বৃহস্পতিবার, জুন ২০

এ তো প্রায় রূপকথা, আমাজনের গহীন জঙ্গলে বইছে ফুটন্ত এক নদী!!!

রূপাঞ্জন গোস্বামী
পেরুর এক প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রামে বসে বালক আন্দ্রেস রুজো তার গাঁওবুড়ো ঠাকুরদার কাছে একটা গল্প শুনেছিল। একটা রূপকথার নদীর গল্প। যে গল্প শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শুনে আসছে পেরুর শিশুরা, তাদের ঠাকুরদা ,ঠাকুমা, দাদু , দিদিমার কাছ থেকে।
আমাজনের গভীরে বাস করতো এক প্রকাণ্ড সাপের আত্মা।  নাম তার ‘ইয়াকুমামা’ (জলের মা)। মানুষের ক্ষতি করতো না। শিশুদের খুব ভালো বাসতো। কিন্তু এক অপদেবতা ‘তালাল্লু’  ছোটছোট ছেলেমেয়েদের ক্ষতি করতো। তাদের ভেতরে ঢুকে তাদের শরীর নষ্ট করে দিত। ছেলেমেয়েদের বাবা মা কাঁদত। ইয়াকুমামা তখন তাঁর গর্ভে দুটি সন্তান ধারণ করল।
সন্তানদু’টি হলো দুটি নদী। একটি ঠান্ডা জলের নদী এবং অপরটি শানয়-টিম্পিসকা (ফুটন্ত নদী)।  উষ্ণনদীটির মাথায় সূর্য্যদেবতা একটা সাপের মাথার মতো বড় পাথর বসিয়ে দিলেন। শানয়-টিম্পিসকার জল শিশুরা পান করলেই অপদেবতা তালাল্লু পালাতে পথ পেত না। সেই থেকে, শানয়-টিম্পিসকা দৈব নদী হয়ে পেরুর জঙ্গলের গভীরে বইতে লাগলো। তালাল্লু পালালো দেশ ছেড়ে।

আমাজনের গভীরে লুকিয়ে থাকা এই সেই নদী

আন্দ্রেস রুজো আজ বালক নেই। ছোটবেলায় শোনা গল্পটা তাঁর মাথার ভেতর ঘুরতো সব সময়। বড় হয়ে পড়তে চলে যান ভূগোল নিয়ে আমেরিকার টেক্সাসে। সেখানে প্রযুক্তির সাহায্যে  তৈরি করেন পেরুর থার্মাল ম্যাপ। স্যাটেলাইটের সাহায্যে তৈরি করা এই ম্যাপে পেরুর উষ্ণতম স্থানগুলো চিহ্নিত করতে থাকেন।

বছর খানেক ধরে সেই ম্যাপ খুঁটিয়ে দেখে স্তম্ভিত হয়ে যান আন্দ্রেস। তিনি ম্যাপের মধ্যে  আবিস্কার করলেন অত্যন্ত গরম একটি বক্ররেখা। যেটি দৈর্ঘ্যে প্রায় চার মাইল। পৃথিবীর যেকোনও মহাদেশের ভূভাগের থার্মাল ম্যাপে এতো বড় উষ্ণরেখার সন্ধান মেলেনি। আগ্নেয়গিরির কথা আলাদা। থার্মাল ম্যাপে সহজেই আগ্নেয়গিরিকে চিহ্নিত করা যায়। এতবড় বক্ররেখাটি কোনও আগ্নেয়গিরি হতে পারেনা।
উত্তপ্ত রেখাটি তাহলে কী?  এই কি ঠাকুরদার বলা সেই গল্পের ফুটন্ত নদী শানয়-টিম্পিসকা?

জলের উষ্ণতা মাপছেন আন্দ্রেস রুজো

আন্দ্রেসের গবেষণা শুরু হলো। আন্দ্রেস ইতিমধ্যে ভূবিজ্ঞানী। প্রচুর যন্ত্রপাতি তাঁর ল্যাবে। তিনি ঠিক করলেন নিজেই খুঁজে বের করবেন  থার্মাল ম্যাপের উষ্ণ রেখাটিকে। বিভিন্ন সূত্রে খবর পেলেন উষ্ণরেখাটির কাছে অবস্থিত  মায়ানটুয়াচু গ্রামের কিছু পুরোহিত একধরনের  ঔষধিগুণ যুক্ত গরম জল বিক্রি করেন। তাতে বিভিন্ন রোগ সারে বলে স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস।

সূত্র মারফত আন্দ্রেস জানতে পারলেন গরম জলের উৎসের কাছে কাউকে ঘেঁসতে দেননা পুরোহিতরা। গেলে বিপদ অনিবার্য। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, শর্ত এবং অর্থের বিনিময়ে পুরোহিতদের সম্মতি আদায় করলেন আন্দ্রেস। শর্ত একটাই উৎসের জল বিক্রি করতে পারবেন না।

গবেষণার জন্য অবশ্য নিতে পারবেন কিছুটা। এর অন্যথা হলে বেঁচে ফিরতে পারবেন না আন্দ্রেস। এবং আন্দ্রেসকে গরম জলের উৎসে যেতে হবে পুরোহিতদের বেছে দেওয়া লোকের সঙ্গে। অবশ্য আন্দ্রেস একজন লোককে সঙ্গে নিতে পারবেন। তাতেই রাজি হয়ে গেলেন আন্দ্রেস।

নদীর ধারে বাঁশি বাজিয়ে পবিত্র নদীকে তুষ্ট করছেন পেরুর পুরোহিত

নভেম্বর ২০১১, রুজো তাঁর আমাজন অভিযান শুরু করে দিলেন। সঙ্গে নিলেন কোন অভিজ্ঞ অভিযাত্রীকে নিলেন না। নিলেন  তাঁর অতি উৎসাহী মাসিকে। মাসিও ছোটো বেলায় গল্পটি শুনেছিলেন। পেরুর থার্মাল ম্যাপের উষ্ণ রেখাটির সবচেয়ে কাছের শহর পুকাল্লপা। সেখানে পৌঁছে গেলেন। গাড়িতে উঠলো পুরোহিতদের বেছে দেওয়া এক গাইড। তার সঙ্গে আবার আগ্নেয়াস্ত্র।

পুকাল্লপা থেকে গাড়িতে বিপদসংকুল পথ পেরোলেন তাঁরা  সাড়ে চার ঘণ্টায়। এলো এক ঠান্ডা জলের নদী। সেই নদীতে মোটর চালিত ক্যানো করে দলটি এলো, পেরুর অংশে থাকা আমাজন অরণ্যের এক প্রত্যন্ত অংশে। সেখান থেকে আরও পঁয়তাল্লিশ মিনিট দূর্গম কর্দমাক্ত পথে গামবুট পায়ে হেঁটে তিনজন এসে দাঁড়ালেন এক নদীর সামনে। দশফুট দূর থেকেই যার গরম হল্কা অনুভব করলেন আন্দ্রেস। নদীর জলের ওপরে বাষ্পের ঢেউ পাক খেয়ে খেয়ে শূন্যে মিলিয়ে যাচ্ছে।

আনন্দে উচ্ছাসে মাসি আর আন্দ্রেস চিৎকার করে উঠলেন। নদী থেকে একটু দূরে টেন্ট ফেলতে লাগলো গাইড।

নদীর জল ফুটছে টগবগ করে

ল্যাটিন আমেরিকার দেশ পেরুর অংশের আমাজন অরণ্য অত্যন্ত ঘন এবং প্রায় দুর্ভেদ্য। এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক ফুটন্ত জলের নদী। আন্দ্রেস জলের তাপমাত্রা মাপলেন, ২০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট। নদীর বুকে ছড়ানো  হাতীর দাঁতের মতো ধবধবে সাদা পাথর। দুদিকে ৬০ ফুট উঁচু জঙ্গলের দেওয়াল। জলের গভীরতা প্রায় ১৬ থেকে ২৫ ফুট। নদীটি প্রস্থে ৮২ ফুট। নদীর পাড়ের বালি অস্বাভাবিক গরম। খালি পা, ফেলাই যায় না। ফেললেই সেকেন্ডের মধ্যে থার্ড ডিগ্রি বার্ন অবশ্যম্ভাবী।

নদীর জলে ভেসে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন প্রাণীর দেহ, ব্যাঙ, কাঠবেড়ালি থেকে বানর পর্যন্ত। আন্দ্রেস নদীর ভেতর থেকে সন্তর্পণে কিছু সাদা পাথর তুলে নেন। নেন কিছু প্রাণীর দেহও, তাঁর গবেষণার জন্য। নমুনাগুলি নিয়ে যান তাঁর টেন্ট কাম ল্যাবরেটরিতে। স্বপ্নপূরণে খুসি, আন্দ্রেসের মাসি লেগে পড়েন রান্নাবান্নায়,গাইডকে নিয়ে।

আন্দ্রেস রুজোই পৃথিবীর প্রথম ভূবিজ্ঞানী, যিনি হাজার হাজার বছর ধরে পেরুর পুরোহিতদের লুকিয়ে রাখা, ফুটন্ত জলের নদীতে প্রবেশাধিকার পেয়েছিলেন। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিনে লেখা তাঁর প্রবন্ধ থেকেই বিশ্ব জানতে পেরেছে, মৃত্যু শীতল আমাজনের বুকে লুকিয়ে আছে এক ফুটন্ত জলের নদী। যে নদীর জল, যে কোনও প্রাণীকেই কয়েক মিনিটে জীবন্ত সেদ্ধ করতে সক্ষম।

নদীর পাড়ে গবেষণারত রুজো

কেন  নদীর জল অস্বাভাবিক গরম? তাহলে কি কোনও আগ্নেয়গিরির লাভা চুঁইয়ে এসে নদীর জল এতো উত্তপ্ত করে তুলছে? কিন্তু তা অসম্ভব। কারন, সবচেয়ে কাছের আগ্নেয়গিরি প্রায় চারশো মাইল দূরে। তাহলে কি পৃথিবীর অভ্যন্তরে থাকা গলিত ম্যাগমা উষ্ণপ্রস্রবণের ধাঁচেই নদীর জল উত্তপ্ত করছে! কিন্তু রুজ দেখেছেন আমাজনে ম্যাগমাটিক সিস্টেম নেই। তাই ম্যাগমাকেও জলের অস্বাভাবিক তাপের জন্য দায়ী করা যাবে না। তাহলে কীভাবে ২০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটে উঠছে নদীর জলের তাপমাত্রা!

নদীর জলে সেদ্ধ হয়ে যাওয়া ব্যাঙ

রুজো  প্রবন্ধটিতে জানিয়েছেন   fault-led hydrothermal feature নদীর জলকে এতো উত্তপ্ত করে তুলেছে। নদীর জল চুঁইয়ে মাটির ভেতরে ঢুকছে। আবার উত্তপ্ত হয়ে ফিরে আসছে ওপরে। তবে রুজ এখনও নিঃসন্দেহ নন। তাঁর গবেষণা এখনও চলছে। রুজ এখন একটা বড়সড় দল নিয়ে অভিযানে নামতে চলেছেন।

তবে রুজ চিন্তিত পেরুর আমাজনের ওই  অঞ্চলে ব্যাপক হারে গাছ কাটা নিয়ে।  যে পথ যেতে তাঁর  সময় লাগত সাড়ে চার ঘন্টা । এখন গাড়িতে লাগে তিন ঘন্টা। এখন সরাসরি আগুন গরম নদীর ধারে পৌঁছে যাওয়া যায়। শহর ক্রমশ ঢুকে পড়ছে আমাজন অরণ্যে। রুজো  তাই  Boiling River Project নামের এক সেচ্ছাসেবী সংগঠন তৈরি করেছেন নদীটিকে বাঁচাতে। তিনি জানেন মানুষের লোভ নদীটিকে বাঁচতে দেবে না। তাই, পেরুভিয়ান রূপকথার নদী শানয়-টিম্পিসকাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য রুপকথার লড়াইয়ে নেমেছেন  ভূবিজ্ঞানী  আন্দ্রেস রুজো

Comments are closed.