রবিবার, অক্টোবর ২০

দশরথ মাঝি, ২২ বছর ধরে পাহাড় কেটে একাই বানিয়েছিলেন রাস্তা, স্ত্রীর মৃত্যুর বদলা নিতে

রূপাঞ্জন গোস্বামী

ভারতের বিহার রাজ্যের গয়া জেলার মুহরা তহশিলের আতরি ব্লকে আছে পিছিয়ে পড়া প্রত্যন্ত গ্রাম গেহলৌর। গ্রামটিকে পাশের শহর থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে মস্ত এক পাহাড়, তার নামও গেহলৌর। পাহাড় ঘুরে ওয়াজিরগঞ্জ যেতে গ্রামবাসীকে পাড়ি দিতে হয় প্রায় ৫৫ কিলোমিটার পথ। গ্রামের উন্নয়নের পথেও একদিন প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল গেহলৌর পাহাড়।

গ্রামের বাসিন্দারা তথাকথিত নিচু জাতের। তাই বিহারের জাতপাতের রাজনীতি এই গ্রামে উন্নয়নকে ঢুকতে দেয়নি। দারিদ্র, অনাহার, বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুকে নিয়তি হিসেবেই মেনে নিয়েছিলেন গ্রামবাসীরা। নেই পানীয় জল, নেই বিদ্যুৎ, নেই স্কুল বা হাসপাতালও। সবচেয়ে কাছের হাসপাতালটির দূরত্বই প্রায় সত্তর কিলোমিটার। গরুর গাড়িতে করে মূমুর্ষু রোগীকে নিয়ে যেতে যেতে কয়েক ঘন্টার মধ্যে গ্রামবাসী ফিরে আসে রোগীর মৃতদেহ নিয়ে।

গেহলৌর পাহাড়

অভিশপ্ত গ্রামটিতে তবুও থেমে থাকে না জীবন

পাহাড়ের কাঁটা ঝোপের মধ্যে ফুটে থাকা বন্য ফুলের মতোই প্রেম আসে গ্রামের দুই যুবক যুবতী দাশু-ফাল্গুনির জীবনে। দু’জনে একদিন ঘর বাঁধে। সন্তানও হয়। পুত্র ভগীরথ এবং ও কন্যা বাসন্তী। দিন মজুরের কাজ করেন দশরথ। পাহাড় বেয়ে প্রাগৈতিহাসিক সরীসৃপের মত চলে যান পাহাড়ের ওপারে। উচ্চবর্ণদের ক্ষেতে কাজ করে ফিরে আসেন সন্ধ্যের মধ্যে।

দুপুরে  দশরথের খাবার ও জল পুঁটলিতে নিয়ে পাহাড় বেয়ে দিয়ে আসেন ফাল্গুনি। ভীষণ ভয় লাগে তাঁর। পায়ের তলা থেকে নড়ে যায় পাথর। অনেক কষ্টে পৌঁছান দশরথের কাছে। দশরথ রোজ বারণ করেন ফাল্গুনিকে খাবার নিয়ে আসতে, শোনেন না ফাল্গুনি। সারাদিন মানুষটা না খেয়ে থাকবে? কোন ভোরে ছাতু খেয়ে পাহাড় বাইতে উঠেছিল, সে ছাতু কি আর সারাদিন পেটে থাকে?

দশরথ মাঝির বাড়ি

১৯৫৯ সালের এক দুপুর। সেদিনও দুপুরের কড়া রোদ আগুন ছেটাচ্ছিল গেহলৌর পাহাড়ে। ফাল্গুনির জন্য অপেক্ষা করছিলেন দশরথ। ফাল্গুনির আসতে দেরী হওয়ায় দশরথের মনে সেই শঙ্কা দেখা দেয়। দেরি হচ্ছে কেন, তবে কি!  উৎকণ্ঠা বাড়তেই থাকে তাঁর। ওই তো কে যেন আসছে পাহাড় বেয়ে। না ফাল্গুনি নয়, আসেন একজন গ্রামবাসী। দশরথের আশঙ্কাই সত্য হয়েছে। খাবার নিয়ে আসার সময় পাহাড়ে পা পিছলে পড়ে গেছেন ফাল্গুনি। ফাল্গুনির রক্তাক্ত দেহ গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব নিয়ে যেতে হবে সত্তর কিলোমিটার দূরের হাসপাতালে।

গ্রামে পৌঁছে ফাল্গুনিকে গরুর গাড়িতে তুলে হাসপাতাল নেওয়ার সময় দশরথের কোলে মারা যান ফাল্গুনি। এলোমেলো হয়ে যায় দশরথের জীবন। হারিয়ে যায় তাঁর রুক্ষ জীবনের একমাত্র ভালবাসাটুকুও। সমস্ত রাগ ক্ষোভ গিয়ে পড়ে নিস্প্রাণ পাহাড়ের ওপর। ছাগল বেচে দিয়ে কিনলেন হাতুড়ি আর শাবল। পাহাড় আর কারও প্রাণ নিতে পারবে না। যে পাহাড় তাঁর ফাল্গুনিকে কেড়ে নিয়েছে তার বুক নিজে হাতে চিরবেন তিনি। বানাবেন রাস্তা। যাতে গ্রামের মানুষ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছাতে পারে। গ্রামের অভিশাপ চিরতরে ঘুচিয়ে দেবেন দশরথ।

গ্রামবাসীরা বলেন বউয়ের শোকে দাশু পাগল হয়ে গেছে

ডিনামাইট নেই, পাথর কাটার মেশিন নেই, আর দাশু বানাবে রাস্তা। ঠাট্টা তামাশা করেন গ্রামবাসীরা। কিন্তু দশরথ তাঁর সংকল্পে অটুট থাকেন। ১৯৬০ সাল, এক ভোরে সূর্য ওঠার আগে দশরথ নেমে পড়েন  প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের অসম লড়াইয়ে। হাতুড়ির ঘায়ে পাহাড়ের পাথরে দশরথ মাঝির ক্ষোভের ফুলকি ঠিকরে ওঠে। হাতুড়ির প্রতিটি আঘাত যেন স্ত্রী ফাল্গুনির মৃত্যুর প্রতিশোধ।

গ্রামের লোকেরা খবর পেয়ে দেখতে আসেন ভিড় করে। দশরথ কোনও দিকে তাকান না , কারও কথা শোনেন না। দেহের সব শক্তি একত্রিত করে হাতুড়ির আঘাত হেনেই চলেন পাহাড়ের পাথরে। গা দিয়ে ঝর্ণা ধারার মত ঘাম গড়ায়। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়। মুখে ওঠে ফেনা। হাত ফেটে বার হয় রক্ত। তবে থামেন না অক্লান্ত দশরথ। এর চেয়ে অনেক যন্ত্রণা পেয়েছিল তাঁর ফাল্গুনি। সারা দেহের হাড় চুর চুর হয়ে গিয়েছিল।

দিনমজুরির কাজ ছেড়ে দিয়েছেন দশরথ। নাওয়া নেই, খাওয়া নেই, ঘুম নেই তাঁর। উন্মত্তের মত পাহাড় কেটে চলেন। মাঝে মাঝে গ্রামের মানুষের বিভিন্ন জিনিস পাহাড় পার করে দেন। যে পয়সা পান তাই দিয়ে কোনও মতে চলে সংসার। এভাবে এক দিন দু’দিন করে কেটে কেটে যায় বছরের পর বছর।

দশরথ মাঝি

এর মধ্যে গ্রামে দেখা দেয় ভীষণ খরা। অনেকে গ্রামবাসী গেহলৌর ছেড়ে পালান। দশরথের বাবা দশরথকে বোঝান, তাঁদেরও চলে যাওয়া উচিত। কিন্তু দশরথ সবাইকে শহরে পাঠিয়ে নিজে রয়ে যান গ্রামে। এই পাহাড়ের পাশেই যে শুয়ে আছে ফাল্গুনি। তাঁকে ছেড়ে যাবেন না দশরথ।

রোদ ঝড় বৃষ্টি থামাতে পারে না দশরথের হাতুড়ি

কেটে যায় দশ বছর। গ্রামের লোক অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখেন পাহাড়ের গায়ে এই দশ বছরে বড় একটা ফাটল বানিয়ে ফেলেছেন দশরথ। ফাটলটা ধীরে ধীরে বাড়ছে। রোদ ঝড় বৃষ্টিতে সবাই যখন ঘরের নিরাপদ আশ্রয়ে, দশরথ তখনও চালিয়ে যান হাতুড়ি। এভাবেই কেটে যায় বাইশ বছর।

এই সামান্য যন্ত্রপাতি দিয়ে পাহাড় কেটেছিলেন দশরথ মাঝি,দেখাচ্ছেন ছেলে ভগীরথ

১৯৮২ সাল, শেষ পাথরটি কাটার পর দশরথ তীব্র আক্রোশে সেটি লাথি মেরে গড়িয়ে দেন ঢালু পথে। তারপর কান্নায় ভেঙে পড়েন। চোখের জলে ভিজে যায় গেহলৌরের আকাশ। আচমকাই মেঘ ভাঙা বৃষ্টি নামে।

খবর পেয়ে গ্রামের লোক ভিজতে ভিজতেই ছুটে আসেন। স্থানু হয়ে দেখেন, পাহাড়ের বুক চিরে শুয়ে আছে ৩৬০ ফুট লম্বা আর ৩০ ফুট চওড়া রাস্তা। গ্রামবাসীরা দশরথকে কাঁধে তুলে নেন, দশরথ কোনও কথা বলেন না। চোখ দিয়ে বইতে থাকে জলের ধারা। রাতে যখন আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ ওঠে, দশরথ গিয়ে দাঁড়ান পাহাড়ের কোলে, সেই ছোট্ট ডোবাটির ধারে। যেখানে তাঁর প্রিয়তমার চিতা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছিল কোনও এক সন্ধ্যায়।

পাহাড় কেটে দশরথ মাঝি বানিয়েছিলেন এই রাস্তা

সারা বিহারে খবর ছড়িয়ে গেল আতরি ও ওয়াজিগঞ্জ ব্লকের দূরত্ব ৫৫ কিমি থেকে কমিয়ে ১৫ কিমিতে নামিয়ে এনেছেন দশরথ। ২২ বছরের অমানুষিক পরিশ্রমে। গ্রামে ভিড় করে সংবাদমাধ্যম। দশরথ চুপ, তিনি নামবেন আরেক যুদ্ধে। তাঁর তৈরি করা রাস্তাকে পিচ ঢালা মেন রোডের সাথে যুক্ত করতে হবে এই আবেদন নিয়ে তিনি যাবেন ভারতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে।

দিল্লি যাওয়ার পয়সা নেই। কিন্তু যে দশরথ পাহাড় ফাটিয়ে রাস্তা করতে পারেন তাঁর কাছে দিল্লির দূরত্ব তুচ্ছ। পায়ে হেঁটেই দশরথ বিহার থেকে দিল্লি পাড়ি দিলেন। কিন্তু দিল্লিতে গিয়ে দেখা করতে পারেননি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে।

‘মাউন্টেন ম্যান’ দশরথ মাঝি

পদ্মশ্রীর জন্য মনোনীত হয়েও মেলেনি সম্মান

পরবর্তীকালে বিহার সরকার দশরথ মাঝিকে সম্মান জানিয়ে ৫ একর জমি দেন। গ্রামের উন্নয়নই ছিল দশরথ মাঝির জীবনের একমাত্র স্বপ্ন। তাই সেই জমি তিনি দান করে দেন হাসপাতাল তৈরির জন্য। আজ সেখানে তাঁরই নামে গড়ে উঠেছে হাসপাতাল। ২০০৬ সালে বিহার সরকার ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কারের জন্য দিল্লিতে পাঠান দশরথ মাঝির নাম। না, পদ্মশ্রী পাননি দশরথ, তার তোয়াক্কাও করেন নি।

পুরস্কৃত করেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী, তবে অনেক পরে

ঘর্মাক্ত মুখে সাংবাদিককে বলেছিলেন,“আমি আমার কাজের মাধ্যমে সবাইকে এ কথা বিশ্বাস করাতে চেয়েছি যখন ঈশ্বর আপনার সাথে থাকবেন কেউ আপনাকে থামাতে পারবে না। আমি মৃত্যুর আগে পর্যন্ত আমার গ্রামের উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাবো। পদক বা পুরস্কারের লোভ আমার নেই। আর কোনও শাস্তিরও পরোয়া করি না আমি”

তাজমহল দেখেছেন, দেখে আসুন ‘দশরথ মাঝি রোড’

দশরথ মাঝি রোড

১৭ অগাস্ট ২০০৭ সালে, ৭৩ বছর বয়সে পীত্তাশয়ের ক্যান্সারে প্রয়াত হন ‘মাউন্টেন ম্যান‘ দশরথ মাঝি। পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিহার সরকার তাঁর অন্ত্যেষ্টি করে। ভারতীয় ডাক বিভাগ  ‘বিহারের ব্যক্তিত্ব’ সিরিজে দশরথ মাঝিকে নিয়ে একটি স্ট্যাম্প প্রকাশ করে ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৩ তারিখে। দশরথ মাঝির তৈরি রাস্তাটির নাম দেওয়া হয় হয় নাম হয় ‘দশরথ মাঝি রোড’।

সম্রাট শাহজাহান বিশ হাজার শ্রমিক দিয়ে রাজকোষ থেকে কোটি কোটি স্বর্ণমুদ্রা খরচ করে স্ত্রী মমতাজের জন্য বানিয়েছিলেন ভালবাসার প্রতীক তাজমহল। গেহলৌরের হতদরিদ্র দশরথ মাঝি বাইশ বছর ধরে পাহাড় কেটে ভালোবাসার যে অদৃশ্য তাজমহল বানিয়ে গেলেন ফাল্গুনির জন্য, ইতিহাসে তার দাম বুঝি শত শত তাজমহলের চেয়েও অনেকগুণ বেশি।

Comments are closed.