খুন হয়েছিলেন মাইকেল জ্যাকসন, মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা হয়েছিল ‘হোমিসাইড’

মাইকেলের জীবনের শেষ দিনগুলির কথা জানলে শিউরে উঠতে হয়।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    মৃত্যুর পর মাইকেলের দেহ পরীক্ষা করে লস অ্যাঞ্জেলস কাউন্টির department of medical examiner- coroner      মাইকেলের মৃত্যুর কারণ হিসাবে লিখেছিল homicide অর্থাৎ খুন। প্রপোফল ও বেনজোডায়াজিপাইন নামক দুটি ড্রাগের তীব্র বিষক্রিয়ায় মাইকেলের মৃত্যু হয়েছে। মাইকেলের চিকিৎসক ডঃ কনরাড মুরে হলেন খুনি। তবে অনিচ্ছাকৃত খুন। যেটিকে বিচারের সময় কোর্ট বলেছে  involuntary manslaughte

    গ্রেফতার হয়েছিলেন মাইকেল জ্যাকসনের চিকিৎসক কনরাড মুরে
    জীবনের শেষ দিন গুলো খুব অস্থির কেটেছিল মাইকেলের

    ধীরে ধীরে তীব্র অর্থাভাব গ্রাস করছিলো তাঁকে। প্রাণপণে  অর্থনৈতিক সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন মাইকেল। লন্ডনের শো-দিয়ে কামব্যাক করতে চাইছিলেন।  লন্ডনে ২০০৯ সালের জুলাই থেকে ২০১০ সালের মার্চ পর্যন্ত চলার কথা ছিলো তাঁর কামব্যাক সিরিজের। এক কোটির মতো দর্শক আশা করছিলেন প্রোমোটাররা।  দুমাস ধরে দিনরাত এক করে রিহার্সাল দিয়ে যাচ্ছিলেন। মাইকেল যে সিরিজকে বলছিলেন final curtain cal। কিন্তু  কেন! মাইকেল  কি বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর জীবনের যবনিকা পতন আসন্ন!

    চারিদিকে তখন সাজো সাজো রব। অন্য দিকে ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কায়  ক্রমশ ঘরের মধ্যে গুটিয়ে যাচ্ছিলেন বিশ্বের জনপ্রিয়তম নক্ষত্র মাইকেল। এই সময় মাইকেলের নিজস্ব বেডরুমে মাইকেলের  তিন ছেলে মেয়ে ও নিজস্ব চিকিৎসক ডঃ মুরে ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে পারতেন না। এমনকী সাফাইকর্মী ও পরিচারকদেরও ঢুকতে দেওয়া হত না।

     ২০০৯ সালের ২৫ জুন

    ২৪শে জুন স্টেপল সেন্টারে রিহার্সাল করে, শো-এর প্রোমোটারদের সঙ্গে মিটিং সেরে জ্যাকসন ফেরেন লস অ্যাঞ্জেলসের নর্থ ক্যারলউড ড্রাইভে অবস্থিত তাঁর প্রাসাদোপম বাড়িতে। পরের দিন দুপুর বারোটা নাগাদ জ্যাকসনকে অচৈতন্য অবস্থায় শোবার ঘরে আবিষ্কার করেন ডঃ মুরে। তাঁর কথায় তখনও জ্যাকসনের শরীর গরম ছিল, নাড়ির গতি  ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ। দেরি না করে মাইকেলের হার্ট পাম্প করতে শুরু করেন ডঃ মুরে।

    এই বিছানায় জ্যাকসনকে অচৈতন্য অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল

    এগারো মিনিট পাম্প করার পরও মাইকেলের সাড়া মেলেনি। যদিও পরে জানা গিয়েছিল কার্ডিওলজিস্ট ডঃ মুরে হার্ট পাম্পের সঠিক নিয়মই নাকি জানতেন না। জ্যাকসনের পিঠের তলায় একহাত ও বুকে একহাত রেখে পাম্প করেছিলেন। ডঃ মুরে পুলিশকে জানিয়েছিলেন ঘরে ল্যান্ডলাইন না থাকায় তিনি আপৎকালীন নাম্বার ‘৯১১’ তে ফোন করতে পারেননি। জ্যাকসনের দেহরক্ষীদের ফোন করেও পাননি। শেষে নিজে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে গিয়ে দেখা পান জ্যাকসনের রাঁধুনির।  জ্যাকসনের রাঁধুনি ডেকে দেন জ্যাকসনের দেহরক্ষীদের।

    তারা গিয়ে ৯১১ নাম্বারে ফোন করে ডেকে আনে প্যারামেডিকদের। তাঁরা এসে জ্যাকসনের জ্ঞান ফেরানোর প্রাথমিক চেষ্টা করলেও অসফল হন। নিথর জ্যাকসনকে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ছোটে গ্রিন করিডর দিয়ে রোনাল্ড রেগন ইউসিএলএ  মেডিক্যাল সেন্টারে। কিন্তু এরই মধ্যে নষ্ট হয়ে গিয়েছে অমূল্য তিরিশটা মিনিট। ২০০৯ সালের ২৫ জুন, দুপুর দুটো ছাব্বিশে বিশ্ব কেঁপে ওঠে সেই নিদারুণ দুঃসংবাদে

     “জ্যাকো ইজ ডেড”

    মৃত্যুর পর মাইকেল জ্যাকসনের ঘরে ঢুকে হতবাক হয়েছিল লস অ্যাঞ্জেলসের পুলিশ! কে বলবে এটা ছিলর পপ সম্রাট ও শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ পারফর্মার মাইকেল জ্যাকসনের শয়নকক্ষ। এ যেন এক ছন্নছাড়া মাদকাসক্তের ঘর। এলোমেলো বিছানা। সারা ঘরে দুর্গন্ধ। বিছানার পাশের তাকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা চেতনানাশক ওষুধের ভায়াল ও সিরিঞ্জ। হাত বাঁধার রাবারের কর্ড। বিছানার পাশে অক্সিজেন সিলিন্ডার। হ্যাঙারে রক্তমাখা সাদা জামা। চমকে গিয়েছিলেন ঘরে উপস্থিত সংবাদমাধ্যমের লোকেরাও।

    হ্যাঙারে ঝুলছে মাইকেল জ্যাকসনের রক্তমাখা সাদা জামা
    ডঃ কনরাড মুরে বিচারককে বলেছিলেন শিউরে ওঠার মতো কিছু কথা

    মাইকেল জ্যাকসনের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডঃ মুরে কোর্টে জানিয়ে ছিলেন জীবনের শেষদিন গুলিতে জ্যাকসন ভীষণ সন্দেহবাতিক হয়ে গিয়েছিলেন। পরিচারকরা ঘর পরিষ্কার করতে এসে তাঁর অন্তর্বাস চুরি করে নিলামে বেচে দিতে পারে, এমন অবাস্তব কথাও ভাবতে শুরু করেছিলেন মাইকেল।তাই তিনি তাঁর অন্তর্বাস কাউকে কাচতে দিতেন না।

    বিচারকের কাছে দেওয়া ডঃ মুরের হলফনামা বলছে, জীবনের শেষ কয়েক বছর মাইকেল সম্পূর্ণ ভাবে ড্রাগ-অ্যাডিক্ট হয়ে গিয়েছিলেন এবং সেই জন্যই তাঁর দরকার ছিল একজন বিশ্বস্ত ডাক্তারের। তাই তিনি বেছে নিয়েছিলেন ডঃ মুরেকে। মাসে দেড় লক্ষ ডলার মাইনের লোভ সামলাতে পারেননি ডঃ মুরে। মাইকেলের ব্যক্তিগত চিকিৎসকের চাকরি করতে এসে হয়ে উঠেছিলেন জ্যাকসনের  থেকে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আর এটাই ছিল মাইকেল জ্যাকসনের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। সেই দিন থেকেই মাইকেল জ্যাকসন এক পা এক পা করে এগিয়ে গিয়েছিলেন মৃত্যুর দিকে।

    বিছানার পাশে অক্সিজেনের সিলিন্ডার, মাস্ক ও ড্রাগ নেওয়ার জন্য হাত বাঁধার কর্ড

    ডঃ মুরে কোর্টে বলেছেন, একমাত্র তিনি মাইকেল জ্যাকসনের পুরুষাঙ্গে রোজ রাতে হাত দিতেন ক্যাথিটার পরানোর জন্য কারণ মাইকেল দুশ্চিন্তায় বিছানা ভিজিয়ে ফেলতেন। ডঃ মুরে এতটাই ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন পপ-সম্রাটের। কিন্তু  চিকিৎসক যখন রোগীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে ওঠেন, তখন বিস্মৃত হন তাঁর পেশার গুরুত্বের কথা। আর রোগী যদি মাদকাসক্ত হন এবং রোগীর নাম যদি হয় মাইকেল জ্যাকসন হয় তাহলে তো কথাই নেই!

    এ ছাড়াও, জ্যাকসনকে নিয়মিত দেওয়া হতো ওমিপ্রাজোল, হাইড্রোকোডন, পারোক্সিটাইন, কারিসোপ্রোডল এবং হাইড্রোমরফোন।

    এই সেই ড্রাগ যা টানা ষাট দিন মাইকেল জ্যাকসনকে দেওয়া হয়েছিল

    প্রত্যেকদিন তীব্র চেতনানাশক ওষুধের ককটেল নিতেন চরম অনিদ্রার রুগী মাইকেল জ্যাকসন। নিজের হাতে  ড্রাগের এই ককটেল বানিয়ে দিতেন ডঃ মুরে। প্রথম দিকে ডঃ মুরে ইনজেকশন দিলেও শেষের দিকে নিজেই ড্রাগের ককটেল নিজে বানিয়ে নিজের শরীরে পুশ করতেন মাইকেল জ্যাকসন। এবং এই ভয়ঙ্কর ব্যাপারটি জেনে বুঝে হতে দিতেন রোগীর প্রাণ বাঁচানোর শপথ নেওয়া ডঃ মুরে।

    ডঃ মুরে নিজেই স্বীকার করেছেন, মৃত্যুর আগে মাইকেল জ্যাকসনকে ঘুম পাড়াতে তিনি টানা ষাট দিন তীব্র নার্ভ এজেন্ট প্রপোফল মাইকেলের শরীরে ঢুকিয়ে ছিলেন। যে ড্রাগটি ব্যবহার করা হয় অপারেশনের আগে রোগীকে অজ্ঞান করার জন্য। ডঃ মুরে অবশ্য কোর্টে বারবার বলেছেন জ্যাকসন নিজে নিজেকে খুন করেছেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ‘জেনেশুনে’ রোগীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া বা আইনি ভাষায় ইনভলান্টারি ম্যানস্লটার-এর অপরাধে দু’বছরের জেল হয় ডঃ মুরের।

    যিনি ‘ইউ আর নট অ্যালোন’ গানটি গেয়ে সারা বিশ্বের কোটি কোটি হতাশ মানুষকে এক লহমায় জীবনে ফিরিয়ে এনেছিলেন, তিনিই যে সবার অলক্ষ্যে জীবন থেকে ক্রমশ  দূরে সরে যাচ্ছেন, এটা টের পাননি কেউই। একজন ছাড়া। তিনি ডঃ কনরাড মুরে। মাইকেল জ্যাকসনের যে দ্রুত ও নির্মম মৃত্যু আসন্ন সেটা জানতেন, মাসে দেড় লক্ষ ডলারের নেশায় বুঁদ থাকা ডঃ মুরে। যিনি জীবন দিতে এসে জীবন নিয়ে নিলেন ইতিহাসের সর্বকালের সর্বসেরা পারফর্মার মাইকেল জ্যাকসনের।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More