে।
  • ৮ জানুয়ারি ১৯৬২: আমেরিকা থেকে পর্তুগালের স্বয়ংশাসিত দ্বীপ এজোরেস যাওয়ার পথে  USAF KB-50 51-0465 হারিয়ে যায় পাইলটকে নিয়ে।
  • ৯ জুন ১৯৬৫: ফ্লোরিডা এবং গ্র্যান্ড টার্ক দ্বীপের মাঝে দু’জন পাইলটকে নিয়ে হারিয়ে যায়  USAF C-119 Flying Boxcar বিমান। বিমানটি থেকে শেষ ফোন এসেছিল, যখন সেটি বাহামার ক্রুক আইল্যান্ডের কাছে ছিলো।
  • ৬ ডিসেম্বর ১৯৬৫: লডারডেল থেকে গ্র্যান্ড বাহামা আইল্যান্ড যাওয়ার পথে, ব্যক্তিগত বিমান  ERCoupe F01  হারিয়ে যায় পাইলট ও বিমানের মালিককে নিয়ে।
  • ২০ জুন ২০০৫:  Piper-PA-23 বিমান ৩ জন বিমানকর্মীকে নিয়ে হারিয়ে যায়। বাহামার ট্রেজার-কেই আইল্যান্ড থেকে ফ্লোরিডার ফোর্ট পিয়ার্স যাওয়ার পথে।
  • ১০ এপ্রিল ২০০৭: বেরি আইল্যান্ডের কাছে  Piper PA-46-310P  হারিয়ে যায় ২ জন পাইলটকে নিয়ে।
  • ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭: তুরষ্কের বিমান  TK183 ( Airbus A330-200), কিউবার হাভানা যাওয়ার পথে বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের ওপর এসে অকল্পনীয় ভাবে যান্ত্রিক গোলযোগের মুখে পড়ে। বিমানটি, দ্রুত দিক পরিবর্তন করে আমেরিকার ওয়াশিংটনে জরুরিকালীন অবতরণ করে।
  • ১৫ মে ২০১৭: একটি ব্যক্তিগত MU-2B বিমান, বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের আকাশে, প্রায় ২৪০০০ ফুট উচ্চতায় মিয়ামি কট্রোল টাওয়ারের সঙ্গে শেষ যোগাযোগ করে। তারপর বিমানটি রাডার এবং রেডিও যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিমানটিকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের ভিডিও

কবে বিশ্ব প্রথম জানলো বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের কথা

অ্যাসোসিয়েট প্রেসের সাংবাদিক E.V.W. Jones, সর্বপ্রথম এই ‘শয়তান ত্রিভুজ’ নিয়ে খবরের কাগজে লেখেন, ১৯৫০ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর।  ১৯৫২ সালে  Fate ম্যাগাজিনে  George X. Sand লেখেন Sea Mystery At Our Back Door শিরোনামে একটি ছোট প্রবন্ধ। সাড়া জাগানো এই প্রবন্ধে তিনি ‘ফ্লাইট-১৯’ এর নিরুদ্দেশের কাহিনী বর্ণনা করেন। তখনও পর্যন্ত অচেনা অজানা ও রহস্যময় বারমুডা ট্রায়াঙ্গলকে, তিনিই বিশ্বের কাছে বিখ্যাত বা কুখ্যাত করে দেন। এরপর ১৯৬৪ সালে Vincent Gaddis  লেখেন The Deadly Bermuda Triangle  Invisible Horizons  নামে  বেস্টসেলার বই দুটি। জেমস হ্যাডলী চেজ, নিক কার্টার আর জেমস বন্ডে পাগল আমেরিকাবাসীরা, পেয়ে যান নতুন খোরাক। বর্তমান যুগের পরিভাষায়, ভাইরাল হয়ে যায় ‘বারমুডা ট্রায়াঙ্গল’ রহস্য। আর এক বিখ্যাত ফিকশন সাহিত্যিক John W. Spencer, ১৯৬৯ সালে লেখেন আর এক বেস্টসেলার  Limbo of the Lost।  ১৯৭৪ সালে Charles Berlitz লেখেন The Bermuda Triangle। এই বছরেই  Richard Winer লেখেন বিখ্যাত বই ‘শয়তানের ত্রিভূজ’ বা The Devil’s Triangle। রঙ চড়িয়ে লেখা, রোমহর্ষক বইগুলি বাজারে আসা মাত্রই, বাজার থেকে স্রেফ উড়ে যেতে থাকে। প্রকাশকরা নতুন এডিশনের যোগান দিতে দিতে হাঁপিয়ে ওঠেন। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করা বইগুলিও তুমুল সাফল্য পায়।

বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের মধ্যে জল ও আকাশযানদের অন্তর্ধান রহস্যের আদৌ কি কিনারা করা গেছে!

বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের রহস্য উন্মোচন করার নামেও প্রচুর বই লেখা হয়েছে। সেই বইগুলিও সারা বিশ্বে জনপ্রিয় হয়েছে। বিশ্বের মানুষ, বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের দিকে নজর ফেরানোর ফলে, নানা মানুষ নানা ভাবে রহস্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। পিছিয়ে থাকেননি বিজ্ঞানীরাও। সাম্প্রতিক অতীতে কিছু বিজ্ঞানীদের দাবি, বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের মধ্যে, জল ও আকাশযানদের অন্তর্ধান রহস্যকে বিজ্ঞানের স্ক্যানারের তলায় ফেলে, তাঁরা রহস্যভেদ করে ফেলেছেন। কিন্তু, সত্যিই কি তাই! নাকি এখনও অতলান্তিক মহাসাগরের অথৈ জলে রহস্যটিকে আগলে রেখেছে, বারমুডা ট্রায়াঙ্গল ওরফে শয়তান ত্রিভুজ। ( শেষপর্ব আগামী শনিবার)

The Wall-এর ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন

Shares

Comments are closed.