দেশের প্রথম রূপান্তরকামী মডেল তিনি, ব়্যাম্প কাঁপান বিশ্বজুড়ে! আজও বন্ধ বাড়ির দরজা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    তিয়াষ মুখোপাধ্য়ায়

    যেন অন্য কারও শরীরের ঢুকে গিয়েছিল তাঁর মনটা। যেন অন্য কারও জীবনে বাঁচছিলেন তিনি। যেন অন্য কোথাও অন্য কোনও চাহিদা ফেলে এসেছিলেন তিনি। রোজ যেন হারিয়ে ফেলছিলেন কিছু। নিজের সঙ্গে নিজের লড়াইয়ে ক্ষতবিক্ষত হতে হতে এক দিন বুঝেছিলেন, নিজের ভিতরে একটি মেয়েকে বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। তাঁর পুরুষ শরীরে আসলে বাস করছে একটি মেয়ে!

    তুমি ছেলে কিন্তু মেয়েদের মতো আচরণ করো কেন?

    এখন এই কথাটা শুনলে হয়তো একটা বড় অংশের মানুষের তেমন কোনও প্রতিক্রিয়াই হবে না। তৃতীয় লিঙ্গ, রূপান্তরকামী– এই শব্দগুলোর সঙ্গে এখন অনেকটাই পরিচিত সাধারণ মানুষ। কিন্তু সালটা যখন ২০০৫ আর দেশটা যখন নেপাল, তখন বছর কুড়ির যুবকের পক্ষে নিজের লিঙ্গ নিয়ে এই দ্বন্দ্বের কথা প্রকাশ্যে জানানো মোটেই সহজ ছিল না। এই কঠিন পথেই লড়াই শুরু হয়েছিল তাঁর। সে পথের শেষে মিলেছে সাফল্য। নেপালের ও ভারতের প্রথম ট্রান্সজেন্ডার মডেল হিসেবে ফ্যাশন দুনিয়ায় আজ সুপরিচিত তিনি।

    নেপালের নুয়াকোটের এক কৃষক পরিবারে ওয়াইবা দম্পতির কোল আলো করে আসা পুত্রসন্তানের নাম রাখা হয়েছিল নবীন। আর পাঁচটা শিশুর মতোই বেড়ে উঠেছিল সে। সমস্যা শুরু হয় কিশোর বয়স থেকে। এমনই অজানা ও অদ্ভুত এক সমস্যা, যে কথা কাউকে বলাও যায় না, বোঝানো দূরের কথা! তাঁর কথায়, “ছোটবেলা থেকেই আমি ছেলেদের পোশাকের চেয়ে মেয়েদের পোশাক পরতেই বেশি পছন্দ করতাম। স্কুলে আমাকে এ জন্য বৈষম্য ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। আমার বন্ধু ও শিক্ষকরা বলত, তুমি ছেলে কিন্তু মেয়েদের মতো আচরণ করো কেন?”

    ভালবাসি, বিয়েও করব!

    ২০০৫ সালে প্রথম বার নিজের সত্তার কথা প্রকাশ করেন নবীন। কৈশোরের ক্ষতবিক্ষত পথ সবে পার করেছেন তখন তিনি। জানিয়ে দিলেন, ‘অদ্ভুত আচরণ’ই করবেন। মেয়েদের পোশাকই পরবেন এখন থেকে তিনি।

    বলাই বাহুল্য, পরিবারের কেউ মেনে নেয়নি নবীনের এমন অদ্ভুত সিদ্ধান্ত। মা ও বোন পাশে থাকলেও, তাঁরাও চেয়েছিলেন ‘সুস্থ’ হয়ে উঠুক নবীন। লড়াইয়ের শুরু সেই থেকেই। কলেজে পড়াশোনার খরচ নিজেকেই জোগাড় করতে হতো। সেই ২০০৫ সালেই ভালবেসেছিলেন এক জনকে। সে কথাও কাউকে জানানো হয়নি তখন। কিন্তু এখন, প্রায় দেড় দশক পার করে এসে একটি সাক্ষাৎকারে নবীন জানিয়ে দেন, ভালবাসার মানুষকে কোনও না কোনও দিন বিয়েও করতে চান তিনি।

    লিভিং ইনসাইড সামওয়ান এলসেস স্কিন

    তবে এখন আর তিনি নবীন নন। তিনি অঞ্জলি, অঞ্জলি লামা। নেপালের প্রথম ট্রান্সজেন্ডার মডেল হিসেবে প্রায় দশ বছর ধরে দেশবিদেশের ব়্যাম্প কাঁপাচ্ছেন তিনি। আত্মপরিচয়ে হয়ে উঠেছেন অনন্যা। হয়ে উঠেছেন বড় বড় ব্র্যান্ডের মুখ, নামিদামী পত্রিকার প্রচ্ছদ।

    বলাই বাহুল্য, এ সাফল্য আসেনি সহজে। কিন্তু কঠিন জেনেও, এই পথেই হেঁটেছিলেন অঞ্জলি। ভারতে এসে শুরু করেছিলেন মডেলিংয়ের চেষ্টা। কারণ তাঁর মনে হয়েছিল, সারা বিশ্বে ভারতীয় ফ্যাশন দুনিয়ার ভাবমূর্তি বেশ ইতিবাচক। তাই নিজেকে প্রকাশ করার স্বাধীনতার জন্য এই প্ল্যাটফর্মকেই দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখেছিলেন বলে জানান তিনি। ছোট থেকে বেড়ে ওঠা, পরিস্থিতির সঙ্গে তাঁর লড়াই— এ সবে অনুপ্রাণিত হয়ে কিছু দিন আগে তৈরি হয়েছে একটি তথ্যচিত্রও। অঞ্জলি– লিভিং ইনসাইড সামওয়ান এলসেস স্কিন।

    তুমি হিজড়ে, ফ্যাশন শোতে তুমি কী করবে!

    অঞ্জলি বলচিলেন, “একটা সময় পর্যন্ত আমি সত্যিই চেষ্টা করতাম নিজেকে বদলানোর। ভাবতাম, সত্যিই হয়তো আমি অস্বাভাবিক। কিন্তু ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আমি যখন আমারই মতো আরও বহু মানুষ দেখলাম, তখন বুঝতে পারলাম এটা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। আর পাঁচ জন মানুষের চেয়ে আমার কিছু কম নেই। আমিও সব পারি। মডেলিংও করতে পারব। নিজেকে বিশ্বাস করতে শিখলাম তখনই। শিখলাম, নিজের পরিচয় না লুকিয়ে, নিজের প্রতিভাকে আরও উন্মুক্ত করা উচিত।”

    কিন্তু অঞ্জলি যতই আত্মবিশ্বাসী হোন না কেন, প্রথম দিকে সহজ ছিল না কিছুই। সালটা ২০০৯, স্থান মুম্বইয়ের ফ্যাশন পাড়া। ২৪ বছর বয়স হয়ে গেছে অঞ্জলির তখন। যে বয়সে পেশাদার মডেলদের কেরিয়ার শেষের দিকে এগোতে শুরু করে, সে বয়সে মডেলিং-দুনিয়ায় অডিশন দিতে এসেছিলেন অঞ্জলি। “প্রথম দিকে আমি অনেক অডিশন দিলেও কেউ আমাকে নিতে চায়নি। বলেছে, তুমি হিজড়ে। ফ্যাশন শোতে তুমি কী করবে!”– প্রত্যাখ্যানের ধাক্কা আজও ফুটে ওঠে অঞ্জলির গলায়।

    লিঙ্গসত্তাকে ছাপিয়ে যায় প্রতিভা

    কিন্তু হাল ছাড়েননি কোনও ভাবেই। একটু একটু করে নিজেকে তৈরি করেন। ২০১০ সালে একটি অস্ত্রোপচারও করেন নিজের শরীরে। হয়ে ওঠেন আরও একটু নারী। তার পরেই নবীন নাম বদলে অঞ্জলি লামা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি।

    শেষমেশ ২৫ বছর বয়সে মডেলিং শুরু করেন অঞ্জলি। ডাক আসে কয়েকটি ফ্যাশন পত্রিকার ফটোশ্যুটে। আর ফিরে তাকাতে হয়নি। অঞ্জলির দুর্দান্ত প্রতিভা চাপা দিতে পারেনি তাঁর লিঙ্গ-সত্তা। শুরু হয় নিউ ইয়র্ক, মিলান, প্যারিসের র‌্যাম্পে হাঁটা।

    পরিবারের দরজা বন্ধই

    কিন্তু এত কিছুর পরেও পরিবারের দরজা খোলেনি তাঁর জন্য। “আমি তখন তুমুল ব্যস্ত, দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে যাচ্ছি। আমার ভাই ফোন করে বলল, যেটা করছো সেটাই করো। আর কখনও ফিরো না আমাদের বাড়িতে।”– বলেন অঞ্জলি। এর পরেই পাকাপাকি ভাবে মুম্বইয়ে থাকতে শুরু করেন তিনি।

    পরে নেপালের এলজিবিটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ব্লু ডায়মন্ড সোসাইটির সদস্য-কর্মী হন তিনি। সেই সংস্থার হয়ে এখনও কাজ করছেন। ভারতেরও বেশ কয়েকটি সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত তিনি। প্রায় ৩৫ ছুঁয়েও মডেলিং কিন্তু ছাড়েননি। তাঁর কথায়, “কেউ যদি মনে করে যে সে ট্রান্সজেন্ডার আর এই ভেবে সে নিজেকে লুকিয়ে রাখে, তাহলে সে কোনও দিনই কিছু অর্জন পারবন না। সে নিজেই নিজের কাছে হেরে যাবে।”

    নিজেকে প্রকাশ করা জরুরি

    তাই যারা নিজের লিঙ্গসত্তা নিয়ে সমস্যায় রয়েছে, দ্বন্দ্বের মধ্যে রয়েছে, তাদের প্রতি অঞ্জলির বার্তা, “নিজেকে প্রকাশ করুন, আপনি যেমনটা চান তেমন ভাবেই চলুন। যা পেতে চান তার জন্য লড়াই করুন, লুকিয়ে থাকবেন না। প্রথম দুয়েক দিন সমস্যা হবে, তার পর আর হবে না। তখন আপনার ভালো লাগবে, নিজেকে সফল বলে মনে হবে।”

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More