শনিবার, মার্চ ২৩

স্ত্রী ছেড়ে চলে গেছেন, একাই বোট ভাসালেন ক্যাপ্টেন, সাতবছর পর সাগর ফেরালো তাঁর মমি

 রূপাঞ্জন গোস্বামী

জার্মানির  রেইন-ওয়েস্টফালিয়া স্টেটের রাজধানী ডুসেলডর্ফ এর অনতিদূরে ভেলবার্ট। সেখানে তাঁর সাততলার অফিসের  বড় জানালা দিয়ে, হ্রদের নীল জলের দিকে তাকিয়ে থাকতেন  ইন্সুরেন্স সেলসম্যান ম্যানফ্রেড বাজোরাট। রাত তো বটেই, মাঝে মাঝে দিবাস্বপ্নেও, নীল সমুদ্রে  জাহাজ নিয়ে নেমে পড়তেন। ছোট্ট ইয়ট জাতীয় জলযানে বিশ্বভ্রমণ করতে চান ম্যানফ্রেড। তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ এটাই, তাঁর আশৈশবের স্বপ্ন। রোজ বাড়ি ফিরে  স্ত্রী ক্লডিয়া ও মেয়ে নিনাকে বলতেন তাঁর স্বপ্নের কথা। সাধারণত, এসব ক্ষেত্রে স্ত্রীরা বাধা দেন। কিন্তু ক্লডিয়া উৎসাহই দিয়ে যেতেন। মেয়ের পড়াশুনো, ইন্সুরেন্স ব্যবসায় মোটা মুনাফা, তাঁকে সাততলার অফিসে বন্দী করেছে। তবুও, অতলজলের আহ্বানে, ম্যানফ্রেডের মন পালাতে চাইতো অফিসের জানলার কাঁচ ভেঙে।

সাগরে একদিন ভাসবই

সমুদ্রে ভাসার শখ সেই ছোটবেলা থেকেই। বাবা মা’র সঙ্গে ছুটিতে বেলজিয়াম বেড়াতে গিয়ে মোটরবোটের স্টিয়ারিং ধরার হাতেখড়ি। তারপর বড় হয়ে রীতিমতো ছোট ও বড় ইয়ট চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়ে ফেললেন। কিন্তু ইনসুরেন্সের ব্যবসায় মা লক্ষীর নজর। তাই  জাহাজের ক্যাপ্টেন হয়ে সমদ্রে ভাসা হয়নি।
১৯৮০ সালে ম্যানফ্রেডের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় ব্যবসায়ী রেনর কার্সনারের। প্রত্যেক উইকএন্ডে, ম্যানফ্রেডের বাড়ির ব্যাকইয়ার্ডে বারবিকিউ পিকনিক হত। সেখানে বিয়ারের গ্লাস ঠুকে শপথ করতেন ম্যানফ্রেড, “সাগরে একদিন ভাসবই। ২০০৪ সালে,  এরকমই এক রঙিন সন্ধ্যায় ম্যানফ্রেড, রেনরকে বলেন তাঁর স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে।

ছবির ডানদিক থেকে প্রথম ম্যানফেড বাজোরাট, দ্বিতীয় মেনে নিনা, তৃতীয়জন স্ত্রী ক্লদিয়া

এসে গেল নতুন প্রেমিকা ‘সায়ো’, ছেড়ে গেলেন স্ত্রী ক্লদিয়া 

চালু ব্যবসা বেচে দিলেন ম্যানফ্রেড। কিনে ফেললেন ৪০ ফুট লম্বা অত্যাধুনিক ও বিলাসবহুল ইয়ট । ‘সায়োনারা’ শব্দটা ছোট করে ইয়টের নাম রাখলেন সায়ো। এই ইয়ট যে তাঁর দ্বিতীয় প্রেমিকা। বেরিয়ে পড়লেন স্ত্রীর সঙ্গে সাগর অভিযানে। মেয়েকে রাখলেন দামী স্কুলের হস্টেলে।  ছোট ছোট অভিযান দিয়ে শুরু হলো বড় স্বপ্নকে অবয়ব দেবার চেষ্টা। এভাবেই সুখের সাগরে ভেসে কেটে যাচ্ছিল দিন। হঠাৎ  উঠলো ঝড়, ভাঙতে বসলো এতদিনের স্বপ্ন। স্বামী ম্যানফ্রেডের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ চেয়ে বসলেন তাঁর তিরিশ বছরের বন্ধু, প্রেমিকা ও স্ত্রী ক্লদিয়া। পায়ের তলায় মাটি সরে গিয়েছিল সেই দিন। ক্লডিয়া ম্যানফ্রেডকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন ক্যারিবিয় দ্বীপপুঞ্জের মার্টিনিক-এ।

ম্যানফ্রেড বাজোরাটের শেষ সমুদ্রযাত্রার রুট

‘ লাস্ট ভয়েজ,’
মেয়ে এখন কলেজে পড়ে। তাঁকে নিজের সব সম্পত্তি বুঝিয়ে দিয়ে ‘সায়ো‘কে নিয়ে জলে ভাসলেন ম্যানফ্রড। ক্যাপ্টেনের পাশের চেয়ারে বসতেন ক্লদিয়া। সেই চেয়ারে রাখলেন ক্লদিয়ার একটা ছবি। দুরন্ত গতিতে মাঝ সমুদ্রের দিকে ছুটে চললো ক্যাপ্টেন ম্যানফ্রডের জলযান ‘সায়ো’। দু’বছর ম্যানফ্রেডের কোনও খোঁজ মেলেনি। ২০১০ সালে ক্যারিবিয় দ্বীপপুঞ্জের মার্টিনিকেই ক্যানসারে মারা যান ক্লদিয়া। মেয়ে নিনা, বাবাকে স্যাটেলাইট ফোনে খবরটা দেন। চুপ করে শোনেন ম্যানফ্রেড, তারপর, “ভালো থাকিস” বলে ফোনটা কেটে দেন। নিনা প্রেমিককে নিয়ে চলে মায়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায়।

২০১৬ সাল, ফিলিপিন্সের সুরিগাও ডেল সার থেকে ৫০ মাইল দূরে, প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে উদ্দেশ‍্যহীন ভাবে একটি ইয়টকে সমুদ্রে ভাসতে দেখেন দু’জন মৎস‍্য‍জীবী। অনেকক্ষণ ধরে ডাকাডাকি করে কারও সাড়া পান না। জলযানটির পাশে নৌকা ঠেকিয়ে, দুজনে ইয়টটির ডেকে উঠে আসেন। ইয়টটির পিছনের অংশ জলে ডুবে গেছে। ঢেউয়ের তালে তালে নাচছে ‘সায়ো‘। মৎসজীবী দু’জন ভাবেন, এখনও কী করে ভেসে আছে ইয়টটি। বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় ডুবে যাওয়ার কথা। ডুবে গেলে হয়তো পৃথিবী জানত না এক বিয়োগান্তক উপাখ্যান।

খুঁজে পাওয়া গেল, উদ্দেশ্যহীন ভাবে ভেসে চলা বোটটিকে

মৎস‍্য‍জীবী দু’জন ভাঙা মাস্তুলের পাশ দিয়ে নীচে নামলেন। চিৎকার করে ডাকলেন “হেই, কেউ আছো?“। সাড়া মেলে না।  সিঁড়ি ধরে দুজনে নীচে নামেন। সামনে ক্যাপ্টেনের কেবিন। ঘরটি অন্ধকার। ঘরের ভেতর  টর্চ লাইট ফেলতেই, আঁতকে ওঠেন দুজন। ক্যাপ্টেনের কেবিনের ভেতরে টেবিল। টেবিলের ওপর রেডিও সেট। সেটের সামনে খালি গায়ে মাথা হেলিয়ে বসে আছেন একাকী ক্যাপ্টেন। সামনে খাতা আর পেন। একটা হাত বাড়ানো রেডিও সেটের দিকে।

নিথর, নিষ্পন্দ।  ছাই রঙা মৃতদেহে পচন ধরেনি। ঘরে দুর্গন্ধ নেই এতটুকু। হওয়ার কথা নয়। কারণ মমি হয়ে গেছেন, উনষাট বছরের  ম্যানফ্রেড বাজোরাট। জীবিত অবস্থায়  আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন স্যাটেলাইটে তীরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। পারেননি, তার আগেই ঢলে পড়েছেন মৃত্যুর কোলে। তাঁকে নিয়ে  সমুদ্রে ভেসেছে সায়ো, পুরো সাত বছর।

বোটের কেবিনে ম্যানফেড বাজোরাটের মমি

এল পুলিশ

বাজোরাতের শরীর স্পর্শ করলে ধুলোর মতো গুঁড়ো ঝরে পড়ছিল। পোস্টমর্টেম হয়েছিল বুতুয়ান সিটিতে। ম্যানফ্রেড বাজোরাটের মৃত্যুর কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন। কোলন শহরের  বিখ্যাত ফরেনসিক ক্রিমিনলজিস্ট ডঃ মার্ক বেনেসকে বলেছিলেন, “যেভাবে উনি বসে আছেন, এটা থেকে বোঝা যাচ্ছে মৃত্যু হটাৎ এসেছিলো। হতে পারে এটা হার্ট অ্যাটার্ক থেকে মৃত্যু। পুলিশি তদন্তে জানা যায়, ম্যানফ্রেড বাজোরাটকে শেষ জীবিত দেখতে পাওয়া গিয়েছিল  ২০০৯ সালে।  অ্যাটলাণ্টিক মহাসাগরের সঙ্গে জুড়ে থাকা ভূমধ্যসাগরের ভেতরে, স্পেনের মাল্লোর্কা বন্দরে দেখতে পাওয়া গিয়েছিল তাঁকে।

হতবাক পুলিশেরাও

কীভাবে হলেন মমি!

জুরিখের, ইনস্টিউট অফ ইভোলিউশনারি মেডিসিনের ডিরেক্টর, প্রফেসর ফ্রাঙ্ক রূহলি। তিনি একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “মৃতদেহ অনেক ভাবেই আপনা আপনি মমি হয়ে যেতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মমি হওয়া মৃতদেহের টিস্যু, জল হারিয়ে ফেলে। যার ফলে কোষ সংকুচিত হয়, শুকিয়ে যায়। নোনা এবং নির্দিষ্ট গতির বাতাস মমি হতে সাহায্য করে। একবার, মমি হওয়া ধাপগুলি নিখুঁতভাবে হয়ে গেলে ও আবহাওয়ার পরিবর্তন না ঘটলে,  মৃতদেহে পচন ধরতে পারে না। অনির্দিষ্ট কালের জন্য মৃতদেহটি মমি হয়ে থাকতে পারে”

ক্যাপ্টেনের কেবিনে মেলা অ্যালবামে পাওয়া গেল ক্লদিয়ার এই ছবি

শেষ চিঠি
টনাটি মর্মান্তিক দিকে মোড় নিলো , যখন পুলিশ ক্যাপ্টেন বাজোরাটের মৃতদেহের পাশ থেকে উদ্ধার করলো একটি চিঠি। চিঠিটি ক্যাপ্টেন ম্যানফ্রেড লিখেছেন, তাঁকে ছেড়ে চলে যাওয়া স্ত্রী ক্লদিয়াকে। চিঠি লেখার সময়, ম্যানফ্রেড মনের কোণে ক্লদিয়ার প্রতি আর  অভিমান অবশিষ্ট ছিল না। কারণ তিনি জানতেন, তাঁর স্ত্রী ভোরের শুকতারা হয়ে গেছেন। তাই,  বাজোরাট ও তাঁর স্ত্রীয়ের মধ্যে ২০০৮ সালে বিচ্ছেদ ঘটে গেলেও, মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে, একাকী সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে তাঁর প্রাণ কাঁদছিলো তাঁর ক্লদিয়ার জন্য। তাই লিখেছিলেন চিঠি,

ক্লদিয়া

প্রিয়তমা

৩০ বছর ধরে আমরা একসাথে জীবনের পথে চলেছি। বিধাতার বিচিত্র খেয়ালে  রাহুর  কাছে পরাজিত হলো আমাদের জীবনের রঙিন স্বপ্নগুলি। জানি  তুমি চলে গেছ। তোমার আত্মা শান্তি খুঁজে পাক।  

                                                                                                                       তোমার ম্যানফ্রেড

জীবনসাগরে প্রেম হারিয়ে, শোকসাগরের ঢেউয়ে ভাসতে ভাসতে ক্যাপ্টেন ম্যানফ্রেড স্বপ্ন ছুঁতে গিয়েছেন। তাঁর মমি হওয়া দেহ নিয়ে ভেসেছে ‘সায়ো’, পুরো সাত বছর। একজন আজন্ম নাবিক হয়তো এভাবেই , প্রেম হারিয়ে  খুঁজে নিয়েছেন তাঁর যোগ্যতম মৃত্যু।

Shares

Comments are closed.