মৃত্যুকে হারিয়ে কীভাবে বিষ মধু ছিনিয়ে আনে নেপালের ‘হনি হান্টার’!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    যুগ যুগ ধরে সারা পৃথিবীর পর্বতাভিযাত্রীদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হল নেপালের খুম্বু হিমালয়। এখানেই আছে মাউন্ট এভারেস্ট সহ আরও কত নামজাদা পর্বতশৃঙ্গ। আছে শেরপারা, কাঠবেড়ালি যেমন অনায়াসে গাছে চড়ে, শেরপারাও তেমনই অনায়াসে তুষারশুভ্র শৃঙ্গগুলিতে আরোহণ করে। তাদের কথা সভ্য জগতের সবাই জানেন। কিন্তু জানেন না কুলুংদের কথা। যাদের মত রক ক্লাইম্বার হয়ত এই পৃথিবীতে কমই পাওয়া যাবে। তবে তারা অভিযাত্রীদের মতো শখে খাড়া পাথরের দেওয়াল আরোহণ করেন না। ‘পেটের খিদে’ শেরপাদের মতো কুলুংদেরও বিপদসংকুল খাড়া পাথুরে পাহাড় আরোহণ করতে পাঠায়।

    মাউন্ট এভারেস্টের দক্ষিণে,  একটা উপত্যকার পরেই আছে আর এক দুর্গম পাহাড়ি উপত্যকা। সভ্য জগত থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন। সেখানে সুগভীর গিরিখাতের মধ্যে বয়ে চলে হংগু নদী। সেই গিরিখাতে লুকিয়ে আছে এক গ্রাম, সাদ্দি। সেখানে বাস করে সুপ্রাচীন কুলুং উপজাতি। কোনও এক বসন্তের ভোর, হাজার হাজার পাখির কলতান আর হংগু নদীর জলতরঙ্গের অর্কেস্ট্রা শুনতে শুনতে এগিয়ে চলেছে এগারো জনের দলটি। গ্রামের উত্তরদিকে থাকা উঁচু উঁচু পাথুরে পাহাড়গুলির দিকে।

    বিষ মধুর সন্ধানে

    পাহাড়গুলির পাদদেশে দলটি পৌঁছে যায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। সামনে কয়েক মাইল এলাকা জুড়ে প্রায় হাজার থেকে দেড়হাজার ফুট উঁচু খাড়া পাথুরে দেওয়াল। দেওয়ালের বিভিন্ন দুর্গম স্থানে ঝুলছে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড অর্ধচন্দ্রাকার মৌচাক। এক একটি মৌচাক প্রায় ছয় সাতফুট লম্বা। যার ভেতরে আছে কম করে নব্বই কেজি মধু। এ মধু যে সে মধু নয়। এ মধু খেলে নেশা হয়। কালোবাজারের এ মধুর দাম কেজি প্রতি ২৫০০০ টাকা।

    মৌচাকগুলিকে ঘিরে আছে লক্ষ লক্ষ মৌমাছি। যে সে মৌমাছি নয়, সবচেয়ে বড় মৌচাক নির্মাতা দৈত্যাকৃতি মৌমাছি Apis dorsata। খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠে লক্ষ লক্ষ মৌমাছির আক্রমণ প্রতিহত করে ছিনিয়ে আনতে হবে ঝিম ধরানো আঠালো মধু। বছরের সব সময় এই মধু পাওয়া যায় না। প্রতি বছর মার্চ এপ্রিলে গিরিখাতের রডোডেনড্রন গাছগুলিতে উজ্বল গোলাপি, লাল, সাদা ফুল ফোটে। ফুলের মৌ-এর মধ্যে থাকে বিষাক্ত উপাদান, যা মধুতে আরও ঘনীভূত হয়। সে মধু পান করলে মানুষের চড়া নেশা হয়। যদিও কুলুংরা কয়েক শতাব্দী ধরে বিষ মধু পান করে আসছে কফ সিরাপ ও অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে।

    পুজো পান ‘রাংকেমি’

    এগারো জনের দলটি কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয় পাহাড়গুলির পাদদেশে। দলের সঙ্গে যাওয়া পুরোহিত বাঁশের কঞ্চি দিয়ে মাটিতে বিশাল সুরক্ষা বলয় আঁকেন। তার ভেতরে গিয়ে দাঁড়ায় মধুশিকারীরা। কলাপাতা দিয়ে দুটি বেদী তৈরি করে তার ওপর রাখা হয় শুকনো বিন, ভুট্টা, ভাত ও মদ। মাখনে তুলো ভিজিয়ে প্রদীপ জ্বালানো হয়, মাটিতে গাঁথা হয় জ্বলন্ত ধুপ।

    মন্ত্র পড়েন পুরোহিত। মধুশিকারীরা বেদী দুটির সামনে মাথা ঝোঁকায়। সবার মাথায় মন্ত্রপুত জল ছিটিয়ে দেন পুরোহিত। ছুরি দিয়ে সঙ্গে আনা মুরগী দুটির মুণ্ডচ্ছেদ করে সবার গায়ে রক্ত ছিটিয়ে দেন। মুণ্ডদুটিকে বেদীতে রেখে প্রত্যেকের কপালে রক্ততিলক লাগিয়ে দেন। পুজো শেষ করে পুরোহিত ধরেন গ্রামের পথ।

    উঠে দাঁড়ায় ৬২ বছরের মউলি কুলুং

    ৪৭ বছর ধরে দুর্গম পাহাড় থেকে বিষ মধু পেড়ে আনছে সে। আজ তাকে প্রায় হাজার ফুটের পাহাড় বেয়ে উঠতে হবে। তারপর পাহাড়ের মাথা থেকে নামাতে হবে তিনশ ফুটের দড়ির মই, যার পা-দানিগুলি বাঁশের। ধীরে ধীরে দলটা গিরিগিটির মত পাহাড় বাইতে থাকে। কারও কোমরে পর্বতারোহীদের মত সেফটি রোপ লাগানো নেই। তবে সবাই ওপরে উঠবে না। একেবারে ওপরে উঠবে মউলি কুলুং আর তার ১৫বছরের বিশ্বস্ত সঙ্গী আসধন কুলুং। বাকিদের কেউ থাকবে মাঝে, কেউ নীচে।

    প্রথম যে দিন মধু শিকারে গিয়েছিল মউলি, খাড়া দেওয়াল বাইতে গিয়ে মাকড়শার প্রকাণ্ড জালে আটকে পড়েছিল। জালে ক্রমশ জড়িয়ে যাচ্ছিল সে। জালটাও মউলির ভারে ছিঁড়তে শুরু করেছিল। হঠাৎ পাথরের আড়ালে একটি বাঁদরের দেখা পেয়েছিল মউলি। বাঁদরটি তার বড় লেজ বাড়িয়ে দিয়েছিল। মউলি বাঁদরের লেজ ধরে উঠে এসেছিল।

    মউলি কুলুং

    ঘটনাটি আমাদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও মউলির গ্রামের বয়স্করা বলেছিলেন, বাঁদরটি হল মৌমাছি আর বাঁদরদের আত্মা রাংকেমি। যেখানে মানুষ যেতে পারে না সেখানে তিনি বিরাজ করেন। যে সমস্ত সাহসী মানুষ কেবল মাত্র বেঁচে থাকার জন্য মধু আহরণ করতে যায় তাদের রক্ষা করেন রাংকেমি। কিছুক্ষণ আগে পাহাড়ের নীচে এই রাংকেমি  ও তাঁর সঙ্গী জঙ্গলের আত্মা বানেসকান্দির পুজো করছিলেন কুলুং পুরোহিত।

     শুরু হয় এক অবিশ্বাস্য লড়াই

    ঘণ্টা তিনেকের পরিশ্রমে পাহাড়টির চুড়ায় উঠে পড়ে মউলি আর আসধন। পাহাড়ের সবচেয়ে বিপজ্জনক ঢালে মউলি ঝুলিয়ে দেয় ৩০০ ফুটের দড়ির মই। সেদিকেই আছে মৌচাকগুলি। যেগুলিকে পাহারা দিচ্ছে লক্ষ লক্ষ জীবন্ত ফাইটার জেট। মইয়ের একপ্রান্ত বাঁধা পাথরে আর এক প্রান্ত ঝোলে শুন্যে। মই ধরে নামতে থাকে মউলি।

    প্রথম মৌচাকটা পাথরের একটা সংকীর্ণ তাকের ওপর ঝুলে আছে। মইয়ে দোল খেতে খেতে মউলি পৌঁছে যায় সেখানে। মই ছেড়ে পাথরের তাকে নামে। কারণ এবার মই ধরে নামবে তার সঙ্গী আসধন। মোউলির অভিজ্ঞ হাত ও পায়ের আঙুল খুঁজে নেয় পাথুরে খাঁজ। মোউলি এখন মাটি থেকে প্রায় সাতশ ফুট ওপরে। ইঞ্চি ছয়েক চওড়া পাথুরে তাকে দাঁড়িয়ে। পিঠে ঝুলছে সরু লম্বা বাঁশ, কোমরে জুনিপারের বাণ্ডিল। কাঁচা জুনিপার পাতা জ্বালালে প্রচুর ধোঁয়া হয়। অনেক নীচে হংগু নদী ছুটছে কনকনে ঠাণ্ডা জল নিয়ে।

    ইতিমধ্যে  ওপর থেকে নেমে এসেছে আসধন। মৌমাছিদের তীব্র গুঞ্জনে সঙ্গীর নির্দেশের সবটা কানে ঢোকে না। মইয়ে ঝুলে থাকে থাকে আসধন, তার পিঠে বাঁধা প্যাঁচানো কয়েকশো ফুটের দড়ির কুণ্ডলী খুলতে শুরু করে। সংকীর্ণ স্থানে কোনওমতে দেহের ভারসাম্য রেখে শুখনো ঘাসে আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়া তৈরি করে মউলি।

    বাতাস সহায় ছিল, তাই ধোঁয়া মৌচাক অবধি পৌঁছেছিল। নাহলে আর একটু এগোলেই এক সাথে ঝাঁপিয়ে পড়ত মৌমাছির দল। ভারসাম্য হারিয়ে মউলিকে আছড়ে পড়তে হত কয়েকশো ফুট নীচে। নিশ্চিত মৃত্যু। নিজের ভুলে বা বাতাসের ঝাপটায় ভারসাম্য হারালেও মৃত্যু অনিবার্য।

    ঘন ধোঁয়ায়  উড়তে শুরু করেছে লক্ষ লক্ষ বিরক্ত, ক্রুদ্ধ ও হতভম্ব মৌমাছি। মন্ত্র পড়ে চলে মউলি “হে রাংকেমি, তুমি মৌমাছির দেবতা, আমরা চোর ডাকাত নই। আমাদের পূর্বপুরুষের আত্মা আমাদের সঙ্গে আছে। দয়া করে মৌমাছিদের দূরে পাঠাও। রক্ষা করো।” মন্ত্র পড়তে পড়তে পিঠ থেকে বাঁশ নামিয়ে সেটার ছুঁচাল ডগা ঘষে ঘষে মৌচাকটা খণ্ড খণ্ড করে কাটতে থাকে সে।

    মুখ কান হাত পায়ের খোলা অংশে বিষাক্ত হুল ফোটায় মৌমাছিরা। সেই অবস্থায় মৌচাকের প্রায় পঞ্চাশ কেজি ওজনের  কাটা টুকরোটি বোঝাই করতে থাকে বেতের ঝুড়িতে। তারপর নিচে নামিয়ে দেয় ঝুড়িটা। একটা দুশো কেজির মৌচাক ভেঙে, মউলিরা আবার দড়ির মই বেয়ে উঠে যায় ওপরে। আবার মই নামায় অন্যদিকে। মাঝের ও নীচের দলগুলি সেভাবেই জায়গা পরিবর্তন করে।

    এই ভাবে ১০ ঘণ্টার অমানুষিক পরিশ্রমে প্রায় গোটা পনেরো চাক ভেঙে অবসন্ন দেহটাকে নীচে নামিয়ে আনে মউলি। মৃত্যুর মুখ থেকে ছিনিয়ে আনা বিষ মধু চলে যাবে বিদেশে। ব্রোঞ্জ স্ট্যাচু ঢালাইয়ের কাজের জন্য মোম চলে যাবে কাঠমান্ডুতে।

    মৌমাছির কামড়ে সারাদেহ ফুলে গেছে, রক্তে নাচতে শুরু করেছে মৌমাছির বিষ। আগামী কয়েকদিন মউলির কাটবে বিছানায়, অচৈতন্য হয়ে। সামনের বছর বসন্ত পর্যন্ত দশটি পরিবারের হাতে বাঁচার রসদ তুলে দিয়েছে সে। টলতে টলতে গ্রামের দিকে এগোয় নেপালের শেষ ‘হনি হান্টার’ মউলি। গ্রামটাকে বড় দূরে মনে হয় তার।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More