রবিবার, নভেম্বর ১৭

উলপিটের সবুজ শিশুরা কি ভিনগ্রহ থেকে এসেছিল! রহস্য প্রায় হাজার বছরের

রূপাঞ্জন গোস্বামী

ইংল্যান্ড তখন শাসন করছেন রাজা স্টিফেন। শরতের সকাল। ইংল্যান্ডের সাফোক কাউন্টির উলপিট গ্রামের লোকজন মাঠে নেমে পড়েছেন ধান কাটতে। গ্রামের অদূরে জঙ্গল। সেখানে নেকড়ের বাস, তাই ওই জঙ্গলে গ্রামবাসীরা কেউ যান না।

হঠাৎ একজন গ্রামবাসী চিৎকার করে ওঠেন। জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসছে দুটি বাচ্চা ছেলেমেয়ে। ছেলেটির বয়স বছর সাতেক আর মেয়েটি নয়ের কাছাকাছি। তাদের পরনে অদ্ভুত পোষাক এবং তাদের গায়ের রঙ সবুজ। গ্রামের মানুষ কালো, সাদা আর তামাটে মানুষ দেখেছেন। সবুজ রঙের মানুষ দেখে তাঁরা হতবাক হয়ে যান। এত মানুষ দেখে শিশু দু’টিও আতঙ্কে লুকিয়ে পড়ে পাথরের আড়ালে।

ইংল্যান্ডের উলপিট গ্রাম (এখন )

 গ্রামবাসীরা ঘিরে ফেলেন তাদের

কেউ কেউ বলেন এরা শয়তানের ছেলে মেয়ে , এদের মেরে ফেলা উচিত। কিন্তু দু’টি শিশুকে বুকে আগলে রাখেন মাঝবয়সী এক রমণী। অদ্ভুত দর্শন দু’টি শিশুকেই ভীষণ ক্ষুধার্ত এবং ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। তিনি তাদের খাবার দেন। কিন্তু শিশুদুটি খেতে চায় না। খাবার হাতে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।

তাঁরা কী একটা দুর্বোধ্য  ভাষায় কথা বলছিল। যা কেউ বুঝতে পারছিল না। অগত্যা গ্রামবাসীরা শিশুদুটিকে নিয়ে যায় স্থানীয় জমিদার স্যার রিচার্ড ডি কেন-এর বাড়িতে। সেখানে তাদের অনেক ভালো ভালো খাবার দেওয়া হলেও, তারা সেই খাবার ছোঁয় না। জমিদারের লোকেরা বিভিন্ন খাবার সামনে এনে রাখেন, যেটা পছন্দ যদি সেটা খায়।

কয়েকদিন পর শিশু দুটির চোখ পড়ে শিমের দিকে। গোটা গোটা শিম গাছ থেকে ছিঁড়ে তারা গোগ্রাসে খেতে থাকে। উদ্ধারকারী রমণী তাদের শিখিয়ে দেন কীভাবে শিমের বীজ খুলে খেতে হয়। এরপর বেশ কিছুদিন ধরে তারা কেবল শিমের বীজই খেতে থাকে। কিন্তু ছোট ছেলেটি দিন দিন রোগা আর অসুস্থ হয়ে যেতে থাকে। তার মনমরা ভাবও আর কাটে না। কিছুদিনের মধ্যেই দিদির কোলে মাথা রেখে মারা যায় ভাইটি।

মেয়েটি কিন্তু বেঁচে যায়। শিমের বীজের পাশাপাশি অন্যান্য খাবারও সে খেতে শুরু করে। কয়েক মাসের মধ্যে তার গায়ের সবুজ রঙ হারিয়ে যায়,ফিরে আসে ত্বকের স্বাভাবিক রঙ। মেয়েটিকে ইংরেজি ভাষা শেখানো হতে থাকে। পরিবেশের সাথে কোনওমতে খাপ খাইয়ে নিলেও মেয়েটি সারাক্ষণ উদাসীন থাকে। কোনও কাজেই যেন তার মন নেই।

রহস্য বাড়িয়ে দিলো সবুজ কন্যা

মেয়েটি ইংরেজিতে কথা বলা শেখার পর সন্ধান মেলে এক গভীর রহস্যের। তাকে তার অতীত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে, মেয়েটি গ্রামবাসীদের এক অদ্ভুত  কাহিনী শোনায় তারা নাকি এসেছিল এমন এক জায়গা থেকে যে জায়গাটি সব সময় কুয়াশাচ্ছন্ন থাকতো। সেখানের সূর্যের আলো ছিল গোধূলির মতো নরম। সেখানকার সব মানুষের গায়ের রঙ ছিল সবুজ। 

মেয়েটি, তাদের গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা এক নদীর কথাও মনে করতে পেরেছিলো। তারা দুই ভাইবোন একদিন তাদের বাবার গরু খুঁজতে নদীর পাশের ফসলের ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে হাঁটছিলো। হঠাৎ পাশের পাহাড়ের গুহা থেকে এক অদ্ভুত  শব্দ শুনতে পায় তারা। শব্দের উৎস খুঁজতে তারা গুহায় ঢোকে। কিন্তু গুহার অলিগলির মধ্যে হারিয়ে যায় তারা।

নেকড়ের গুহা

দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে গুহার মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে তারা এক সময় গুহার অন্য প্রান্তে এসে পৌঁছয়। প্রখর সূর্যের আলোতে চোখ ধাঁধিয়ে যায় দু’জনের। হতবুদ্ধি অবস্থায় কিছুক্ষণ গুহার মুখে শুয়ে থাকে শিশুদুটি। তারপর উলপিটের কৃষকদের ক্ষেতে কাজ করার শব্দ শুনতে পেয়ে সেদিকেই হাঁটতে শুরু করে তারা।

সব কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে যায় গ্রামের লোকজন। সবুজ চামড়ার মানুষদের গ্রাম খুঁজতে বের হয়ে যান গ্রামবাসীরা। কিন্তু মেয়েটির বর্ণনা মতো এগিয়ে একটি নদী ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পান না গ্রামবাসীরা।

শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও চলছে ঘটনাটির ব্যাখ্যা

● কেউ বলেছেন, বাচ্চা দুটো ছিল নরফোক কাউন্টির অত্যাচারী জমিদার বা আর্লের আত্মীয়। তাদের সম্পত্তি হাতিয়ে নিতে অনাথ শিশুদের খাবারে আর্সেনিক মেশান আর্ল। বিষের প্রভাবে দুই শিশুর গায়ের রং হয়ে যায় সবুজ। কথাবার্তাও হয়ে যায় অসংলগ্ন। পরে কারও সাহায্যে নরফোক থেকে পালিয়ে উলপিট-এ চলে আসে শিশু দুটি।

●কেউ বলেছেন,  ওই দুই শিশু এসেছিল উলপিটের পাশের গ্রাম সেন্ট মার্টিন থেকে। গ্রামে যুদ্ধ লাগলে প্রাণ বাঁচাতে খনিগর্ভে লুকিয়ে থাকায় শ্যাওলা লেগে বদলে গিয়েছিল গায়ের রং। কিংবা তারা হয়তো ভুগছিল রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়ায়। যাকে তখন বলা হত গ্রিন সিকনেস। এই রোগের সাথে অপরিচিত ছিলেন গ্রামবাসীরা। তাই সবুজ রঙের শিশু দুটিকে দেখে আতঙ্কে হইচই ফেলে দেন। পরে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পর মেয়েটির ত্বকের স্বাভাবিক বর্ণ ফিরে আসে।

চার্লস ওমান নামে এক গবেষক লিখেছিলেন এদের কথা। তাঁর মনে হয়েছিল শিশুদুটিকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল গুহার ভিতর এবং তাদের নেশগ্রস্থ করে রাখা হত বিশেষ কোনও উদ্দেশ্যে। কোনও ভাবে তারা পালিয়ে আসে।

●পরবর্তী সময়ে কেউ তাদের বলেছেন ভিনগ্রহের মানুষ, কেউ বলেছেন মাটির তলায় বাস করা মানুষ।

 বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন ঐতিহাসিক পল হ্যারিস 

একাদশ-দ্বাদশ শতকে, উত্তর বেলজিয়ামের ফ্ল্যান্ডার্স  থেকে দলে দলে জার্মান বংশদ্ভুত ফ্লেমিশরা এসেছিল ব্রিটেনে শরণার্থী হয়ে। ওই শতকেই, ১১৭৩ সালে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় হেনরি ও  Chief Justiciar  রবার্ট ডি বিউমন্টের মধ্যে একটি যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে প্রাণ হারান অসংখ্য ফ্লেমিশ। যুদ্ধক্ষেত্রটি  ছিল সেন্ট এডমন্টবারির উত্তরে। এখান থেকে মাত্র ১১ কিমি দূরে উলপিট গ্রাম।

প্রাণে বাঁচতে কোনও এক ফ্লেমিশ পরিবার হয়তো পালিয়ে এসে উলপিট গ্রামের একটি নেকড়ের গুহায় আশ্রয় নেন। বাবা-মা মারা গেলেও সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় শিশু দুটি। গুহা থেকে বার হবার পথ খুঁজে পায় তারা। অনাহারে থাকতে থাকতে বাচ্চা দুটোর শরীরে Hypochromic anemia/chlorosis/ green sickness হয়েছিল বলে তাদের গায়ের রঙ হালকা সবুজ হয়ে যায়।

গায়ের সবুজ রঙ, ফ্লেমিশ জামা-কাপড় ও  ফ্লেমিশ ভাষার সাথে উলপিট গ্রামবাসীদের পরিচয় না থাকায় তাদের মনে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল। সুষম খাবার পাওয়ার ফলে বাচ্চা দুটোর গায়ের রঙ স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

ঐতিহাসিক পল হ্যারিস

 সত্যিই কী উলপিটে এসেছিল সবুজ শিশুরা!

স্যার রিচার্ড ডি ক্যালনের পারিবারিক ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ডানকান লুকান ঘটনাটির সত্যতা স্বীকার করেছিলেন। তিনি জানান, মেয়েটিকে অ্যাগনেস নামও দেওয়া হয়েছিল। খ্রিস্টধর্মে দীক্ষাও দেওয়া হয়েছিল।  জমিদার স্যার রিচার্ড ডি কেনের বাড়িতে মেয়েটি বহুদিন সেবিকা হয়ে থাকেন। পরে বড় হয়ে মেয়েটি নরফোক কাউন্টির এক যুবককে বিয়ে করে, যিনি ছিলেন রাজা দ্বিতীয় হেনরির কর্মী।

 এই বিজ্ঞানীই আবার বাড়িয়ে দিলেন রহস্য

অ্যানালগ ম্যাগাজিনে ডানকান লুকান  ঘটনাটি নিয়ে একটি প্রবন্ধ লেখেন ১৯৯৬ সালে। তিনিই প্রথম বলেন সবুজ শিশুগুলি ভিনগ্রহের বাসিন্দা। বাকি সবাই ভিনগ্রহে ফিরে গেলে ওরা ফিরতে পারেনি। তিনি বলেন, শিশুগুলি যে গ্রহে বাস করত সেই গ্রহে সূর্যের আলো খুব কম পড়ে।

উলপিট গ্রামের প্রতীকে আজও আছে সবুজ শিশুদুটি

ওদের গায়ের রঙ সবুজ, কারণ পৃথিবীর উদ্ভিদের পাওয়া ক্লোরোফিল সেই গ্রহের মানুষদের শরীরেও সক্রিয় ছিল। পৃথিবীতে যেমন কিছু ফোটোট্রপিক ব্যাকটেরিয়ার (Rhodobacter capsulatusChromatiumChlorobium ইত্যাদি) মধ্যে আজও অন্যভাবে সক্রিয় ক্লোরোফিল দেখতে পাওয়া যায়।

ডানকানের প্রবন্ধ আবার রহস্যকে বাঁচিয়ে তুলল। এত ব্যাখ্যা থাকা সত্ত্বেও উলপিটের শিশুদের কাহিনী তাই আজও রহস্যের তিমিরেই রয়ে গেছে। এবং রহস্যটিকে ক্রমশ জটিল করে চলেছে শিশুদুটির গায়ের সবুজ রঙ

Comments are closed.