মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৭

সাইবেরিয়ার ডলগ্যান , অস্তিত্বের সংগ্রামে হার না মানা একদল যোদ্ধা

রূপাঞ্জন গোস্বামী

উত্তর দিকে উত্তর মহাসাগর, দক্ষিণে কাজাখিস্তান, মঙ্গোলিয়া ও চীন সীমান্ত। পূর্বে  প্রশান্ত মহাসাগর এবং পশ্চিমে উরাল পর্বতমালা। এর মাঝখানে  এক কোটি একত্রিশ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে অবস্থান করছে তুষারমরু সাইবেরিয়া।

সপ্তদশ শতাব্দী থেকে যে ভৌগোলিক অঞ্চলটি রাশিয়ার অংশ এবং যেটি সমগ্র রাশিয়ার ৭৭% অংশ জুড়ে আছে। এবং যেখানে প্রতি বর্গমাইলে মাত্র ৬ থেকে ৭ জন মানুষ বসবাস করেন।

বিশ্বযুদ্ধের সময়ে রাজনৈতিক বন্দীদের কারাগার এবং নির্বাসনের স্থান হিসেবে বিশ্বব্যাপী সাইবেরিয়ার কুখ্যাতি থাকলেও, তীব্র ও অসহনীয় ঠান্ডার জন্য বিখ্যাত সাইবেরিয়া। শীতকালে এ অঞ্চলের তাপমাত্রা শূন্যের ৭০ ডিগ্রি নীচে নেমে যায়। সারা বছরে বৃষ্টিপাত হয় মাত্র ১৫ সেমি বা তারও কম। বছরে মাত্র ৮ থেকে ১০ সপ্তাহ থাকে গ্রীষ্মকাল।

জমে যাওয়া বৈকাল হ্রদ, সাইবেরিয়া

মানুষের বসবাসের পক্ষে অনুপযুক্ত আবহাওয়া মনে হলেও এখানেই প্রায় এক লাখ বছর আগে মানুষের বসতি গড়ে উঠেছিল। সাইবেরিয়ার একটু উষ্ণ অংশের বিভিন্ন শহরে সভ্য ও আধুনিক মানুষ বাস করলেও, সাইবেরিয়ার বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করে বিভিন্ন উপজাতি সম্প্রদায় যারা আজও আদিম জীবনে অভ্যস্ত। যেমন ‘ডলগ্যান’।

সাইবেরিয়ার তাইমির পেনিনসুলায় বাস করে ডলগ্যান উপজাতি

রাশিয়ানরা ১৭ শতাব্দীতে মধ্য ও পূর্ব সাইবেরিয়াতে ডলগ্যানদের দেখা পায়। এই রাশিয়ান উপজাতি অত্যন্ত লড়াকু এবং  স্বাধীনচেতা নৃগোষ্ঠী। অনেক নৃবিজ্ঞানীর মতে এরা মধ্য এশিয়ার লড়াকু তাতারদের বংশধর। এশিয়া থেকে হাজার হাজার বছর আগে তারা সাইবেরিয়া গিয়েছিল খাদ্যের সন্ধানে। রাশিয়ার মধ্যে বাস করে, আজও যারা সভ্যতা থেকে নিজেদেরকে ইচ্ছা করেই দূরে রেখেছে।

ডলগ্যান উপজাতি

২০১০ সালের জনগণনায় জানা যায় প্রায় ৭৮৯০ জন ডলগ্যান সাইবেরিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে বাস করে। হাজার পাঁচেক ডলগ্যান ডুডিনকা নামে এক শহরের আশেপাশে বাস করলেও। প্রায় ২০০০ এর বেশি ডলগ্যান সাইবেরিয়ার একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাস করে। তুষারঝড় ও মৃত্যুশীতল তাপমাত্রায় প্রতিনিয়ত লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয় তাদের। যাদের জীবনযাত্রা এক কথায় অবিশ্বাস্য।

 ডলগ্যানরা বরফের ওপর পেতে ফেলে অস্থায়ী গ্রাম

বেশিরভাগ ডলগ্যান যাযাবর। গরমের সময়ে ডলগ্যানরা উত্তরের দিকে যায়। শীতে দক্ষিণের দিকে আসে একই পথ ধরে। প্রত্যেক বছর যাত্রাপথ পরিবর্তন করে। তিন বছর অন্তর অন্তর আবার পুরনো রুটে ফিরে আসে।

কয়েকশো মাইল যাত্রার পর বরফের ওপর  ডলগ্যানদের স্লেজ গুলো এসে থামে। স্লেজ থেকে নামানো হয় বাড়ি। স্লেজ গাড়িতে বয়ে নেওয়া যায় এমন বাক্স বা শঙ্কু আকৃতির খুঁটি দিয়ে টাঙানো বাড়ি। এই বাড়ি গুলির নাম ‘চাম’।

উপযুক্ত জায়গায় গ্রাম পাতার জন্য এগিয়ে চলেছে ডলগ্যান উপজাতিরা

কিছু কিছু ডলগ্যান গোষ্ঠীর স্থায়ী গ্রীষ্ম আবাস আছে। গ্রীষ্মের আবাসগুলি সাধারণত নদী বা জঙ্গলের ধারে হয়। সেগুলিও কাঠের তৈরি। শিকারের সময় বা খাদ্য সংগ্রহের সময় বা মরসুমি স্থানান্তরের সময় স্থায়ী বাড়িগুলি পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকে।

বহনযোগ্য শঙ্কু আকৃতির বাড়িগুলি সাধারণত একটি ঘরের ও বাক্স আকৃতির বাড়িগুলি দুটি ঘরের হয়। প্রতি পরিবারের একটি করে বাড়ি থাকে। পরিবারের ছেলের বিয়ের পর প্রথম সন্তান জন্মালে, ছেলেকে আলাদা বাড়ি বানিয়ে নিতে হয়। বাড়িগুলিতে একটা জানলা থাকে। ভেতরে সারাদিন চর্বির প্রদীপ জ্বলে। কার্বন-ডাই-অক্সাইড বের করে দেওয়ার জন্য বিশেষ নল থাকে।

ডলগ্যানদের স্লেজ দিয়ে টানা বাড়ির জানলায় ডলগ্যান শিশু

সঙ্গে থাকা কয়েকশো বল্গা হরিণদের খাদ্য যেখানে পাওয়া যায়, সাধারণত  সেখানেই অস্থায়ী গ্রাম পেতে ফেলে ডলগ্যানরা। আফ্রিকার মাসাই উপজাতির যেমন গরু, সাইবেরিয়ার ডলগ্যানদের তেমন বল্গা হরিণ। এই বিশাল শিংওয়ালা গড়ে আটশো কেজি ওজনের হরিণগুলির ওপর নির্ভর করেই বেঁচে রয়েছে ডলগ্যানরা। এই বল্গা হরিণরা যাযাবর ডলগ্যানদের খাদ্য ও বস্ত্র জোগায়। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গোটা গ্রামকে স্লেজ গাড়িতে করে বহন করে নিয়ে যায়।

ডলগ্যানদের গ্রাম আবার পেশাগত ভাবে দুই ধরণের হয়। শিকারী ডলগ্যানদের গ্রাম ও পশুপালনকারী ডলগ্যানদের গ্রাম। শিকারীদের গ্রামে একাধিক পরিবার মিলে এক একটি শিকারের দল তৈরি করে। এরকম দশ বারোটি দল শিকারে বার হয়। শিকার করে বল্গা হরিণ, খরগোশ, শিয়াল, পাখি ও মাছ। বরফে গর্ত খুঁড়ে তার মধ্যে শিকার করা পশু,পাখি, মাছ রেখে দেয়।  খাবার সময় প্রয়োজন মত প্রকৃতির ডিপ-ফ্রিজ থেকে বার করে নেয়।

বল্গা হরিণেরা চরে বেড়াচ্ছে,,পাহারায় আছে ডলগ্যানরা

পশুপালনকারী ডলগ্যানদের আবার শহরে যাতায়াত আছে। তারা কাছাকাছি শহরে পশম ও চামড়া বেচে প্রয়োজনীয় খাবার দাবার, ওষু্‌ধ, বাসনপত্র কিনে আনে। কখনও কখনও দুটি ডলগ্যান গোষ্ঠী একে অপরের কাছ থেকে বিনিময় প্রথায় প্রয়োজনীয় জিনিসের আদানপ্রদান করে। এক একটি অস্থায়ী গ্রামে গ্রামবাসীর সংখ্যা ৫০ থেকে ৬০০ জন পর্যন্ত হতে পারে।

 আজও আদিম খাদ্যেই পেট ভরে ডলগ্যানদের 

ডলগ্যানদের মূল খাদ্য বল্গা হরিণ, পাহাড়ি ভেড়া, খরগোশ,হাঁস ও বিভিন্ন পাখির মাংস ও ডিম। এছাড়াও তারা খায় মাছ ও বল্গা হরিণের দুধ। আটা জাতীয় খাবার খুব কমই খায় ডলগ্যানরা। সবজি প্রায় খায় না বললেই চলে। গ্রীষ্মের সময় মাশরুম সংগ্রহ করে রাখে শীতে খাওয়ার জন্য। সমস্ত খাবার স্লেজের ওপর রেখে বরফের গুড়ো ছড়িয়ে দেয়  বা বরফের গর্তে রাখে।

সাধারণত নভেম্বর মাসে পোষা বল্গা হরিণ কাটে মাংসের জন্য। কারণ শীতকালে অবিশ্বাস্য ঠাণ্ডা ও তুষারপাতের মধ্যে অনেক সময় পাঁচফুট দূরের বস্তু দেখা যায় না। তখন বল্গা হরিণের মাংস, জমাট দুধ, রক্ত, চর্বি আর বরফে কাঠ হয়ে থাকা মাছই ডলগ্যানদের প্রধান খাদ্য হয়ে ওঠে।

বরফে রেখে দেওয়া হয়েছে বল্গা হরিণের মাংস

ডলগ্যানদের রান্নার পদ্ধতি খুবই সাধারণ। কয়েক ধরণের জড়িবুটি ফেলে মাছ বা মাংস সেদ্ধ করে তাতে একটু লবন ফেলে দেওয়া। বল্গা হরিণের দুধও খায় লবণ ফেলে। হিমায়িত কাঁচা মাছ বা পশুর মেটে পাতলা ফালি করে কেটে  লবণ ছড়িয়ে কাঁচা খায়। চিনির ব্যবহার খুব কম এদের খাদ্যে। বরফে জমিয়ে তোলা দুধ ও চর্বির টুকরো সারাক্ষণ মুখে রেখে লজেন্সের মতো চুষে খায় ডলগ্যানরা।

লবণে জারানো কাঁচা মাছের টুকরো, খেতে হবে গাছের ডাল দিয়ে তৈরি কাঁটা দিয়ে

ডলগ্যানদের সমাজে বয়স্করা পান সর্বোচ্চ সম্মান

গ্রামের বাচ্চা থেকে বুড়ো সবাইকেই দেখা যায়  সারাদিন কিছু না কিছু কাজ করতে। পুরুষরা শিকারে যায়। কাঠ, হাড়, চামড়া দিয়ে শিকারের অস্ত্র তৈরি করে। স্লেজ গাড়িতে বহনযোগ্য মাছ ধরার নৌকা তৈরি করে। বল্গা হরিণদের দেখভাল করে ও হরিণদের প্রজনন করায়। বল্গা হরিণের গা থেকে পশম তোলে। বরফের তলায় জমিয়ে রাখা মাছ বা মাংস কুড়ুল দিয়ে কাটে। জ্বালানি কাঠ জোগাড় করে। গ্রীষ্মকালে দূর থেকে স্লেজে করে বরফ খন্ড নিয়ে আসে খাবার জলের জন্য। শহরে চামড়া ও শিং বেচতে যায়। স্থানান্তরের সময় গ্রাম গুটিয়ে স্লেজে বোঝাই করে।

ডলগ্যানরা সব সময় কোনও না কোনও কাজ নিয়ে  ব্যস্ত থাকে

অন্যদিকে ডলগ্যান নারীরা পরিবারের জন্য খাবার বানায়। বিভিন্ন পশুর পশম ও  চামড়া দিয়ে দিয়ে পোশাক, বিছানার চাদর, তাঁবু তৈরি করে। বল্গা হরিণের পায়ের চামড়া দিয়ে জুতো বানায়। বিভিন্ন পশু পাখির নাড়িভুঁড়ি শুকিয়ে ও পাকিয়ে এরা সুতোর কাজ চালায়।

নারীদের আরেকটি কাজ হল, গ্রামের নিরাপত্তারক্ষীদের দেখভাল করা। এক একটি অস্থায়ী ডলগ্যান গ্রামে পঞ্চাশ থেকে ষাটটা চুকচা বা হাস্কি প্রজাতির কুকুর থাকে। ভয়ঙ্কর বদমেজাজি কিন্তু পরিশ্রমী কুকুরগুলিকে ডলগ্যানরা প্রচণ্ড ভালবাসে। কুকুরগুলি গ্রামের নিরাপত্তা দেওয়া ছাড়াও প্রয়োজনে স্লেজ টানে ও চরার সময় বল্গা হরিণদের চোখে চোখে রাখে। যাতে কোনও বল্গা হরিণ দলছুট না হয়।

ডলগ্যানদের হাস্কি কুকুর

ডলগ্যান সমাজে বয়স্ক নারী পুরুষদের কথাকে সবাই বেদবাক্য বলে মানা হয়। তাঁদের কাজ গ্রামবাসীদের মধ্যে একতা ধরে রাখা ও  বিয়ের ঘটকালি করা। সাধারণত চারপুরুষ দূরের সম্পর্কে বিয়ে হতে বাধা নেই। তুতো ভাইবোনদের মধ্যেও বিবাহ হয়, তবে কম।

বিয়েতে কনেপক্ষ যৌতুক হিসাবে দেয় বল্গা হরিণ, মাছ ধরার নৌকা বা শহুরে বাসনপত্র। বিয়ে হয় কনের বাড়িতে। তিনদিন ধরে চলে খানাপিনা। আত্মীয়রা দূরদূরান্ত থেকে আসে স্লেজ গাড়ি চালিয়ে। .

প্রেম করে বিয়েও হয়। কিন্তু বিয়ের আগে বাড়ির সবচেয়ে বয়স্ক মানুষটির অনুমতি নিতে হবে। তিনি অনুমতি দিয়েই দেন কারণ এখনও ডলগ্যানদের সমাজে প্রেম করলে বিয়ে করা বাধ্যতামূলক।

ডলগ্যানদের আকাশে অরোরা বোরিয়ালিস

জন্মের মতোই মৃত্যু আসে ডলগ্যানদের জীবনে। মৃত্যু্র পর মৃতদেহ দুদিন বাড়িতে শুইয়ে রাখা হয়। তৃতীয় দিন বিকেল বেলায় বরফের সমাধিতে শুইয়ে দেওয়া হয় মানুষটিকে। মৃত মানুষটি পুরুষ হলে সঙ্গে দেওয়া হয়  তির ও ধনুক ও নারী হলে চিরুনি ও ছুঁচ সুতো।

পরবর্তীকালে সহজে চিহ্নিত করা যাবে এমন এক জায়গায় সমাধিস্থ করা হয় মানুষটিকে। সমাধির ওপরে কাঠ দিয়ে ক্রস চিহ্ন তৈরি করা হয়। সেই  রাতে বল্গা হরিণের মাংসের ভোজ দেওয়া হয়। সন্তানেরা বল্গা হরিণের মাথাটা রেখে আসে হয় সমাধির ওপর।

হিমশীতল তুষারমরুর বরফের নীচে শুয়ে থাকে  রুদ্ধশ্বাস ও লড়াকু জীবন শেষ করা এক ডলগ্যান।  তিন বছর পর এই রুটেই  ফিরে আসবে তার সন্তানেরা, সেই আশা নিয়ে।

Comments are closed.