ভারতের প্রথম মহাকাশচারী রাকেশ শর্মা, যিনি দেশকে মহাকাশে ডানা মেলার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

 রূপাঞ্জন গোস্বামী

১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দের ২ এপ্রিল। এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হওয়ার জন্য সারা দেশ বসে পড়েছিল টিভির পর্দার সামনে। দূরদর্শনের পর্দায় ভেসে উঠেছিল ইন্দিরা গান্ধীর মুখ। ভেতরের আনন্দ চেপে রাখতে পারছিলেন না তাঁর মতো লৌহমানবীও।

টিভির পর্দায় ভেসে এসেছিল সেই সুরেলা কন্ঠ, “স্কোয়াড্রন লিডার রাকেশ শর্মা, পুরো দেশের নজর এখন আপনার দিকে। আমরা সবাই আপনাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। এটা একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। আমাদের আশা এর ফলে আমাদের দেশ অন্তরীক্ষের প্রতি সচেতন হবে এবং এর ফলে আমাদের তরুণ সম্প্রদায় সাহসী হবার প্রেরণা পাবে।

আপনাকে অনেক প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করছে, কিন্তু অল্প প্রশ্নই করছি। পৃথিবীতে আপনার ট্রেনিং ভীষণ কঠিন ছিল, কারণ এখানে  মহাকাশের পরিবেশ (কৃত্রিম ভাবে) সৃষ্টি করা হয়েছিল। এখন আপনি বাস্তবের মহাকাশে আছেন। পরিস্থিতি কি একই রকম না আলাদা?”

দূরদর্শনের পর্দায় দেশ দেখছিল ইন্দিরা গান্ধী আর রাকেশ শর্মার কথোপকথন

দূরদর্শনের পর্দায় ভেসে উঠেছিল স্যালিউট -৭ মহাকাশ স্টেশনের কন্ট্রোল রুম। সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন ছয় মহাকাশচারী। তাঁদের মধ্যে বাম দিক থেকে তৃতীয় ছিলেন রাকেশ শর্মা। তাঁকে দেখে সারা ভারত উল্লাসে ফেটে পড়েছিল।

ইথার তরঙ্গে ভেসে এসেছিল স্কোয়াড্রন লিডার রাকেশ শর্মার কন্ঠস্বর, “সবার প্রথমে আমি সমস্ত ভারতবাসীকে ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আমার সহ মহাকাশচারীদের পক্ষ থেকে আপনাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। এখানের পরিস্থিতি পৃথিবীর মতো নয়, অনেক কঠিন। তবে আমরা সাফল্যের সঙ্গে সব বাধা পেরিয়েছি……।”

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল, “ওপর থেকে ভারতবর্ষকে কেমন দেখাচ্ছে?”  মহাকাশ থেকে ভেসে এসেছিল এক গর্বিত ভারতবাসীর সেই অবিশ্বাস্য উত্তর, “একটুও না ভেবে বলতে পারি, সারে জাঁহা সে আচ্ছা।”

মহাকাশ থেকে আমাদের ভারতকে যে রকম দেখায়

রাশিয়ার ইন্টারকসমস কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে, ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্সের টেস্ট পাইলট রাকেশ শর্মাকে মহাকাশে পাঠিয়ে পৃথিবীকে চমকে দিয়েছিল ভারত।

ভীষণ কঠিন পরীক্ষার বাধা টপকে,  ১৯৮২ সালে ২০ সেপ্টেম্বর, মহাকাশচারী হওয়ার জন্যে মনোনীত হয়েছিলেন রাকেশ শর্মা। ১৯৮৪ সালের ২ এপ্রিল, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বৈকানুর কসমোড্রোম থেকে মহাকাশের দিকে উৎক্ষিপ্ত হয়েছিল সোভিয়েত মহাকাশযান সোয়ুজ টি-১১। মহাকাশযানে ছিলেন দু’জন সোভিয়েত মহাকাশচারী, কম্যান্ডার ইউরি মালিশেভ এবং ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার গেন্নাদি স্ত্রেকালভ। আর ছিলেন ভারতের রাকেশ শর্মা।

রাশিয়ার দুই মহাকাশচারীর সঙ্গে রাকেশ শর্মা

তাঁরা সোয়ুজ টি-১১ মহাকাশযানে করে মহাকাশে অবস্থিত স্যালিউট -৭ স্পেস-স্টেশনে পৌঁছান। স্যালিউট -৭ স্পেস-স্টেশনে রাকেশ শর্মা ৭ দিন ২১ ঘণ্টা এবং ৪০ মিনিট কাটান। ভারত ও রাশিয়ার তিনজনের দলটি মহাকাশে থাকাকালীন  ৪৩টি বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায়। এর মধ্যে রাকেশ শর্মা দায়িত্বে ছিল বায়ো-মেডিসিন এবং রিমোট সেন্সিং সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা। যা তিনি সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করেন।

মহাকাশ অভিযানের সেরে পৃথিবীতে ফেরার পর সোভিয়েত ইউনিয়ন রাকেশ শর্মাকে ‘হিরো অফ দ্য সোভিয়েত ইউনিয়ন’ সম্মানে ভূষিত করে। ভারত তাঁকে অশোকচক্র প্রদান করে। এখনও পর্যন্ত তিনিই একমাত্র ভারতীয় নাগরিক, যিনি মহাকাশ ভ্রমণ করেছেন। কল্পনা চাওলা বা সুনীতা উইলিয়ামস মহাকাশ ভ্রমণ করলেও তাঁরা ভারতীয় নাগরিক ছিলেন না।

মহাকাশ অভিযান শেষে পৃথিবীতে ফিরে এলেন রাকেশ শর্মা

মনে প্রশ্ন জাগে রাকেশ শর্মার মত ভারতীয় মহাকাশচারীর মুখ, মহাকাশ থেকে আবার কবে ভেসে উঠবে টিভির পর্দায়!

উত্তরটি অবশ্য এ বছর স্বাধীনতা দিবসে, তাঁর ভাষণে দিয়ে দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এখনও পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও  চিন, এই তিন দেশের মহাকাশচারীরা মহাকাশযান ছেড়ে মহাশূ্ন্যে পা রেখেছেন। এ বার সেই তালিকায় প্রবেশ করবে আমাদের ভারত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর ভাষণে বলেছেন ২০২২ সালের মধ্যেই ভারতীয় মহাকাশচারীরা ভেসে বেড়াবেন মহাশূ্ন্যে।

ইসরো-এর চেয়ারম্যান কে শিবান, সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন ‘গগনযান’ নামে এক মহাকাশযান করে তিনজন ভারতীয় মহাকাশচারী মহাকাশে যাবেন। ভারতের ৭৫তম স্বাধীনতা দিবসের ছ’মাস আগেই এই গগনযান অভিযান সম্পন্ন করা হবে।  এই মিশনের জন্য ব্যবহার করা হবে, দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি GSLV Mk-III লঞ্চ ভেহিকল।

গগনায়ন মিশনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে ইসরো
‘গগননায়ন’ মিশনের জন্য তিনজন মহাকাশচারীকে বেছে নেওয়া হবে শীঘ্রই। যুগ্মভাবে তিন মহাকাশচারী নির্বাচন করবে ভারতীয় বায়ুসেনা ও ইসরো। নির্বাচিত মহাকাশচারীদের প্রস্তুতি নিতে হবে দুই থেকে তিন বছর। এর মধ্যে তাঁদের মহাকাশে থাকতে হবে পাঁচ থেকে সাত দিন।
অতএব বোঝাই যাচ্ছে, বেঙ্গালুরুর নিউ বিইএল রোডের ‘অন্তরীক্ষ ভবন’ কিন্তু  ক্রমশ ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে। নামটা অচেনা লাগছে? আমরা না জানলেও সারা বিশ্বের মহাকাশ সংস্থা, মহাকাশ বিজ্ঞানী ও গবেষক ও মহাকাশচারীরা ‘অন্তরীক্ষ ভবন’ নামটির সঙ্গে বেশ পরিচিত। কারণ এটিই ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো-এর সদর দপ্তর। যে সংস্থাটি একের পর এক সফল মহাকাশ অভিযান করে বিশ্বের বিস্ময় হয়ে উঠেছে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More