আবার তোলপাড় হবে অ্যাটলান্টিক, মিলবে কি জলদস্যু ব্ল্যাক-বেয়ার্ডের গুপ্তধন!

১৭১৬ – ১৭১৮, এই দু’বছরে অবিশ্বাস্য পরিমাণ সম্পদ লুঠ করেছিল জলদস্যু ব্ল্যাক বেয়ার্ড। অনুমান করা হয় আজকের দিনে সেই গুপ্তধনের মুল্য কয়েক লক্ষ কোটি টাকা।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    মাত্র একশো বছর আগেও এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে যাবার জন্য জলপথই ছিল একমাত্র ভরসা। সমুদ্রপথে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি, ওঁত পেতে থাকত আরেক বিপদ। জলদস্যু। প্রাকৃতিক বিপদ থেকে তবুও রক্ষা পাওয়া যেত, কিন্তু জলদস্যুদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব।

    সমুদ্রের গভীরে নিশ্চিন্তে লুঠপাট চালিয়ে, যাত্রী ও নাবিকদের হত্যা করে, হতভাগ্যদের লাশ সমুদ্রে ফেলে দিত জলদস্যুরা। তারপর তাদের জলযান নিয়ে ভেসে বেড়াত পরের শিকার ধরার জন্য। লুঠপাট, হত্যা ও নৃশংসতা দিয়ে জলদস্যুরা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল মাঝ দরিয়ায়। জমিয়ে ছিল সুবিশাল সম্পদ। যে সম্পদের শতকরা নব্বইভাগ পরবর্তী সময়ে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

    যেমন খুঁজে পাওয়া যায়নি পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত জলদস্যু ব্ল্যাক বেয়ার্ডের গুপ্তধন। ১৭১৬ – ১৭১৮, এই দু’বছরে অবিশ্বাস্য পরিমাণ সম্পদ লুঠ করেছিল জলদস্যু ব্ল্যাক বেয়ার্ডে। অনুমান করা হয় আজকের দিনে সেই গুপ্তধনের মুল্য কয়েক লক্ষ কোটি টাকা।

    কে এই ব্ল্যাক-বেয়ার্ড!

    আমেরিকার ওপর দখলদারি নিয়ে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মধ্যে ‘কুইন অ্যানি’ যুদ্ধ হয়েছিল। আমেরিকার রেডইন্ডিয়ানরাও জড়িয়ে পড়েছিল এই যুদ্ধে। এই যুদ্ধে স্পেন, ফ্রান্সের পক্ষ নিয়েছিল। আমেরিকা জুড়ে ব্যাপক লুঠতরাজ ও গণহত্যা চালিয়েছিল স্প্যানিশরা। তাদের ক্যাম্পে জমা করেছিল টন টন সোনা রূপা আর রত্নরাজি।

    এই ‘কুইন অ্যানি’ যুদ্ধের সময় ইংরেজ জাহাজের এক মারকুটে নাবিক ছিল ক্যাপ্টেন এডোয়ার্ড টিচ। যুদ্ধ চলেছিল ১৭০২ থেকে ১৭১৩ সাল পর্যন্ত। যুদ্ধ শেষে, ১৭১৬ সালে ক্যাপ্টেন টিচ যোগ দিয়েছিল তখনকার কুখ্যাত জলদস্যু ক্যাপ্টেন বেঞ্জামিন হর্নিগোল্ড-এর দলে। বাহামার নিউ প্রোভাইডেনসের নির্জন দ্বীপ ছিল জলদস্যু হর্নিগোল্ডের বেসক্যাম্প।

    ক্যাপ্টেন হর্নিগোল্ড, জলদস্যুদের একটি জাহাজের ক্যাপ্টেন করে দিয়েছিল ক্যাপ্টেন টিচকে। পরে আরও কিছু ইংরেজ জাহাজ যোগ দিয়েছিল জলদস্যুদের এই নৌবহরে। জলদস্যুদের এই নৌবহরের মধ্যে একটি জাহাজের কম্যান্ডার ছিল আরেক কুখ্যাত জলদস্যু টেড বনেট। বেশ চলছিল হর্নিগোল্ড-এডোয়ার্ড টিচ-টেড বনেট ত্রয়ীর দস্যুবৃত্তি।

    কিন্তু লুঠ করা সম্পদের বখরা নিয়ে লেগেছিল খুনোখুনি। নৃশংসতার দিক থেকে জলদস্যুদের মধ্যে ক্যাপ্টেন টিচ ছিল সেরা। ক্যাপ্টেন টিচের হাতে প্রাণ হারাবার ভয়ে ক্যাপ্টেন হর্নিগোল্ড ১৭১৭ সালের শেষে জলদস্যু জীবন থেকে সরে গিয়েছিল। ক্যাপ্টেন হর্নিগোল্ড জলদস্যু জীবন থেকে সরে যাওয়ার পর ক্যারিবিয় ও উত্তর অ্যাটলান্টিক সমুদ্রের একছত্র অধিপতি হয়ে উঠেছিল ক্যাপ্টেন টিচ। ঘন কালো দাড়ির জন্য ক্যাপ্টেন টিচের নতুন নাম হয়ে গিয়েছিল ব্ল্যাক বেয়ার্ড।

    ক্যাপ্টেন টিচ ওরফে ব্ল্যাক বেয়ার্ড।

    টিচ ওরফে ব্ল্যাক বেয়ার্ড, একজন প্রচণ্ড ধুর্ত জলদস্যু নেতা ছিল। সে জানত তাকে দেখতে ভয়ানক। নৌ ডাকাতি করার সময় ইচ্ছে করে টুপির দুদিকে দুটি রং-মশাল জ্বালিয়ে রাখত। যাতে বিপদগ্রস্থ জাহাজের নাবিকরা ভয় পায়। ইচ্ছা করেই দলে ও সর্বত্র, প্রথম থেকেই একটা ভয়ঙ্কর খুনির ইমেজ গড়ে তুলেছিল। তার নিষ্ঠুরতা আর বেপরোয়া জীবনযাপনের মধ্যে দিয়ে। ফলে লুঠতরাজে বাধা আসত না।

    ভিনদেশি জাহাজের মাঝিমাল্লারা দূর থেকে ব্ল্যাক বেয়ার্ডের জাহাজের পতাকা দেখলেই ভয়ে আধমরা হয়ে যেত। ওয়েস্টইন্ডিজ ও নর্থ আমেরিকার অ্যাটলান্টিক উপকূলে নৃশংসভাবে লুঠতরাজ চালাত ব্ল্যাক বেয়ার্ড। ব্ল্যাক বেয়ার্ড দখল করে নিয়েছিল এক ফরাসি জাহাজ। নাম দিয়েছিল, ‘কুইন অ্যানিজ রিভেঞ্জ’। ফরাসী জাহাজে সে বসিয়েছিল ৪০টি কামান। ‘কুইন অ্যানি’ যুদ্ধে অব্যবহৃত গোলা-বারুদ নৌ-ডাকাতির কাজে লাগাতে শুরু করেছিল ব্ল্যাক বেয়ার্ড। দস্যুবৃত্তির ঘাঁটি করেছিল বাহামা আর নর্থ ক্যারোলিনা।

    এরকমই দেখতে ছিল ব্ল্যাক বেয়ার্ডের জাহাজ “কুইনস অ্যানিজ রিভেঞ্জ’
    চোরের ওপর বাটপাড়ি

    ‘কুইন অ্যানি’ যুদ্ধের শেষে, স্প্যানিশরা মেক্সিকো আর দক্ষিণ আমেরিকা থেকে লুঠ করা কোটি কোটি পাউন্ডের সম্পদ স্পেনে নিয়ে যাওয়ার কথা ভেবেছিল। কিন্তু সাগরে ওঁত পেতে আছে দস্যু ব্ল্যাক বেয়ার্ড। তাই স্পেনে ফেরার জন্য স্প্যানিশরা জন্য দুর্যোগপুর্ণ আবহাওয়া বেছে নিয়েছিল। তারা ভেবেছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে ব্ল্যাক বেয়ার্ড স্প্যানিশ জাহাজে হানা দেবে না। নিজেদের জাহাজ বাঁচাবার চেষ্টা করবে।

    কিন্তু স্প্যানিশদের কৌশল আগেই আঁচ করে ফেলেছিল ধুরন্ধর ব্ল্যাক বেয়ার্ড। দুর্যোগের মধ্যেই স্প্যানিশ জাহাজের জন্য মাঝ সমুদ্রে অপেক্ষা করছিল ব্ল্যাক বেয়ার্ড ও তাঁর সঙ্গীরা। ঠিক সময়ে, মাঝ সমুদ্রে, ঠান্ডা মাথায় স্পেনের জাহাজ থেকে স্প্যানিশদের লুঠ করা কোটি কোটি পাউন্ডের সম্পদ মাঝ সমুদ্রে লুঠে নিয়েছিল ব্ল্যাক বেয়ার্ড। ব্ল্যাক বেয়ার্ডের সম্পদের পরিমাণ আকাশ ছুঁয়েছিল।

    সমুদ্রবক্ষে জলদস্যুদের আস্ত একটা সিন্ডিকেট তৈরি করে ফেলেছিলব্ল্যাক বেয়ার্ড। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চার্লস টাউন বন্দর, সাউথ ক্যারোলিনা ও অন্যান্য বন্দরে তোলা আদায় করত ব্ল্যাক বেয়ার্ড। আর নিজে, নর্থ ক্যারোলিনা সংলগ্ন বিউফোর্টের সমুদ্রে তার জাহাজ কুইন অ্যানিস রিভেঞ্জ নিয়ে ওঁত পেতে থাকত শিকারের অপেক্ষায়

    এই এলাকা জুড়ে ব্ল্যাক বেয়ার্ড চালাত তার দস্যুবৃত্তি।
    পাপের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল নৃশংসভাবেই

    বন্ধু জলদস্যু ক্যাপ্টেন বনেটের সঙ্গে এলাকা ভাগ করে, ১৭১৮ সালে নর্থ ক্যারোলিনার বাথ টাউনে বাস করতে শুরু করেছিল ব্ল্যাক বেয়ার্ড। ইংল্যান্ডের রাজ পরিবারের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিল, জানিয়েছিল সে আর দস্যুবৃত্তি করবে না। ক্ষমা সে পেয়েও গিয়েছিল, কিন্তু রক্তে যার লোভ, পাপ আর তঞ্চকতা, সে সৎ ভাবে বাঁচবে কেন! কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই, জাহাজ নিয়ে আবার জলে ভেসেছিল ব্ল্যাক বেয়ার্ড। এই তঞ্চকতা মানতে না পেরে ভার্জিনিয়ার গভর্নর ব্ল্যাক বেয়ার্ডকে হত্যা করার জন্য লেফটেন্যান্ট রবার্ট মেনার্ডের নেতৃত্বে একটা দল পাঠিয়েছিলেন।

    ১৭১৮ সালের ২২ নভেম্বর, নর্থ ক্যারোলিনার ওকরাকোকের কাছে, সমুদ্রবক্ষে ব্ল্যাক বেয়ার্ডের নৌবহরকে হাতের নাগালে পেয়ে গিয়েছিলেন লেফটেন্যান্ট মেনার্ড। এক ভয়ঙ্কর ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে হার মানতে বাধ্য হয়েছিল ৩৮ বছরের জলদস্যু ব্ল্যাক বেয়ার্ড ও তার সঙ্গীরা। লেফটেন্যান্ট রবার্ট মেনার্ড নিজের হাতে ব্ল্যাক বেয়ার্ডের শিরচ্ছেদ করেছিলেন। ব্ল্যাক বেয়ার্ডের কাটা মুণ্ডটা নিজের জাহাজের সামনে থাকা এক শলাকায় গেঁথে দেশে ফিরে এসেছিলেন। বীরের সম্মান পেয়েছিলেন দেশে।

    অন্তিম মুহূর্তে জলদস্যু ব্ল্যাক বেয়ার্ড।
    কিন্তু কোথায় গেল ব্ল্যাক বেয়ার্ডের হাজার কোটি পাউন্ডের গুপ্তধন!

    রবার্ট লুইস স্টিভেনসন-এর লেখা এক রোমহর্ষক উপন্যাস ট্রেজার আইল্যান্ড। সেখানে জলদস্যু ‘ব্ল্যাকহেডেড ডগ’ গুপ্তধনের ম্যাপ রেখে গিয়েছিল। কিন্তু, পৃথিবীর সবচেয়ে কুখ্যাত জলদস্যু ব্ল্যাক বেয়ার্ড সেরকম কোনও সাংকেতিক মানচিত্র রেখে যায়নি। কিন্তু ব্ল্যাক বেয়ার্ড মৃত্যুর আগে স্বীকার করেছিল, এক অজ্ঞাত স্থানে সে এই কুবেরের ধন লুকিয়ে রেখেছে। সেই থেকে প্রায় তিনশো বছর ধরে গুপ্তধন সন্ধানীরা খুঁজে চলেছেন ব্ল্যাক বেয়ার্ডের গুপ্তধন।

    ১৯৯৬ সালে নর্থ ক্যারোলিনার বিউফোর্টের সমুদ্রগর্ভে  খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল ব্ল্যাক বেয়ার্ডের জাহাজটিকে। কিন্তু তার মধ্যে ব্ল্যাক বেয়ার্ডের সম্পত্তির কণামাত্র মেলেনি। সম্প্রতি গবেষকরা বলেছেন, ব্ল্যাক বেয়ার্ডের গুপ্তধন রাখা থাকতে পারে, চারটি জায়গার যেকোনও একটিতে। জায়গাগুলি হল ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, ভার্জিনিয়ার চিসাপিকে-বে এবং কেম্যান দ্বীপের গুহা ও কোস্টারিকার কোকোস আইল্যান্ডে। তবে এই চারটির জায়গার মধ্যে কোকোস আইল্যান্ডেই থাকার সম্ভাবনা শতকরা নব্বই ভাগ।

    কোকোস আইল্যান্ড। এখানেই লুকানো আছে ব্ল্যাক বেয়ার্ডের লক্ষ কোটি টাকার গুপ্তধন!

    তাই, আবার নতুন উদ্যমে জলযান নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়েছেন, বিশ্বের সেরা সেরা গুপ্তধন সন্ধানী। যদি একবার পেয়ে যান ব্ল্যাক বেয়ার্ডের কয়েক লক্ষ কোটি টাকার গুপ্তধন, নিমেষেই তাঁদের থেকে সম্পদের নিরিখে পিছিয়ে পড়বেন বিল গেটস, জেফ বেজোসরা।  হোক না সে সম্পদ নিরীহ মানুষের রক্ত মাখা। আবহমান কাল ধরে মানুষ তো সম্পদের পর্বতে উঠেছে নিরীহ মানুষের রক্ত মাড়িয়েই।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More