সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৩

৫০০ বছর ধরে এক অলৌকিক ঘটনার স্মৃতি বয়ে নিয়ে চলেছে ,পাকিস্তানের বাবে-দি-বের গুরুদ্বার

রূপাঞ্জন গোস্বামী

ষোড়শ শতাব্দী। বর্তমান পাকিস্তানের সিয়ালকোটে বাস করতেন পীর হামজা গাউস। তিনি নানান অলৌকিক কান্ড দেখিয়ে স্থানীয় মানুষদের বোঝাতে চাইতেন তাঁর মধ্যে দৈব ক্ষমতা আছে। মানুষেরা তাঁর কাছে আসতেন বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে। শহরের হিন্দু ও মুসলিম উভয় সমাজে ছিল তাঁর বিপুল প্রভাব।

একদিন এক গিগা নামে এক ক্ষত্রিয় পীরের কাছে এসেছিলেন। তাঁর কোনও পুত্র সন্তান ছিল না। গিগা পীরবাবাকে প্রণাম করে একটি পুত্র সন্তান ভিক্ষা চেয়েছিলেন। পীর হামজা গাউস, সব শুনে ক্ষত্রিয় ব্যক্তিটিকে বলেছিলেন, তিনি মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করবেন। কিন্তু তাঁর একটি শর্ত আছে।

সিয়ালকোট,পাকিস্তান

শর্তটি হল, একাধিক পুত্র সন্তান জন্ম নিলে, পীরবাবাকে প্রথম সন্তানটি উপহার দিতে হবে। রাজি হয়েছিলেন গিগা । পীরবাবা কিছু প্রসাদী শুকনো ফল দিয়েছিলেন ব্যক্তিটিকে। ফলগুলি স্বামী ও স্ত্রীকে খেতে বলেছিলেন।

পীরবাবার তপস্যা

কয়েক বছরের মধ্যে গিগার তিন পুত্র সন্তান জন্ম নিয়েছিল। বড় পুত্রকে নিয়ে পীরের কাছে এসেছিলেন গিগা। পুত্র সন্তানটিকে পীরবাবার পায়ের কাছে বসিয়ে বলেছিলেন, “আমি আমার ছেলেকে আপনাকে উপহার দিলাম । এখন পুত্র সন্তানটির দাম বলুন। আমি আপনাকে টাকা দিয়ে সন্তানটি কিনে নেবো।” তখনকার দিনে এটাই ছিল রীতি।

কিন্তু গিগাকে হতচকিত করে দিয়ে পীর বলেছিলেন, তিনি চান ছেলে। টাকা নেবেন না। কান্নায় ভেঙে পড়ে গিগা বলেছিলেন তিনি পীরবাবাকে প্রচুর অর্থ দেবেন। এমন কি ছেলের ওজনের সমান সোনা-রুপো দেবেন। কিন্তু পীর অনড়। শর্ত অনুযায়ী তাঁকে ছেলেই দিতে হবে। শর্ত ভেঙে ছেলে নিয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন গিগা ।

ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে গিয়েছিলেন পীর সাহেব। তাঁর কথা না মানা মানে, তাঁকে অসম্মান করা। রাগে কাঁপতে কাঁপতে পীরবাবা  গোটা সিয়ালকোট শহরের বাসিন্দাদের বেইমান বলেছিলেন। শহর ও শহরের বাসিন্দারা অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে  বলে অভিশাপ দিয়েছিলেন।

অতীতের সিয়ালকোট শহর

অপমানিত, অভিমানী পীরসাহেব নিজেকে স্বেচ্ছায় বন্দি করে ফেলেছিলেন দরগার গম্বুজওয়ালা ঘরটিতে। ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়েছিলেন ঘরের দরজা। শিষ্যদের বলেছিলেন তাঁকে যেন কেউ কোনও ভাবেই বিরক্ত না করে। তিনি তপস্যায় বসবেন।

ঘর থেকে বেরিয়ে আসবেন চল্লিশ দিন পর। সেদিন, বেইমান শহরবাসীর ওপর নেমে আসবে তাঁর অভিশাপ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়ে কেউ বাঁচবেন না। কেবল বেঁচে থাকবেন তিনি ও তাঁর গোটা কয়েক শিষ্য ছাড়া।

আগুনের মত খবরটি ছড়িয়ে গিয়েছিল সারা শহরে। শহরবাসীরা নিশ্চিত ছিলেন, পীর তাঁর দৈব ক্ষমতায় সিয়ালকোট শহর ধ্বংস করে দেবেন। হিন্দুরা বিভিন্ন দেবতার কাছে, মুসলিমরা বিভিন্ন মসজিদ, দরগা ও মাজারে মানত করতে শুরু করে দিয়েছিলেন শহর ও নিজেদের জীবন বাঁচাতে। ক্ষমা চাইতে বার বার পীরের দরজায় গিয়েছিলেন শহরবাসীরা। পীর ছিলেন অনড় ও নিশ্চুপ।

ঠিক সেই সময়, শিয়ালকোটে আসেন গুরু নানক

কাশ্মীর থেকে পাসুর যাওয়ার পথে শহরে এসেছিলেন শিখদের প্রথম ও প্রধান ধর্মগুরু গুরু নানক। সিয়ালকোট শহরের বাইরে, একটি কবরস্থানের পাশে, একটি বের (কুল) গাছের নীচে, তিনি বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বসেছিলেন। সেখান থেকে দেখা যাচ্ছিল পীরসাহেবের দরগার সুদৃশ্য গম্বুজ। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর গুরু নানক, পীরের দরগায় পাঠিয়েছিলেন শিষ্য মর্দানাকে।

শিষ্য মর্দানা গিয়ে পীরের দরজায় প্রহরারত পীরের মুরিদদের( শিষ্য) বলেছিলেন শিখ ধর্মগুরু গুরু নানকদেব এসেছেন তিনি পীরের সঙ্গে কথা বলতে চান। কিন্তু পীরের মুরিদরা বলেছিলেন, তাঁরা তাঁদের গুরুর কথা অমান্য করতে পারবেন না। তাঁকে কোনও মতেই বিরক্ত করা যাবেনা। মর্দানা ফিরে এসেছিলেন তাঁর গুরুর কাছে।

শহরে ইতিমধ্যে খবর ছড়িয়ে গিয়েছিল, শহরের বাইরে সাদা পোশাক পরা দেবদূত এসেছেন। তিনি চেষ্টা করেছেন পীরের সঙ্গে কথা বলার। কিন্তু পীর ফিরিয়ে দিয়েছেন। আতঙ্কিত শহরবাসী দৌড়ে এসেছিলেন গুরু নানকের কাছে। গুরুনানক শিষ্য মর্দানাকে আবার পাঠিয়েছিলেন পীরের দরজায়। শহরের মানুষেদের পক্ষ থেকে।

গুরুনানক বলে দিয়েছিলেন, যদি আবার মর্দানা ব্যর্থ হন, তিনি যেন পীরের মুরিদদের বলে আসেন, পীরের তপস্যা মাঝপথে ভঙ্গ হবেই। তাই ভক্তদের মুখের দিকে তাকিয়ে পীর যেন ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসেন। সেবারও পীর ও তাঁর মুরিদরা ছিলেন অনড়।

মর্দানা ফিরে এসে গুরুকে জানিয়েছিলেন মুরিদদের বক্তব্য। গুরুনানক স্মিত হেসেছিলেন। সুমিষ্ট কন্ঠে ভজন গাইতে শুরু করেছিলেন শিষ্য মর্দানা। কুল গাছের নিচে উপবিষ্ট গুরু নানক অর্ধনিমীলিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন পীরের দরগার গম্বুজটির দিকে। হতাশ শহরবাসী বসে পড়েছিলেন কুলগাছটিকে ঘিরে।

গুরু নানকের ডান দিকে শিষ্য মর্দানা

সূর্য তখন ঠিক মাঝ গগনে

মেঘমুক্ত ঘন নীল আকাশে উড়ছে একঝাঁক সাদা পায়রা। ভয়ঙ্কর বজ্রপাতের শব্দ ভেসে এলো গম্বুজের দিক থেকে। কেঁপে উঠেছিল শিয়ালকোট শহর। আতঙ্কিত শহরবাসীরা দেখেছিলেন, পীরের দরগার গম্বুজটির মাথায় ভয়ঙ্কর ফাটল ধরেছে।

ফাটল দিয়ে উজ্বল সূর্যালোক প্রবেশ করেছিল ঘরের ভেতরে। অন্ধকারে তপস্যারত পীরের চোখে পড়েছিল আলো। ভঙ্গ হয়েছিল তপস্যা। গম্বুজের বাকি ছাদ ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় আতঙ্কিত পীর প্রতিজ্ঞা ভুলে দরজা খুলে দৌড়ে বাইরে এসেছিলেন। হতাশ হয়েছিলেন পীরের মুরিদরা। উল্লাসে ফেটে পড়েছিলেন পীরবাবার ভক্তরা।

তাঁরা গুরু নানকের পায়ে লুটিয়ে পড়েছিলেন। লজ্জা পেয়ে পীর এসেছিলেন গুরু নানকের কাছে। শহরবাসীর বিরুদ্ধে প্রতিজ্ঞাভঙ্গের অভিযোগ করেছিলেন। বলেছিলেন, শহরবাসীরা মিথ্যুক। পীর, ফকির, সন্ন্যাসীতে ভক্তি নেই। তাই শহরবাসীর শাস্তি পাওয়া উচিত।

আজও গম্বুজটির মাথায় আছে সেই ফাটল

গুরু নানক হেসে বলেছিলেন, “পীরের কাজ ক্ষমা করা, ধংস করা নয়। ঈশ্বর বা আল্লা, ভালোবাসারই অপর নাম। আমরা তাঁর দাস। খোদার ক্ষমার পথই আমাদের পথ হওয়া উচিত। পৃথিবীতে এমনিতেই অবিশ্বাস, দ্বন্দ্ব ও ঘৃণায় পরিপূর্ণ। আমরা ঈশ্বরের সেবকরা তাই ভালোবাসার বীজ বপন করব। আপনি যদি সন্তানের পিতা হতেন। কাউকে আপনার সন্তান মন থেকে চিরতরে দিয়ে দিতে পারতেন! আমার মনে হয় না পুরো শহর মিথ্যুক।

এই বলে গুরু নানক, শিষ্য মর্দানাকে শহরের দোকানে এক পয়সার সত্য আর এক পয়সার মিথ্যা কিনতে পাঠিয়েছিলেন । দোকানদাররা হেসে কুটোপাটি। সবাই ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, একজন দোকানি ছাড়া। তিনি মৌলা কারার। তিনি একটি কাগজে মৃত্যুই সত্য জীবন মিথ্যা লিখে গুরুকে দেখাতে বলেছিলেন।

গুরু নানক ও পীর হামজা গাউস

মর্দানা গুরু নানককে চিরকূটটি দিয়েছিলেন। তিনি স্মিত হেসে সেটি পীরবাবাকে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, “দেখুন আপনার কথা ঠিক নয়, আধ্যাত্মিক ভাবে জীবিত অন্তত একজন মানুষ এই শহরে আছেন। এবং সত্য কী আর মিথ্যা কী সবার জানা সম্ভব নয়। তাই সারা শহরের ওপর আপনার এই ভয়ঙ্কর ক্রোধ অযৌক্তিক।”  পীরসাহেব তাঁর ভুল বুঝেছিলেন। গুরু নানককে অভিবাদন জানিয়েছিলেন।

আজও আছে গুরু নানকের স্মৃতি মাখা সেই কুল গাছ

বাবে-দি-বের সাহিব

ঘটনার পর নাথা সিংহ নামে এক ভক্ত কুল গাছটির অদূরে  তৈরি করেন গুরুদ্বার বাবে দি বের সাহিব। গুরু নানকের এই ঘটনাটিকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে।

গুরুদ্বার বাবে-দি -বের সাহিব

গুরু নানকের স্মৃতি মাখা কুল গাছটি আজও জীবিত আছে। আছে পীর হামজা গাউস সাহেবের সেই ফাটল ধরা গম্বুজটিও। দেশভাগের পর শিখ ধর্মের পবিত্র এই তীর্থস্থানটি ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের জন্য বন্ধ করে দিয়েছিল পাকিস্তান।

কিন্তু সম্প্রতি তারা ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের জন্য খুলে দিয়েছে ৫০০ বছর পুরোনো এই ঐতিহাসিক গুরুদ্বারটি। গুরু নানকের ৫৫০তম জন্ম জয়ন্তীকে স্মরণীয় করে রাখতে। নাকি, পীর সাহেবের মতই জেদ ধরে রাখতে না পেরে।

Comments are closed.