সৌরভ কালিয়ার ক্ষতবিক্ষত দেহ ফেরত পাঠিয়েছিল পাকিস্তান, তবুও জ্বলছে বদলার আগুন

নায়েক গুল নামে এক পাক সেনা, পাকিস্তানের টিভিতে প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিল, ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়া সহ ছয় সেনাকে তারাই হত্যা করেছিল।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    হিমাচলের পালামপুরের ডিএভি স্কুলে পড়ত মিষ্টি চেহারার লাজুক ছেলে সৌরভ। কথা বলত খুব কম। অত্যন্ত মেধাবী। অমৃতসর থেকে পড়তে এসেছিল সে। ক্লাসে বরাবরই প্রথম হয়। কিন্তু তার বন্ধুত্ব ক্লাসের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া ছেলেটির সঙ্গেও। ক্যুইজে তার প্রচুর আগ্রহ। পৃথিবীর হেন তথ্য নেই, যা সে জানে না। ছেলেটি অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজে গিয়েছিল। স্নাতক স্তরেও করেছিল দুর্দান্ত ফল। বন্ধুরা ভেবেছিল, হয় সৌরভ বিজ্ঞানী হবে, নয় প্রফেসর।

    না, সে সব কিছুই হননি তিনি। ১৯৯৭ সালের আগস্ট মাসে কম্বাইন্ড ডিফেন্স সার্ভিস পরীক্ষায় বসে পড়েছিলেন। সেখানেও সফল। যোগ দিয়েছিলেন ইন্ডিয়ান মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে। ১২ ডিসেম্বর, ১৯৯৮, ভারতীয় সেনাবাহিনীর জাঠ রেজিমেন্টের ফোর্থ ব্যাটেলিয়নের ক্যাপ্টেন হয়ে গিয়েছিলেন সৌরভ কালিয়া। প্রথম পোস্টিংই হয়েছিল কার্গিলের কাকসার সেক্টরে। ১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাসে কার্গিলে থাকা তাঁর ব্যাটেলিয়নের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন সৌরভ।

    বাবা মায়ের সঙ্গে ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়া।
    ১৫ মে, ১৯৯৯

    ১৯৯৯ সালের মে মাস। কার্গিলের পাহাড়ে পাহাড়ে গত শীতে পড়া বরফ গলতে শুরু করেছে। শীতকালে প্রচুর বরফ পড়ে এই কাকসার সেক্টরে। তাপমাত্রা নেমে যায় শূন্যের অনেক নীচে। ন্যাড়া পাহাড়ের চূড়ায় থাকা ভারতীয় সেনাবাহিনীর বাঙ্কারগুলি তখন চাপা পড়ে যায় কয়েকফুট বরফের তলায়। ভারতীয় সেনারা তখন বাঙ্কার ছেড়ে নেমে আসেন তাঁদের শীতকালীন পজিশনে। গ্রীষ্মকালে পাহাড় চূড়ার বরফ গলে গেলে আবার তাঁরা উঠে যান পাহাড়চূড়ার বাঙ্কারগুলিতে।

    আরও পড়ুন: কার্গিল যুদ্ধে পাকিস্তানকে চরম শিক্ষা দিয়েছিলেন, ভারত মায়ের বীর সন্তান ক্যাপ্টেন বিক্রম বত্রা

    ১৯৯৯-এর ১৫ মে, ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়া ছিলেন ১৪ হাজার ফিট উঁচুতে থাকা বজরঙ্গ পোস্টে। কাকসার-লাংপা এরিয়ায় ভারতীয় সেনার তখন জোরদার পেট্রল চলছিল। জানার চেষ্টা হচ্ছিল, কতখানি বরফ গলেছে। সেই মতো সেনারা ফিরে যাবে গ্রীষ্মকালীন বাঙ্কারগুলিতে। লাইন অফ কন্ট্রোলের কাছে, প্রায় ১৮০০০ ফুট ওপরে থাকা একটি ভারতীয় বাঙ্কারের বর্তমান অবস্থা দেখতে ছ’জনের একটি দল পাঠিয়েছিল ভারতের ১২১ নং ব্রিগেড।

    দলে ছিলেন ২২ বছর বয়সী ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়া ও পাঁচ জওয়ান। তাঁরা হলেন, সিপাই ভিখা রাম‚ অর্জুন রাম‚ ভনওয়র লাল বাগারিয়া‚ মূলা রাম ও নরেশ সিং। কতটা বরফ গলেছে দলটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তারই জরিপ করছিল। ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়ার হাতে ছিল বাইনোকুলার। বাইনোকুলারের ভিউ-ফাইন্ডারে চোখ রেখে লাইন অফ কন্ট্রোলের কাছে থাকা বিভিন্ন পাহাড়ের মাথায় মাথায় ভারতের ছেড়ে আসা পজিশনগুলি লক্ষ্য করছিলেন ক্যাপ্টেন কালিয়া।

    হঠাৎ, সৌরভ কালিয়ার নজরে পড়েছিল একটি ভারতীয় বাঙ্কারে কিছু মানুষের নড়াচড়া। অবাক হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। ভারতীয় সেনা তো গ্রীষ্মকালীন পজিশনে যায়নি, ওরা তাহলে কারা! আবার ভালো করে দেখলেন, এবার চমকে উঠেছিলেন। মানুষগুলির পোশাক তাঁর চেনা। লাইন অফ কন্ট্রোল পেরিয়ে ভারতীয় পোস্ট দখল করে নিয়েছে পাকিস্তানি রেঞ্জার্স। সঙ্গে সঙ্গে ওয়াকিতে খবর পাঠিয়েছিলেন উর্দ্বতন কতৃপক্ষের কাছে। ক্যাপ্টেন সৌরভ জানিয়েছিলেন, সীমানা পেরিয়ে শত্রুসেনা ঢুকে পড়েছে ভারতীয় ভূখণ্ডে।

    এলাকার  বিভিন্ন পাহাড়চূড়া দখল করে বসে থাকা পাকিস্তানি ফৌজের বাইনোকুলারেও ধরা পড়েছিলেন সৌরভ কালিয়া ও পাঁচ ভারতীয় জওয়ান। ভারী মেশিনগানের গুলি ছুটে এসেছিল পাকিস্তানি সেনাদের দিক থেকে। একটু না দমে, সঙ্গে থাকা রাইফেল ও অল্পকিছু গুলি নিয়ে এক দুঃসাহসী লড়াইয়ে নেমেছিলেন ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়া। পিছু না হটে, বীরবিক্রমে সৌরভ  ও তাঁর পাঁচ সঙ্গী গুলি করতে করতে এগিয়ে চলেছিলেন নির্দিষ্ট পর্বতটির দিকে।

    কিন্তু  তাঁরা বুঝতে পারেননি, অভিমন্যুর মতই তাঁরা ঢুকে পড়ছিলেন এক চক্রব্যুহে। পাক সেনা ও উগ্রপন্থীদের পাতা ফাঁদে। তাঁরা বুঝতে পারেননি, শুধু সামনে নয়, আসে পাশে এমনকি পিছনের পাহাড়গুলির ওপরেও ঘাপটি মেরে আছে অগণিত পাক সেনা। কিছুদূর এগোবার পর চারদিক থেকে গুলি আসতে শুরু করেছিল। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও কয়েকশো পাক সেনার বিরুদ্ধে পাথরের আড়াল থেকে গুলি চালিয়ে গিয়েছিলেন ছয় অকুতোভয় ভারতীয়। ফুরিয়ে আসছিল গুলি। সাহায্য চেয়ে ঘাঁটিতে খবর পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সে সাহায্য আসার আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল গুলি। ঘিরে ফেলেছিল পাক সেনা। আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন ছ’জন।

    কাকসার সেক্টরের এই জায়গায় টহল দেওয়ার সময় নিখোঁজ হয়ে যান ক্যাপ্টেন সৌরভ সহ ছয় ভারতীয় সেনা।

    ভারতীয় সেনার ব্যাক-আপ দল, ক্যাপ্টেন সৌরভের জানানো জায়গাটিতে এসে ভারতীয় দলটিকে খুঁজে পায়নি। রক্ত, ধস্তাধস্তি বা অন্য কোনও চিহ্ন নেই মাটিতে কিংবা পাথরে। ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়ার দলটির খোঁজে ভারতীয় সেনা আরেকটু এগোতেই পাহাড়গুলির মাথা থেকে ছুটে এসেছিল ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি। আচমকা এই আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছিলেন দুই ভারতীয় জওয়ান।

    ভারতীয় সেই মুহূর্তে সেনা বুঝতে পেরেছিল রীতিমত যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে পাকিস্তান। নিয়ে এসেছে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র। পাক অধিকৃত কাশ্মীরের ভেতর দিয়ে লাইন অফ কন্ট্রোল পর্যন্ত, তৈরি করে ফেলেছে সাপ্লাই লাইন। কিন্তু কোথায় ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়া আর তাঁর পাঁচ সঙ্গী!

    শুরু হয়েছিল পাকিস্তানের পৈশাচিক অত্যাচার

    সেদিন বিকেলে, পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের ‘স্কার্দু রেডিও‘ ঘোষণা করেছিল, “পাকিস্তানি সেনার হাতে ধরা পড়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়া ও তাঁর পাঁচ সঙ্গী”। আনন্দে মেতেছিল পাকিস্তান ও পাক অধিকৃত কাশ্মীর। পাক অধিকৃত কাশ্মীরের গোপন ক্যাম্পে শুরু হয়েছিল ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়া ও তাঁর পাঁচ সঙ্গীর ওপর অকথ্য অত্যাচার। ১৫ মে থেকে ৭ জুন পর্যন্ত চলেছিল অমানুষিক অত্যাচার। যুদ্ধবন্দি সংক্রান্ত জেনেভা কনভেনশনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে।

    ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়ার সারা গায়ে কয়েক হাজার সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছিল। গরম শলাকা ঢুকিয়ে দুই কানের পর্দা ফুটো করে দেওয়া হয়েছিল। তীক্ষ্ণ কিছু দিয়ে দুটি চোখ গেলে দেওয়া হয়েছিল। শক্ত কিছু দিয়ে মেরে সব দাঁত ভেঙে দেওয়া হয়েছিলো। ধাতব কিছু দিয়ে মেরে মাথার খুলি ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ঠোঁট ও দু চোখের চোখের পাতা কেটে নেওয়া হয়েছিল। কেটে নেওয়া হয়েছিল হাত ও পায়ের সবকটি আঙ্গুল এমনকি যৌনাঙ্গও। সব শেষে মাথায় গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছিল সৌরভ কালিয়া্কে। মেরে ফেলা হয়েছিল সৌরভের সঙ্গে থাকা পাঁচ জওয়ানকেও।

    নায়েক গুল নামে এই পাক সেনা স্বীকার করেছিল, ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়া সহ ছয় সেনাকে তারাই হত্যা করেছিল।
     দেশে ফেরত এসেছিল ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়ার ছিন্নভিন্ন দেহ

    ৯ জুন‚ ১৯৯৯ ,পাকিস্তান ফেরত দিয়েছিল যুদ্ধবন্দি ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়া ও পাঁচ জওয়ানের কফিনবন্দি দেহ। কফিন খুলে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল ভারত। ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট থেকে জানা গিয়েছিল, মৃত্যুর আগে ২২ বছরের সৌরভ কালিয়া ও তার সাথী জওয়ানদের কী অমানুষিক অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিল।

    কার্গিল যুদ্ধ  শুরু হয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই। ছয় ভারতীয় সেনার পৈশাচিক হত্যার খবর পেয়ে উন্মত্ত ভারতীয় বাহিনী  তার সর্বশক্তি উজাড় করে ভয়ঙ্কর আক্রমণ করেছিল ভারতের মাটিতে পা রাখা পাকিস্তানি সেনাকে। পাকিস্তানি সেনারা যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে হারতে শুরু করেছিল। তারই মধ্যে, ১৫ জুন ভারত সরকার পাকিস্তানি হাই -কমিশনারকে ডেকে জানিয়েছিল, যুদ্ধবন্দী সংক্রান্ত জেনেভা প্রস্তাব শোচনীয় ভাবে লঙ্ঘন করেছে পাকিস্তান। ওই আন্তর্জাতিক প্রস্তাবের ১৩ নম্বর ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, এক জন যুদ্ধবন্দির সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ ব্যবহার করতে হবে। তার উপর কোনও শারীরিক বা মানসিক অত্যাচার করা যাবে না। সমস্ত রকম হিংসার ঘটনা থেকে তাঁকে সুরক্ষা দিতে হবে।

    ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়ার বাড়ি ‘সৌরভ নিকেতনে আজও আছে ‘সৌরভ স্মৃতি কক্ষ’।

    তৎকালীন বিদেশ মন্ত্রী যশোবন্ত সিং, পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রী সরতার আজিজকে জানিয়েছিলেন, ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়া সহ ছয় সেনার হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি দেওয়ার জন্য। না হলে ভয়ঙ্কর পরিণাম ভোগ করতে হবে পাকিস্তানকে। পাকিস্তান বরাবরের মতো ভারতের এই গুরুতর অস্বীকার করেছিল। ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়াকে পাশবিকভাবে হত্যা করার ১৩ বছর পর, ২০১২ সালের ১৪ ডিসেম্বর,পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রহমান মালিক জানিয়েছিলেন,ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়া মারা গিয়েছিলেন খারাপ আবহাওয়ার জন্য।

    মিথ্যা, লোভ আর ঘৃণার ঔরসে জন্ম নেওয়া পাকিস্তানের বলা কোটি কোটি মিথ্যার তালিকায় যুক্ত হয়েছিল আরেকটি মিথ্যা। সৌরভের বাবা ডঃ এন কে কালিয়া, তাঁর ছেলে এবং পাঁচ ভারতীয় যুদ্ধবন্দিদের ওপর পাকিস্তানের পৈশাচিক অত্যাচারের  বিচার চেয়ে রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। কিছুতেই কিছু হয়নি। নায়েক গুল নামে পাক সেনাটি, পাকিস্তানের টিভিতে প্রকাশ্যে স্বীকার করা সত্বেও, আজও শাস্তি পায়নি পাকিস্তান। আজও শাস্তি পায়নি ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়া ও পাঁচ জওয়ানের নৃশংস খুনিরা।

    ২৩ তম জন্মদিনের ঠিক ২০ দিন আগে, পাকিস্তান ফিরিয়ে দিয়েছিল ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়ার ক্ষতবিক্ষত লাশ। কিন্তু পাকিস্তান জানে না, ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়ার ক্ষতবিক্ষত দেহ থেকে চুঁইয়ে পড়া রক্ত শুধুমাত্র বাইশ বছরের এক ভারতীয় তরুণের রক্ত নয়, সে রক্ত ১৩০ কোটি ভারতবাসীর রক্ত। তাই আজও ভারতীয় সেনার বুকে জ্বলছে বদলার আগুন। সে আগুনে পুড়তেই হবে পাকিস্তানকে। আজ, নয়ত কাল।

    আরও পড়ুন:হাসতে হাসতে শহিদ হয়েছিলেন রাইফেলম্যান যশবন্ত সিং, চিনের থাবা থেকে অরুণাচলকে ছিনিয়ে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More