খড়গপুর আইআইটির কৃতী ছাত্র এখন দুঁদে আইপিএস অফিসার, পাচারের হাত থেকে এক বছরে বাঁচিয়েছেন ৫৫০ শিশু ও নারীকে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    মহারাষ্ট্রের তুলিঞ্জ পুলিশ থানা। কিশোরী রাধিকার (পরিবর্তিত নাম) সামনে হাসি মুখে বসে আছেন মানুষটি। ঠিক, বাড়ির বড় দাদার মত। দুজনের হাতেই ধূমায়িত চায়ের কাপ। রাধিকার জন্য আনা হয়েছে ওর প্রিয় ‘বড়া পাও’। রাধিকা তার ট্রমা কাটিয়ে, স্যারের সঙ্গে এখন নির্ভয়ে গল্প করছে। স্যারের হাতে ডায়েরি। মাঝে মাঝে কী সব লিখছেন তাতে। রাধিকা সমানে স্যারকে বলে যাচ্ছে, তার বন্ধুকেও যেন উদ্ধার করা হয়। স্যার শুধু বললেন, “আমায় কয়েক ঘন্টা সময় দাও”।

    এক সপ্তাহ ধরে রাধিকাকে পালঘরের একটি কুখ্যাত যৌনপল্লীতে আটকে রাখা হয়েছিল। আটকে রেখে  যৌন পেশায় নামার জন্য শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছিল। খাওয়া দাওয়া, এমনকী টয়লেট যাওয়া পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। অমানুষিক অত্যাচারের শেষে রাধিকা ভেঙে পড়েছিল। প্রায় অন্ধকার, তালাবন্ধ, কুঠরির ভেতরে ফুটফুটে রাধিকা রাজি হয়েছিল যৌন পেশায় নামতে। জানলা খুলে দিয়েছিল দালাল। বাইরে তখন সূর্য ডুবছে।

    সেই মুহুর্তেই  ঈগলের মত অতর্কিতে হানা দিয়েছিলেন ভাসাই-ভিরার-এর অ্যাডিশনাল সুপারিনটেনডেন্ট,  আইপিএস রাজ তিলক রৌশন। হাতে উদ্যত রিভলবার। সাথে এক ঝাঁক ডাকাবুকো তরুণ পুলিশ অফিসার।

     কে এই রাজ তিলক!

    খড়গপুর আইআইটির কৃতী ছাত্র এই রাজ তিলক রৌশন। পাঁচ বছর উঁচু পদে কাজ করেছেন  প্রাইভেট সেক্টরে। ভারতে ও বিদেশে। বছরে কোটিরও বেশি তাঁর বেতন ছিল। কিন্তু দেশের টানে এবং বিবেকের তাড়নায় লোভনীয় চাকরি হেলায় ছাড়লেন। কারণ তাঁর মনে হয়েছিল, প্রাইভেট সেক্টরের কাজ হল ধনী মানুষকে ধনী করা। এবং তিনি ধনী হতে চান না।

    “আমি তখন আমার প্রফেশনাল কেরিয়ারের শীর্ষে।  হঠাৎ একদিন আমার মন আমাকে বলল,  দেশের জন্য কী করলে রাজ ? প্রস্তুতি নিয়ে আইপিএস হয়ে গেলাম, রাস্তায় নেমে কাজ করব বলে।”

    ২০১৭ সালে ওসমানাবাদ থেকে পালঘরে বদলি হয়ে এসেছিলেন রাজ তিলক রৌশন। পালঘরের ভাসাই-ভিরারে আসার পর, তাঁকে অবাক করেছিল হারিয়ে যাওয়া শিশুদের পরিসংখ্যান। শিশুগুলিকে খুঁজে পাওয়ার হার আশঙ্কাজনক রকম কম।

    রাত জেগে শুরু হল গবেষণা

    রাজ তিলকই প্রথম অফিসার যিনি মিসিং কেসগুলোতে খুনের তদন্তের সমান গুরুত্ব দেওয়ার কথা অনুভব করলেন। কিন্তু  কার্যকরী ও আধুনিক পদ্ধতির অভাব বোধ করলেন। তাই ছ’বছর  আগের লিপিবদ্ধ তথ্য নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন রাজ। দিন রাত এক করে চলল রাজের গবেষণা। গবেষণায় প্রচুর অসঙ্গতি ও ফাঁকফোকর খুঁজে পেলেন তিনি।

     তিনি দেখছিলেন পুলিশ অফিসারের মধ্যে তদন্তে ক্ষেত্রে সদিচ্ছার অভাব আছে। আছে সচেতনতার অভাব। এক একটি তদন্তে অস্বাভাবিক বেশি সময় লাগছে। তদন্তের মাঝপথেই হাল ছেড়ে দেওয়ার মানসিকতা গ্রাস করছে পুলিশকে।

     “আমি দেখলাম, আমার এলাকায় এক মাসে ৩০-৪০জন শিশু হারানোর কেস রয়েছে। আমি বসে চিন্তা করতাম। কত কী ঘটতে পারে  হারানো শিশুগুলির জীবনে। তাদের যৌনপেশায় বা শিশুশ্রমিক হিসেবে  কাজে লাগানো হতে পারে। এমনকী তাদের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ পর্যন্ত বেচে দেওয়া হতে পারে।”

    তা হতে দেবেন না রাজ, শুরু করলেন লড়াই। একক লড়াই। সম্বল বলতে মেধা আর অদম্য ইচ্ছা।

    আবিষ্কার করলেন নিজস্ব তদন্ত পদ্ধতি

    কয়েক মাসের মধ্যে এসে গেল তাঁর নিজের গবেষণালব্ধ Standard Operating Procedure (SOP)। তদন্তকারী অফিসারদের জন্য ৭২ কলামের একটি বিজ্ঞানভিত্তিক  গাইডলাইন তৈরি করলেন মেধাবী রাজ। রাজের তৈরি  SOP,  তদন্তকারী অফিসারের বাইবেল হয়ে উঠল। যার সাহায্যে খুব কম সময়ে হারিয়ে যাওয়া শিশু বা নারীদের উদ্ধার করা যাবে।  তদন্তে, কোন কাজটা জরুরিকালীন ভিত্তিতে সবার আগে করতে হবে এবং কী ভাবে করতে হবে সব বলা আছে রাজের তৈরি গাইডলাইনে। 

     রাজ বলছেন

    পুলিশ অফিসারদের মনে করতে হবে যেন তাঁদের বাড়ির শিশু বা মহিলা হারিয়ে গেছে। সব বাধা ডিঙিয়ে ঘরের ছেলে-মেয়ে-মা-বোনকে ঘরে ফেরাতে হবে। 

    ●  প্রত্যেকটি শিশু পাচারের কেসকে মানব পাচারের (Human trafficking)  দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে অফিসারদের । শিশু পাচারের  কেসগুলি খুনের কেসের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পাচার হয়ে যাওয়া শিশু প্রতি মুহূর্তে খুন হয়। জোর করে তাকে জঘন্য কাজে লিপ্ত করানো হয়।

    রেড চলতেই থাকবে, থামানো যাবে না। ধরা যাক, নাগপুর এলাকা থেকে একটি মেয়েকে উদ্ধার করা হল। মেয়েটিকে উদ্ধারের পরও সেই এলাকায় আরও রেড করা হবে। মেয়েটির কেস বন্ধ হয়ে যাবে, কিন্তু তার পরেও রেড চলবে। যে যে এলাকা দিয়ে মেয়েটিকে দালালরা নিয়ে গিয়েছিল বা  যেখানে যেখানে তাকে রাখা হয়েছিল, সেখানে সেখানে রেড চলতেই থাকবে। রাজের ফর্মুলায় মহারাষ্ট্রের সবচেয়ে কুখ্যাত নারী পাচারকারী গ্যাং-এর বেশির ভাগ সদস্য এখন জেলে। যারা বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫০০ নাবালিকাকে পাচার করেছিল।

    ●  পাচারকারীদের ধরতে গেলে সবাইকে সচেতন হতে হবে। তাই রাজ তাঁর এলাকার  স্কুল ও কলেজে নিয়মিত পুলিশ টিম পাঠান। সেই টিম গুড টাচ ব্যাড টাচ-এর বিষয়ে বাচ্চাদের সচেতন করেন, বাচ্চাদের জানিয়ে দেন তারা কী করে পাচারকারীদের চিনবে। সচেতন করেন অভিভাবকদের, কী ভাবে অভিভাবকরা মিসিং রিপোর্ট করবেন, যাতে দ্রুত হারানো শিশুকে ফিরে পান। একই সঙ্গে রাজের টিম শিশু ও নারীপাচারের বিষয়ে অটো, বাস , ট্যাক্সির ড্রাইভার ও হকারদের সচেতন করেন।

    রাজ করছেন

    ●  টোপ ফেললেই পাকড়াও। কোনও শিশু বা মহিলাকে কোনও পাচারকারী বা কিডন্যাপার টোপ ফেলে প্রভাবিত করতে গেলেই রাজের টিমের র‍্যাডারে ধরা পড়বে। ছদ্মবেশ ধরা মহিলা পুলিশ অফিসারেরা অত্যন্ত গোপনে দায়িত্ব পালন করেন।

    ● হারিয়ে যাওয়া  মহিলা ও শিশুদের  কেসকে গুরুত্ব সহকারে দেখার জন্য, রাজ প্রত্যেক থানাতে ভিন্ন ভিন্ন টিম তৈরি করেছেন। ২০ বছরের পুরোনো কেসে সাফল্য এনেছেন ।

    ● তদন্তের অগ্রগতি এক সেকেন্ডে বোঝার জন্য রাজ তদন্তের ফাইলে  কালার কোডিং ব্যবহার করেন। যেমন, যে ফাইলের রঙ লাল, বুঝতে হবে সেই কেসে কোনও সূত্র মেলেনি এবং এই কেসটিকে সব চেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। যে ফাইলের রঙ সবুজ, বুঝতে হবে হারিয়ে যাওয়া শিশু বা মহিলার সম্পর্কে সব তথ্য পাওয়া গেছে।

    ●  নাবালিকাদের উদ্ধারের পর রাজের টিম তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সাহায্য করে। এই জন্য তারা শহরের বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও  চাইল্ড ওয়েলফেয়ার সেন্টারের সঙ্গে প্রতিমুহূর্তে সংযোগ রেখে চলে।

    রাজের আগমনে, ২০১৭ সালে পালঘর ডিস্ট্রিক্টে পুলিশি তদন্তে সাফল্যের হার দাঁড়ায় ৮৯ শতাংশে। মাত্র এক বছরে ভাসাই-ভিরার এলাকায় হারিয়ে যাওয়া ৪৫০ জন শিশুকে উদ্ধার করেছিল রাজের বাহিনী। শতাধিক পাচার হয়ে যাওয়া মহিলাকে যৌনপেশায় প্রবেশের আগেই পাচারকারীদের হাত থেকে ছিনিয়ে এনেছিলেন তাঁঁরা।

    ভারতের পুলিশের ছবিটা বুঝি এভাবেই একার হাতে বদলে দিতে চলেছেন বর্তমানে নাগপুর পুলিশের ডেপুটি কমিশনার রাজ তিলক রৌশন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More