থ্রিলারের থেকেও কম নয় ব্রুস লি’র মৃত্যু, খুন হয়েছিলেন? (দ্বিতীয় পর্ব)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    (…. রেমন্ড বেটির শয়নকক্ষে ব্রুসকে দেখেন ,তখন ব্রুস সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় মাটিতে পাতা ম্যাট্রেসে শুয়েছিলেন। বেটি ব্রুসের শরীরের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপছিলেন।)

    (দ্বিতীয় পর্ব)

    রাত ৯.৪৫ ( ২০ জুলাই,১৯৭৩)

    প্রেমিকা বেটি আর তাঁর বেশিরভাগ ছবির প্রডিউসার রেমন্ড চাওয়ের ডাকে ব্রুস আর সাড়া দেননি। রেমন্ড চাও বুঝলেন তাঁর ছবির মহাতারকা আর নেই। রেমন্ড ঝুঁকে পড়ে ব্রুসের প্রাণহীন শরীর দেখছেন। রেমন্ড আর বেটি, দুজনকে কি  গ্রাস করছে নতুন এক আতঙ্ক! হংকং-এর সবচেয়ে জনপ্রিয় মানুষটি মৃত অবস্থায় পড়ে আছে তাঁর প্রেমিকার ঘরের মেঝেতে, বিবস্ত্র অবস্থায়।

    সাক্ষী তাঁরা মাত্র দু’জন। সারা বিশ্বের প্রেস তাঁদের দোষী করবে। নতুন স্ক্যান্ডাল রটবে। দু’জনের কেরিয়ার শেষ হয়ে যাবে। রেমন্ডের কি মনে হয়েছিল, কি কুক্ষণে তিনি এসেছিলেন বেটির অ্যাপার্টমেন্টে? ব্রুস লি’র মৃত্যু তো অন্য জায়গায় হতে পারতো!


    ব্রুস লি সঙ্গে ছেলে ব্র্যান্ডন আর স্ত্রী লিন্ডার কোলে মেয়ে শ্যানন

    রেমন্ড ব্রুস লি’কে আগে কাপড় পরাবেন ঠিক করলেন। তাঁকে শার্ট পরালেন, ইউরোপিয়ান স্টাইলের ট্রাউজার পরালেন। হাইহিল প্ল্যাটফর্ম-শু পরালেন। ব্রুসের স্ত্রী লিন্ডাকে ফোন করলেন না এই কয় ঘণ্টায়, একবারও। বললেন না ব্রুস গুরুতর অসুস্থ। আশপাশের লোক ডেকে ব্রুসকে  ব্যাপটিস্ট হসপিটালে নিয়ে গেলেন না।  রেমন্ড জানেন ১০ মে’ র কথা। তা জেনেও ক্রনিক সেরিব্রাল ইডিমার পেশেন্টকে বাড়িতে ফেলে রাখলেন।

    যেখানে ১০ মে ব্রুসকে ভর্তি করা হয়েছিল, সেই ব্যাপটিস্ট হসপিটাল বেটির বাড়ি থেকে গাড়িতে মাত্র তিন মিনিট। অনেক পরে রেমন্ড চাও, বেটিকে বেটির নিজস্ব চিকিৎসককে ডাকতে বললেন। বেটি ডাক্তার ডাকলেন। এলেন বেটির ডাক্তার ব্যাপটিস্ট হসপিটালেরই ডাক্তার ইউজিন চু পো হুয়ে। তিনি ঘুণাক্ষরেও জানতেন না কাকে তিনি দেখতে আসছেন, এবং পেশেন্টের অবস্থা কেমন বেটি তাঁকে বলেনও নি।


    এই সেই বাড়ি ,সেকেন্ড ফ্লোরে বেটির ফ্ল্যাট

    ধোঁয়াশা:

    ● ডাক্তারকে ফোন না করে, রেমন্ডের কেন  ব্রুস লিকে জামা কাপড় পরানোই প্রথম কর্তব্য বলে মনে হল? 

    ● অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তিকে ছোঁয়া পুলিশি আইন বিরোধী, কেন আইন ভাঙলেন রেমন্ড?

    বেটির বাড়ি থেকে ব্যাপটিস্ট হসপিটাল গাড়িতে মাত্র তিন মিনিট (যেখানে ১০ মে ব্রুস ভর্তি হয়েছিলেন) সেখানে ব্রুসকে দু’জনে  নিয়ে গেলেন না কেন?

     দুই মাস আগে সেরিব্রাল ইডিমায় প্রায় মরো মরো  ব্রুসকে বেটির বাড়িতে বিনা চিকিৎসায় ফেলে রাখলেন কেন রেমন্ড ও বেটি ?

    ●ব্রুস অসুস্থ দেখেও কী ভাবে হোটেলে ডিনার করতে গেলেন রেমন্ড?

      ব্রুস অসুস্থ হওয়ার  প্রায় ঘণ্টা তিনেক পরে রেমন্ড চাও, বেটিকে বেটির নিজস্ব চিকিৎসককে ডাকতে বললেন। এটা সন্ধ্যা ৭ টার সময় করা হয়নি কেন?

    বেটির ডাক্তার ইউজিন চু পো হুয়ে কাকে দেখতে আসছেন এবং পেশেন্টের অবস্থা কেমন,সেটা বেটি তাঁকে বলেননি কেন ?


    রেমন্ড চাওয়ের সঙ্গে ব্রুস

    রাত ১০.০৫

    ব্রুস লি এখন বিছনায় শুয়ে । ডাক্তার ইউজিন চু পো হুয়ে ব্রুসের পালস পেলেন না। হার্টবিটও শুনতে পেলেন না। ব্রুস শ্বাসও নিচ্ছেন না। তিনি দশ মিনিট ব্রুসের হৃদপিন্ড পাম্প করলেন, সফল হলেন না। রেমন্ড বার বার ডাক্তারকে বলেন ব্রুসকে ব্যাপটিস্ট হসপিটালে গাড়ি করে নিয়ে যেতে। ডাক্তার অ্যাম্বুলেন্স ডাকেন। যদিও অ্যাম্বুলেন্স কর্মীদের বলেন না কাকে নিয়ে যেতে হবে। বেটির ডাক্তার ব্রুসের নিথর দেহ ৩ মিনিট দূরের ব্যাপটিস্ট হসপিটালে না পাঠিয়ে, পাঠিয়ে দিলেন ২৫ মিনিট দূরের কুইন এলিজাবেথ হসপিটালে।

     ধোঁয়াশা:  

    ● রেমন্ড বার বার ডাক্তারকে বলেন ব্রুসকে ব্যাপটিস্ট হসপিটালে গাড়ি করে নিয়ে যেতে। এত  দেরীতে কেন,নিজেরাই তো নিয়ে ব্রুসকে মাত্র তিন মিনিট দুরের হসপিটালে নিয়ে যেতে পারতেন?

    ডাক্তার ব্রুসের নিথর দেহ ৩ মিনিট দূরের ব্যাপটিস্ট হসপিটালে না পাঠিয়ে, কেন পাঠিয়ে দিলেন ২৫ মিনিট দূরের কুইন এলিজাবেথ হসপিটালে ?

    ● তিনি কি বুঝতে পেরেছিলেন ব্রুস লির মৃত্যু স্বাভাবিক নয়?  তাই তিনি চাননি স্ক্যান্ডালটিতে  তাঁর কর্মক্ষেত্র ব্যাপটিস্ট হসপিটাল জড়িয়ে যাক?

    ডাক্তার ইউজিন চু পো হুয়ে অ্যাম্বুলেন্স কর্মীদের ডাকেন, কিন্তু বলেন না কাকে নিয়ে যেতে হবে, কেন?

    বেটির বাড়ি থেকে গাড়িতে মাত্র তিন মিনিট দূরে ছিল এই ব্যাপটিস্ট হসপিটাল

    অ্যাম্বুলেন্স আসার আগেই রেমন্ড চাও নেমে পড়লেন  চিত্রনাট্যকারের ভূমিকায়। পইপই করে বোঝালেন বেটি যেন প্রেসের কাছে মুখ না খোলেন। বেটিকে সব শিখিয়ে পড়িয়ে, ব্রুসের স্ত্রী লিন্ডাকে ফোন করলেন।
    – “তুমি এক্ষুনি কুইন এলিজাবেথ হসপিটালে যাও। ব্রুস কে সেখানে অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।”
    – “কি হয়েছে ব্রুসের ! ! ” লিন্ডার গলায় আশঙ্কা।
    – “আমি জানিনা ঠিক, মনে হয় সেদিনের মতো কিছু”

    ধোঁয়াশা: 

    ●কেন রেমণ্ড বেটিকে পইপই করে বোঝালেন, বেটি যেন প্রেসের কাছে মুখ না খোলেন? মুখ খুললে কি বেরিয়ে যাবে? তাতে কে কে বিপদে পড়বে?

     বেটিকে সব শিখিয়ে পড়িয়ে ব্রুসের স্ত্রী লিন্ডা কে ফোন করলেন রেমন্ড। এতো পরে কেন? এটা সন্ধ্যা ৭ টায় করলেন না কেন?

    রাত ১০,৩০

    অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার এবং  দুজন প্যারামেডিক বেটির ঘরে ঢোকেন। সিনিয়র প্যারামেডিক পান তাক সুন  ব্রুস লিকে চিনতেন না । তিনিও ব্রুস লি’র হার্ট পাম্প করেন। কৃত্রিম ভাবে অক্সিজেন দেবার চেষ্টা করেন।  বিফল হয়ে অ্যাম্বুলেন্সে তোলেন ব্রুস লি কে। অ্যাম্বুলেন্সে ওঠেন রেমন্ড চাও আর ডাক্তার। প্যারামেডিকরা পুরো পথে ব্রুস লিকে বাঁচাবার চেষ্টা করতে থাকেন। রেমন্ড চাও আর ডাক্তার সব জেনেও দেখতে থাকেন ,একটি মৃতদেহে প্রাণ ফেরানোর অবান্তর চেষ্টা।

    ধোঁয়াশা: 

     বেটির ডাক্তার তো আগেই দেখেছেন ব্রুস মৃত। দেহ সরাসরি হসপিটালে না পাঠিয়ে, আবার প্যারামেডিকদের দিয়ে প্রান বাঁচানোর নাটক মঞ্চস্থ হলো কেন? 

    বেটির বাড়ি থেকে ২৫ মিনিট দূরে কুইন এলিজাবেথ হসপিটালে আনা হয় ব্রুসকে

    ব্রুস লি’র স্ত্রী লিন্ডা, হসপিটালে অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছনোর পনেরো মিনিট আগেই এসে গেছিলেন। অপেক্ষা করতে করতে তিনি যখন হসপিটালের রিসেপশনে জিজ্ঞেস করলেন তাঁর স্বামীর ভর্তির হওয়ার কথা। তখন রিসেপশনে লোকরা বলেছিল ,”কেউ আপনার সঙ্গে ফোনে মজা করেছেন ম্যাম। ব্রুস লির এখানে ভর্তি হওয়ার কোনও খবর নেই”। সবে লিন্ডা বাড়িতে ফোন করতে যাবেন, তখন দেখতে পেলেন প্যারামেডিকরা হুইলওয়ালা স্ট্রেচারে ব্রুস লি’কে ইমার্জেন্সি রুমে নিয়ে যাচ্ছেন। “আমার তখনও মনে হয়নি ব্রুস মারা যাবে,যদিও তাকে মৃতই আনা হয়েছিল।” লিন্ডা পরে বলেছিলেন।

    ধোঁয়াশা: 

       ব্রুস লি’র মতো হাই-প্রোফাইল ব্যক্তির ভর্তির খবর  কুইন এলিজাবেথ হসপিটালে আগে  জানানো হয়নি কেন ?

    ● সাধারণত এসব ক্ষেত্রে পেশেন্ট আসার আগেই হসপিটালে যুদ্ধকালীন তৎপরতা দেখা যায়। সেটা কারও নজরে আসেনি,কেন?

    লিন্ডা দৌড়ে গিয়েছিলেন ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে। যেখানে ব্রুসের হৃদপিন্ডে সরাসরি ইনজেকশন দেওয়া হচ্ছিল। বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হচ্ছিল। লিন্ডাকে হসপিটালের লোকজন ব্রুসের সামনে থেকে সরিয়ে নিতে যেতে চাইছিলেন। কিন্তু লিন্ডা যেতে চাইছিলেন না। চিৎকার করে বলছিলেন,” আমি দেখতে চাই”। মিনিট দশেক পর ডাক্তার ব্রুস লিকে মৃত ঘোষণা করলেন। লিন্ডার কাছে জানতে চাইলেন, লিন্ডা পোস্টমর্টেম চান কিনা। লিন্ডা বললেন, “হ্যাঁ আমি জানতে চাই কেন ব্রুস মারা গেলো।”

    ধোঁয়াশা: 

     ● কুইন এলিজাবেথ হসপিটালের ডাক্তার পোস্টমর্টেমের কথা তুললেন কেন? বুঝেছিলেন এটি অস্বাভাবিক মৃত্যু? লিন্ডা রাজি হলেন কেন? কিছু কি আঁচ করছিলেন?

    রাতের হংকং (জুলাই,,১৯৭৩ )

    রাত ১১.৩০

    হংকংয়ে প্রায় সব টেলিফোন এক সাথে বেজে উঠল। দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লো, বিশ্বকে হতচকিৎ করে দেওয়া সেই খবর।

    মাত্র ৩২ বছর বয়েসে মারা গেলেন হংকং-এর বেতাজ বাদশা ব্রুস লি।  মৃত্যুর কারণ এখনও অজানা। পোস্টমর্টেম রিপোট এখনও পাওয়া যায়নি।

    চিরনিদ্রায় শায়িত মার্শাল আর্ট সম্রাট ব্রুস লি

    সেই রাতে হংকং শহর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল কুইন এলিজাবেথ হসপিটালে। ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বিশ্বের তাবড় তাবড় মিডিয়ার হংকং করেসপন্ডেন্টরা। হসপিটাল ঘিরে ফেলেছিল হংকং পুলিশ। ব্রুসের মৃত্যুর কারণ নিয়ে বিভিন্ন উড়োখবর  উড়ে বেড়াচ্ছিল হংকং-এর আকাশে। চারটি ইংরেজি দৈনিক ও প্রায় পঞ্চাশের ওপর চিনা ভাষার দৈনিকের সাংবাদিকরা, হন্যে হয়ে পৌঁছতে চেষ্টা করছিলেন কুইন এলিজাবেথ হসপিটালের মর্গে রাখা ব্রুস লি’র শরীরের কাছে। (চার পর্বে সমাপ্ত, তৃতীয় পর্ব আগামী শুক্রবার দুপুর ১ টায় )

     তথ্যসূত্র: শেষপর্বে

     এই  লিঙ্কে পড়ুন : থ্রিলারের থেকেও কম নয় ব্রুস লি’র মৃত্যু।খুন হয়েছিলেন? (প্রথম পর্ব)

    দ্য ওয়ালের ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More